মার কন্ঠ

আমার কোন জ্বর করেনি। রোদে গা-ও পুড়েনি। তবে ঘুমানোর অসুবিধা ছিল। ঘুম আমার ভাল লাগে। ঘুমাতে ভালবাসতাম। ঘুম যেন আমার রসের নাগরী, যার সাথে চলতো জলাজলি, ঢলাঢলি। ও আমাকে জড়িয়ে নিতো। আবেশায়িত হতে হতো। আবেশ ছড়াতে আমিও ভালবাসতাম। মুচকি মুচকি হাসাহাসি করতাম ঘুম ঢুলু ঢুলু দু’চোখ।

আমার ঘুম কখনো আমাকে নিয়ে এসেছে সাগর পাড়ে। বিশাল জলরাশির মাঝে আঁধারে আমার দৃষ্টি চলে যেতো দূরে। মনে হতো এই বিপুল জলরাশি মাড়িয়ে আমি তখন ওপার আঁধারে পৌঁছে যাবো। আঁধার আমায় করেছে গো বরণ। আমি তো আছি ডুবে তারই মাঝে।

আমার মা ছিল এক। যেমন, অনেকের থাকে। আমার ঘুমের ভেতর উনি আমার পিছু নিতেন। ঘুমালে উনাকে চোখে পড়তো না আমার কখনো। আমি তাতে অবাকই হতাম। এই যে দেখুন, আমি গ্রামের পুকুর পাড়ে হেঁটে চলে এসেছিলাম। পুকুরের টলটলে জল আমাকে আলিঙ্গনে হাত বাড়ালো। আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না। চতুর্দিক আঁধার শুধু পুকুরের উপর এক ছাইরঙা নীলাভ আলো। কেমন ভয় ভয় হচ্ছে। বেশিক্ষণ কিন্তু না। বোধ হয়, গভীর জলের বড় এই পুকুরটা আমার মনের কথা বুঝলো। সে কী তার পানি ছিটিয়ে আমাকে চুমুতে ভিজিয়ে দিয়ে গেলো! না, আমি তো খটখটে শুকনো। তাহলে এমন বোধ হলো কেন? জেলে পাড়ার বুড়ো নিবারণ দাদু বলেছে, জলের সাথে বেশি মাখামাখি হলে এমনই হয়। তবে কি আমি জলে ডুবে যাচ্ছি?

তা হবে কেমন করে? আরে এই আঁধারেই আমার সামনে জলের বিশাল পুকুরটা এক নিমিষে শুকিয়ে কটকটে হয়ে গেলো। দেখো দেখো এর মাঝের গভীর ফাটলে পানি উঁকি দিচ্ছে। কে চুষে নিলো নিমিষে এই তরল পানীয়, মায়ের বুকের দুধ যেমন সন্তান চেপে চুষে নেয়। মনে হলো, আমি নির্বিঘ্ন এক কিশোর পাড়ি দিতে পারবো এই জলের গভীর শুকনো পথ। কী জানি, মাঝের গভীর ফাটলে পৌঁছে গেলে, সেখানে হয়তো কোন এক পথ এসে খুলে যাবে। আমাকে নিয়ে নেবে অতল গভীরে, হয়তো গভীর জলের কোন এক দেশে। সেখানে থাকবে কারা? রুপবতী সখীরা? তাদের মধ্যমণি হয়ে থাকবে তিলোত্তমা মৎস্য এক কন্যা। বেশি ভাবতে পারে না সদ্য কিশোর উড়ু মনটা।

আমি যেই জলে ঝাঁপ দেবো, পেছন থেকে কে যেন আমার শার্ট ধরে টান দিলো। আর বলে উঠলো, “এ্যাই।” আমি কিছুই দেখতে পাইনি। জানি শুধু, আমার চেতনা লুপ্ত হলো। পতিত হচ্ছিলাম ভূমিতে আমি। পুকুর পাড়ের ভেজা ঘাসের অস্তিত্ব অনুভব করিনি আমি এতটুকু। আর জানি, “এ্যাই” বলা কন্ঠটা আর কারোর নয়, আমার মায়ের।

Advertisements

পরশ পাহাড় [শেষ পর্ব]

পরশ পাহাড় [শুরুর পর্ব]
পরশ পাহাড় [মধ্য পর্ব]

এ ঘটনার পর এক বছর পেরিয়ে যায়। সাব্বিরের পাহাড়ে ঘোরার নেশা কাটে না। মায়ের অজান্তে সুযোগ পেলেই সে পাহাড়ে চলে যায়। মুক্ত স্বাধীন জীবনটা তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। পাহাড়ের কোথাও কোথাও ঘুরলে কোন কোন জায়গাকে তার খুব রহস্যময় মনে হয়। কী না কী আছে এতে। শুধু তার নিজের মত আবিষ্কার করার অপেক্ষা। ঔ যে দূরে পাহাড় ঘেরা লেকটা। কী সুন্দর প্রকৃতির কোলে শরীর এলিয়ে বয়ে চলেছে। সাব্বির তার কাছে পৌঁছে যায়। এই লেকের নীরব নিঃসঙ্গ সময়ের রুপ তাকে বেশী টানে। কিন্তু সে রুপের দেখা হয়ে উঠে না যে! কোথা থেকে এত মানুষ আসে এ লেকের কাছে! পাহাড়-প্রকৃতি আর লেকের নিঃসঙ্গতা তাকে টেনে ধরে। কী জানি, এদের সাথে তার এক আত্মার সম্পর্ক সে খুঁজে পায়। এরিই মধ্যে বছরের কোন কোন সময়ে এলে সে এই পাহাড়-প্রকৃতি বা লেককে মোটামুটি নিঃসঙ্গ অবস্থায় পাবে, তা তার জানা হয়ে গেছে। এই তো কিছুদিন আগে, সে ফিরতে বেশ দেরী করে ফেলে। বুকের ভেতরটা কেমন ধুকু-পুকু করতে থাকে, যদি আজ মা কিছু বলে। মাঝে মাঝে তাকে না পেলে মা যে কেমন অস্থির হয়ে উঠে। মাগরেবের আযান হয়ে গেছে। আকাশের লালিমা এখনও মিশে যায় নি। খোলা পাহাড়ে একটু শীত শীত করছে। অথচ মাগরিবের আগেই তার ঘরে থাকার কথা। এ যাত্রায় সে বেঁচে যায়। বাসায় ফিরে মিনার মার সাথে মাকে সে খুব জরুরী কিছু নিয়ে বেশ নিমগ্ন হয়ে কথা বলতে দেখে। মিনার মা যেতে যেতে বলে, “আপা আমি এখন যাই, দেরী হয়ে গেল। পরে কথা বলবো।” বাসার পেছনের দরজা দিয়ে সাব্বির এতক্ষণে ভেতরের বারান্দায় এসে গেছে। সে মূহুর্তে তাকে দেখে মা শুধু শাসনের স্বরে বলার জন্যই বলে, “কিরে কই ছিলি?” সাব্বিরও বুঝে এ মূহুর্তে যেমন তেমন একটা উত্তর দিয়ে দিলেই হবে, “এইতো এইখানে।” আজ একটু ভয়ও পেয়েছিল সে। মূলতঃ সন্ধ্যা নামাতে পথ হারিয়ে ফেলার ভয়। তবুও মাথাটাকে ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করেছে। পরিচিত পথ থেকে যেন বেপথে চলে না যায়। বাসার ভেতরে আলো জ্বালানো আছে। বারান্দায় এখনো আলো জ্বালানো হয় নি। মিনার মার পেছনে সে মিনাকে দেখে। দিন দিনে তাকে কেমন যেন পটু পটু লাগে। আর মিনাকে সামনে দেখলে, সাব্বিরের মাঝে কোথা থেকে হাবাগোবা এক ভাব এসে জড় হয়। ইস্‌, সে যদি বাসায় থাকতো আজ। মিনা নিশ্চ্য়ই তার সাথে দু’চারটে কথা বলতো। না, মিনাকে নিয়ে সে এত সহজে খেলতে বসতে পারবে না। “যেমন খুশী তেমন সাজো”-তে বউয়ের সাজে দেখার পর থেকে, যতবারই মিনাকে সে দেখেছে, ততবারই তার মাঝে আপনা আপনি এক লাজ-নম্র ভাব প্রকট হয়ে উঠেছে। মিনার সামনে আসতেই তার যত সংশয়। তাই দূর থেকে দেখে চলা। আজ সে পরেছে একটা হাতাকাটা কমলা রঙের ফ্রক, যাতে আছে ফুলের কিছু চমৎকার ছাপ। কেমন সুন্দর মানিয়ে গেছে তাকে। গতবারের আগের বার “যেমন খুশী তেমন সাজো”-র তার সেই ইটা রঙের শাড়ীর সাথে আজকের এই সাজের কোথা যেন একটা মিল। এই এক বছরে মিনাকে তার চেয়ে অনেক বেশী চটপটে, সাহসী ও সুঠাম মনে হয় সাব্বিরের। মিনাকে দেখলেই কেন জানি সে নিজেকে তার সাথে তুলনায় বসে যায়। আর বারে বারে মিনাকে সে উঁচুতে স্থান দেয়। সাব্বিরকে দেখে যেতে যেতে মিনা এক নজর তাকায়। সে সাথে তার স্বভাবসুলভ একটা মিষ্টি হাসি দেয়। সে মূহুর্তে সাব্বিরের মিনাকে তার চাইতে কমসে কম দু’তিন বছরের বেশি বড় মনে হয়। এ বছরে মিনা কি আবারো বউ সাজবে? সাব্বিরের পড়াশুনা আগের চেয়ে কিছুটা ভাল হয়েছে। এবার ৬ষ্ঠ স্হান অর্জন করেছে। শুনেছে এবারে মিনা না কি দ্বিতীয় হয়েছে। স্কুলের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণীতে মিনার হাতে পুরস্কার থাকবে, তার হাতে নয়। কিছুটা মুষড়ে পড়ে সাব্বির।

আজও সে সেই স্বপ্নটা দেখে। সে পাহাড়ে উঠার খুব চেষ্টা করছে। পা যে তার একদম চলতে চায় না। উফ্‌ কী ভীষণ কষ্ট! আগে থেকেই পাহাড়ের মাঝামাঝি উঠাবস্থায় সে, অনেক চেষ্টা করেও আরেক পা বাড়াতে পারছে না। কষ্টকরভাবে একই জায়গায় সে থেকে যাচ্ছে! এমন সময় মায়ের গলায় তাকে ডাকার ডাক শোনে। ভীষণ ভয় পেয়ে যায় সাব্বির। আর তখনই সে দেরী না করে পাহাড় থেকে উল্টে পড়ে গড়াতে থাকে নীচে। কোন কিছু ঘটার আগে এবারেও সে আঁতকে ঘুম থেকে উঠে পড়ে এবং বরাবরের মতই ভীষণ আশ্চর্য হয়ে তাকে আবিষ্কার করে বিছানা থেকে উঠে বসা অবস্হায়। বিগত এক বছরে বেশ কয়েকবার সে এই স্বপ্নটা দেখেছে। আবার একসময় ঘুম থেকে উঠার পর ভুলেও গেছে, যদিও কখনো কখনো স্বপ্নটা তার মনে এসেছে।

গত দু’দিন সে ক্লাসে যায়নি। বছরের শুরুতে বার্ষিক পুরস্কার বিতরণীর উপলক্ষে তিনদিন স্কুলে কোন ক্লাস হয় না। সব স্যারই পিটি স্যারকে হেল্প করে খেলাধূলা ও দৌড়-ঝাঁপের ইভেন্টগুলো ঠিকমত শেষ করতে। স্পোর্টসের কথা শুনে মাও সাব্বিরের স্কুলে না যাওয়াতে তেমন কিছু বলে নি। কিন্তু ফাইনাল দিন সকালে সাব্বির স্কুলে যায়। প্রথমে ক্লাসে আসে যদি সহপাঠি কারো দেখা মেলে। কাউকে না পেয়ে সে স্কুলের বড় মাঠে চলে যায়। এখানে ওখানে বিচ্ছিন্নভাবে দৌড় ঝাঁপের প্রতিযোগিতা চলছে। একটা উৎসব উৎসব ভাব। যে যার মত করে উপভোগ করছে। প্যান্ডেলের একপাশে একা একা বসে থেকে সাব্বির একসময়ে শব্দযন্ত্রে বিস্কুট দৌড়ে অংশগ্রহণের ঘোষনা শুনে। তাদের বয়সের ছেলেদের অংশগ্রহণের জন্য আহবান জানানো হচ্ছে। কিছুটা কৌতূহলী হয়ে উঠে সাব্বির। সে মাঠের দিকে পা বাড়ায়। কিছুটা সংকোচ, কিছুটা দ্বিধা তাকে জড়িয়ে রাখে। একসময় মনে হয়, দেখিই না কী হয়! সে ঝটপট দৌড়ের জন্য দাঁড়িয়ে যায়। হুইসেলের সাথে সাথে সে দ্রুত দৌড়াতে থাকে। বিস্কুট ঝুলানো দড়ির কাছে ছুটে যায়। ও মা, লাফাতে না লাফাতেই একটা বিস্কুট তার মুখে এসে পড়ে। আর দেরী না করে সাব্বির বিস্কুট মুখেই দৌড়ে গন্তব্যে পৌঁছে যায়। যুগপৎ দৌড় ও উত্তেজনায় হাঁপাতে থাকে। অনেক কষ্টে স্যারদের তার নাম বলে এবং সে সাথে কোন শ্রেণীর ছাত্র তাও জানাতে হয়। তার পৌঁছার কিছু পরেই বিস্কুট মুখে আরেকজন ছেলেকে তাদের দিকে ছুটে আসতে দেখে।

পুরস্কার হাতে নিয়ে সাব্বির দ্রুত বাসার দিকে পাড়ি দেয়। তখন সন্ধ্যা হয় হয়। মাগরেবের আযান এখনো পড়েনি। দরজা খুলে বাসায় ঢুকে সে ভেতরের বারান্দায় মাকে পায়। জোর স্বরে মাকে শুনিয়ে বলে, “মা, আমি বিস্কুট দৌড়ে প্রথম হয়ে এই কলমটা পুরস্কার পেয়েছি।” মা চুপ করে থেকে কিছুক্ষণ সাব্বিরের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর খুশীতে মার মুখে হাসি ফুটে উঠে।

প্রথম প্রকাশ: প্রথম আলো ব্লগ। ফেব্রুয়ারী ২, ২০১০

পরশ পাহাড় [মধ্য পর্ব]

পরশ পাহাড় [শুরুর পর্ব]

তাই এবারে সে উৎসাহ খুঁজে পেতে চায়। তার বয়েসের বিভিন্ন ইভেন্টে অংশ নিতে মাঠে ঘুরে ফিরে। সুযোগ বুঝে মোরগের লড়াই-এর বৃত্তের মাঝে ঢুকে পড়ে। বাছাই পর্বে ফাইটে টিকে থাকা যে আটজনকে বেছে নেয়া হয়, তাতে তার নাম আসে। প্রথম চারজনের মাঝেই সে ছিল। একটা আকাঙ্খা গড়ে উঠে সাব্বিরের মাঝে। খেলায় যে চতুরতার আশ্রয় সে নিয়েছে, তা অনুসরণ করলে প্রথম তিনজনে তার নাম আসাটা অসম্ভব কিছু না। সে সেদিনের মত বাসায় পৌঁছে যায়। মনে মনে ভালভাবে সে ফন্দি আঁটে, কিভাবে অন্যদের আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচাবে। সে ডিফেন্সিভ খেলতে ভালবাসে। অন্যরা কাঁধ দিয়ে আক্রমণে এলেই সে কুঁজো হয়ে নুইয়ে পরে। তাই আক্রমণগুলো তার গায়ে আর লাগে না। অন্যরা নিজেদের মধ্যে ফাইট করুক, ঝরে পড়ুক। কিন্তু সে নিজে তাতে শরীক হবে না। যখন সংখ্যা কমে তিনে আসবে, তখনই সে সুযোগ খুঁজবে কিভাবে দু’জন মিলে একজনকে আক্রমণ করা যায়। পরিকল্পনা পাকাপাকি করে রাতে সে ঘুমাতে যায়। রাত তার আর কাটে না, যেন স্বপ্নেও সে দেখে কিভাবে তাকে যুদ্ধে টিকে থাকতে হবে।

সকালে ঘুম থেকে সে ঠিকমত উঠতে পারে না। চোখে ঘুমের ঘোর আর কাটে না। বিছানা থেকে উঠতেও ইচ্ছে করে না। ঘুম থেকে উঠতে না দেখে, মা এসে তার কপালে হাত রাখে। সে অবস্থায় মা চিৎকার জুড়ে দেয়, “কাল সারাদিন তুমি কোথায় ছিলে, হ্যাঁ? তোমার গায়ে এত জ্বর কেন? স্কুলে কি করেছিলে, কোথায় ছিলে?” সাব্বির ভড়কে উঠে। মায়ের এ চিৎকারে সে কখনো কিছুই লুকাতে পারে না। গড়গড় সে বলে ফেলে, “মা, কাল স্কুলে আমাদের স্পোর্টস ছিল। আমি কক ফাইটে নির্বাচিত হয়েছি। আজকে আমাদের ফাইনাল। আমাকে যেতে হবে।” তেতেমেতে উঠে মা, “কি বললে? কাল তুমি মাঠে মাঠে দৌড়িয়েছো। রোদে ঘুরে এইজন্য তো জ্বর বাঁধিয়েছো। আমাকে তুমি স্পোর্টসের কথা জানিয়েছো? আবার আজকেও জ্বর নিয়ে মাঠে যাবার কথা বলছো? তোমার কোথাও যাওয়া হবে না। তুমি বাসায় থাকবে।” সাব্বির পড়ি্-মড়ি করে কাঁদো কাঁদো গলায় মাকে বলে, “মা আমাকে যেতে হবে। আজ ফাইনাল।” “আবারো তুমি আমার মুখের উপর কথা বলো। কম সাহস তো তোমার না। দাঁড়াও তোমার বাবা বাসায় আসুক আজকে।” সাব্বির তার নিয়তি আঁচ করে ফেলে। কিন্তু নিয়তিকে মেনে চলা আজ তার পক্ষে সম্ভব না। সে হাঁস-ফাঁস করে। টেবিল ঘড়ির কাটার দিকে তার চোখ পড়ে। বেলা ১১:৩০ মিনিটে কক ফাইটের ফাইনাল। এখন ঘন্টা আড়াইয়ের মতো বাকি। সে কিছুক্ষণ বিছানায় শুয়ে থাকে। কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করে বিছানায়। মাকে যে কিভাবে বুঝ দেয়া যায়! এই মা যে কখনও কখনও তার ছুটে চলার গতিকে বন্ধ করে দেয়, তা সে কিভাবে কাকে বোঝায়? সাত-পাঁচ ভাবে সে। একদিন তো মনে মনে সে খুব কেঁদে ফেলেছিলো। মনে হয়েছিল, মা তাকে একদমই ভালবাসে না। তাকে চায় কি না, তাও সে জানে না। মরে গেলে কী হয়! এমন সব সাত-পাঁচ চিন্তা। আধা ঘন্টা পর গৃহকর্মী শিউলি এসে তার বিছানার পাশে এক বাটিতে করে পাতলা সুজি রাঁধা দিয়ে যায়। সে সাথে দু’টো পাতলা করে বেলে নেয়া রুটি। সাব্বির তৃপ্তির সাথেই সুজি দিয়ে রুটি খায়। খাওয়া শেষ হলে আবার ঘড়ির দিকে তাকায়। একটু একটু করে সময় এগিয়ে যাচ্ছে। তার ভেতরেও ধীরে ধীরে অস্থিরতা আঁকুপাঁকু করছে। নিজের মধ্যে কিছুটা সুস্থ সবল উচ্ছ্বল ভাব নিয়ে আসার চেষ্টা করে সে। মা তার রুমে এলেই খাট থেকে নেমে এসে, সাব্বির পাশে তার পড়ার টেবিলের দিকে আগাতে যায়। তার সামনে এসে মা দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেন, “এই সিরাপটুকু একটু খেয়ে নাও।” শিশি থেকে সিরাপ চামুচে ঢেলে সাব্বিরের মুখে দিয়ে দেন দুই দুইবার। সাব্বির ঔষুধ খেয়ে নিয়ে মাকে বলে, মা আমি এখন বেশ সুস্থ বোধ করছি। মা শুধু ‘ঠিক আছে’ বলে রুম থেকে বেরিয়ে যান। কোনরকম ভাবলেশ নেই মার মুখে। কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়ে সাব্বির। বুঝে উঠতে পারে না, মাকে কোন রকম বুঝিয়ে স্কুলে যেতে পারে কি না। একটু পরে ঘুম ঘুম ভাব তাকে জড়িয়ে ফেলে। ঘড়ির কাটা দশটার কাছাকাছি। বিছানায় আরেকটু শুয়ে নিতে ইচ্ছা হয় তার।

পেছনের পাহাড়ের উত্তরদিকে বসবাস করেন সালেহীন সাহেব। তার যথেষ্ট ভদ্র অথচ দুরন্ত ছেলে সামির পাহাড়ে উঠতে যেয়ে একদিন পাহাড় থেকে নীচে গড়িয়ে পড়ে। পাহাড়ের তলদেশের গা ঘেঁষে পাহাড়ের সমান্তরালে পানির ইয়া বড় মোটাসোটা পাইপ সুবিস্তৃত হয়ে বসানো রয়েছে। কোথাও কোথাও পাইপের আশে-পাশের পাহাড়ের মাটি সরে গিয়ে পাইপটা খুব উন্মুক্ত হয়ে গেছে। সামির পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়লেও অলৌকিকভাবে পাইপের সাথে সংঘর্ষ থেকে বেঁচে যায়। পাহাড়ের উপর থেকে গড়াতে গড়াতে সে একেবারে নীচে এসে সাব্বিরদের বাসার ঠিক সীমানার বাইরে পড়েছিল। সীমানার ভেতর থাকা সাব্বির তখন সামিরের শরীর থেকে এক ক্যোঁত করা শব্দ শুনতে পায়। পুরো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে সে ভীষণ শংকিত হয়েছিল। সামিরের এই অল্পতেই বেঁচে যাওয়াতে তার আশ্চর্য হয় খুব। কোন ব্যথাই লাগেনি ছেলেটার শরীরে। এমূহুর্তে সেও পাহাড়ে উঠার খুব চেষ্টা করছে। পা যে তার একদম চলতে চায় না। উফ্‌ কী ভীষণ কষ্ট! আগে থেকেই পাহাড়ের মাঝামাঝি থাকা সে, অনেক চেষ্টা করেও আরেক পা বাড়াতে পারছে না। কষ্টকরভাবে একই জায়গায় যে সে থাকছে! এমন সময় সে শোনে মায়ের গলায় তাকে ডাক। ভয় পেয়ে যায় ভীষণ সাব্বির। আর ঠিক তখনই সে দ্রুত পাহাড় থেকে উল্টে পড়ে গড়াতে থাকে নীচে। কোন কিছু ঘটার আগে সে আঁতকে ঘুম থেকে উঠে পড়ে এবং ভীষণ আশ্চর্য হয়ে তাকে আবিষ্কার করে বিছানা থেকে উঠে বসা অবস্হায়। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার মতই অবস্থা। দেরী না করে সে তড়িৎ গতিতে ঘড়ির দিকে তাকায়। ও মা, এ তো বেলা তিনটা বাজে। সাব্বির বুঝে উঠতে পারে না, কেন সে এত ঘুমালো। দ্রুত সে ঘর থেকে বেড়িয়ে বাসার সামনের গেইটের দিকে যায়। সামনের রাস্তা দিয়ে দু’চারজন করে স্কুল ছাত্ররা তাদের বাসায় ফিরছে। অস্থির আর ভাঙ্গা মন নিয়ে কোন কিছু না ভেবে বোকার মত দু’তিনজনকে জিজ্ঞেস করে ফেলে, “আচ্ছা, কক ফাইট কি হয়ে গেছে?” কোন সদুত্তর পায় না কারো কাছ থেকে। বরং কোন কিছু বুঝতে না পেরে দু’একজন অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকায়। কেউ ঈষৎ অবজ্ঞা দেখিয়ে চলে যায়। সাব্বিরের আর কাউকে প্রশ্ন করার ইচ্ছে বা সাহস কোনটাই হয় না। তাকে কষ্ট এক ভীষণ গিলে ফেলে। একটা পাওয়া তার হাতছাড়া হয়ে গেছে। মনের কষ্ট মনে গুজে তাকে বাসায় ফেরত আসতে হয়।

এ ঘটনার পর এক বছর পেরিয়ে যায়। [শেষ পর্বের শুরু]

পরশ পাহাড় [শুরুর পর্ব]

পাহাড়ের পাদদেশে থেকে থেকে কেমন যেন উন্মনা হয়ে উঠে সাব্বির। দৃষ্টি তার দূরে ফেলতে পারে না। বাড়ি পালানো ছেলের মতো লুকিয়ে লুকিয়ে পাহাড়ে চড়েছে সে। তাও সুযোগ বুঝে, যখন মা বাসায় থাকেন না বা দুপুরে খাওয়া শেষে গল্পের বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে যান। বাবা তো অফিসে, কখনও কখনও অফিসের কাজে ট্যূরে। কষ্ট করে পাহাড়ে একবার উঠে পড়লে কি চমৎকারই না লাগে। মজাও কী কম। পৃথিবীর নির্মল বায়ু সেবন, সে সাথে চারপাশটাকেও খুব কাছে মনে হতে থাকে। খুব ছোট হয়ে আসে কি না। উঁচুতে থেকে নীচে দেখা যে কী আনন্দের!

এই পাহাড়ের তলেদেশে থেকে থেকে দৃষ্টি সবসময় পাহাড়ের উঁচুতে উঠে যেত তার। সেখানে একটা বাড়ির কিছুটা দেখা যায়। তারপর আর কিছু দেখা যায় না। মনে মনে উপরে উঠে ওপার-এপার সব পার-কে দেখার এক তীব্র আকাঙ্খা জেগে উঠতো। মার কাছে থেকে প্রতিনিয়ত একটা নিষেধ শুনতে থাকায় সাব্বিরের সাহস হতো না মাকে রাগিয়ে পাহাড়ে যেতে। তাই সুযোগের অপেক্ষায় থাকা। বাড়ির পেছনে পাহাড়। বাড়ির সামনে সমতল রাস্তা মসৃণ করে ইট বিছানো। এই পথ দিয়ে স্কুলে যায় সে। স্কুলের ছেলেমেয়েরাও এই রাস্তাটাকে অনুসরণ করে। স্কুলে যায়, বাড়ি ফিরে। নীচে থেকে পেছনের পাহাড় দেখা, নতুবা বাড়ির সামনের রাস্তায় মানুষ চলাচলের দিকে সাব্বিরের অনিমেষ তাকিয়ে থাকা। যেন পথচলা মানুষদের মনের জগতের খবর নেয়া। কিন্তু সে তো এতটুকুন। চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র। কতটুকুই বা বুঝে আর?

স্কুলের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান শুরু হচ্ছে। তিনদিন ব্যাপী ক্রীড়া প্রতিযোগিতা তো মূল আকর্ষণ। সে সাথে প্রতিবছর যারা পড়াশুনায় বিভিন্ন শ্রেণীতে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হচ্ছে, তাদেরকেও এই পুরস্কার বিতরনী অনুষ্ঠানে পুরস্কৃত করা হচ্ছে। গতবছর ক্রীড়া প্রতিযোগীতার দিনগুলোতে সাব্বির মাঠের দিকে পা-ই বাড়ায়নি। মা যদি কিছু বলে। মা কোথাও যেতে দেয় না। পাহাড়ে যেতে অথবা বাসা থেকে দূরে। স্কুল থেকে একটু দেরী হলেই, বাসাখানা মাথায় তুলে। কত যে কৈফিয়ত দিতে হয়। একদিন স্কুল ছুটি হওয়ার অনেক আগে,তাদের বিভিন্ন ক্লাসের মধ্যে ফুটবল প্রতিযোগীতা ছিল বলে মাঠে নেমে পড়েছিল। খেলায় সবাই তো গোল দেয়ার জন্য উপরে উঠে খেলতো। সাব্বিরের কপালে পড়তো গোলকিপার হবার দুর্ভাগ্য বা সৌভাগ্য। তাই সে মেনে নিতো। গোল পোস্টে বল ঠেকানোতে সুনামও কুড়িয়েছিল। অতটুকুতেই আন্তঃস্কুল জুনিয়র ফুটবল প্রতিযোগিতায় সাব্বিরের নাম এলো গোলকিপার হিসেবে। যখন মায়ের কানে এলো, ‘আপনার ছেলে তো ভাল গোলকিপার হয়ে উঠেছ’, তখনই হৈ-হল্লা পড়ে গেল। “কি তুমি পড়াশুনা বাদ দিয়ে ফুটবল নিয়ে মেতেছো? এত বড় স্পর্ধা! কেউ কি তোমাকে কিছু বলার নেই?” সাব্বিরের সকল আগ্রহ উল্লাস ওখানেই অস্তমিত।

তাই গতবছর যখন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা শুরু হলো, স্কুল ছুটি হলেও, মার শাসনের কথা মনে করে সাব্বির আর ওদিকে ভ্রুক্ষেপ করেনি। সে সোজা বাসায় চলে আসে। নতুন বছরে নতুন বইয়ের পাতা ওল্টায় মলাট বাঁধে। মনে মনে পণ করে, এবার তাকে প্রথম, দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় হতে হবে। তার রোল নাম্বার সবসময় ১১-র পরে। গতবছর ছিল ১৩।
আটেও চলে আসতে পারতো সে যদি আর ১১ নাম্বার বেশি পেতো। অংকটাই তাকে ডুবিয়েছে। অথচ এ অংকটাই সে ভাল পারতো ক্লাসে। এবারে ৯ম হয়েছে সে। স্বান্তনা শুধু অতটুকুই। কিন্তু এবারে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা বাদ দেয়ার চিন্তা করতে পারছে না। গতবছর ক্রীড়া প্রতিযোগিতার শেষ দিনে পুরষ্কার বিতরনীর ঠিক আগে আগে সে মাঠে গিয়েছিল। তাদের ক্লাসে ৫ম স্হান অধিকারী শোয়েবের ইচ্ছায়। “চল্‌ দেখি আসি, অন্য সব ক্লাসের কারা কারা প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়েছে।” মূলতঃ পড়াশুনার কথাই সে বুঝিয়েছে। শোয়েবকে অনুসরণ করে ঠিকই সে মাঠে যায় পুরস্কার বিতরনীর কিছু আগে থেকে। মাঠে তখন ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ চলছে। চারিদিকে কেমন সাজ সাজ রব। ভাল লেগে যায় সাব্বিরের। সে তন্ময় হয়ে সবার সাজগুলো দেখে। কেউ সাংবাদিক, কেউ ফটোগ্রাফার, কেউ চাষী, কেউ ফেরিওয়ালা এমন কত কি? একটু পরেই তার চোখ ছানাবড়া হয়ে উঠে। আরে এতো মিনা। তাদের পাশের বাসার। প্রায়ই তো তাকে দেখে বাসার উঠোনে। তার মার সাথে আমাদের বাসায় আসে। এতটুকু মেয়ে এত সুন্দর করে বউ সেজেছে। সে তো শুধু তার এক ক্লাস নীচেই। কালো মেয়েটাকে দেখতে তখন যেন এক কালো পরীই মনে হচ্ছিল তার। সাব্বিরের মুখে লজ্জার আভা দেখা দেয়। দেখতে না দেখতে অন্য ছাত্র-ছাত্রীরা তাকে ঘিরে ধরে। একটু পরে, পিটি স্যার এসে সবাইকে সরিয়ে দেয়। মিনাকে যত দেখে ততই সাব্বির লজ্জা পায়, অবাকও লাগে তার। এতটুকু মেয়ে, সবার সামনে কি সাহসে না মাঠে হেঁটে বেড়াচ্ছে। এ সাহসটুকু কি তার আছে?

পুরস্কার বিতরণী অনু্ষ্ঠানে এসে তার অবাকের আর কিছুই বাকি থাকে না। সবাই যার যার মত পুরস্কার নিয়ে গেছে। কেউ কেউ লেখাপড়ায় ভাল করার জন্য পেয়েছে, আবার কেউ কেউ খেলাধুলায় ভাল করাতে পুরস্কার পেয়েছে। ক্রীড়ায় একাধিক পুরস্কার পেয়ে কেউ চ্যাম্পিয়ান হয়েছে, কেউ হয়েছে রানার আপ। এই মিনাটাও প্রথম পুরস্কার বাগিয়ে নিয়েছে, ‘যেমন খুশি তেমন সাজ’-তে। অথচ তার না আছে পড়াশুনায় ভাল করার স্বীকৃতি, না খেলাধূলায়। সাব্বির কিছুটা বিমর্ষ হয়ে পড়ে। নিজেকে মূল্যহীন মনে হয় তার। মাঠ থেকে সে দ্রুত বাসায় ফেরে এক না পাওয়ার বেদনা নিয়ে।

তাই এবারে সে উৎসাহ খুঁজে পেতে চায়। [মধ্য পর্বের শুরু]

%d bloggers like this: