শব্দ-বিভ্রাট এবং মেধাবী ও সুদর্শনা নারী [শেষ অংশ]

শব্দ-বিভ্রাট এবং মেধাবী ও সুদর্শনা নারী [প্রথম অংশ]

মাস দুয়েক আগে এই টোরন্টোতে তুষার পড়ল খুব। এমনি এক তুষার পড়া সন্ধ্যারাতে আমার এক প্রকৌশলী চাচাতো ভাইয়ের বাসায় দাওয়াতে কয়েকজন বাঙ্গালী পরিবার একত্রিত হল। এখানেও সেই একই শব্দের ব্যবহার। যেমন, ‘বরফ পড়াতে গাড়ি চালাতে অসুবিধা হচ্ছে’ অথবা ‘যা বরফ পড়ছে, এভাবে চলতে থাকলে রাস্তায় বরফ পরিষ্কার না হলে ফেরার পথে গাড়ি চালাতে সাংঘাতিক অসুবিধা হবে’। কী আর করা! চুপচাপ থাকা ঠিক বলে সাব্যস্ত করলাম। এবার জেনেশুনে আর বিপদ ডেকে নাজেহাল হতে চাই না। একটু পরে এক নারী কন্ঠ ভেসে এল। আমি পাশের ঘরে। ভদ্রমহিলা তার স্বামীকে বলছে, ‘দেখো বেশি বরফ পড়লে তোমার আর আজকে ড্রাইভ করা দরকার নেই। ভাইয়ের এখানে গাড়ি রেখে চলো আমরা বাস আর সাবওয়ে ধরে ফিরি।’ অন্যদের শুনিয়ে মহিলা আরও বলতে থাকে, ‘গত উইন্টারে ও ভালই বাঁচা বেঁচে গেছিল। যা স্কিড করেছিল ওর গাড়ি! ভাগ্যিস, আশে পাশে আর কোন গাড়ি ছিল না। এই বরফ পড়ার সময় একটু সাবধানে থাকা ভাল।’ এইবার আর পারলাম না। ‘বরফ পড়া’ শোনার পর পরই আমার মাথা বিগড়ে গেল। আরে! ভীষন বিস্মিত হওয়ার পালাও আমার! যখন আমি টের পেলাম, শুধুমাত্র নারীকন্ঠে ‘বরফ পড়া’ শুনলেই আমার ভেতরটা ভীষন বিদ্রোহ করে উঠে। যেন আমার ভেতর থেকে বলতে শুরু করে, না, না, আর মেনে নেয়া সম্ভব না। এবার কিছু একটা করা চাই-ই চাই। অথচ এতক্ষণ ধরে পুরুষকন্ঠে ‘বরফ পড়া’ শোনা সত্ত্বেও নিজেকে অনেক কষ্টে চেপে রাখতে পারছিলাম। হায়রে, মনে মনে বলি, কী অদ্ভূত মনস্তত্ত্ব আমার! বিস্মিত যেমন আমি নিজের মনস্তত্ত্ব জেনে, তার চেয়েও যে আরো বেশি বিস্মিত হলাম লিভিং রুমে এসে যেই মাত্র ‘বরফ পড়া’ বলা নারীকন্ঠের দিকে তাকালাম। আরে, ইনিও তো মহা সুদর্শনা! মেধাবী কি না, তা এখনও অবশ্য জানা হয়নি। স্বাভাবিক কারণেই আমায় ভীতি চেপে ধরল।

আমার কাজিনের বয়স অনুসারে অতিথি পরিবারগুলোর বয়স গড়পড়তা তিরিশের মাঝামাঝি মনে হচ্ছে। শুধু দু’একজন ব্যতিক্রম ছাড়া। আগত পরিবারগুলো আমার কাজিনের পারিবারিক বন্ধু। আমার সাথে তাদের কোন পুর্ব জানা-পরিচয় নেই। আজই প্রথম তাদের সাথে দেখা। আস্তে আস্তে পরিচয় হচ্ছে সবার সাথে। এরই মাঝে সুযোগ খোঁজার চেষ্টা করি, কিভাবে যে উত্তর দিই এই ‘বরফ পড়া’-র। ঠিক সময়মত এই লিভিং রুমেই আমার উল্টোদিকে বসা পুরুষ অতিথি একজন আমাকে প্রশ্ন করেন, ‘তারপর কেমন আছেন? আপনি করছেন কি?’ উত্তর দিলাম, ‘এই চালিয়ে নিচ্ছি আর কি।’ এরপর একটু সময় নিয়ে বললাম, ‘আর একটা জিনিস কিন্তু আমি নিয়মিত করছি।’ তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘জিনিসটা কি?’ বললাম, ‘ব্লগিং।’ তিনি বললেন, ‘ব্লগিং? কোথায়?’ অন্যদের চোখও দেখি আমার দিকে সরে এল। আমিও নিজেকে বেশ প্রস্তুত করলাম। একটু গুরুত্ব দেখিয়ে বললাম, ‘প্রথম আলো ব্লগিং’। ‘ও, তাই না-কি?’ আশেপাশের দু’একজনও দেখি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। একজন বললেন, ‘নেটে প্রথম আলো পড়তে যেয়ে চোখে পড়েছে।’ আর এই ফাঁকে আমার মাথার বুদ্ধিও ধীরে ধীরে তার নিজস্ব পথ পেয়ে বেশ উৎসাহিত হয়ে এগুতে শুরু করল। এইতো মোক্ষম সময়ের দিকে এগুচ্ছি। আমি তাদের বললাম, ‘জানেন আমাদের ব্লগে, ‘বরফ আহাসান’ এবং ‘বরফ কন্যা’ নামে দু’জন ব্লগার আছেন।’ ‘তাই না-কি?’ একজন হেসে ফেলল। আরেকজন এমন অদ্ভূতভাবে জিজ্ঞেস করল যেন অন্য সবার হয়ে, ‘এগুলো আবার কেমন নাম?’ সেই ‘বরফ পড়া’ বলা নারী কন্ঠও তাল মেলাতে পিছপা হয় না, ‘ছোটবেলায় তো তুষার কন্যার গল্প বলে রুপকথার একটা বই পড়েছিলাম। বরফ কন্যা তো কখনও শুনিনি।’ আমি এবার সত্যি সত্যিই ভেতরে ভেতরে প্রমাদ গোনা শুরু করলাম। এবারেও কি? বাবারে, যদি কোথা থেকে আবারও কিছু ঘটে বসে? একই বিষয়ে একইভাবে বারে বারে নাজেহাল হতে কার এত সয়! মহা সুদর্শনার কাছে শেষমেশ আবার ধরা খেয়ে বসি না তো! এ অসময়ে আমার কাজিন সুমনও মুখ খুলে বসে, ‘বলিস কি রে, বরফ আহাসান বলে কোন নাম আছে না কি? কী অদ্ভূত নাম!’ আমি স্বর একটু নীচু করেই বললাম, ‘যদি বিশ্বাস না হয়, তবে তুমি তোমার কম্পিউটার অন কর।’ এবার সুমন ভাই বলল, ‘কম্পিউটার অন-ই আছে নীচে আমার স্টাডি রুমে।’ ‘তুমি কি ল্যাপটপ ইউজ করছো এখন?’, আমি জিজ্ঞেস করি। ‘হ্যাঁ।’ ‘তাহলে আমি ল্যাপটপ এখানে নিয়ে আসছি’ বলে বেসমেন্টের স্টাডি রুম থেকে তাড়াতাড়ি করে ল্যাপটপটা উপরের এই লিভিং রুমে নিয়ে আসি। খাবার টেবিলে এখনও খাবার সেভাবে পরিবেশন হয়নি। টেবিলের অনেকটা খালি পড়ে ছিল। আমি ল্যাপটপটা নিয়ে একেবারে খাবার টেবিলের মাঝামাঝি বসে যাই। মহিলা দু’তিনজন আগে থেকেই খাবার টেবিলের পাশে বসে আজকের হোস্ট আমার চাচাতো ভাবীর সাথে টুকটাক আলাপ করছিল। আর খাবার সাজাতে ভাবীকে সাহায্য করছে দু’একজন নারী অতিথিও। এসময় কৌতূহল মেটাতে তাদের, দু’একজন করে পুরুষ মেহমান টেবিলে আসতে থাকে। আমি প্রথম আলো ব্লগের ওয়েবসাইটে চলে আসি। শীর্ষ ব্লগারের কলাম হতে তুষার আহাসানকে ক্লিক করি। তারপর সবাইকে বলি দেখতে। একজন পুরুষ মেহমান বলে উঠে, ‘এটাতো তুষার আহাসান, বরফ আহাসান না।’ একটু ঝুঁকে পড়ে দেখে অন্যরাও সায় দেয়। স্বাভাবিকভাবেই একটু রাগতস্বরে সুমন ভাই বলেন, ‘কিরে তুইতো বললি নামটা বরফ আহাসান, তুষার আহাসান হল কি করে, হ্যাঁ? একটু ঝিম মেরে থেকে চোখ ঘুরিয়ে টেবিলের আশ-পাশটা দেখে নিই, বিশেষ করে সেই মহা সুদর্শনা নারীটিকে। সুদর্শনার মাঝে আবার বড় কোন মেধা লুকিয়ে নেই তো? এরি মধ্যে ভদ্রমহিলাদের একজন তুষার আহাসান-এর ব্লগে মনোযোগ নিয়ে তাকিয়ে দেখে শট করে বলে ফেলেন, ‘ভদ্রলোক তো ভালই হৃদয় এফোঁড়-ওফোঁড় করতে জানেন।’ কেমন আলতো মাখানো বুলি মহিলার। আমি চমকে উঠি, কী বলে মহিলা! তারপরই আমার তুষার আহাসানের আইকনের দিকে চোখ যায়, আরে, ঠিকই তো বলেছেন! সুমন ভাই আমার অবিচল ধীর স্হির অবস্থা দেখে একটু বিস্ময় ও বিরক্তি নিয়ে তাড়া দেন, ‘কিরে চুপ করে আছিস কেন? কিছু বল্‌।’ আমি বেচারা শেষমেশ আর করি কি? বলেই ফেললাম, ‘তোমরা যদি তুষার পড়া-কে বরফ পড়া বলো, আমি কেন তুষার আহাসান-কে বরফ আহাসান বলতে পারি না?’

এক মূহুর্তেই যেন সবাই থতমত খেয়ে গেল। এক্কেবারে পিনপতন নীরবতা। কেউ কেউ কি লজ্জা পেল? শুধু সেই ‘বরফ পড়া’ বলা মহা সুদর্শনা ললনা সত্যিকারের আনন্দ ও বিস্ময় প্রকাশ করে বলল, ‘তাই তো?’ এই প্রথম আমার এই শব্দবিভ্রাট সংক্রান্ত মানসিক সমস্যায়, আমার সমর্থনে অন্ততঃ একজনকে পেলাম। যিনি নেহায়েৎ সুদর্শনা এবং নিজের মাঝের আবেগকে যেন সঠিকভাবে প্রকাশ করতে জানেন। সেই সাথে এও বুঝে নিতে কষ্ট হল না যে, এই নারী মহা সুদর্শনা হতে পারেন, তবে কোনক্রমেই মেধাবী নন, তা নিশ্চিত।

সুপ্রিয় ব্লগার বন্ধুরা, আপনাদের মধ্যে যদি অন্ততঃ একজনও মেধাবী ও সুদর্শনা হয়ে থাকেন, তবে এ যাত্রা আমাকে রেহাই দেবেন কি?

[বি.দ্র.: তুষার আহাসান এবং তুষার কন্যা, আমাকে মার্জনা করিতে আপনাদের আপত্তি আছে কি? আপনারা মাইন্ড খাইলে, আমি নির্ঘাত ব্যান খাইব।]

উৎসর্গ: ব্লগার তুষার আহাসান ও তুষার কন্যা
প্রথম প্রকাশ: প্রথম আলো ব্লগ, শব্দ-বিভ্রাট এবং মেধাবী ও সুদর্শনা নারী, ১৭ এপ্রিল ২০০৯

Advertisements

শব্দ-বিভ্রাট এবং মেধাবী ও সুদর্শনা নারী [প্রথম অংশ]

মানুষের শব্দ ব্যবহারে কেমন অদ্ভূত মনস্তত্ত্ব কাজ করে। তার রহস্য ভেদ করা যে কী কঠিন, জ্বলন্ত এক প্রমাণ আমি পেয়েছি বিশ্বের দু’টি দেশে বসবাসের সুবাদে। প্রথমে আমি ক্যানাডার ক্যালগেরি শহরে ছিলাম। সেখান থেকে জাপানের নিগাতা। ক্যালগেরিতে শীত টোরন্টোর চাইতে অনেক বেশি। যেমন, টোরন্টোয় হিমাঙ্কের নীচে -১০ ডিগ্রী সেলসিয়াস হলে, ক্যালগেরিতে তা -২০ ডিগ্রীতে চলে যেতে পারে।

যে শব্দের ব্যবহার দিয়ে শুরু করতে চাচ্ছি, তা আমি প্রথম শুনি ক্যালগেরিতে আমার বাংলাদেশী রুমমেট থেকে। কোন এক ছুটির দিনে ভর শীতের সকালে। ঘুম থেকে উঠেই সে লিভিং রুমের কাঁচের স্লাইডিং ডোরের পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকিয়ে বেশ হতবাক হয়ে জোরে বলে উঠে,’কী বরফ পড়ছে বাইরে!’ চেয়ার ছেড়ে উঠে বাইরে একচোখ তাকিয়ে নিয়ে, তারপর রুমমেটের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি কতক্ষণ। সে তা খেয়াল করে না। আমিও আর কিছু বলি না। বাইরে তো ভীষন স্নো (snow) পড়ছে। তখনই একটু চিন্তিত হয়ে পড়ি। বরফ তো হলো একটা শক্ত, ভারী জিনিস। সেটা আবার উপর থেকে পড়ে কি করে? স্নো শব্দের কি কোন বাংলা নেই? না, আছে তো! সুলেখক সৈয়দ মুজতবা আলী-ই তো আফগানিস্থানে ভ্রমণ বর্ণনায় পেজা পেজা তুলার মত তুষারপাতের একটা চমৎকার বর্ণনা দিয়েছিলেন। অনেক আগে পড়া। বাইরে তো এখন তাই হচ্ছে। ভীষন পেজা পেজা তুলার মত তুষারের বিমুগ্ধকর নীরব-ছন্দময়তায় পতন। কিছুক্ষণ এক নাগাড়ে তাকিয়ে থাকলে কেমন যেন স্বপ্নাচ্ছন্ন করে তোলে। কিন্তু এর উল্টো ব্যাপারও আছে। এই তুষার পতন অনেকের কাছেই বিরক্তিকর। রাস্তা-ঘাটে গাড়ি চালানো ভয়ংকর ও বিপদজনক হয়ে উঠতে পারে। স্নো পরিষ্কার করতে মানুষের কষ্ট স্বভাবতঃই বেড়ে যায়।

কিন্তু আমার প্রশ্ন হল, ‘তুষার’এর মত সুন্দর একটা শব্দ ব্যবহার না করে বরফের মত একটা শক্ত, ভারী বস্তুকে বলছি কেন? আমি নতুন ক্যালগেরিতে এসেছি মাত্র। আর দু’একজন বাংলাদেশী লোকের মুখেও বরফ পড়া শুনেছি। অন্ততঃপক্ষে বরফ না বলে স্নো বলতে পারে তারা এই ইংরেজির দেশে থেকে। অহরহ তো স্নো-ই বলছে এখানকার মানুষেরা এখানে সেখানে। আইস(ice) বলছে তখনই, যখন দু’একদিন রাস্তায় থেকে তুষার বা স্নো ঠান্ডায় জমে যাচ্ছে। সেটাকেই তো বাংলায় বরফ বলা স্বাভাবিক। খুব ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল। বাংলাদেশে শিলাবৃষ্টির সময় শখ করে উঠানে নেমে শিলা কুড়াতে গেলে, মাকে কখনো কখনো একটু উত্তেজিত হতে দেখতাম, ‘এ্যাই সাবধান, শিলা মাথায় লেগে আবার মাথা ফাটবে দেখিস।’ এরপর কখনো শিলা কুড়াতে গেলে নিজের অজান্তেই শিলা মাথায় পড়া থেকে সাবধান থাকতাম। আর এখন বুঝুন, একবার বরফ যদি মাথায় পড়ে, তবে কি হয়? বরফের একটা বড় চাঁই যদি পড়ে মাথায়………..।

নিগাতায় যখন এলাম, সেখানেও দেখি একই অবস্থা! বেশির ভাগই ছাত্র। সবাই জীবনে প্রথম ‘বরফ পড়া’ দেখে আনন্দিত। কেউ কেউ রোমাঞ্চিত! আর আমি মনে মনে প্রমাদ গুনি, সত্যিকারের বরফ পড়লে না জানি কী না হয়! এভাবে ‘বরফ পড়া’ শুনতে শুনতে ভেতরে ভেতরে একসময় তিতি-বিরক্তি হতে শুরু করলাম। বুঝলাম, আমার মনস্তত্ত্বে সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

একদিন এক ‘বরফ পড়া’ শীতের সন্ধ্যায় জাপানে চাকুরিজীবি এক বাংলাদেশি ভদ্রলোকের বাসায় বাঙ্গালী ছাত্রদের এক দাওয়াতের আসর বসল। সেখানে নতুন-পুরাতন অনেকে আছেন। কিছুটা নতুন এক তরুনী মহিলা এসেছেন পিএইচডি করতে। তিনি এর আগে জাপানের হোক্বাইডোর সাপ্পোরো-তে ছিলেন। সেখান থেকে এমএস করা। যেমন মেধাবী, তেমন সুদর্শনাও বটে। আর তাই আজ দাওয়াতে তিনি একরকম মধ্যমনিই। দাওয়াতে একে একে ছাত্ররা আসেন (কেউ কেউ পরিবারসহ) এবং সবার কথার মাঝেই প্রধান বিষয়বস্তুই ছিল, ‘যা বরফ পড়ছে না আজ!’ মেধাবী-সুদর্শনা মহিলা আস্তে আস্তে একটু নড়ে চড়ে উঠেন। তিনি জাপানে ছিলেন না আগে! একসময় সুরেলা তেজোদীপ্ত কন্ঠে বলে উঠেন, ‘এখানে আবার এমন বরফ কি? সাপ্পোরোতে যা বরফ পড়ে না। সে তুলনায় এখানে তো তেমন কিছুই না।’ এতক্ষণ ধরে ‘বরফ পড়া’ শুনতে শুনতে নিজেকে তা থেকে কোন রকমে চুপচাপ বাঁচিয়ে রেখেছিলাম। যেই মেধাবী-সুদর্শনা রমনীটি, আজ এই আসরে নিজেকে ‘যা বরফ পড়া’ দেখার এক নিষ্পাপ গর্বিত বোধে আপ্লুত হলেন, তখন আমাকে পায় কে? মোক্ষম সময় আমি পেয়ে গেলাম। ‘বরফ পড়া’ কাকে বলে এবার দেখাচ্ছি! তাছাড়া মেধাবী-সুদর্শনাদের ঝাড়ি কষার সুযোগ আমার মত সামান্য মানুষের মনে উসখুস করলেও সে সুযোগ কি সবসময় জুটে? আর দেরি হতে না দিয়ে অন্য কোন সাত-পাঁচ চিন্তা না করে ঘর-ভরা আসরে সবার সামনে বলেই ফেললাম, ‘আচ্ছা, বরফ পড়লে তো আপনার মাথা ফেটে যাবে।’ সুদর্শনা একটু আঁৎকে উঠে। চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকায়। এতে যে তাকে আরো বেশি সুন্দরী লাগবে তা আমি কখনও ভাবিনি। মনে মনে বেশ মজা পাই। দেখি ঘরভর্তি সব চোখ জোড়া আমার দিকে কেমন একটা কৌতূহল ও সামান্য কিছুটা অবজ্ঞা নিয়ে তাকিয়ে আছে। সুদর্শনা কিছু বুঝে না উঠে আমাকে বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘মানে?’ এবার আমি একটু আমার জ্ঞান দেখাই,’আরে স্নো জমে হয় আইস, আর আইস-এর বাংলা হল বরফ। সুতরাং বরফ পড়লে তো মাথা ফাটবেই। স্নো-র বাংলা হল তুষার, আমাদের ‘তুষার পড়া’ বলা উচিত।’ যারা এতক্ষণ আমাকে সামান্য অবজ্ঞার ভাব দেখাচ্ছিল, তারা দমে গিয়ে চুপসে গেল। আর যে ছাত্ররা ব্যাচেলর ছিল, তারা যেন নীরব হিংসার এক একটা টেনিস বলের মত তুষার গোলা ছুঁড়ে মারছিল আমার পানে। আমারও বলা শেষ হলে নিজের অজান্তেই বেশ এক তৃপ্তি ও প্রশস্তির ভাব ফুটে উঠে। তুষার পড়া শেষ হলে যেমন পৃথিবীর অবস্থা স্বচ্ছ, নির্মল ও তুষার ধবল হয়ে উঠে, ঠিক তেমনি। যাক – আমারও তাহলে মেধা একটু-আধটু আছে। কী যে তৃপ্তি – আহ্!

কিন্তু হায় হায়, আমার এই তৃপ্তির ভাব কাটতে না কাটতেই রমণী যে মূর্তিতে উদয় হলেন, সেরুপ দেখা তো আমার কাম্য ছিল না – তাকে যে বড় বেশি অসুন্দর লাগছে এবার! তার চোখের দিকে তাকিয়ে আমার মাঝে যতটুকু রোমান্টিকতা ছিল, তা যে হল বিদায়। উল্টো তিনি আমাকে যেভাবে সোজা ঝাড়ি (তা না বলে ধোলাই বা রামধোলাই বললে বোধ হয় বেশ মানায়) দিলেন, তাতে নিজের স্বল্প মেধা ও বুদ্ধি যে খেল প্রচন্ড আঘাত। তা আঘাত খাক, না হয় হজম করলাম। কিন্তু সবার সামনে ভীষন এক লজ্জা ও দ্বিধাতে যে আমায় ডোবালো! এমন জানলে নিশ্চিত করে বলছি, এ জীবনে কখ্‌খনই মেধাবী আর সুদর্শনাদের পিছনে লাগতাম না। ভালভাবেই বোঝা গেল, মেধাবী-সুদর্শনাকে সবার সামনে জ্ঞান দিতে গিয়ে এই বিপত্তি বাঁধিয়ে ফেলেছি। ওনার আঁতে ঘা যে লেগেছে দারুন। সে যে সাংঘাতিক! তরুনী মহিলা উচ্চস্বরে তেজ ও তাচ্ছিল্য নিয়ে বলে উঠলেন, ‘কেন, আপনি পানি খান না, পানি পান করেন তো বলেন না! আবার তো সিগারেট খাওয়া বলেন, ধুমপান করা তো বলেন না! সুতরাং বরফ পড়া আর তুষার পড়া একই কথা!’ এমন ঝাড়ির পর ঝিম মেরে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। বাবারে, কে যে কারে জ্ঞান দেয়! মেধা যে কী জিনিস, জীবনে প্রথম অগ্নিমূর্তির দেবীকে দেখে সাক্ষাৎ প্রমাণ পেলাম। একবার ভাবি, মুজতবা আলীকে এখানে উদ্ধৃত করা যায় কিনা। কিন্তু মূহুর্তেই বুঝলাম, সুবিধা তো কিছু হবে না বরং উল্টো হতে পারে। তাই মুখ বুঁজে হজম করা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না কোন। সে সাথে নীচু মাথাটাকে একটু তুলে অন্য কারো দিকে তাকাতে আর ইচ্ছে হল না। তবুও না তাকিয়ে উপায় কি আছে? তাতেই দেখি, আমার নাজেহাল অবস্থা দেখে ঘরভর্তি একটু আগে চুপসে যাওয়া প্রায় সবার মাঝে একটু একটু পুলক পুলক ভাব। ব্যাচেলরগুলোর কেউ কেউ আবার মুচকি টিপি টিপি হাসি দিচ্ছে, যেন এ মাত্রই তারা তাদের হারানো পৌরুষ ফিরে পেয়েছে। সুতরাং সংগত কারণেই, আমার সমর্থনে আর কাউকেই পাওয়া গেল না।

মাস দুয়েক আগে এই টোরন্টোতে তুষার পড়লো খুব।

[পরের পোস্টে সমাপ্ত]

%d bloggers like this: