এ লে ফ্লে দ্যু মাল – শেষ পর্ব

এ লে ফ্লে দ্যু মাল – ৫

১৮

ফয়েজুর রশীদ বোনো আগে থেকেই কিছু একটা আঁচ করতে পেরেছেন। বুঝতে পেরেছেন, ব্যাপারটা কৌশলে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সাপ মারতে তিনি ওস্তাদ, কিন্তু এবারে সাপটাকে সুকৌশলে নিয়ন্ত্রণে আনা চাই। তার মান-সন্মান, প্রভাব-প্রতিপত্তিকে পর্যুদস্ত করে ফেলতে যাচ্ছে এই অস্ত্রধারী দুর্ধর্ষ ছোকরা। অথচ এর সামান্যতম ইঙ্গিত বা লক্ষণ তাদের হাতে ছিল না। মানুষ কখন যে কার দ্বারা জব্দ হয়, তা কি কেউ জানে! এত জালে, চক্রাকারে সারা জীবন খেলেও এখনো তাল পান না, কখন কোথায় কী ঘটে যাবে! তার জন্য প্রস্তুতিই বা কি? একেই বলে, সবই আল্লাহর ইচ্ছা। মানুষের ধরা-ছোঁয়া-বোঝার বাইরে।

শায়ান সাজঘরের দরজায় এসে উপস্থিত হয়। ঘরের মাঝামাঝি আলিশা। আতঙ্কে সেও উঠে দাঁড়িয়েছে। বিউটিশিয়ানরা এখনো কনের পাশে রয়ে গেছে। তারাও ভীত-সন্ত্রস্থ। দু’চারজন আলিশার বান্ধবীও সে রকম আতঙ্ক নিয়ে শায়ানকে দেখছে। চোখে চোখে কথা হয়, আলিশা ও শায়ানের। কিন্তু শায়ান আলিশার চোখের ভাষা বুঝে উঠে না, বুঝে উঠতে কষ্ট হয় তার মুখের অভিব্যক্তি, যা আগে কখনো হয়ে উঠেনি। ওখানে না আছে আবেগ, প্রেমময় অনুভূতি, ভালবাসা বোধ। আলিশার শুষ্ক চোখে কেমন এক রোষ, তার আজ এই উৎসবের দায়িত্ব পালনই সব। সেখানে শায়ান কই? একি সেই আলিশা, যাকে শায়ান তার স্বপ্নের উর্বশী বলে জেনেছে! আলিশা নির্বাক, যদিও আলিশার কন্ঠে কথা শায়ান কখনো শোনেনি। নির্বাক আলিশার চোখ এবং মুখাবয়বে আজ এ কিসের ইঙ্গিত?

শায়ান কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে উঠে। কী করতে হবে ভেবে পায় না। কি হলো আলিশার? তাকে এই নরকপুরীতে উদ্ধারের কাজেই তো সে নিল আজ এই সাজ। ছোট বেলায় শুনে শুনে বড় হয়েছে, ‘যেমন কুকুর তেমন মুগুর’। আজ সেও তাতে সজ্জিত হলো। তাহলে কেন এমন আলিশার ভাব! প্রচন্ড রাগ হচ্ছে তার। কিন্তু রাগ করবে কার উপর? এতো সে নয়, যে এক নিমিষে তার সাথে উড়ে গিয়েছিল সে বন বনানীতে। তাহলে কি সে এক মিথ্যা স্বপ্নে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছিল? ধূর্ত ফয়েজুর রশীদ বোনো এই সময়টার জন্যই বোধ হয় অপেক্ষা করে আছে। তিনি শায়ানকে পাশ কাটিয়ে সাজঘরে ঢুকে আলিশার দিকে এগিয়ে এসে বলেন, ‘মা, তোমাকে উনি নিতে এসেছেন। তুমি তার সাথে যাও।’ আলিশা পাথর হয়ে আছে। বারগেন্ডি গাউনে বিয়ের সাজ। ভাস্করের হাতে গড়া এক মোহনীয় মূর্তি। তার চোখের পাতার পলক পড়ছে না। উদ্ভ্রান্ত তার দৃষ্টি। শূণ্যতার সাথে মিশে আছে কেমন এক ঘৃণা, ভয়। বড় উদ্ভ্রান্ত সে। কোন উত্তর আছে বলে তার মনে হয় না। কালো মেয়ের কালো পুরু ঠোঁট। তাতে কাঁপুনির দেখা মেলা যায় কি?

বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে শায়ান। যার জন্য সে নিয়েছে এমন বেশ, সে এখন পাথর সদৃশ স্তব্ধ। যে প্রতিজ্ঞা নিয়ে এসেছে এখানে, তা এখন বিনষ্ট হতে বসছে। এক ঝটকায় সে নিজের ডান হাত দিয়ে আলিশার ডান হাত ধরে টানতে থাকে। উচ্চস্বরে বলে উঠে আলিশা, ‘না!’ থতমত খেয়ে শায়ান তার হাত ছেড়ে দেয়। এই প্রথম দেবীর কথা তার কানে এলো। তা এক গভীর তীক্ষ্ণতায় তার হৃদয়ের তন্ত্রী ছিঁড়ে দিলো। দেরী না করে ফয়েজুর রশীদ বোনো-ও সাথে সাথে বলে উঠে, ‘যাও মা, উনি অনেক কষ্ট করে তোমাকে এখানে নিতে এসেছেন।’ ‘না, আমি যাবো না। আমি ওর সাথে যাবো না।’ আলিশার জেদী ও দৃঢ় উত্তর। আলিশার কন্ঠগত প্রকৃতির মাদকতাও ঝরে পড়ে। প্রচন্ড আক্রোশে ফেটে পড়ে শায়ান। এ যে তার সন্মানের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন। ক্ষুব্ধ হয়ে তীব্র বেগে সে আবারো নিজের ডান হাতে আলিশার ডান হাত শক্ত করে চেপে ধরে, ঝটকা টানে দৃঢ়তায় বলে, ‘আসো, আসো আমার সাথে।’ আলিশাও ছেড়ে দেবার পাত্রী নয়। সে এবার সর্বশক্তি দিয়ে নিজের হাত টেনে রেখে, আগের চাইতে প্রচন্ড শক্তি নিয়ে চেঁচিয়ে বলতে থাকে, ‘ছাড়ো ছাড়ো আমাকে। আমি যাবো না, কখ্‌খনো ওর সাথে যাবো না। তারপর হবু শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘বাবা, ওকে এখান থেকে চলে যেতে বলুন। এক্ষুনি এখান থেকে চলে যেতে বলুন।’ মূহুর্তেই শায়ানের হিতাহিত জ্ঞান বিলুপ্ত হয়। কোন কিছু না ভেবে কাঁধের অস্ত্র উঠে আসে তার দু’হাতে। একেবারে আলিশামুখো তাক করে বসে। হিস্টিরিয়াগ্রস্থ রোগীর মত চিৎকার দিয়ে উঠে আলিশা, ‘মারবে? মারো। এ ছাড়া তোমার আর কি বা করার আছে? হোক এটাই তোমার আমার সাথে সর্বশেষ কীর্তি।’ সশব্দে কাঁদতে শুরু করে আলিশা। কাঁদতে কাঁদতে ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়ে। তার সাজসজ্জাকালে বসা নীচু কাঠের বেদীতে মাথা নামিয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকে।

কনফিউজড শায়ান। কী করতে এসে কী করে ফেললো সে! নিজেকেই বা দোষ দেয় কিভাবে? এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। একি! তার ভেতরের থাকা আলিশার বাকি দু’চারটা প্রজাপতি ছটফট করছে কেন? তার এমন লাগছে কেন? এ কিসের লক্ষণ? আহ্‌ প্রজাপতিগুলো এভাবে বেরিয়ে আসতে চাইছে কেন? এত যন্ত্রণা হচ্ছে কেন তার? হা করে থাকে শায়ান কিছুক্ষণ। প্রজাপতিগুলো তার নিশ্বাস নিঃসৃত হয়ে দুর্বল গতিতে আলিশার চোখের জলে মিলিয়ে যায়। শায়ানের সেখানে টিকে থাকা অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। প্রজাপতি শূন্য হৃদয় অসহ্য বেদনায় ঝড়ের গতিতে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে তার জিপ গাড়িতে উঠে বসে।

পুরো বিয়ে বাড়ি এতক্ষণ পিন পতন নীরবতায় এক দুর্দান্ত নাটকের মহড়া সচক্ষে অবলোকন করে স্তব্ধ হয়ে পড়ে। শায়ানের প্রস্থানে তাদের সম্বিত ফিরলে বিয়ে বাড়ির সবাই আলিশার ভূমিকাকে দারুন দারুন বলে সমর্থন দিয়ে উপভোগ করতে থাকে।

১৯

বনানীর এক প্রান্তে গাড়িটাকে দাঁড় করিয়ে শরীর থেকে যুদ্ধ বেশ খুলে ফেলে দেয় জীপ গাড়ির মাঝে। আজ প্রকৃতিকে ভীষণ উষর নিঃসঙ্গ নিস্তেজ মনে হয় তার। এত বিষাদাত্মক রূপ প্রকৃতির সে কখনো দেখেনি। শায়ানের পথ চলে না। জলাধারে পানি বয়ে যায়। কিন্তু তার হৃদয়ের শুষ্কতা কমে না। শায়ান জানে না, কী তার করা উচিত! কিন্তু তার ভেতরের বিক্ষোভ যে কাটে না। একসময় হৃদয়ের আগুন ঠিকই বেরিয়ে আসে। মনোরম সুদৃশ্য পিকচার পারফেক্ট বাড়িটা এখন সে আগুণে জ্বলে পুরে ছাই হচ্ছে। এক স্তব্ধতা জড়িয়ে ধরে শায়ানকে। জলাধারের মাঝখানের উষ্ণ পানিতে দপ করে সে বসে পড়ে বাম পা সামনে ভাঁজ করে, ডান পা হতাশ ভঙ্গিতে সামনে এলিয়ে দেয়। চতুর্দিকে ধোঁয়ার উদগীরণ চলছে অনবরত।

দূরে খোলা আকাশ মেঘ কালো। পাহাড়ের উপরও কালো মেঘ। কালো মেঘ আকাশের একাংশে। অল্প অল্প করে বৃষ্টি নামছে। এই বৃষ্টি শায়ানের খুব প্রিয়। এমনকি শ্বেত উর্বশীদের দেশেও ছিল তা তার প্রিয়। ভঙ্গুর এক মানুষ জলাধারের খোলা প্রান্তরে নিশ্চুপ হেলে বসে আছে। বৃষ্টি নামছে তার উপর। তার প্রিয় বৃষ্টি। ধোঁয়া নেতিয়ে গেছে বা মিলিয়ে গেছে। পোড়া বাড়ির অবশেষও এই বৃষ্টিতে সটান ভিজে আছে বিষন্নভাবের জলছবিতে। কাঠ কয়লাগুলোতে পানি গড়িয়ে যাচ্ছে। ছাইগুলোও হচ্ছে পানিতে জবুথুবু। পানির সাথে গড়িয়ে যাচ্ছে ছাই। বৃষ্টি বিধৌত প্রকৃতির এই পরিবেশ কোনভাবেই শায়ানের ভেতরের সেই দীপ্ত সুরকে স্তব্ধ করে দেয়নি:

All my life I’ve been waiting for
In the perfume of pain
To forget when I needed more
Of love’s endless refrain

We live and we pray
pour les fluers du mal
I’ve lost my way
What is done will return again
Will I ever be free?

httpv://www.youtube.com/watch?v=l5pIC2MIelQ

শামান সাত্ত্বিক | ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১১ | ১৬:৩৯ বিভাগ: গল্প

এ লে ফ্লে দ্যু মাল – ৫

এ লে ফ্লে দ্যু মাল – ৪

১৫

শহরের সর্বত্র উৎসব। মনে হচ্ছে, নাটকের শেষ দৃশ্য রূপায়নে সব কিছুর সন্নিবেশ ঘটে গেছে। শহরের মানুষেরা উৎসুক আনন্দে সে দিকে ধাবনোম্মুখ।

আজ যে শহর কন্যার বিয়ে। সাজ সাজ রব উঠে গেছে এরি মধ্যে। কী পোষাক হবে কন্যার! টক অব দা টাউন! ঠিক কন্যার শরীরের মাপে মাপ এক উজ্জ্বল গোলাপী গাউন এসে গেছে বিলেত হতে। শহরের মনুষ্য জীবদের আর অপেক্ষা সয় না। সাথে এসেছে বিলেত থেকে ব্রোঙ্কোর জন্য স্যূট, নটছাড়া ছোট টাই। ব্রোঙ্কোর নিত্য নতুন অদ্ভূদ ঘোষণায় শহর বাসীর নিত্যদিনের ঘুম তিরোহিত হয়ে গেছে। কী হবে কী হবে এমনতরো অদ্ভূদ আবেশে শহরটা ঢেকে গেছে। ব্রোঙ্কোর সাম্প্রতিক ঘোষণায় রয়েছে বিপুল চমক, শায়ানের নতুন যে বাড়িতে আলিশার এক রাত অতিবাহিত হয়েছে, ঠিক তার সামনেই সে জলাশয় বন বনানীর ঘেরা পরিবেশে তাদের বিবাহ অনুষ্ঠিত হবে।

শায়ানের অপেক্ষার সময় নেই। হাসপাতাল থেকে আসার পর শহরে তার মাতৃকবাসে সে আশ্রিত হয়। রুমে সামান্য ছিদ্র রাখার উপায় ছিল না। মায়ের কড়া আদেশ ছিল। বাইরের কোন সংবাদ শায়ানের কান অবধি না এসে পৌঁছয়। মুক্ত বিহঙ্গের মত শায়ান। কোন রকম অবরোধ তার অসহ্য। শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা তৈরি করে। বরং শায়ান নিজেই তো মুক্তি খুঁজে যাচ্ছে। আর তাই তার জানালা খুলে দিতে হলো। বাইরেরটা থমথমে মনে হলো। বাতাস খুঁজে পাচ্ছে না সে। এ পরিস্থিতির জন্য তৈরি ছিল না একেবারেই। এখনো তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা আলিশার প্রজাপতিগুলোও ছটফট করছে। তারাও কি মুক্তি চায়? আহ্‌, এ আবার কি রকম অবস্থা তৈরি হলো! সে বোঝার চেষ্টা করে। তার এই ভগ্ন দশায় প্রজাপতিগুলো আর কতদিন এভাবে বেঁচে থাকবে। প্রজাপতি মানেই তো মুক্তি। মুক্তি কে না চায়? আর কতদিন প্রজাপতি বেঁচে থাকে, তার শূন্য খাঁচায়? নিথর শরীরে? শরীরের শক্তি তার কিছু ফিরে এসেছে। সে শরীরে সে উঠে দাঁড়ায়।

বাইরের গুমোট হাওয়া তার জন্য কি কোন বাণী হয়ে আসছে? মেঘটাও ধূসর। এ আলো এ পরিবেশে প্রজাপতির উড়তে নেই। সুতরাং সেগুলো তার বুকেই চাপা পড়ে থাকে। হঠাৎ করে শায়ানের বুকে অজানিত এক দোলা জাগে। কিসের দোলা? বুকের ভেতরের প্রজাপতির ডানার? অজানিত আশঙ্কাও বটে। শায়ান আর অপেক্ষা করে না। দূর পাহাড় তাকে হাতছানি দিচ্ছে। শরীরের যে শক্তি ও সজীবতা ফিরে এসেছে, তা নিয়ে সে ছুটতে থাকে। এক সময় লোকালয়ের স্পর্শ এড়িয়ে ছুটতে থাকাবস্থায় এক যুবকের বিদ্রুপমাখা শ্লেষ উক্তি তার ভিতকে নাড়া দেয়। ‘শালা, বোধাই একটা। মাগীটা বিয়া করতাছে আরেকজনকে। আর হে এহানে মজনু হইয়া ঘুরতাছে। দুইনন্যার বোধাই আর কারে কয়!’ শায়ান ভড়কে উঠে সাথে সাথে। বেশ থতমত খায়। থেমে যায়। আর একজন তার দিকে এগিয়ে এসে ধারালো গলায় বলে, ‘কী আর করবেন! আর দুইটা দিন অপেক্ষা করেন। তাইলেই সব টের পাবেন। কাল মাইয়ার গায়ে হলুদ। তার একদিন পর তো আসল বিয়া।’ এই বলে লোকটা হাসতে থাকে। তার আশে-পাশের লোকগুলোও অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।

শায়ান আর টিকতে পারে না সেখানে। আবার ছুটতে থাকে। একটু খুঁড়িয়ে সে ছুটছে। কিছু পর পর সে থেমে থেমে চলে। বুকে ব্যথা অনুভব হয়। মনে হয়, প্রজাপতিগুলো মুক্তি খুঁজছে। তারা স্নিগ্ধ আলোর পানে ছুটতে চায়। কিন্তু বাইরে তো আলো নেই। গুমোট ধূসর। এই ধূসর সমুদ্রে প্রজাপতিরা কোথায় বেরিয়ে গিয়ে বাঁচবে। জোর করে তাদের শায়ান বুকের মাঝেই আটকা রাখে। অনেক কষ্টে হোঁচট খেয়ে ছুটতে ছুটতে সে পৌঁছে যায়, সেই নতুন বাড়িতে, যে বাড়িটি শুধু আলিশা এবং তার জন্য নির্মিত। সে বাড়ির ভেতরে ঢুকলে পাগলের মত দেয়ালে দেয়ালে হাহাকার বাড়ি খায়। শায়ান বুঝে উঠে না তার কি করার আছে? আগামীকাল গায়ে হলুদ। এটা কোন দুঃস্বপ্ন, তা তাকে চিন্তাগ্রস্থ করে রাখে। এ কি তাকে বিশ্বাস করতে হবে? ও আমার প্রেম, আলিশা। তুমি শুনছো কি, কি বলছে ওরা? ও মন কোথায় তুমি?

বাইরে এক সময় কোলাহল উঠে। কিছু লোকজনের গলার আওয়াজ পায় শায়ান। সে ধীর স্থির পায়ে এগিয়ে যায়। তাকে দেখে লোকজন বিস্মিত হয়। একজন তেজী গোছের লোক এগিয়ে এসে তাকে বলে, ‘ও আপনি এখানে? ভালই হইল। দু’দিন বাদে বিয়ে তো আপনার এই বাড়ির সামনের এই গাছতলায় হবে। আমরা সব দেইখা শুইনা যাইতাছি। যদি তেরপাল টাঙ্গাইতে হয়, তাও টাঙ্গামু। কিন্তু আপনার জন্য খাস দাওয়াত। কোথাও যাইবেন না, কইলাম।’ মাথা একটা ঝাড়ি খায় শায়ানের। কি বলে লোকগুলা? ওরা কে? উত্তেজিত হয়ে সে জিজ্ঞেস করে বসে, ‘এই তোমরা কারা? আমার এইখানে কি?’

”আপনার এখানে মানে? ব্রোঙ্কো ভাইরে কি বুইলা গেলেন এত তাড়াতাড়ি। ভুইলা যাবারই তো কতা। যা মাইরডা খাইছিলেন না। আমরা তো জানাযার জন্য রেডি অইয়া গেছিলাম। আল্লাহ আপনার প্রতি কত দয়ালু। এ যাত্রায় বাঁইচা গেলেন। যাউক গা – ব্রোঙ্কো ভাই আর আলিশা ভাবীর বিয়া এইখানেই পড়ানো অইব, এইটা ব্রোঙ্কো ভাইয়ের নির্দেশ। এই তো শুক্কুরবার দিন, জুমা বাদ। আপনিও থাকবেন। ব্রোঙ্কো ভাইয়ের পক্ষ থেইক্যা দাওয়াত। আপনেরেও আমরা চাই।” এই বলে, লোকগুলো জোরে সোরে এক পশলা হাসি দিলো। প্রচন্ড হতাশা শায়ানকে ছেয়ে ফেলে। জলাশয়ের পাশে চলে আসে সে।

১৬

সারা শহর জুড়ে না কি একটা দু’টা করে প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে। হলুদ রঙ মেখে নিয়ে। খুব ধুমধামে আলিশার গায়ে হলুদ চলছে। ছোট এই শহরের আকাশে বাতাসে তার খবর ছড়িয়ে পড়ছে। কব্জি অবধি যে হাত শায়ান কেটেছে গতকাল, তাতে সাদা ব্যান্ডেজ। তার যন্ত্রণাগুলো এখন হিংস্র হয়ে পড়ে। ভেতরের প্রজাপতিগুলো সব প্রতিক্রিয়া হারিয়ে ফেলেছে। তার ভেতরের তীব্র বেদনা হিংস্রত্বে রূপ নেয়।

১৭

বারগেন্ডি ওয়েডিং গাউনে সেজেছে কালো আলিশা। বিউটি পারলারের বিউটিশিয়ান তাকে সাজিয়েছে। মাথার চুল থেকে কাঁধে নেমে এসেছে হালকা ফিনফিনে বারগেন্ডি নেট। অপরূপা। জুমা শেষে পুরুষরা একে একে ফিরছে। একটু পরই এসে যাবে বর ব্রোঙ্কো তার দলবল আত্মীয় স্বজনসহ। কিন্তু ঠিক এই সময়ে এমন একটা মূহুর্তের জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না।

বাইরে গোলাবাজির শব্দ। ব্রোঙ্কো কি তার পুরোনো হিংস্রতায় আজ এই দিনে এভাবে আনন্দ প্রকাশ করছে? তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরীরা এতে একধরণের আতঙ্ক বুকে ধারণ করেও বিয়ের উত্তেজনার আনন্দে ধাবিত হয়ে বাড়ির বাইরে আসে বেরিয়ে। তাদের ভ্রম ভাঙ্গে সেই সাথে। শায়ানের এই ভয়ংকর ভয়াবহ রূপ একেবারেই অপ্রত্যাশিত তরুণ কিশোরী গন্যমান্য সবার কাছে। পেছনে এক জীপ গাড়ি। শায়ানের সারা শরীর আবৃত বুলেটের কার্তুযে। দু’হাতে আধুনিক অস্ত্র। যুদ্ধংদেহী সাজ। শায়ান অশান্ত আজ। সব কিছুকে চুরমার করে দেবে। বাতাসেও বারুদের গন্ধ। এখানে প্রজাপতিদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না।

বিয়ে বাড়িতে সবাই শংকিত। গুরুজনদের শংকাটা বড় ভয়ানক হয়ে উঠছে। কিংকর্তৃব্যবিমূঢ় হয়ে উঠে বিয়ে বাড়ি। যে কোন মূহুর্তে, যে কোন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। একবার ব্রোঙ্কো ও তার দল এ বাড়িতে এসে গেলে পরিস্থিতি যে কোন দিকে মোড় নিবে, তা সহজেই অনুমেয়। শায়ান বিয়ে বাড়ির ভেতর বীর দর্পে এগিয়ে যায়। ভয়ের মত এক মারাত্মক অনুভূতি সৃষ্টি করে আলিশার সাজ কক্ষের দিকে আগাতে থাকে। অস্ত্রধারী শায়ানের সামনে থেকে সবাই সরে যেতে থাকে। অশেষ আতংকে পুরো বিয়ে বাড়ি আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। এখনই মৃত্যুপুরীতে রূপান্তরিত হবে এই প্রাণবন্ত সরব বিবাহ অঙ্গন। কেউ কেউ চোখ বুজে ফেলে আশংকায়। শায়ানের এমন রূপ কারো সুদূর কল্পনায়ও নেই।

মূহুর্ত দেরী করেননি ফয়েজুর রশীদ বোনো। বিদ্যুৎবেগে চলে আসেন বিয়ে বাড়িতে। তিনি ছাড়া আর কেবা আছেন এই পরিস্থিতিকে কূটনৈতিকভাবে সমাধান দিতে পারেন। শায়ানকে তার জানা ছিল, জানা ছিল সব ঘটনাই। তার সন্তানের সাথে সংঘর্ষের ইতিবৃত্ত। কিন্তু ছেলেটা যে এভাবে গর্জে উঠবে, এটা ভাবেননি। কী আর করবেন তিনি। অনেক ভেবেও হদিস মেলেনি, কিভাবে এত অস্ত্র এলো এই ছেলেটার হাতে। কে আছে এমন এই শহরে অন্ততঃ তাকে না জানিয়ে একে এত অস্ত্র দেয়? ক্ষমতাসীন দলে তিনি এখন নেই। তাই বলে ক্ষমতার সাথে যিনি এখন জড়িয়ে, তার সব কর্মকান্ড নখদর্পণে নেই, এমন তো নয়। এ রকম কোন ইঙ্গিত তিনি পাননি। তাহলে কি? এই শহরের অন্য প্রান্তে সেনাদের একটা ছাউনি আছে। সেখানে হতে কি? কেউ কি আছে সেখানে শায়ানের সহানুভূতিশীল। নইলে এমন কাজ করার সাহস-ই বা কার? একটু থমকে যান ধূর্ত ফয়েজুর রশীদ বোনো। বুঝে উঠেন, এতে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে কিছু করতে নেই। এই ঘটনায় কোন প্রতিক্রিয়া দেখাতে নেই। ভাগ্যিস, ছেলেকে জানিয়েছিলেন, তিনি নিজে ঘটনাটা আগে বুঝে নেবেন। তারপরই যাবেন প্রয়োজনীয় একশানে। ছেলে যেভাবে অস্থির ও গোঁয়াড় হয়ে উঠেছে, তাকে সামলানোই তো ছিল অসম্ভব। ব্রোঙ্কোর সারা শরীরে কিছু ভীমরুল হুল ফুটাচ্ছিল। অগত্যা বোনো তার খুব কাছের কিছু মাসলম্যন দিয়ে পাহারায় রেখে এসেছে তাকে। বোনোর অনুমতি ছাড়া ব্রোঙ্কোর বাড়ি ছাড়া নিষেধ। ঠিক বিয়ের আসরের আগে এরকম হেস্ত-নেস্ত পরিস্থিতি, তার বিরুদ্ধাচরণ, শায়ানের ধৃষ্টতা, পুরো বিয়ের আনন্দঘন পরিবেশকে তছনছ করে দেয়া ব্রোঙ্কোকে উন্মাদ করে তুলছে। এমন একজন এই শহরে আছে, সে তার কল্পনারও ধরা ছোঁয়ার বাইরে। লন্ডনে থেকেও সে তার এই প্রিয় শহরকে প্রতি মূহুর্তে পর্যবেক্ষণে রেখেছিল। এই শহরের লোকের বা পরিবেশের সামান্য কিছু পরিবর্তনও তার না জানার বাইরে ছিল না। তার প্রচ্ছন্ন সায় ছাড়া কোন ধরণের ব্যবসা, অর্থ উপার্জন এখানে হালাল হয়ে উঠেনি, সেটা ক্ষমতাসীনই হোক বা ক্ষমতার বাইরের কারো দ্বারা হোক। নিয়মিতই তাকে এই শহর সম্পর্কে অভিহিত করে গেছে তার তৈরি করা ব্রোঙ্কো বাহিনীর একেবারেই ভেতরের গুরুত্ববাহী দায়িত্ববান লোকেরা, প্রভুভক্ত প্রাণীর মত। আজ কী না তার বিবাহের এই ক্লাইমেক্স মূহুর্তে এমন বৈরী বিদিকিচ্ছি আচরণ! ব্রোঙ্কোর ভেতরের আহত বাঘটা ফুসতে থাকে। গর্জন করার শক্তি সে হারিয়ে ফেলেছে। হাতের কাছে পেলেই শিকারীকে এক্কেবারে ছিঁড়ে খুঁড়ে তছনছ করে খাবে। ঘটনাটা তার সকল হিসেব-নিকেশকে মিথ্যে করে দিয়েছে। হাতের মুষ্টির এক প্রচন্ড শক্তিতে সে তার বসার ঘরের মাঝের ডিম্বাকৃতির কাঁচের টেবিলটা ভেঙ্গে ফেললো। বরের হাত আজ রক্তাক্ত। ডান হাতের কব্জি থেকে বাহুর কাছ অবধি রক্তাক্ত। অসাধারণ এক দ্বন্দ্ব ও বৈরীতা এই ছোট্ট শহরটাকে আচ্ছন্ন করে ফেললো। পুরো শহরজুড়ে কেউ আজ আর প্রজাপতির দেখা একেবারেই পাচ্ছে না।

শামান সাত্ত্বিক | ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০১১ | ১৫:০২ বিভাগ: গল্প

এ লে ফ্লে দ্যু মাল – ৪

এ লে ফ্লে দ্যু মাল – ৩

১১

স্কুল পথে মটর বাইকে ব্রোঙ্কোকে দেখে অথবা কলেজে যেতে আলিশার বুকের ভেতরের প্রজাপতিগুলোর কখনো ঘুম ছুটেনি, নির্ঘুম রাত কাটেনি। প্রজাপতিগুলো মাঝে মাঝে হাওয়ায় উড়েছে আলিশার সাথে হেঁটে যেতে যেতে। মুক্ত হাওয়ায় উড়ে বেড়াতে কার না মন চায়! যেই না শুনেছে ব্রোঙ্কোর মটর বাইকের গর্জন, ওরা দেরী না করে ভীত-ত্রস্ত হয়ে আলিশার বুকের গভীরে ডুবে গেছে। এই প্রথম এক কন্যাকে দেখে বড় অপরিচিত ঠেকে ব্রোঙ্কোর। কালো রূপের কন্যার ভেতরটাকে অদ্ভূদ ঠেকে। কন্যার রূপের গরিমা নাইবা থাকুক, মনের গরিমা যে ঠিকই বুঝে ফেলে চতুর চোখের ব্রোঙ্কো। মনের এই গরিমা তার কালো কুসুম রূপে যে ঝলক তুলতো, তাই ব্রোঙ্কোর চোখে ধাঁ ধাঁ লাগিয়ে দিতো। এই রূপকে কুক্ষিগত করার এক তীব্র স্পৃহা জেগে উঠতো তার মধ্যে। মাঝে মাঝে তাকে প্রচন্ড অস্থির করে তুলতো। কিন্তু পাত্রীর নিস্পৃহতা তার জ্বলন্ত রাগকে নির্বোধ করে তুলতো। কোন এক ক্ষিপ্রতায় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতো সে। করতো তার প্রতিহিংসাকে নিবৃত্ত। বংশ পরম্পরায় গড়ে উঠা তার এতদিনের সমৃদ্ধি একটা চ্যালেজ্ঞের মুখোমুখি। কি নেই তার? সামাজিক প্রভাব প্রতিপত্তি দাপট। আর কি চায়? প্রয়োজনে যুদ্ধে নেমে গেছে সে নিজ অধিকার আদায়ে। আর কি না এই পুরুষ্টু ঠোঁটের কালো গোলাপ কী এক দুর্বিনীত দৃষ্টিতে প্রতি দর্শনে তাকে গ্রাহ্যের বাইরে রেখে যায়! কিন্তু এখানে কোন সংগ্রামের অনুভব নেই। তার অধিকার আদায়ের তীব্রতা নেই, ব্রোঙ্কো ভালই জানে। মেয়েটার গ্রাহ্যের বাইরে তার অবস্থানকে সমীহ ভাবে নিয়ে নেয় ব্রোঙ্কো। এ পরোক্ষ বিতাড়ন তাকে ক্ষ্যাপাটে করে তোলে, সে সাথে তীব্র আকর্ষণ তৈরি করে কিশোরী ভাব অতিক্রমনরত এই তরুনী নারীর প্রতি। সে সাথে সৃষ্টি হয় এক দুর্বার ভাললাগাবোধ। এতদিন কোন কিছু দখলে আনার যে দুর্দমনীয় তীব্রতা কাজ করতো, আজ তা অন্য এক ভুবন জয়ের নেশায় তাকে উতল করে তোলে। এই প্রথম তার খেদ জমে নিজের প্রতি। নিজের মাঝে কিছু একটার অভাব তীব্রভাবে সে বোধ করে। তার অপ্রতিরোধ্য বাসনা যে কোন পূর্ণতার আশায়, যখন তখন যত্র তত্র ছুটেছে। আজ তার দমন সে মানতে চায় না। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে বসে, ‘তোমার জন্য যা যা প্রয়োজন, তার সব বাজিতেই আমি জিতবো। আমার বাবার ইচ্ছা সাত সমুদ্দর তেরো নদী পাড় থেকে নিয়ে আসার এক স্বর্ণাভ কাগজের সনদ, সম্মান করে যাকে সবাই ডিগ্রি লাভের সার্টিফিকেট বলে। যা না হলে না-কি মানুষের জীবনের কোন মূল্যই নেই। তার চেয়েও বড় স্বর্ণ হীরক বা মুক্তোর প্রয়োজনে গভীরে নেমে যেতে পারি আমি হাঙ্গরের সাথে যুদ্ধ হেনে, গহীন গুহার ভয়ংকর আঁধারে জীবন রেখে বাজি। তবুও চাই পেতে তোমাকে পাহাড় ঘেরা ঝর্ণার জলের গভীর দেশে। আমার চরণ সেবায় তোমায় নিয়োজিত হতে।’

স্থানীয় বেতারে ঘোষিত হয়ে গেছে বন্ধুমহল হয়ে এই ছোট শহরটাতে, ব্রোঙ্কোর পাত্রী ঠিক হয়ে গেছে। ব্রোঙ্কো বিলাতেও যাচ্ছে। বিলাত ফেরত হয়ে আসার পরই আলিশা-ই করবে তার ঘরকে রোশনাই। এই শহরের আর কোন রোমিও এখন পর্যন্ত পয়দা হয় নাই, আলীশার নজরকে তার দিকে ঘুরিয়ে দেয়। সেক্ষেত্রে একতরফা ডুয়েটে যেতে আপত্তি নেই ব্রোঙ্কো বাহিনীর। আলিশার প্রতি সামান্য কৌতূহলী যে কোন রোমিও বা অন্য কোন যুবকের জন্য যে দুঃসংবাদ তাও ছড়িয়ে আছে সংবাদের কানায় কানায় – তারা সব থাকবে কড়া গুপ্তা নজরদারীর। সেটা ব্রোঙ্কো থাকুক দেশে বা বিদেশে।

ছেলের এই জোরাজুরির ফয়েজুর রশীদ বোনোর কোন আপত্তি ছিল না। প্রথমতঃ অস্থিরমতি ছেলেকে শান্ত রাখার জন্য এতে তার চুপ থাকা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না। দ্বিতীয়তঃ আলিশার তেজোদীপ্তি গুণ আর বংশের খবর তার জানা ছিল। তৃতীয়তঃ বিলেত যেতে ছেলের নিদারুন অনীহার হঠাৎ পরিবর্তন বোনোকে উল্লসিত এবং উচ্ছ্বসিত করে তুলে। বোনোর ইচ্ছাই যখন এই শহরের ইচ্ছে। পুরো ব্যাপারটিতে আলিশার পিতার নীরবতা সারা শহরে এই সত্যকে একতরফা প্রতিষ্ঠিত করে। আলিশার শির সোজা থাকে। পায়ে হেঁটে এখন ভীত সখীদের হারিয়ে একা একা স্কুল যাতায়াত থেমে যায়নি। আর দূর থেকে তার আসা দেখে, তার চলার রাস্তা সভয়ে যুবকশূন্য হয়ে উঠে। এক দেমাগী নিঃসঙ্গ প্রিন্সেসের আগমন ও সড়ক পরিভ্রমণের নামান্তর হয়ে উঠে তা।

১২

শায়ান অস্থির হয়ে উঠে এ নন্দন অঙ্গনে। আলীশা তার সম্মুখে এসে দাঁড়িয়ে যায়। ভোরের বাতাসে যেন আলিশার সুবাস চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। এই বন বনানী তার চেতনায় তীব্র অনুরণন সৃষ্টি করছে। আলীশা সর্বত্র জেগে গেছে। এই আলোয়, দূর রৌদ্রে। আলীশার চিৎকার কি সে শুনতে পেলো? তার উচ্ছ্বাস, কলকল হাসির জোয়ার। হায় কোথাও কোন ঝর্ণা নেই। আলিশাও কি নেই? কান পেতে শব্দ শোনার চেষ্টা করে, কিন্তু স্বচ্ছ জলাশয়ের পানির কুল কুল ধ্বনি ছাড়া আর কিছুই শায়ানের কর্ণকুহরে পৌঁছালো না। কোথায় হঠাৎ চীৎকার উঠলো “শায়ান!” আবার তা মিলিয়ে যায়। এই বনানী, জলাশয়ের কুল কুল ধ্বনি শায়ানকে এর বাইরে যেতে দিচ্ছে না। দূরে ট্রেন যাবার আওয়াজ সে শুনতে পায়। কোথায় সে আলিশাকে খুঁজবে। ওরা ওকে কোথায় নিয়ে গেছে ধরে। চোখে অশ্রুর বাষ্প জেগে উঠে তার। ভাসমান চোখের জল বাঁ-ডান হাতে আলতো মুছে নেয়। যে সুরের নিক্কন আলিশা জাগিয়ে দিয়েছে তার প্রাণে, সে সুর সর্বত্র সম্প্রসারিত সুবিস্তৃত হয়ে গেছে। এ থেকে শায়ান আর নিজেকে চ্যূত করতে পারে না। এবার সে নিজে নিজে তার দু’কানের দু’পাশে দু’হাত মেলে গগণবিদারী চীৎকার করে উঠে, “আ-লি-শা!” কোথাও কেউ নেই। চারিদিকে এক কাঁপন উঠে। এই বসন্তে গাছপালা প্রকৃতিতে কেমন এক ভাঙনের সুর বাজে। জলাশয়ের পানিগুলোও ভেঙ্গে ভেঙ্গে আগাচ্ছে। তেষ্টা বোধ করে শায়ান। আজলা ভরে পানি তুলে প্রথমে চোখ মুখে মেখে নেয়। ভেজা চোখ মুখে এবার সে সূর্যের আলোর দিকে তাকায়। আলোকেরশ্মির কোমল তীব্র উষ্ণ ছিঁটা তার চোখ মুখে তুলে নেয়। কোথাও পাখি ডাকার আওয়াজ শুনে। আরেকবার চীৎকার করতে ইচ্ছে করে, “আ-লি-শা!” শায়ান সন্দিহান, এই চীৎকার আলিশার কানে গিয়ে পৌঁছুবে কি? এবার তার ভগ্ন হৃদয়ে হালকা বরফ ভাঙ্গার মোচড় তোলে। ঝুর ঝুর বরফ কিছুটা ঝরে পড়ে। নিজের এই ভগ্নতাকে সামলায় শায়ান। কিছু একটা করার তীব্রতা জেগে উঠে, এই নির্মল আকাশ সূর্যরশ্মি ও খোলা প্রকৃতিকে আরেকবার স্বাক্ষী রেখে। কিন্তু তা কী! শায়ান বুঝে উঠে না। রাতে যেখানে এসে নেমে থেমে ছিলো কিছু সময় তারা দু’জন, সেখানে ফিরে আসে সে। এবার তার আবেগের বাঁধ ভেঙ্গে যায়। যে আকাশ বাতাস প্রকৃতিকে স্বাক্ষী করে তারা যাত্রা শুরু করেছিল গতরাতে, তার প্রতি তীব্র এক ক্ষোভ তৈরি হয় তার। প্রচন্ড আক্রোশে ফেটে পড়ে সে। কী এমন আমি করেছি, আমাকে রেখেছো তার থেকে সুদূর! কান্নায় অবনত হয় সে। কাঁদতে কাঁদতে ছুটে যায়, জলাশয়ের পাড়ে। চোখের পানি জলাশয়ের পানির সাথে মেশে। শায়ান বুক ভরে হাওয়া নেয়।

জলাশয় বন বনানী ছেড়ে শায়ান অনিকেতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। এক সময় দূরে পাহাড়ের উপর হাঁটতে থাকে। দিগন্ত জুড়ে আকাশ। মেঘ। মেঘ তাকে স্পর্শ করে। শায়ান চলতে থাকে।

১৩

এভাবে কয়দিন ধরে পাহাড় থেকে পাহাড়ে সে হেঁটে চলেছে। শায়ান তা জানে না। আদৌ কি সে ঘরে ফিরেছে? কিছু খেয়েছে? এক সময় দূর থেকে পাহাড়ের ভিন্ন দিক থেকে একটা দলকে এগিয়ে আসতে দেখে তার সম্বিত কিছু ফেরে। লোকগুলো কেমন এক চাঞ্চল্য নিয়ে ছুটে আসছে কি তার দিকে? ভ্রু কুঁচকে ওই দিকে তাকায় শায়ান। কেমন পরিচ্ছন্ন চমৎকার সাজে একজন। উন্মাদ তেজোদীপ্ত পদক্ষেপ তার। তাকে ঘিরে অন্যরাও এগিয়ে আসছে। লোকগুলো এগিয়ে আসতেই শায়ানের চোখে পড়ে তাদের ক্ষিপ্রভাব । আরে, তাদের সবার হাতে হকিস্টিক কেন! কাছে এসেই বেদমভাবে তারা শায়ানকে মারতে থাকে। শরীরের সর্বত্র জুড়ে হকিস্টিকের আঘাতের পর আঘাত। শায়ান অল্পতেই ধরাশায়ী হয়ে পড়ে। এক সময় সে সংজ্ঞা হারায়।

১৪

শোনা যায়, মাস তিনেক ধরে শায়ান কমা-তে ছিল। এদিকে ব্রোঙ্কো ঘোষনা দিয়ে ছাড়ে, যেদিন শায়ান হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ঘরে আসবে, তার এক হপ্তার মধ্যে সে আলিশা-কে বিয়ে করবে। যে লেলিহান যাতনা বুকে নিয়ে সে এক হপ্তার মধ্যে লন্ডন ছেড়ে দেশে ফিরেছে, তখন প্রতিটি বিন্দু বিন্দু মুহুর্ত তাকে জ্বলে পুড়ে এসিডে কুকড়ে কুকড়ে যন্ত্রণায় নীল করেছে। ঠিকই একই দুঃসহ যন্ত্রণার লোবান সে শায়ানের মাঝে বিস্তৃত করতে চায়। বুঝুক, তার বুক থেকে প্রিয়াকে ছিনিয়ে নেবার নীল দংশন। ব্রোঙ্কোর এই নব ঘোষণায়, শহরের মানুষের মাঝে সিনেমা থিয়েটার উপভোগের মত এক বৈচিত্র্যময় অবস্থার সৃষ্টি হয়। মঞ্চের পর্দা কখন সরে আসবে, তা দেখার জন্য নীরব চাপা অপ্রকাশিত উত্তেজনা বিরাজ করে শহরময়। এই শহরের বাতাসও নাটকের আবহ তৈরিতে জড়িয়ে যেতে গোপন ইচ্ছে ব্যক্ত করে।

শামান সাত্ত্বিক | ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০১১ | ১৫:০৪ বিভাগ: গল্প

এ লে ফ্লে দ্যু মাল – ৩


সম্বিত ফিরে পায় শায়ান। অদ্ভূদ আঁধার এক জড়িয়ে আছে ঘরটাকে। ঝিম ঝিম মাথা নিয়ে মেঝে থেকে উঠে পড়ে। কেমন টলমল লাগছে সব। প্রজাপতিগুলো তার চোখে পড়ছে না। ছটফট করতে লাগলো সে। কোথায় মিলিয়ে গেল এরা। তাদের ছাড়া সে চলবে কিভাবে? তারাই তো তাকে ঘোরতর এক স্বপ্নলোকে উপনয়ন ঘটিয়েছে। যন্ত্রণাটা সুতীব্র হতে থাকে খুব কলজে জুড়ে। ভেতর থেকে চিৎকার উঠে, “আলিশা।” আলিশা নেই। তার প্রজাপতি নেই। পঙ্গুত্ব তাকে জাপটে ধরে আষ্টেপৃষ্ঠে। তার হৃদপিন্ড টেনে বের করে আনছে কে? হাহ্‌।

হঠাৎ অন্য প্রান্ত থেকেও সে চিৎকার শুনতে পায়, “শায়ান। শায়ান।” আলিশা বিছানার যেখানে শুয়ে ছিল, সেখানে বসে তার বালিশে মাথা উপুড় করে রেখে শায়ান যন্ত্রণাকে সামাল দিচ্ছিল। ডাক শুনে চমকে সে মজনুর মত উদভ্রান্ত দৃষ্টিতে ফাঁকা ঘরে এদিক সেদিক তাকায়। তারপর দীপ্ত উগ্র ভঙ্গিতে শরীরে যতটুকু শক্তি সম্ভব জমা করে বীর্যবানের মত ঘরের মূল দ্বারে উপনীত হয়। ঠিক সে সময় ভোরের সব আলো তার খোলা ঋজু দেহটাকে আনন্দে পরিপূর্ণ গ্রাস করে। সূর্যরশ্মি তার দীপ্ত চেতনাকে বিস্ফোরিত করে। ভেতর থেকে ফুঁসে উঠে শায়ান। সে শরীরে কাপড় জড়িয়ে নিতে দ্রুত ঘরের ভেতর প্রবেশ করে।

ভোরের আলো জলাশয়ের এ ধারে এখনো পৌঁছে নি। পত্র-পত্রালীর আড়ালে গাছ গাছড়ার তলে এখানে নিবিড় প্রকৃতি। শায়ান সেখানে মূহুর্ত খানেক অপেক্ষা করে। গতরাতে তারা তো শূন্যে উড়ে এখানে এসে নেমেছিল। বাম বাহুতে আলিশার নিতম্ব পেঁচিয়ে একেবারে প্যারাসুটে করে নেমে এসেছিল উর্ধ্বলোক থেকে এ নন্দন অঙ্গনে।

আলিশা কালো ভ্রমর হয়ে গুঞ্জন তুলছিল বিয়ে বাড়িতে। শাড়ি পড়া কনের সইয়ের বেশভূষ কনেকে ছাড়িয়ে বিয়ে বাড়ির সব আলো কালো রূপের বন্যায় শুষে নিচ্ছিল প্রতিক্ষণ। যুবকরা তার দিকে তাকিয়ে নিজেদের সংযত করে পরক্ষণ। এক আতঙ্ক তাদের স্তব্ধ করে দেয়। আলিশার আশ-পাশ থেকে তারা দূরে ধাবিত হয়। সব আলোকে নিজের কাছে এনে আলিশা তার চতুর্দিকে শূন্যের এক পরিস্কার বৃত্ত তৈরি করে। বৃত্তের চক্রে এসে কে তার বাকি প্রজাপতিদের উড়িয়ে নেবে সে প্রতীক্ষার অবসান হয়ে গেছে। অপেক্ষা এখন শুধু বৃত্তাবদ্ধ হওয়া। এই বৃত্তে যুগলবন্ধী হয়ে উর্ধ্বমুখী হওয়া। বিয়ের মূল আসনে বর কনের সলাজ আসন। আয়নায় একে অপরকে দর্শন। কনের পেছনে দাঁড়ানো আলিশার চোখের পলক আর পড়ে না। সে এক বড় আয়না দেখে তার চোখে। সে আয়নায় ভাসে একটি মুখ, আত্মীয় অতিথি ভীড়ের শেষ প্রান্তে দাঁড়ানো শায়ান। আলিশা সে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে প্রগাঢ়। সে মুখের চোখের পাতা নড়ে একবার। দেখে মুখটাও গভীর সম্মোহনে উলটো মেরু হতে। সে একই আয়নায় গম্ভীর প্রগাঢ় আলিশার প্রেমময় সুখ। তারপর এক এক করে প্রজাপতিগুলো বেরিয়ে আসতে থাকে আলিশা ও শায়ানের শরীরের সর্বত্র থেকে। আলিশা প্রেরিত শায়ানের প্রজাপতিগুলো নেচে নেচে উর্ধ্বে ধাবিত হয়। তাদেরকে অনুসরণ করে আলিশার কাছে থাকা বাকিগুলো। তারপর রঙীন প্রজাপতিগুলো যুগলে যুগলে উর্ধ্বমুখী হয় ছন্দে তালে।

ঠিক সে মূহুর্তে বিয়ে বাড়ির সব আনন্দ উত্তেজনাকে স্তব্ধ করে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। যুবকরা কেঁপে উঠে। ভীত-সন্ত্রস্থ হয়ে উঠে প্রবীণরা। কিন্তু কোন দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে এক ট্যাঙ্গো নাচের ধ্বনি সুর ছন্দ নেমে আসে সব কিছু ছাপিয়ে। সেই পূর্বের সেই শূন্য প্রান্তর যেখানে সর্বত্র রঙিন প্রজাপতি উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। একদিক থেকে সে প্রান্তরে ছুটে আসে শায়ান ট্যাঙ্গো নাচের প্রস্তুতিতে, অন্য প্রান্তরে হতে আলিশা এসে দাঁড়িয়ে গেছে শরীরে তার সব মুদ্রা তুলে। তুমুল চলতে থাকে নাচ। দূরে দাঁড়িয়ে সেই বিয়ের অতিথি মনুষ্যজন। চরম বিস্ময়ে বিস্ফোরিত হয়ে তাকিয়ে দেখছে। তাদের কষ্ট কল্পনায় এমন দৃশ্য নেই। নাচের শেষ দৃশ্যে আলিশা ধনুর মত তার শরীরকে উর্ধ্বমুখী বাঁকা করে শায়ানের বাঁ বাহুতে লুটিয়ে পড়ে। ঠিক সে মূহুর্তে আরেক অদ্ভূত দৃশ্যের অবতারণা হয়। উর্ধ্বলোক থেকে প্রজাপতি সব দ্রুত নেমে এসে এই যুগল মূর্তিকে সম্পূর্ণ পরিবৃত করে ফেলে। একসময় বিয়ে বাড়ির অতিথিরা এই পরিপূর্ণ আসর হতে আলিশা ও শায়ানকে সম্পূর্ণ উধাও হয়ে যেতে দেখে। এই ঘটনায় প্রবীণরা স্তব্ধ হয়ে পড়ে। আর যুবকরা আতংকে তটস্থ হয়ে এক দুঃসহ আগামীর দেখা পেতে আরম্ভ করে।

১০

ব্রোঙ্কো লন্ডনে। শোনা যায় তার একটা এমবিএ চাই। ল’-তে পড়া সম্ভব হয় নি। মানায় না তার সাথে। বাবার ব্যাবসা-সম্পত্তির দেখাশোনা করতে হবে তাকেই। একদিন সব তারই হবে। বাবা ফয়েজুর রশীদ বোনোর রাজনীতি আর ব্যবসার প্রসার, দু’জন দুজনার। গল্প প্রচলিত আছে এক। সেটা অবশ্য স্বামী-স্ত্রীর জীবন মেলানোর গল্প। গল্পটা এমন। কুরবানীর হাট থেকে একটা খাসী কিনে তাকে হাঁটিয়ে বাড়িতে নিয়ে চলুন। দেখুন খেলাটা জমে কেমন। খাসিটা একসময় ঘাড় ত্যাঁড়া করে খুঁটি গেড়ে বসবে। শত টানাটানিতেও নড়চড় নেই। কিন্তু আরেক সময় ভোঁ দৌঁড়। আর যদি খাসির গলায় বাঁধা দড়িটা আপনার হাতে থাকে, তবে তো কথাই নেই। এবার আপনাকেও তার পিছু পিছু ছুটতে হবে ভোঁ পড়ি-মরি করে, যতক্ষণ পাজিটা না থামে। কেমন গ্যাঁড়াকলে অবস্থা। দেখুন। ফয়েজুর রশীদ বোনোর রাজনীতি যদি ছাগল হয়, এবার বলুন, ব্যবসাটা কখন অচল থাকে। আর কখন ভোঁ দৌঁড় দেয়। ঝানু আদমি ফয়েজুর রশীদ বোনো, রক্তের উত্তরাধিকারী ছেলে আফসার রশীদ ব্রোঙ্কোকে তার রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অর্জনে যোগ্য উত্তরসূরী করে উঠাতে চান। ভালই জানেন, পরিবর্তনশীল এই রাষ্ট্র ও সে সাথে পরিবর্তিত এই সমাজে বিদ্যা অর্জনের চেয়ে ডিগ্রীর মূল্য অনেকখানি। আর সে অর্জন যদি পশ্চিম থেকে ঘটে, তবে তোফা বড়ই।

ব্রোঙ্কো ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল। শৈশব থেকে ভয়ংকর কান্ড ঘটাতেই সে পটু। তার কথার বাইরে সমবয়সীদের যাবার অবকাশ নেই। তাতে হিতে বিপরীত। শত্রুকে মাটিতে ফেলে বুকের উপর পা তুলে দিয়ে মা কালীর লজ্জাটাকে আরো বাড়িয়ে তুলতো। কি রকম দন্ত বিদারী উল্লাস বাবা! বাবাকে হার মানাতো। কে জানি বললো, এ ছেলেটা পারলে, যে কাউকে নরমাংসের স্বাদ ভক্ষণ করাতে জানে। নর রক্ত পান না করেও নিজেকে রক্তপায়ী ভ্যাম্পায়ার থেকে কম দূরে সে ভাবে না। হ্যাঁ, অন্ধকার তার প্রিয়। অন্ধকারে চমৎকার চক্র আছে তার, যাদের দিয়ে গুটি চালা সহজ। ভোর হতেই সে ঘুমে মিলিয়ে যায়। কখনো কখনো ঘুম থেকে উঠে শুনে কিছু ভয়াবহ সংবাদ। শহর জুড়ে অথবা পত্রিকার পাতায় নৃশংসতায় আর্ত চিৎকার। তখন তার চোখের ঢুলু ঢুলু নিদ তিরোহিত। মটর বাইকে করে শহর প্রদক্ষিণ। পেছনে আরো কয়েক জোড়া বাইকে এক তরফের প্রাণের বন্ধুরা, নৃশংসতার সখারা। পুরো শহর সংবাদের ভেতরের সংবাদটা পেয়ে যায়। দোকানপাট, ব্যবসা বাণিজ্য অফিস আদালত চলে তার নিজস্ব গতিতে। কোন কিছুর বন্ধ থাকার কথা নয় আজ। সব নির্মল স্বাভাবিক। শহর জুড়ে ব্রোঙ্কোর টহল সব নিশ্চিত করে যায় । কোথাও কিছুই ঘটেনি। এই শহরে পটকাও ফাটে আবার তার ঘুমিয়ে থাকার সময়। এতে নিদ্রা আরো গাঢ় হয়। বিশেষ করে যখন শহরে চলে ধ্বংস যজ্ঞ ও রক্তের হোলি খেলা বিষন্ন। বন্ধ দোকানপাট ব্যবসা বাণিজ্য, যানবাহন অফিস আদালত। সেদিন ব্রোঙ্কো আর ঘর থেকে বের হয় না। ঘুম থেকে জেগে কার্ড খেলাটাকে বেছে নেয়, একতরফা প্রাণের বন্ধুদের বা তার পিস্তল বন্দুক ছোঁড়ার খেলার সখাদের নিয়ে ধীরে মেতে। অর্জন যা হয়েছে, ভাড়াটে ক্যাডারদের দ্বারা তা হয়ে গেছে। নিজেদের এখন আর বন্ধুক পিস্তল নিয়ে খেলার দরকার পড়ে কি?

ব্রোঙ্কোর এই মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়া অশান্ত অবস্থা কিন্তু বাবা বোনোর মেনে নেয়া সম্ভব হয় না। তার অনুপস্থিতে ব্রোঙ্কোকে টিকে থাকতে হলে, নতুন সময়ের নতুন ফর্মূলাতে পদার্পণ করতে হবে। নিজের অর্জিত বিদ্যা ও প্রতিষ্ঠা দিয়ে এখনই তাকে হিমসিম খেতে হচ্ছে। ব্রোঙ্কোর চাই নতুন ডাইমেনশান। নতুন সময়ে খেলতে জুয়া একটা শিক্ষা, জ্ঞান এবং গর্বের আবরণ চাই, যা হবে ব্রোঙ্কোর নিতান্ত নিজস্ব অর্জন। অস্থিরমতি ব্রোঙ্কোকে এই দেশে রেখে কোনক্রমে শান্ত মনে, বেঁধে রেখে জ্ঞানার্জনে নিয়োজিত রাখা সম্ভব নয়। সে বাস্তবতা অনেক আগেই তিরোহিত এই দেশে। এখন প্রয়োজন তাকে তার পরিচিত শেকড় এবং পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করা। যে আতঙ্কের এক সাক্ষাৎ ইমেজ ব্রোঙ্কো, তাকে যে দিনে দিনে উর্ধ্বমুখী করছে সে, তাকে থামাতে হবে, মানুষের বোধ বুদ্ধি বিবেচনার অন্তরে ব্রোঙ্কোকে এবার জায়গা করে নিতে হবে। ব্রোঙ্কোর বিদ্যা শিক্ষায় নিয়োজিত না হলে, তার আর কোন বিকল্প ফয়েজুর রশীদ বোনো খুঁজে বের করতে পাচ্ছেন না। এখনকার এবং আগামীদিনের তরুণ প্রজন্মের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতাকে প্রতিষ্ঠা করতে, সুশীল শিক্ষায় পশ্চিমী চিন্তাধারায় আলোকিত হয়ে উঠুক ব্রোঙ্কো, পঞ্চাশোর্ধ্ব বোনো ঠিকই উপলব্ধি করছেন। ব্রোঙ্কোর যে আতঙ্কের মূর্তি সারা শহরে জেগে আছে, তার পাশে পশ্চিমী বিদ্যা অর্জন হবে, পরিপূর্ণ সোহায় সোহাগা। শেষমেশ ব্রোঙ্কোকে তাই লন্ডন যেতেই হয় কাঁচা অংকের বিনিময়ে। শোনা গেছে, প্রচুর অর্থের শ্রাদ্ধ করছে ব্রোঙ্কো। কিন্তু পড়াশুনা কতদূর এগিয়েছে, তা কারো তেমন জানা নেই।

শামান সাত্ত্বিক | ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১১ | ০৭:১১ বিভাগ: গল্প

এ লে ফ্লে দ্যু মাল – ৪

এ লে ফ্লে দ্যু মাল – ২

এ লে ফ্লে দ্যু মাল – ১

বত্রিশ বছর শায়ানের। বাইশে দেশ ছেড়েছিল। মা জিজ্ঞেস করেছিল, বাইরে যাচ্ছিস কেন? সে বলেছিল, সে এক স্বপ্নপুরীতে এক পরীর দেখা পেয়েছিল। পরী তাকে বলেছিল, তাকে না কি সাত সমুদ্দর তের নদী পার হতে হবে। মা বলেছিল, পাগল! কিন্তু এক নাগাড়ে প্রায় দীর্ঘ ন’বছর দেখে কোন পরীর দেখা না পেয়ে, সে শুধু শ্বেত উর্বশীদের গল্প শুনেছিল বৃদ্ধদের মুখে। কেমন এক আকর্ষণ তার ভেতর কাজ করছিল। সে নেশায় থেকে এত বছর কেটে গেছে। একসময় মনে হলো, পরীর স্বপ্ন দেখার জায়গায় সে ফিরে যাবে। মাও তাড়া দিচ্ছিল। বলছিল, তার মনের মত পরীর সে দেখা পেয়েছে। ফিরে আয় বাছা। কিন্তু ফিরে এসে পরে মনের মত পরী তো দূরে থাক, তার স্বপ্ন শয্যায় ঘুমিয়ে থেকেও আগের সেই পরী বা স্বপ্নের খোঁজ সে পায়নি। এমন বিক্ষুব্ধ বা যন্ত্রণাকর অবস্থা শায়ানের কখনো হয়নি। এই প্রথম তার মনে হলো, বাসার কাঁচগুলো সব ভেঙ্গে ফেলতে। টেবিলের খালি চায়ের কাপ আছাড় মেরে খান খান করতে। ঘরের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে দেয়ালের মাঝখানের লম্বা সুদৃঢ় ঘোলাটে কাঁচ ঘুষি মেরে ভেঙ্গে ফেলতে। শায়ান দেখে তার দু’হাতের মুঠোর পিঠে কাঁচের ভাঙ্গা কিছু টুকরো এলোপাতাড়ি ঢুকে রক্তের সাথে মিশে যাচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্য তার হাতে কোন যন্ত্রণাই নেই। কিন্তু সাথে সাথে চমকে উঠে, মাকে উপরে সিঁড়ির, মাথায় দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে। শায়ান তার হাতের মুঠোবদ্ধ কব্জির দিকে তাকায়। না সেখানে কোন রক্তের চিহ্ন নেই, ভাঙ্গা কাঁচের টুকরোও নেই। দেয়ালের মাঝের লম্বালম্বি লাগানো কাঁচে কোন ভাঙ্গা ক্ষত নেই।

বিয়ে। শোয়েবের বিয়ে। শায়ানের খালার ছেলে। একসময়ের কাছের বন্ধু। এখন প্রতিষ্ঠিত ব্যাঙ্কার। সুন্দরী এক রমণীর খোঁজ পেয়েছে। তাই আত্মীয় বন্ধু সবাইকে তার খোঁজ জানিয়ে দিয়ে মহাসমারোহে তার ঘরে নিয়ে আসার আয়োজন করছে। বিয়ে বাড়ীর চারদিকে সাজ সাজ। শান্ত ধীর ছোট শহর। এখানে হাতে গোনা দু’চার উঁচু-অর্থ ঘর। পুরো শহর কোন এক মায়ায় আবেশে শায়িত সটান। কোন এক মায়ার যাদুর কাঠিতে সবকিছু বয়ে চলে নিরবিচ্ছিন্ন সাবলীল শীতল।

পুরো ঠোঁটের মেয়ে সরল কালো পরশ পাথর গোলাপ। কাছে এসেও দূরে থাকে। গায়ে হলুদ কনের পশ্চাতে দাঁড়ানো উর্বশীর মুখে চোখে রহস্যের চাদর। ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে জায়গা হয় না তার। হাত কাঁপে শায়ানের, ইতস্ততঃ ভাব। চমক থেমে থাকে না আর। এসে গেছে সেই পরী সলাজ। সাবলীল সাহসী প্রেমময় প্রেমাস্পদ। হা, ভাঙ্গা কাঁচের কণাগুলো দু’হাতের মুঠোর উল্টো পিঠে ভীষণ যাতনা দিচ্ছে আবার। কাঁচের টুকরোগুলো তার ধমনী শিরায় ঢুকে গেছে মিহি মিহি দানায়। মনে হচ্ছে, একেবারে হৃদপিন্ডে এসে তার কাঁপন থামিয়ে দেবে। শায়ান হয়ে উঠবে অসাড় মৃত। শায়ানের হৃদপিন্ড থেমে যায়। কিন্তু আশ্চর্য কী এক লাস্যময়ী প্রজাপতি ছুটে আসে একের পর একে আলিশার মুখ, পুরু ঠোঁট থেকে। প্রথমে প্রজাপতিগুলো বসে শায়ানের মেরুন শার্টের মখমলে কলারের চারপাশে, তারপর গলার নীচের বোতামের ফাঁক গলে। একে একে ঢুকে পরে একেবারে পৌঁছে যায় তার হৃদপিন্ডে। শায়ান তার বাঁ হাত নড়াতে পারে না। ডান হাতে ধরা তার ক্যামেরা। আলিশার মিহি হাসি মুচকি হয়ে পুরো মুখ জুড়ে প্রসারিত হয়। সে ঘর ছেড়ে পাশের রুমে চলে যায়। শায়ান ঢোক গিলে উঠে পড়ে। এই মাত্র জীবিত শরীরখানি কোনক্রমে টলেমলে পাশের জানালা গলে বেরিয়ে রাতের আঁধারে মিশে চলে। তারপর সটান নেমে এলো তাদের চারতলা বাড়ির ছাদে, যেভাবে প্যারাসুটে নেমে পড়ে আকাশে উড়ে বেড়ানোর সাধে বিভোর আকাশচারী। শায়ানের গা থেকে আলোর দ্যুতি ছুটছে। তাকে ঘরের মাঝে দেখে মা তো রীতিমত অবাক হতভম্ব। তার শরীরের দ্যূতিতে মায়ের চোখ ঝলসে দেয়। গৃহকর্মী ভয়ে হাঁটার জায়গা ছেড়ে দেয়। শায়ান নিজের ঘরে যেয়ে উপরের ছাদের ভেতরের দেয়ালে নিজেকে সেঁটে রাখে, যেভাবে বিছানায় শুয়ে থাকে মানুষ। আর তার নীচে নামার ইচ্ছে নেই।

ধোঁয়া উড়ছে হাঁড়ি থেকে, বিরাট বিরাট হাঁড়ি। রান্নার বিবিধ গন্ধে মৌ মৌ করছে সে দিকটা। মানুষ জন যার যার মত বসে আছে টেবিলের পাশে। কেউ কেউ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জটলা তৈরি করে আলাপে মত্ত, হাসি ঠাঁট্টা, তামাশা, যদিও এক ভাব গভীরতা বজায় রয়েছে সর্বত্র। আজ তো বিয়ের দিন। শোয়েব আসবে বর বেশে গাড়ী করে। শায়ানের সেই অপেক্ষা নেই। তার ভেতরের প্রজাপতি তাকে উড়াতে শিখিয়েছে। এমন মুক্তি তার আসবে সে কখনো ভাবে নি। কিন্তু তার প্রজাপতিগুলো তো তাদের উৎপত্তির মূলের দিকে তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। আসলে কি এই মুক্তি সে চেয়েছিল? এভাবে কালো উর্বশীর প্রতি ধাবমানতা তাকে কোন্‌ স্বপ্নীল পুরীতে ভাসাবে সে জানে না। শায়ান ভেসে যেতে চায়। দীর্ঘ জীবনে এই ভেসে যাওয়াই তার নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পেছনে ফেরার সব দ্বার, ইচ্ছাই বন্ধ হয়ে আছে। তাকে সেই পরশ পাথর গোলাপটার স্পর্শ নিতেই হবে। শায়ান বিয়ে বাড়ির আকাশে বাতাসে ভাসতে থাকে। নীচের সেই মাহেন্দ্র ক্ষণের অপেক্ষা এবং তা পাবার নিশ্চিত আনন্দ বা বেদনা তার মাঝে নেই। সে হাওয়ায় উড়তে থাকে বিয়ের বাড়ির মাঝ আকাশে স্থির ভেসে থেকে। হঠাৎ তার দৃষ্টি নিবব্ধ হয়, বাড়ির লাগোয়া পুষ্প কাননে বসে থাকা সেই কালো উর্বশীর প্রতি। আশ্চর্য হয়ে পড়ে সে। মাত্র দু’চারটে প্রজাপতি তার শরীর ছুঁয়ে বসে আছে। প্রজাপতিগুলো তাদের উজ্জ্বলতাও যেন হারিয়ে বসেছে। কেমন মন মরা মুখ প্রিয় উর্বশীর। তার পুতুল খেলার প্রিয় প্রজাপতিগুলি হারিয়ে এখন নিঃস্বতায় আক্রান্ত। ছ্যাঁৎ করে উঠে ভেতরটা তার। হা প্রিয়া! হা প্রাণ! অস্থির হয়ে পড়ে শায়ান। ডানা মেলে নীচে নেমে আসতে চায় এবার সে। তার ভেতরের প্রজাপতিগুলোও চঞ্চল হয়ে উঠছে যে! প্রজাপতির ডানায় ভর করে সে নীচে নেমে এলো, দাঁড়াতে গেল প্রিয় প্রেয়সীর সম্মুখ। তার আগেই কে যেন ডেকে তুলে নিয়ে গেল তারে বাড়ির ভেতর। শায়ানের ভেতরের প্রজাপতিগুলো তাকে অস্থির করে তুললো। কোন ক্রমেই তারা তাদের মূল আবাস থেকে বিচ্ছিন্ন হতে আর পারছে না। কোথাকার কোন এক আবাসে এত সময় অজ্ঞানে কাটিয়ে দিয়ে এখন তাদের ধৈর্যচ্যূতি ঘটার উপক্রম। ঘুর ঘুর করতে থাকে শায়ান বাড়ির আশপাশ। কোন ঘরে তার প্রেয়সী লুকিয়ে বুঝে উঠে না সে। প্রজাপতিগুলি তার ভেতরে তীক্ষ্ণ কামড় বসায়। সে দিক বিদিক জ্ঞানহারা হয়ে ছুটতে থাকে বাড়ির সর্বত্র। হঠাৎ তার ধাক্কায়, গুতোগুতিতে বাড়ির অতিথিদের বিস্ময় বিরক্তি দুই ঘটে যুগপৎ। হা করে তাকিয়ে থেকে, এই উন্মাদনার অর্থ খুঁজে তারা পায় না। বিয়ে বাড়িতে নাচের হুল্লোড় উঠে। সেখানেও আলিশা নাই। আবার কাঁচ ভাঙ্গার যন্ত্রণা জেগে উঠে তার ভেতর। এক দৌড়ে সে অতিথিদের জন্য জড়ো করা অসংখ্য গ্লাস একবারে যেই ভেঙ্গে ফেলতে উদ্যত হয়, তখনই দেখে দূরে দাঁড়িয়ে দ্বারে প্রাণেশ্বরী তার। ঠিক তখনই পাশের পানির ভরা ড্রাম উল্টে গিয়ে স্লো মোশানে সব পানি ড্রাম থেকে বের হয়ে শায়ানের আশপাশ ভাসিয়ে দিতে থাকে। তার সাদা চোশতের নীচ এবং নাগড়া পানিতে ভিজে সয়লাব। এক সময় সে তার কাছে টেবিলের পাশে রাখা চেয়ারটায় দপ করে বসে পড়ে। কে যেন টেবিলটায় রাখা বুরহানী ভরা জগটা ধাক্কা দেয়। ছলাৎ করে সব সাদা বুরহানী শায়ানের সবুজ পাঞ্জাবীর দখল নিতে ছুটে পড়ে। শায়ানের ঘাড় আর গলার দু’পাশ এবং চিবুক বুরহানীর সাথে কিঞ্চিৎ সখ্যতা গড়ে তোলে এক ভিন্নরূপে সাজিয়ে তুলে তাকে। চারিদিকে পিন পতন নীরবতা। তাকিয়ে দেখছে তামাশা নীরব বাঁয়ে-ডানের অতিথিগণ। তারই মধ্যে দূরের দ্বার থেকে উচ্চৈঃস্বরে গলায় খিলখিল আওয়াজ উঠলো। আলিশা এইমাত্র জেগে উঠলো। খানিক নীরব ভাব। শায়ানের ভেতরের প্রজাপতিও প্রশান্ত ছন্দে উড়াউড়ি শুরু করে দিলো। এ সময় আশপাশের পুরো অঙ্গন এক নিমিষে উধাও হয়ে সেখানে এক শূন্য প্রান্তর তৈরি করলো। সে প্রান্তরের সর্বত্র জুড়ে শুধু রঙিন প্রজাপতি, তা্রা ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়। সবুজ গাছ ও বনানী প্রজাপতিতে ছেয়ে যায়। আর প্রজাপতিগুলো এগুলোর আড়ালে লুকিয়ে নির্বিঘ্নে নিরিবিলিতে ছায়াময় প্রশান্তিতে নিমগ্ন হয়। শায়ান ছুটছে, সামনে ছুটছে আলিশা। আলিশা ছুটে যায় সরল আঁকাবাঁকায়। শায়ান প্রানান্তকর প্রয়াসে তাকে ছুঁয়ে দিতে ছুটে।

দৃশ্যান্তর ঘটে। কাঠ ও মাটির সমন্বয়ে গড়া ভেতরের অন্দরমহলে মিষ্টি কোমল আলো খেলা করছে। বড় ড্রেসিং আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলের পরিপাটি রূপটি আরেকবার দেখে নিচ্ছে শায়ান। হালকা ফর্সা সৌষ্ঠব গড়নের শায়ানের মুখে পাতলা খোঁচা দাড়ি। উদোম শরীর। শুধু কোমরের নীচটা সদ্য স্নান সারা হালকা নীল টাওয়েলে জড়ানো। পাশের বিছানায় বিছানো মখমলের মেরুন রঙটা একটু আগে আলিশার খোলা বুক জড়িয়ে ছিল। সে এখন সেটাকে দিয়ে যতদূর সম্ভব তার অনাবৃত সারা শরীরকে জড়িয়ে নিয়ে এক পা এক পা করে ভীরু মায়াবী প্রেমময়তায় আয়নার সামনে দাঁড়ানো শায়ানের কাছে এগিয়ে আসে। একসময় প্রজাপতিগুলো সারা ঘরময় হঠাৎ উড়তে থাকে। মনে হলো, এতক্ষণ তারা মাটি-কাঠের অন্দরের প্রতিটি অংশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুমিয়ে ছিলো। আলিশা শায়ানের কাঁধে মাথা রাখে। অমনি রঙ-বেরঙের প্রজাপতিগুলো সব উড়ে এসে তাদের দুয়ের পুরো শরীর ছেয়ে যায়। শায়ান তার বাঁ হাতে আলিশার কোমড় জড়িয়ে রাখে। এভাবে তাদের কতক্ষণ কাটে তারা জানে না। ভোরের আলো ফুটি ফুটি করছে। বাইরের দরজায় প্রচন্ড কশাঘাত শোনা যাচ্ছে। প্রচন্ড আঘাতে দরজা ভেঙ্গে পড়ে। ভয়ে প্রজাপতিগুলো আচমকা তাদের শরীর ছেড়ে কাঠের ছাদে পৌঁছে পথ খুঁজে পালাতে চায়। ছিটকে সরে আসে আলিশা। তার আগেই লোকগুলো ঘরে এসে ঢুকে। কোন একজন আলতো করে আলিশাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নেয়। বিদ্যুৎ গতিতে তাকে আক্রমণে শায়ান এগিয়ে আসে। তার আগেই মাথায় প্রচন্ড এক আঘাত শায়ানকে মাটিতে ধরাশায়ী করে। আর কিছু তার চেতনায় নেই।

প্রজাপতিগুলো সারা ঘরময় প্রাণে বাঁচার অস্থিরতায় দিকবিদিক ছুটে চলে। তারা আলোর মুখ দেখতে চায়। ভেতরটা অন্ধকার ঠেকে। কিন্তু আলো নেই। রুপালী আঁধার। ক্লান্ত হয়ে আসে এই প্রজাপতিগুলো।

শামান সাত্ত্বিক | ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০১১ | ১১:৩১ বিভাগ: গল্প

এ লে ফ্লে দ্যু মাল – ৩

এ লে ফ্লে দ্যু মাল – ১

“এ লে ফ্লে দ্যু মাল” – সেরাহ ব্রাইটম্যান

এই প্রথম জলাশয়ের পাশে বসে আছে শায়ান। এখন বিকেল। দূরে বিস্তৃত পাহাড়, তার উপর মেঘ। ভেসে যেতে থাকে তার গভীরতা নিয়ে। কিন্তু শায়ানের মনের গভীরতা বোঝার উপায় কি? একটু আগে ট্রেনটা তার গতিতে শব্দস্বরে এগিয়ে গেছে। শায়ানকে সামান্যই নাড়া দিতে পেরেছে। সেই শান্ত ধীর জলাশয় ঘিরে প্রকৃতিতে কেমন এক স্বর্গীয় সরসতা। এতে মরে গেলে কি হয়! কত মানুষই তো মরেছে! কীভাবে মরে মানুষ! রোগ শোকে কাতর হয়ে? না, এ মৃত্যু শায়ানের নয়। এখানে শোকও নেই। তবে কি? হারানোর বেদনা আছে, না আছে পাবার যাতনা। সেরাহ ব্রাইটম্যানের আরাবিয়ান নাইটস নয়, একেবারে এ লে ফ্লে দ্যু মাল (the flower of evil)। শায়ান উঠে দাঁড়ায়। একবার পেছনে ফেরে। তার চোখ বাষ্পায়িত হয়ে আছে। সামনে তাকায় সে। রেল লাইনের পরে দূর আকাশ। সেদিকে বাষ্পমাখা অসহায় কাঁদন। থর থর করে কাঁদতে থাকে শায়ান। সে ঘুরে বসে আবার জলাশয়ের ধারে। জলাশয়ের স্বচ্ছ শীতল জল তাকে প্রাণপনে ডেকে যেতে থাকে। পানিগুলোও থর থর করে কেঁপে কেঁপে এগিয়ে চলে। শীতল জলাধারের পাড়ে বসে পড়ে শায়ান। শক্ত হাইকিং বুট তার পায়। পা-টাকে জলে নামিয়ে আনে কিছুটা। বসে থাকে পা ছাড়িয়ে হতাশ। তারপর হাঁটু ভাজ করে। প্যান্টের পকেট থেকে বের করে আনে ছুরি, যেটা জ্যাক নাইফ। ছুরির ফলাটা টেনে বের করে। তারপর কোন কিছু না ভেবেই একটানে বাঁ হাতের মাঝের মাস্যল থেকে কব্জির উপর অবধি ধারালো ফলা দিয়ে কেঁটে যেতে থাকে সমানে। রক্ত বেরুতে থাকে অনবরত। কাঁটা অংশটার যতটুকু পারা যায়, তা ডান হাতে চেপে ধরে এবার স্বচ্ছ জলাশয়ের পাড়ের পানিতে নামিয়ে আনে। সাথে সাথে হাতের আশ-পাশের জলাশয়ের পানি লাল হয়ে উঠে। রক্তিম পানি ছড়িয়ে ছিটিয়ে মিশে মিশে দূরে মিলিয়ে যায়। কতক্ষণ রক্ত আটকানোর প্রচেষ্টায় জলের তলে হাত চেপে বসে ছিল শায়ান জানে না। সে জানে একটু পরে পশ্চিম আকাশ লালিমায় লাল হয়ে উঠবে, তার শোণিতের ছাপে সারা উদার আকাশ ভরে যাবে। মেঘের কোন আলাদা অস্তিত্ব থাকবে না। মেঘের পরে মেঘ জমবে না।

উঠে পড়ে শায়ান। জলাশয়কে পেছেন ফেলে দাঁড়ায়। সন্ধ্যার এই আঁধারি-তে ভূতের মত ট্রেন ছুটে যায়। কিছুটা ঝিমিয়ে থাকা শায়ান বাষ্পরুদ্ধ ভাবটাকে ভাসিয়ে দিতে পারে না কিছুতেই। তার মাথায় বাজতে থাকে,

Is it you I keep thinking of?
Should I feel like I do?
I’ve come to know that I miss your love
While I’m not missing you

We run ’til it’s gone
Et les fluers du mal
Won’t let you be
You hold the key to a open door
Will I ever be free?

কাটা হাতটাকে এখনো চেপে আছে আগের মত সে। একসময় আলো অন্ধকার হয়ে যায়।

সাদা ঘরে খুব নীলাভ হালকা আলো। আঁধার রাস্তার ওপার থেকে দেখা যায়, কাঁচের ওই ঘরের মাঝটাতে। কালো উঁচু লম্বাটে টেবিলে বসে আছে এক দীপ্তিমান যুবক, এখন সে নিস্তেজ নয়। টেবিলটা শাদা কাফন কাপড়ে মোড়ানো হলেও একপাশ থেকে কাপড় উঠে গিয়ে তার কালো রঙ ঠিকই চোখে সাদা কালোর মিশ্রণ ঘটিয়ে দিয়েছে। তার হাত শ্রশ্রুষায় রত এক ধ্যাণমগ্ন নারী। কাটা হাতটা যতদূর পারা যায় পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে তাতে ব্যান্ডেজ বাঁধিয়ে দেয়া হচ্ছে। সেই হাতে ব্যান্ডেজের দিকে তাকিয়ে কি যেন ঠিকরে বের হচ্ছে শায়ানের চোখ থেকে! নিরুত্তর চারপাশ অথবা আশপাশ।

এখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। এই জলাশয়ের দূরে অন্য এক প্রান্তে ঠিক আকাশের বিপরীতে বাঁশ, কাঁঠ ও মাটির সম্বন্বয়ে নির্মিত একটি চমৎকার দৃষ্টিনন্দন সুদৃশ্য বাড়ি। এইটাকে পিকচার পারফেক্ট বলা যায়, কেননা এর আশে পাশে আর কোন বসত ভিটা নেই। এর পাশ দিয়ে জলাশয়, তার পর সুবিস্তৃত আকাশ। ডান পাশে অতি দূরে উঁচু পাহাড়। এই বাড়িটি শায়ান কিছুদিন আগে নির্মাণ করেছিল। এই বাড়িতেই আলিশাকে সে এনেছিল। আলিশা শহরে বেড়ে উঠছিল। শান্ত স্নিগ্ধ ধীরলয়ের শহর। এই শহরেই আলিশাকে মানাতো। কিন্তু একসময় শায়ানের চোখে তাকে মানানো মনে হয় নি। আলিশার প্রকৃতি কী যেন মিস করছিল। সেই মিসিং লিংকটা পেতে এই বাড়ি। তারপর আলিশা, ১৭ -কে এই বাড়িতে নিয়ে আনা। আলিশার চোখ হরিণী। আলিশা শকুন্তলা। আলিশা পাহাড়ী ঝর্ণা। আলিশা জলাশয়ে পা বিছিয়ে প্রকৃতির বনে হারিয়ে যেতে জানে। শায়ানের এই আলিশাকেই চাই।

শায়ান বিদেশ ফেরৎ। সেখানে পাহাড় ও প্রকৃতি জড়াজড়ি করে থাকে। সেখানে লেকের জলে শ্বেত উর্বশীরা উড়ে উড়ে ভেসে থাকে। সেখানে যে কোন পুরুষকে উর্বশীরা স্বপ্নীল পুরীর চাবি দিয়ে দেয়। কেউ তা রাখে, কেউ তা হারিয়ে ফেলে, কেউ দুয়ার খুলে তলিয়ে যায়। শোনা যায়, উর্বশীরা সেই পুরুষের অপেক্ষা করছে, যে এই চাবিতে দুয়ার খুলে উর্বশীদের সাথে তালে তালে উড়ে বেড়াবে। ওখানকার বুড়ো পুরুষেরা বলে, এমন পুরুষ না কি এখনো মিলে নি।

আলিশা কালো। গোলাপও না কি কালো। আলিশা ধবল নয়। হৃদয় তার ধবল। আলিশার ডানা নেই, কিন্তু উর্বশীদের মত উড়ার পাখা গজিয়েছিলো তার। কারো চোখে পড়েনি। শায়ানই তা প্রথম দেখে। তাই শায়ান এই কালো উর্বশীকে এই জলাধারের বনানীতে নিয়ে আসে। সে জানে, সেই একমাত্র পুরুষ যে এই উর্বশীর সাথে তালে তালে উড়ে বেড়াবে। তখন জগত স্বপ্নীল মায়াবী যাদুর পুরীতে রূপান্তরিত হবে।

এখন এই বেলায় তার বানানো বাড়িটায় লেলিহান শিখা আকাশের বিপরীতে দীপ্র হয়ে উঠেছে। শায়ানের হৃদয়ের আগুন ঠিকরে বেরিয়ে এই বাড়িটা দাউ দাউ জ্বলে উঠেছে। আগুন বের হতে দেখে দূর পাহাড়ের ওপার থেকে লোকজন উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে আসে। ছুটে এসে তারা চমকে যায়, যখন দেখে শায়ানের বুক মুখ থেকে উত্থিত আগুনের শিখা বাড়ির দিকে ছুটে এসে পুরো বাড়িটাকে ছেয়ে ফেলছে। কেউ কেউ জলাশয় থেকে পানি নিতে চেয়েছিল। কিন্তু জলাশয়ের শীতল পানি এখন তাপিত হয়ে আছে। শায়ান সে পানিতে দাঁড়িয়ে থেকে বাড়ির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার চতুর্পাশ্বের জলাশয়ের পানি থেকে বাষ্প উত্থিত হচ্ছে। তা দেখে লোকগুলো দূরে, ওই একটু দূরে বনানীর বড় এক গাছের আড়ালে নিরাপদ দূরত্বে গেছে চলে। শায়ানের খালি পা পানিতে। শায়ানের হাতে সাদা গজের ব্যান্ডেজ।

শামান সাত্ত্বিক | ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০১১ | ১১:০৫ বিভাগ: গল্প

এ লে ফ্লে দ্যু মাল – ২

জোৎস্না জড়ানো শিহরণ

বিছানায় শুয়ে আছে অনুসূয়া। ফুলেল বিছানা। তা বিছানার চাদরে বড় বড় গোলাপের ছাপ। বালিশেও তা। পরিপুষ্ট শরীর। একটা সুখের সৌরভে জেগে উঠেছে। রাত্রিবাসে সে ঘরের আলোতে ছায়াচ্ছন্ন ভাব ধরে আছে। ঘর জুড়ে উত্তরের পর্দা। তা সরালেই সকালের বাহিরের আলো। আজ ছুটির দিন। বাইরের আলোটা কেন জানি মরা।

আজ সুরেশকে মনে পড়ে তার। সুরেশের সাথে লং ড্রাইভে শুধু গিয়েছিল একবার। ড্রাইভটা লং হওয়ার কথা ছিল না। এক বাসায় দাওয়াত থেকে ফিরছিল। তার হৃদয়ের বান্ধবীর বাসায়। না করতে পারে নি। প্রদীপের অফিসের কাজে শহরের বাইরে থাকাতে যেতে না পারাটাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু কুমুর বাসার দাওয়াতকে না বলাটা ঠিক ছিল না। এদিকে অনুসূয়ার গাড়ীতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। ব্রেকটাই একটু গন্ডগোল করছিল। ভাল গাড়িটা প্রদীপ নিয়ে গেছে। কুমু তাকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে গেলেও, শেষমেশ ফিরতে সুরেশের গাড়িতে উঠতে হয়েছে। কুমুই সুরেশকে অনুরোধ করেছিল, অনুসূয়াকে তার বাসার পথে নামিয়ে দেয়ার জন্য। কিন্তু দু’জনে কথাতে এত মশগুল ছিল যে, সুরেশের অনুসূয়াকে নামিয়ে দেয়াটা মাথা থেকে সরে গিয়েছিল।। সে তার নিজের ঘরমুখী চলছিল। তার স্ত্রী দেশে গেছে বাচ্চা দু’টোকে নিয়ে। দু’মাস থাকার পরিকল্পনার, শেষ দু’সপ্তাহে সুরেশ গিয়ে দেশে পৌঁছবে। তারপর একসাথে সবাই ফিরে আসবে।

পঁয়তাল্লিশ মিনিট ড্রাইভ করে সুরেশ যখন তার বাসার কাছে পৌঁছালো, তখনই মনে হলো, অনুসূয়াকে নামানো হয়নি। গাড়ি তখন রেড লাইটে এসে থেমেছে। আর তখনই দু’জন দু’জনার মুখের দিকে চেয়ে হেসে উঠলো।

শনিবারের রাত। আকাশটাকে বেশ অন্যরকম লাগছিলো। রাতের শহরের যে একটা পরিচ্ছন্ন, গুছানো রুপ আছে, তা শহর থেকে একটু বাইরে গেলে ধরা পড়ে। অগাষ্টের প্রথম দিকের আবহাওয়াটা বেশ চমৎকার। একটা ফুরফুরে ভাব আছে। উপভোগ্যই মনে হচ্ছিল রাতের এই উদাসীন সৌন্দর্যকে। অফিস-আদালতের ব্যস্ততার বিপরীতে এক মনোরম আনন্দবর্ধক অনুভূতি। এমন অনুভূতি মানুষের জীবনে হঠাৎ-ই আসে। আসে এমন হারানোর অভিলাষ। ছুটি পেলে প্রদীপের ঘুমিয়ে বা ইন্টারনেটে কাটাতেই পছন্দ। ঠেলে কোথাও নিয়ে যাওয়া যায় না সহজে। নিজের মর্জিকে বেশি দাম দিচ্ছে। বলে কি না, মুড না এলে কোন কিছু সে করতে পারে না। কোথাও যাওয়াও না। তাছাড়া যুক্তিও দেয়। “সবসময় তো বাইরেই থাকি। ছুটিতে আর বাসায় থাকতে দেবে না?”

এখনকার এ মূহুর্তটাকে আর অবহেলায় হারানো যায়? এরকম মূহুর্তগুলোয় শুধু নিজেকেই উপভোগ উপলব্ধির মধ্যে নিতে হয়। অন্যের সাথে শেয়ার করা যায় না। প্রদীপের সাথে তো নয়। ভিডিও গেমে যে আনন্দ উপভোগ করে, সে জোৎস্নায় ভেসে যাওয়া বালুকাময় চরে জিপে চড়ে বেড়াতেই ভালবাসবে। তাতে জোৎস্নাকে উপভোগ করা নয়, তাকে মাড়িয়ে যাওয়াই হয়।

অনুসূয়া তখনো হাসছে। হঠাৎ মনে হলো, কী আছে একটু হারিয়ে গেলে! কেমন হয়? সুযোগটা নেয়া যাক! স্বাচ্ছন্দ্যে সুরেশকে বলে বসে, “চলুন না, শহরের বাইরে কোথাও এক ছুট দিয়ে ঘুরে আসি।”

সুরেশও রাজী হয়ে যায়। তাই তো! কী বা করবে ঘরে গিয়ে এখনই। একটু কাটানো যাক না এভাবে।

পাক্কা ঘন্টা দেড়েকের উপর হাইওয়েতে ড্রাইভ শেষে তারা এমন একটা স্থানে আসে যা পুরোপরি শহর ছাড়িয়ে। সেখান হতে দূরে শহরটাকে পুরো দেখা যায়। শহরের স্তর থেকে এটা উঁচুতে। তাই পুরো শহরটার আকাশসীমারেখার পরিষ্কার দর্শন মেলে। রাতের কৃত্রিম আলোয় শহরটাকে অদ্ভূত সাররিয়েল মনে হয়। অথচ এই আলোয় রাতের জোৎস্নাকে একদম টের পাওয়া যাচ্ছে না। শহর ছেড়ে এদিকে আসায় পূর্ণিমাকে ভালই টের পাওয়া যায়। গাড়ি থেকে নেমে এসে এই উঁচুতে দাঁড়িয়ে তারা আলোর বিচিত্রতায় দূর শহরের দৃশ্যটাকে উপভোগ করে নীরবে।

দু’একটা গাড়ি কিছু পর পর শাঁ শাঁ করে পেছনের রাস্তা ধরে চলে যায়। এভাবে শব্দহীন রাতের সাথে সখ্যতা গড়ে দু’জনে ঘন্টা আধেক অথবা কিছুক্ষণ আরো। অনুসূয়া একসময় বলে উঠে, “সুরেশ বাবু, ফেরার ইচ্ছে করছে না?” একটু দ্বিধান্বিত হয়ে সুরেশ বলে, “আমার তো ভালই লাগছে।” অনুসূয়া উৎফুল্ল হয়ে বলে, “আমার তো থেকে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে আজ।” দুজনে কিছুক্ষণ হাসলো। কোন অর্থ আছে কি না এই হাসাতে তা বোঝা যায় না। দু’জনে হাঁটতে থাকে এলোমেলো দু’দিকে। কিছুটা উদভ্রান্ত মনে হতে পারে। এই হাঁটার যেমন অর্থ নেই, দু’জনের মাঝে এই নিয়ে কোন ঝগড়া-ঝাটিও নেই।

এইভাবে কতক্ষণ হাঁটে একা একা অনুসূয়া মনে নেই। তবে হেঁটে সে অনেকদূর চলে আসে। তারপর এক জায়গায় অনাদরে পড়ে থাকা এক ছোট বর্গাকৃতির পিলারের উপর পা ঝুলিয়ে বসে থাকে। পূর্ণিমা রাতের সুনসান সৌন্দর্য এই বিস্তীর্ণ প্রান্তরের বিশালতায় জেগে আছে। প্রাণভরে অনুসূয়ার আত্মার অতলে তলিয়ে যেতে থাকে তা। অন্যদিকে সুরেশের আর বেশি দূরে যাওয়া হয় না। সে উল্টো ঘুরে তার গাড়ির কাছে চলে আসে, যে স্থান থেকে তারা দু’দিকে হাঁটা দিয়েছিলো। পূর্ণিমার আলো তার প্রাণেও বাঁশির সুর তোলে। অনেকক্ষণ আনমনা হয়ে থাকে সে। চাঁদের দিকে তাকিয়ে সাত-পাঁচ ভাবে। দূর হতে অনুসূয়া হেঁটে আসে। সুরেশকে দেখে তার হাঁটার গতি বেড়ে যায়। সুরেশের কাছে এসে পাশে একটু দাঁড়ায়। তারপর ক্ষীণ কন্ঠে বলে, “চলুন, ফেরা যাক।” “ও হ্যাঁ” বলে সুরেশ গাড়ির দরজা খুলে অনুসূয়াকে ঢুকতে দেয়। ভোরের আলো ফুটে উঠার দেরি বেশি নেই।

“আপনি ঘরে ফিরে আমাকে জাস্ট একটা ফোন দেবেন। তাহলে বুঝতে পারবো, আপনি ঠিক ঠিক বাসায় পৌঁছে গেছেন।” – অনুসূয়াকে বাসায় নামিয়ে দিলে সুরেশকে সে এই কথাগুলো বলে। সুরেশ ফোন করে নিরাপদে বাসায় ফেরার কথা ঠিকই জানিয়ে দেয়।

এর দু’দিন পর প্রদীপ ফিরে এলো। সেই সাথে মেয়ে স্বাতীও ফিরলো, পাশের শহরে খালার বাসা থেকে। কী আশ্চর্য! টেলিফোনে আগত কললিস্ট থেকে বৌদি শিবানীর ফোনের উত্তর দিতে গিয়ে ভুলক্রমে সুরেশের ফোন নাম্বারে ফোন করে বসলো অনুসূয়া। সঙ্গত কারণেই ফোন সুরেশের ভয়েস মেইলে চলে গেছে। সুরেশ এখন দেশে। বৌ-বাচ্চাকে নিয়ে ফিরবে।

অগাস্টের শেষ। এই সময় আবহাওয়ার মাঝে একটা শীতল ঠান্ডা আমেজ থাকে। এটা খুব ভাল লাগে অনুসূয়ার। এই সময়টাই বেশি প্রিয়। ‘ফল’ ঋতু আসার আগে ‘সামার’ মিলিয়ে যাবার সময়টা এখানে উপভোগ্য ঠেকে। শীতে দেশে যাবার পরিকল্পনা আছে বলে, অনুসূয়া বা প্রদীপ, কারোরই এবার অফিস থেকে গ্রীষ্ম ছুটি নেয়া হয়নি।

সুরেশকে বেশ মনে পড়ছে। আবারও অফিসের কাজে প্রদীপ দূরের শহরে গেলে পথে স্বাতীকে তার চাচার বাসায় নামিয়ে দিয়েছে।

অনুসূয়া পর্দা সরিয়ে বাইরের প্রকৃতিটাকে আরেকবার দেখে। সূর্যের দেখা এখনো মেলেনি। শান্ত প্রকৃতির কেমন থমথমে ভাব। কী হয় ঘুমিয়ে নিলে আরেকবার!

%d bloggers like this: