সুমনের একাত্তর

পুকুরে পানি দেখাটা বা পানির উপর হাঁসের সাঁতার কাটাটা নতুন হলেও সব কিছুই কেমন স্বাভাবিক ঠেকে সুমনের কাছে। সব ছিমছাম। গোছালো ভাব সর্বত্র। এখন যা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে, পরে তা তুলে নেয়া হচ্ছে। উঠোনটাকেও তাই ছিমছাম মনে হয়। নারকোল পাতার বাতাসে নড়া অথবা আম পাতার সৌরভ, কাঁচা আম, ঝুলন্ত কাঁঠাল সব তার কাছে নতুন। নারকেলের পানির চেয়ে, শ্বাসটা তার বেশি পছন্দ। আবার কাঁচা নারকেলের ভেতরের সাদা ঘন তরলটাও তার পছন্দ। পছন্দ কলার ভেলা ধরে পানিতে ধাপাধাপি। সুমন এর মাঝেই ডুবে থাকে। মার জোর করে বিছানায় পড়াতে বসিয়ে রাখাটা তার কাছে বেদনাকর। মাকে বোঝায় কে? এখন তো কারো কোন স্কুল নেই। যেদিন রাতে তাদের বেড়ে উঠা শহরের বাসা ছেড়ে, পরদিন কোন একসময় লঞ্চে করে শেষমেশ নানা বাড়ি হয়ে দাদার বাড়িতে আসা হলো গভীর রাতে, সেদিন থেকে তো আর পড়াশুনার প্রশ্ন উঠলো না। স্কুলে যাওয়ার কোন তাগাদা ছিল না। এখন আবার জোর করে পড়তে বসা কেন? মা-টাকে পছন্দ করতে পারে না সুমন। তার বড় দুই আপন ভাই বা তার থেকে সামান্য ছোটবড় চাচাতো-জ্যাঠাতো ভাইয়েরা তো বইয়ের ধারে কাছে নেই। তাহলে একা একা তাকেই কেন বা পড়াশুনোর শাস্তি ভোগ করতে হবে? তার ভাইয়েরা বা তার চেয়ে বেশ বড় চাচাতো-জ্যাঠাতো ভাইয়েরা তো দুরন্তপনায় কম যায় না। তারা পড়ে ক্লাস ফোরে, কেউ সিক্স, সেভেন-এইটে। ক্লাস ওয়ান পাস করা সুমনকে মাঝে মাঝে বড়দের দামালপনা ছুঁতে পেছনে পেছনে দৌঁড়াতে হয়। সবার পেছনে পরে থাকার যে কষ্ট আছে, এটা অন্যদের বোঝাবে কে? কখন যে বড় হবে!

মাকে মাঝে মাঝে বলতে শোনা যায়, “একবার সুযোগ পেলে, তবে সব ছেলেগুলোকে বন্দুক চালানো শেখাবো।” মাকে তখন উত্তেজিত মনে হয়। বন্দুক চালনা জানা থাকলে, অন্ততঃপক্ষে অস্তিত্ব রক্ষার দুঃশ্চিন্তা নিয়ে সর্বক্ষণ কাউকে থাকতে হবে না। এমন চিন্তা মাকে করতে দেখে কেউ তখন অবাক হয় না। সুমনরা চার ভাই। সুমন ভাইদের মধ্যে সবার ছোট।

বড় ভাইয়া গ্রামে এলেই মাকে বেশ উদ্বিগ্ন দেখাতো। ভাইয়াও বেশ গম্ভীর হয়ে থাকতো। ভাইয়া মোমেনশাহী ক্যাডেট কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে পরে। একবার দু’তিনজন জোয়ান মানুষ এসে সুমনের চাচা-জ্যাঠাদের ভিটে-বাড়িতে ঢুকে প্রত্যেকে প্রতিটি ঘরের খাটের তলাতে কি যেন খুঁজে বেড়াচ্ছিল। তাদের হাতে বন্দুক ছিল। সে সময় ভাইয়া বাড়িতে ছিল। এক গম্ভীর সলাজ তটস্থ একটা ভাব ভাইয়ার মধ্যে তখন বিরাজ করছিল। সুমন জানতে পারে, লোকগুলোকে রাজাকার বলা হতো। তারা খাটের নীচে বন্দুক খুঁজে বেড়াতো। এ কারণে মা চাইতো না, ভাইয়া বাড়িতে থাকুক। এরকম তিনজন লোক আরো একবার বাড়িতে এসে প্রতি ঘরে ঘরে গিয়ে খাটের নীচে বন্দুক খুঁজে বেড়িয়েছিল। সেবার ভাইয়া ক্যাডেট কলেজে ছিল। বাবা বাড়িতে থাকতেন না। রেলওয়েতে কর্মক্ষেত্রেই থাকতে হতো বাবাকে।

বন্দুক নিয়ে রাজাকারগুলো খাটের তলা খুঁজতে এলে এতটুকু সুমনের ভয় করতো। ভয় আরো করতো, যখন দক্ষিণ বাড়ির নূরালী সিদ্দিক চাচার ছেলে সুমনদের বাড়িতে এসে তার মেজো জ্যাঠার ভিটের উপর পিঁড়িতে বসে সারাদিন কাটিয়ে দিতো। ভিটের উপর তার পাশেই সে তার বন্দুকটা রাখতো। সুমনের এজন্যই ভয়টা বেশি হতো। লোকটা মাথা নীচু করে যেভাবে তাকায়, তাতেও সুমনের ভয় করে। উনি ছুটিতে ওনার বাড়ি এলে দিনের বেলা এ বাড়িতে এভাবে বসে কাটিয়ে দেন। একদিন এক চাচী তাকে জিজ্ঞেস করেছিলো, ‘কিরে দাউদ, তুই সারাদিন এইখানে বইসা থাকোস কেন্‌? কোন উত্তর দেয়নি সে। শুধু একটু নড়ে বসে, মাটিতে রাখা বন্দুকটাকে স্পর্শ করে। যেভাবে সে বন্দুক স্পর্শ করতো, তাতে সুমনের মনে হতো, লোকটি বন্দুককে স্পর্শ করছে, নাকি বন্দুকটির স্পর্শ পেয়ে লোকটি জোর ফিরে পাচ্ছে। সে সাথে নিজেকে শক্তিশালী ভাবছে। তাকে কি কেউ এখানে মারবে? তাহলে সে ভয় পাচ্ছে কি? এতসব বুঝে না সুমন। শুধু দূর থেকে আড়ালে লক্ষ্য করেছে, সামান্য একটু শব্দ হলেই লোকটার হাত বন্দুককে স্পর্শ করে। সুমন এও লক্ষ্য করেছে, রাজাকারদের সাথে কেউ কথা বলে না একদম। তারা এলে তখন সবকিছু থমকে যায়। রাজাকারদেরও কথা বলার চাইতে একরকম তটস্থ থাকতে দেখে ও।

কিন্তু যখন বাড়িতে প্রথম দু’জন মুক্তিযোদ্ধা এলো, উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিল বাড়ির লোকেরা। কড়কড়ে সূর্যতাপে গাছ থেকে সাথে সাথে ডাব পেড়ে খাইয়েছে। তাদের জন্য দুপুরে খাওয়ার আয়োজন করতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা থাকেনি। কাজ আছে বলে চলে গেছে। এই দু’জন লোককে বেশ প্রাণবন্ত লাগছিল, যদিও তাদের মাঝে একধরণের ক্লান্ত ভাব ছিল। চোখ দেখে মনে হতো, তারা এখনো ঘুমায়নি বা তাদের এখনো ঘুমোনোর সময় হয়নি। কাজ বোধ হয় এখনো বাকি রয়ে গেছে। একটা তাড়া ছিল তাদের মাঝে। সুমনের চোখে পড়েছিল, লম্বা লোকটির লুঙ্গিতে কোন সেলাই নেই। সে একটু পর পর তার সরে যাওয়া লুঙ্গির অংশটাকে সামনে নিয়ে আসছিলো। লোক দু’জনকে দেখে তার আরো মনে হয়েছিল, এদের ঘর নেই, বাড়ি নেই, দিন নেই রাত নেই। যখন যেখানে প্রয়োজন, তখন সেখানে ছুটে যাচ্ছে। বাড়ির এবং পাশের বাড়ির অন্য ছোটবড় ভাইদের সাথে সেও এই দুই মুক্তিযোদ্ধার সাথে হেঁটে বাড়ির সীমানা পর্যন্ত এসেছিল। তাদের কাঁধে সে বন্দুক দেখেছিলো। কিন্তু কারো মাঝে তেমন কোন ভয় দেখেনি এবং এমনকি সুমনের নিজের মাঝেও। কী যে সদর্পে লোক দু’টো হেঁটে যাচ্ছিল! কেমন এক সাহসী, শান্তি ভাব। ওইদিনটা অন্যদিনের চাইতে অন্যরকম ছিল।

একবার বাবা গ্রামে এলে সুমনরা তিনভাই মিলে বাবার সাথে জুমার নামাজ শেষে বাড়ি ফিরছিল। নূরালী সিদ্দিক চাচা বেশ ধার্মিক। জিন্নাহ্‌ টুপি পাঞ্জাবী-পাজামা সবসময় পরে থাকতেন। উনি নাকি শান্তি কমিটির মেম্বার ছিলেন। কথা বলাতে খুব চালু ছিলেন। বাবার ছোটকালের বন্ধু বলে বলছিলেন, “সাদেক দেইখো, এইসব জয় বাংলা, স্বাধীন বাংলা একদিন কোথায় চইলা যাইবো। শেষমেশ শুধু থাকবো, ইসলাম আর পাকিস্থান।” বাবার কাছ থেকে কোন উত্তর না পেয়ে বা ভাবান্তর না দেখে তিনি চীৎকার করে বলতে থাকেন, “আরে এগুলি তো হিন্দুদের চক্রান্ত, ইন্ডিয়ার ষড়যন্ত্র। আমাগো যদি ঈমান ঠিক থাকে, তবে ইনশাল্লাহ্‌ পাকিস্থানের কোন ক্ষতি কাফেররা করতে পারবো না।” বাবা সামনের দিকে মাথা নেড়ে সম্মতি দিতে দিতে দ্রুত সুমনদের নিয়ে বাড়ি ফেরেন।

যুদ্ধ শেষে দু’বছর বাদে সুমন তাদের গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যায়। লোকমুখে শুনে নূরালী সিদ্দিক চাচা বাবাকে ধরেছে তার ছেলে দাউদের জন্য রেলওয়েতে চাকরির ব্যবস্থা করার। বছরখানেক পর চাকরিতে প্রমোশনের পর বাবার বদলীর কারণে সুমনরা উত্তরবঙ্গের সৈয়দপুরে চলে আসে। এখানে প্রচুর অবাঙ্গালী আছে। ‘৭১-এ তারা পাকিস্থানের সমর্থনে ছিল। তাদের কিছু বাংলাদেশ রেলওয়েতে তখনও ছোট চাকরি করে। একদিন সুমন তার বাবার অফিসে গেলে রাজাকার দাউদকে দেখে। সে সৈয়দপুর রেলওয়েতে চাকরিতে যোগ দিতে এসেছে। লোকটাকে যুদ্ধের সময় সে মাথা নীচু করে থাকতে দেখেছে। এখন তার ঘাড়টাও সে সাথে নীচু হয়ে গেছে। তখনও যেমন সে কথা বলতো না, এখনো সে কথা বলে না, নিজের কাজ নিয়ে আছে। সুমনের ইচ্ছে হয়, একবার কি জিজ্ঞেস করবে, “আচ্ছা আপনি রাজাকার হয়েছিলেন কেন?” কিন্তু লোকটা কোনদিকেই তাকায় না। কাগজ হাতে এক অফিস থেকে আরেক অফিসে ছুটছে।

চাকরির প্রমোশন হওয়াতে বাবার কাজের পরিধি ও চাপও বেড়েছে অনেক। অনেক খাটতে হয় তাকে। একদিন খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। হাসপাতালে কাটাতে হয় বাবাকে কিছুদিন। এই সময় মা খুব অধৈর্য্য, উৎকন্ঠিত এবং অসহায় হয়ে পড়েছিলেন। বড় ভাইয়া যুদ্ধ শেষের বছর দুয়েক পর ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পড়ছে। সুমনরা বাকি তিনভাই। যুদ্ধের সময় মার ইচ্ছে ছিল সব ছেলেকে বন্দুক চালানোর ট্রেনিং দেবেন। তার ব্যবস্থা তিনি কোনদিনই করে উঠতে পারেন নি ঠিকই। কিন্তু বাবা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গেলে বলেছিলেন, “বড় ছেলে তো ডাক্তারি পড়লোই না, বাকি তিন ছেলের সবগুলিকে আমি ডাক্তার বানাবো।”

আর সবার ছোট বলে এই চাপটা সুমনের উপর বেশি পড়ছে। সেই যুদ্ধের বছরের মত তাকে জোর করে পড়তে বসানোটা মার এখনো চালু আছে।

শামান সাত্ত্বিক | মার্চ ০৬, ২০১২ | ০৪:৩২ বিভাগ: গল্প, মুক্তিযুদ্ধ

Advertisements

উদ্বাস্তু সময় – ৬

উদ্বাস্তু সময় – ৫

সারাটা দিন একটা প্রচ্ছন্ন বেদনাতে কুঁকড়ে থেকেছে মালেকিন সন্ধ্যা হলে তারা অনেক ফুল সংগ্রহ করে রাখে। তাদের কেউ কেউ সেই ফুলে মালা গাঁথে। গাঁদা, ডালিয়া, কসমস, চন্দ্র মল্লিকা, জিনিয়া, মোরগ ফুল। সে সাথে আছে টগর, জবা। কেউ কেউ আবার ভোরে আসতে গোলাপ, রজনীগন্ধা নিয়ে আসবে। মালেকিন মুঠোভরে ফুলের গন্ধ নেয়। ফুলগুলো তার ভেতরের রক্তে উন্মাতাল অনুভূতি আনে। তার আত্মাকে এই ফুলের সাথে মিশিয়ে নেয়। প্রাণে স্পন্দন খেলে তার। এই যে, তিনটা মিনার দাঁড়িয়ে আছে, তাদের নত মাথা উঁচু করে। এ কি শুধু অর্থহীন দাঁড়িয়ে থাকা? এ কি এক সাগর আবেগকে ধরে রাখা নয়? এ কি শহীদানের স্মরণ নয়? এ কি শহীদানের আত্মদানের সাথে আমাদের আত্মিক যোগাযোগ নয়? এই মিনারের দিকে তাকিয়ে দাঁড়ালে আমাদের অস্তিত্ব ও চেতনা শাণিত হয়ে উঠে না? দেশ মাতৃকা কি প্রাণে এসে বসে না? আর এমন কী বা করণীয় আছে; যার কারণে দেশমাতৃকার চেতনা ও বোধ তীব্র হয়ে ফুটে উঠতে পারে।

খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে পড়ে মালেকিন। তখনও আজান দেয়নি। পাখিও ডাকেনি। পাখির ডাক মালেকিনের খুব পছন্দ। আজও সে তার শ্রুতিতে পাখির গান চায়। তার প্রাণে যে শোকাবহ আবেগ তৈরী হয়েছে, আছে তাতে দেশ প্রেমের উন্মাদনা। নিরবিচ্ছিন্ন পাখির কলতান তার খুব প্রয়োজন। তা না হলে এক অসামজ্ঞস্য প্রকৃতির ভারসাম্যহীনতা তাকে আরো অস্থির বিচলিত করে তুলবে।

কিছুক্ষণ পর পাখির ডাক শুরু হয়ে যায়। মুয়াজ্জীনের আজান ভেসে আসে দক্ষিণের মসজিদ থেকে। প্রাতঃক্রিয়াদি সম্পন্ন করে মালেকিন নিজেকে আরো শুদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করে। ফুপার শহর থেকে নিয়ে আসা মেরুনরঙের নতুন পাজ্ঞাবীটা শরীরে চাপায়। পাজ্ঞাবীর উপর সূতার নক্‌শা করা কাজ তার ভাল লাগে। এই নক্‌শা যে বাঙ্গালীর নিজস্ব পরিচিত। বাইরে এখনো আঁধার, ফর্সা হয়ে উঠেনি। বাঁশের বেড়ার জানালা দিয়ে যে আলো আসছে, তাতে নিজেকে তেমন দেখা না গেলেও, বাবা-মা-দের সময় থেকে ঘরে বাঁশের দেয়ালে ঠেস দিয়ে থাকা লম্বা আয়নায় নিজেকে সে আপাদ-মস্তক দেখে একবার। সাথে সাথে আবেগ এসে ভর করে মালেকিনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে।

হাঁ, বুইব্বাই তো। তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে এখন। আর মিটিমিটি মিষ্টি হাসছে। মালেকিন আয়নার ভেতর দিয়ে তা পরিষ্কার দেখছে। কখনো নতুন কোন শাড়ী পরলে নিজেকে আপাদমস্তক অনেকক্ষণ খুঁটে খুঁটে এই আয়নায় দেখতো বুইব্বা। আবার মাঝে মাঝে আলমিরা থেকে ভাঁজ করা মায়ের শাড়ী পরে নিজেকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতো। মালেকিন তখন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতো। সে সময় পেছনে আয়নায় মালেকিনকে দেখা গেলে, সে আয়নার দিকে তাকিয়ে বুইব্বা ভেংচি কাটতো। ঘুরে ঘুরে যখন নিজেকে দেখতো আয়নায়, তখন মালেকিনের এইরুপ তাকিয়ে থাকা দেখে বলতো, “কিরে শাড়ী পইড়বি? ঠোঁটে লাল লিপিস্টিক লাগাইবি? চোখে কালা কাজল?” মালেকিন মাথা কাৎ করে চোখে মুখে গোস্বাভাব দেখাতো। তখন বুইব্বা বলতো, “তোরে যা সোন্দর লাগবো না, এইরকম সাজাইলে।” তারপর হি হি করে হেসে উঠতো। ওই অবস্থায় মালেকিনের আর দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হতো না। অভিমানে রাগে দ্রুত সে কক্ষ ছেড়ে পাশের কক্ষে চলে যেতো।

মালেকিন দ্রুত পেছনে তাকায়। ফাঁকা ঘরে ওপাশের জানালা দিয়ে মৃদু আলো আসতে চায়। ঘর এখনো অন্ধকার। কেউ নেই। মালেকিনের চিন্তার তাল কেটে যায়। নতুন চিন্তা এসে ভর করে।

মানুষ মরে গেলে তাকে কোথাও পাওয়া যায় না। আর কোথাও! বাবা-ভাই মারা গেলেও সে প্রথম এত টের পায়নি। ধীরে ধীরে বুকের কোথাও যেন ব্যথার ক্ষরণ থেকে থেকে শুরু হয়েছিল ঠিকই। মা-কে দেখে ঠিকই বুঝতো, কেন ব্যথাটা হচ্ছে তারও। কিন্তু বুইব্বা চলে যাবার পর, সবকিছু তার কাছে শূন্য ফাঁকা মনে হয়। বাবা-ভাই-বুইব্বা, কোথায় যেন তার মাঝে এক নিখাদ শূন্যতা সৃষ্টি করে। মাকে দেখলে সে শূন্যতার একটা পরিমাপ করা চলে। কিন্তু তার তল যে ছুঁইতে পারে না মালেকিন।

মালেকিন আরো ভাবে, মৃত মানুষটা তো হারিয়ে যায়। এই মাটির পৃথিবীতে তার কোন অস্তিত্বই নেই। তাকে মনে রাখে আর কে? শুধু তারাই বাধ্য হয় মনে রাখতে, যাদের সাথে ছিল বা আছে তার নাড়ীর যোগাযোগ। তারা শত চেষ্টা করেও তাকে ভুলতে পারে না, যেহেতু সে মিশে থাকে জীবিত মানুষটার সত্ত্বায়। এভাবে যে যত মিশে থাকতে পারে, জীবিত মানুষের সত্ত্বায়, সে মৃত মানুষকে ভুলে থাকা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আর মা বোধ হয়, সে এক কঠিন পাথরের বোঝা মাথায় বয়ে বেড়ায়, আজও দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। মালেকিনের মনে হয়, গ্রামের মানুষেরই বা কেন এত দায় হবে, তার বাবা-ভাই-বুইব্বাকে মনে রাখার। এই দায়, একান্তই তাদের পরিবারেরই। এইজন্যই কি সে এত বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস বা ভাষা শহীদ দিবস পালন করে আসছে? একটা চিন্তা সেই মূহুর্তে মালেকিনকে ধাক্কা দেয়। স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসের সাথে না হয়, তার বাবা-ভাই-বুইব্বা ওতপ্রোতভাবে জড়িত আছে, কিন্ত ভাষা শহীদ দিবসের সাথে তো তাদের শহীদানের কোন সম্পর্কে নেই। তবুও এত আবেগ, এত বোধের তীব্রতা তাকে গ্রাস করে কেন এই দিনটি পালনের? তার চিন্তা কিছুক্ষণ থমকে যায়। সে কি তাহলে আজ ঘরে বসে থাকবে প্রভাত ফেরী বাদ দিয়ে?
‘ভাইজান’!’ ‘ভাইজান’!’
কে মোত্তালিব না? এমন হেঁড়ে গলায় চিৎকার করছে কেন? মালেকিনের চিন্তার জাল ছিন্ন হয়।
‘ভাইজান!’ আবারও আগের চাইতে উঁচু গলায় চীৎকার করে। ফুপার গলার আওয়াজ শোনা যায়। পাশের ভিটার ঘরের দরজা খোলার শব্দ আসে। মালেকিন ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।

এরই মধ্যে ৪/৫ জন গ্রামের ছেলে মালেকিনদের উঠানে ফুলের তোড়া ও মালা হাতে জড়ো হয়েছে। তারা মোত্তালিবের চিৎকার শুনে তার কাছে এগিয়ে গেছে। মালেকিন উৎসুক কৌতূহল নিয়ে মোত্তালিবের কাছে এসে দাঁড়ায়। মোত্তালিবদের বাড়ি স্কুলের দক্ষিণে। মালেকিনদের শহীদ স্মৃতি সংঘের সে এক নিবেদিত প্রাণ কর্মী। যে কোন অনুষ্ঠানের ভাল-মন্দ দিকগুলো সবার আগে, তার নজরে আসে। আর সে কারণে, সে সব অনুষ্ঠানের মধ্যমণি হয়ে উপস্থিত হয়। মালেকিন জানে, গত দু’বছরের একুশে শোভাযাত্রায় সে ছিল সামনের সারিতে মধ্যস্থলে। একপাশে মালেকিন নিজে, অন্য পাশে মোত্তালিব মিলে শহীদ মিনারে পুষ্প স্তবক অর্পণ করে। আজও যে ব্যত্যয় হবে না, এমনি সে আশা করে। কিন্তু মোত্তালিবের মানসিক অবস্থা দেখে সে কিছুই আঁচ করতে পারে না। সে শুধু চোখ দু’টো বড় করে কী যেন বলতে চাইছে। এই দেখে মালেকিন তাকে তড়িৎ জিজ্ঞেস করে, “কিরে কি অইছে?”
– “ভাইজান।”
– “হাঁ, কি অইছে ক!” মোত্তালিব কিছু বলতে যেয়ে থেমে যায় বলে মালেকিন সাথে সাথে বলে উঠে।
-“ভাই-জান…” মোত্তালিব তার কথা শেষ করতে পারছে না, অথচ সব চোখ তার উপর। এদিকে পারুল, বকুল, শিমুল পাশের বাড়ির তিন বোন এসে গেছে। ১২, ১০, ৭ তাদের বয়স। তারা প্রভাতফেরীতে গান ধরবে। “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো…”/ তাদেরকে অনুসরণ করে অন্যরা গান তুলবে গলায়। তিন বোন গান শিখে নিয়মিত। শহীদ স্মৃতি সংঘের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের প্রাণবিন্দু যেন।

কেমন যেন মনে হচ্ছে মোত্তালিবকে। কিছু বলে ফেললে সে আজকে, সব আয়োজন যেন এখানেই শেষ হয়ে যাবে। এমন একটা ভয় বা ধাক্কা তার মধ্যে কাজ করছে কি? সেই তো সবাইকে সবকিছুকে জড় করে সব অনুষ্ঠানে। তাহলে আজ তার কি হলো?

– “ক’ না, কী কইতে চাস, ক্‌। কিছুটা অসহিষ্ণু হয়ে, আবার কিছুটা সহানুভূতির স্বরেই বলে মালেকিন।
“ভাইজান, ভাইজান, ভাইঙ্গা ফেলাইছে।” থেমে থেমে এতটুকু বলে মোত্তালিব।
“কি ভাঙ্গছে?” এবারে মালেকিন কিছুটা তটস্থ হয়।
“সব ভাইঙ্গা ফেলাইছে। শহীদ মিনার।” মোত্তালিব সত্যি সত্যি কেঁদে ফেলে।

মালেকিন ভিটের বেড়ার পাশে সামান্য ভিটে জায়গাতে বসে পড়ে। একটু পরে মাথা দু’হাতে চেপে ধরে। কিছুই বুঝছে না সে। নিয়মিত পেপার পড়ে বলে, এইসব দু’একটা ঘটনা চোখে পড়েছে তার। কিন্তু আজ তাদের বাড়ির পাশে, তাদের জমি দান করা স্কুলে এমন ঘটনা ঘটবে, এটা ছিল তার ভাবনা-চিন্তার বাইরে। সে চুপ করে বসে থাকে অনেকক্ষণ। অন্যদের মাঝে এরই মধ্যে খানিক স্পন্দন কি আলোড়ন তৈরি হয়েছে। তাহলে আজ কি প্রভাত ফেরী হবে না? তারা কি মিনারে ফুল দেবে না? আলোও ফুটে উঠেছে কিছুটা। এখন তো বসে থাকা না। হয় যেতে হবে শহীদ মিনারে, নয়তো বাসায় ফিরতে হবে।

মালেকিন উঠে দাঁড়ায়। তীব্র একটা অবস্থার মুখোমুখি দাঁড়ায়। এর কোন প্রস্তুতি ছিল না তার। আজ তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কি প্রভাত ফেরি নিয়ে এগিয়ে যাবে শহীদ মিনারে, হাহ্‌ ভাঙ্গা শহীদ মিনারে? না কি যার যার কুলায় ফিরবে ব্যর্থতা পূঁজি করে। এগিয়ে যাওয়া কষ্টের হলেও শহীদানের কষ্টকে কি উপলব্ধি করাবে তাদের? না কি ঘরে বসে থেকে তারা ভাববে, ভেবে নেবে, কি করণীয় হতে পারে আগামীর জন্য। কিন্তু এই যে একদল শিশু-কিশোর তারুণ্যের জোয়ারের দিকে এগিয়ে যেতে আজ এই ঊষাগ্রে এসে উপস্থিত হয়েছে, তাদের এই নিষ্পাপ আগমন ও স্পন্দনকে কি এ মূহুর্তে সে থামিয়ে দেবে। অপেক্ষা করবে, কোন এক স্বর্ণালী ঊষার আগমন। কিন্তু ঘরে বসে থেকে কি সবটুকু আদায় সম্ভব? এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় তো প্রকাশ হওয়া উচিত। ঘরে বসে আর যা হোক ঐক্য কতটুকু তৈরি হতে পারে? এর জন্য প্রয়োজন উদ্যোগী হওয়া, নিজের ভাবনা-চিন্তাকে বাস্তবতার সাথে আরো নিবিড় করে তোলা। না হলে অগ্রগতি কি নিশ্চিত হবে? এত কিছু এই বয়সে বুঝে উঠবে কি করে? ফুপু বলে প্রায়, ‘তোর মন কি কয় তা শোন্‌। সেভাবে কাজ কর। হুট-হাট হুজুগের মত কিছু করিস্‌ না। তাইলে পরে পস্তাবি।’ কিন্তু এই মূহুর্তে কোন্‌ সিদ্ধান্ত নিয়ে সে আগাবে? এটা তো হুট-হাট তার উপলব্ধিতে আসা উচিত। নতুবা আজকের সবকিছু পন্ড হয়ে যায় যে! এক পা পিছিয়ে পড়ে, দু’পা এগিয়ে যাও। ইংরেজি স্যারকে বলতে শুনেছে মালেকিন, যখন তাদের বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান ঠিক জায়গায় ঠিক সময়ে করতে পারেনি।

এখন সে বুঝে উঠতে পারে না, কোথায় পিছাবে আর কোথায় আগাবে? এখন একটাই সিদ্ধান্ত, তারা কি প্রভাত ফেরি করবে, না কি ঘরে ফিরবে। সাত বছরের ছোট্ট শিমুল এগিয়ে এসে মালেকিনের হাত ধরে টান দেয়, “যাইবা না ভাইজান? ফুলগুলি তো শুকায় যাবে। তাড়াতাড়ি চলো।” আর কিছু ভেবে উঠতে পারে না মালেকিন। শিমুলের মৃদুভাষী আলতো কথার সুমিষ্ট স্রোতস্বিনী তার মধ্যে তড়িৎ উজান হাওয়া বইয়ে দেয়। সে বলে উঠে, “চলো সব। মিনার যেমনই থাক, আমরা ফুল দিবো।” সবার মধ্যে ক্ষুদ্র একটা সাড়া পড়ে। সব মিলে এতক্ষণে ১২/১৪ জনে এসে দাঁড়িয়েছে। মোত্তালিব চোখ দু’টো বড় হয়ে উঠে। তাকে দেখে মনে হয়েছিল, সব শেষ হয়ে গেছে। তার হাতে ফুলের স্তবক ভিটের কাছে দাঁড়া করানো ছিল। সেটাও একসময় মাটিতে গড়িয়ে গিয়েছিল। মোত্তালিব তা মাটি থেকে হাতে তুলে নেয়। ডান হাতে সে পুষ্পস্তবকের এক পাশ ধরলে, বাম হাতে মালেকিন পুষ্পস্তবকের আরেক পাশ ধরে। তাদের পিছনে দাঁড়িয়ে তিনবোন গাইতে শুরু করে, “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি …”/ অন্যেরা পাশে পেছনে দাঁড়িয়ে সুর মেলায়। সে সাথে মোত্তালিব, মালেকিনও।

শামান সাত্ত্বিক | জানুয়ারি ০৬, ২০১২ | ১১:৫৩ বিভাগ: গল্প, মুক্তিযুদ্ধ | ট্যাগ: টীনএজ গল্প

উদ্বাস্তু সময় – ৫

উদ্বাস্তু সময় – ৪

টেস্ট পরীক্ষায় মালেকিনের ফলাফল ভালই হয়। সে হয় প্রথম। সাতশ-র কাছাকাছি নম্বর। খবরটা শুনে মালেকিন খুব খুশী হয়। কিন্তু যার খুশী মুখ দেখার খুব ইচ্ছে হল, তাকে তো স্কুলে পাওয়া গেল না। খবর নিতেই বেরিয়ে আসে, ইংরেজী স্যারেরও বদলি হয়ে গেছে। এ কারণেই আজ স্কুলের দিকে পা মাড়ান নি। ভীষণ এক ব্যথায় কুকড়ে উঠে হৃদয়টা। বেদনায় নীল কি একে বলে? মনে মনে ভাবে সে। আস্তে আস্তে সে ছুটে যায় স্যারের বাসায় দিকে। স্যারের সেই আশংকা যে এত দ্রুত সত্য লাভ করবে, এ ছিল তার কল্পনার বাইরে। তার বুক ফেটে আর্তনাদ উঠে নীরবে, “আমরা কোথায় চলেছি স্যার?” সে আর্তনাদ কোথাও পৌঁছে না। নিজের ভেতরে ধুকড়ে ধুকড়ে মরে। স্যারকে সে বাসাতেই পায়। কেমন যেন চেহারা, অবনত দৃষ্টি। অনেকক্ষণ চুপ করে থাকেন স্যার। কোন কথা বলেন না। শেষে এক গভীর শ্বাস ছেড়ে বলেন, “গ্রামের পোলাপাইনরে পড়াইতে চাইছিলাম। পড়াইতে পারলাম না। ঘরের দুয়ারের স্কুল থুইয়া দূরে যাইয়া পড়াইতে হইবো আর কি?” তারপর একটু পরেই বলেন, “তুই এখন যা।” মালেকিন তখন তাড়াহুড়ো করে বলে, “স্যার আমার রেজাল্ট দিছে। আমি ফার্স্ট হইছি।” ইংরেজী স্যার কিছুক্ষণ অন্যমনস্কভাবে মালেকিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। কি যেন ভাবে। তারপর বলে, “তোরা ভাল করলে তো আমি খুশী। দেখ্‌ এখন কী হয় দিন দুনিয়ার। আগের মত আর কিছুই নাই রে। যার যার ভালা, তার তার কাছে এখন।” আর কিছু বলেন না স্যার। মালেকিন ভাবে, স্যারও জানি কেমন অন্যরকম হয়ে গেছেন। কেমন যেন দূর দূর, ছাড়া ছাড়া। তাহলে কার কাছে যাবে সে। হেডস্যারের কথা মনে পড়ে। তার রেজাল্টের খবর শুনলে খুব খুশী হতেন। কাছে ডেকে নিয়ে বলতেন, আমি জানি তুমি পারবা। এখন যে সে কাউকে কাছে পাচ্ছে না। প্রচন্ড জিদ চেপে বসে তার মাথায়। স্যারের বাসা থেকে ফিরতে ফিরতে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, যেমন করেই হোক, ভালভাবে পরীক্ষা শেষ করে সে এর বিহিত দেখে নেবে। কোথা থেকে কি হচ্ছে? কোথাকার পানি কোথায় গড়াচ্ছে? এখন আর সে কোন কিছুতেই মুখ-চোখ ঘুরিয়ে নিতে প্রস্তুত নয়। তাকে বুঝতে হবে। সবকিছুর উত্তর খুঁজতে হবে। নিশ্চয়ই কোথাও কিছু ঘটে যাচ্ছে। উত্তর জানা সত্ত্বেও এই স্যার দু’জন কিছু বলছেন না। আবার কিছু করতেও পারছেন না। সম্ভবতঃ সাংঘাতিক কিছুই। মালেকিন তার গোপন ইচ্ছাটা এই মূহুর্তে নিজের ভেতরে চেপে রাখে।

২১ শে ফেব্রুযারী এসে গেছে। তার সপ্তাহখানেক পরেই জাতীয় নির্বাচন। কেমন এক হুল-স্থুল, হুল-স্থুল অবস্থা। মানুষগুলো সব পাল্টে গেছে। কেউ কাউকে চিনে না। শোনা যাচ্ছে, টাকা নাকি অনেক কিছুই পাল্টে দেয়। সে সাথে স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও কামড়াকামড়ি। ইলেকশনের আন্দোলনে কম বেশি সবাই আন্দোলিত। পক্ষে-বিপক্ষে প্রচারও অসম্ভব এক তীব্রতায় রুপান্তরিত হয়েছে। সামান্যতেই দু’পক্ষের মধ্যে অসহিষ্ণুতা চরমে উঠছে। পরিচিত মানুষদের এমন যুদ্ধংদেহী ভাব দেখে মালেকিনকে এক ধরণের আতংকগ্রস্থতা চেপে ধরে। কি হতে যাচ্ছে সামনে? শুধু ছটফট করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই তার। পরীক্ষা ঘনিয়ে আসছে হাঁটি হাঁটি পা পা করে। পরীক্ষার প্রস্তুতিকে সে নিশ্ছিদ্র রেখে যাচ্ছে। কিন্তু একুশে ফেব্রুযারী উদযাপন থেকে তো সে দূরে সরে থাকতে পারে না। ইলেকশানের ডামাঢোলের মাঝেও সে এগিয়ে আসে। স্কুলের নতুন হেড স্যারের সাথে সে দেখা করে। প্রতিবছরের একুশে ফেব্রুযারীর প্রভাত ফেরীর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। স্কুলের শহীদ মিনার নির্মিত হবার পর বিগত বছর তিনেক হতে তা রীতিমত হয়ে আসছে। স্যার আঁতকে উঠেন বিষধর সাপ দেখার মত, ” নাউজুবিল্লাহ এ তুমি কি কও? আমারে পাপের ভাগীদার করতে চাও। তোমাদের হেড স্যার হইয়া তো দেখি আমার ঈমান নিয়ে টানাটানি শুরু হয়ে গেছে। এসব বেদাতি কাজ আমারে করতে কও। মূর্তি পূজা আমি করমু? বাবারে, তোমার যা ভাল মনে হয় করো। আমারে এরই মাঝে ঢুকাইও না।” মালেকিন স্যার-কে একটু বোঝানোর চেষ্টা করে, “স্যার, আমরা তো শুধু শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবো ফুল দিয়ে। তাদেরকে স্মরণ করবো। ভাষা শহীদদের অবদানের জন্যই তো আজ আমরা এই স্বাধীন বাংলাদেশ পেলাম। এতে তো খারাপ কিছু দেখি না স্যার।” স্যারের আঁতে ঘা লাগলো। তিনি বলতে শুরু করলেন, “এই দেখো তোমার দাদা, ঔ যে দেখো মসজিদ, তার ইমাম ছিলেন না? তারও দাদা, এই গ্রামের মানুষদের শরিয়তী শিখাইছে। আর তাদের আওলাদ হইয়া তুমি এই বেদাতি, গুনাহ্‌গারী কাজ করবা? তুমি যদি চাও, এই ভাষা শহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনার জন্য আমি এই মসজিদে দোয়া কালামের ব্যবস্থা করতে পারি। তাদের জন্য দরকার হইলে কাঙ্গালী ভোজও দিতে পারি। তবু বাবা, তুমি এসব কাজ থেকে দূরে না থাকলেও, আমার এই কাজ করতে কইও না। নাউজুবিল্লাহ!

বাড়ি ফিরে এসে অনেকক্ষণ ধরে ঝিম মেরে বসে থেকে মালেকিন। শহীদরা এই পৃথিবীতে নেই। তাদের রুহের মাগফেরাত কামনা তো পরকালের জন্য। এতে তো আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু বর্তমানের জন্য, মানুষের চেতনাকে শাণিত, সমৃদ্ধ করার জন্য, যে কারণে শহীদরা তাদের জীবন বিসর্জন দিয়েছেন, তাকে সমুন্নত রাখার জন্য, তাকে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া ও টিকিয়ে রাখার মাঝেই তো শহীদদের প্রতি উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শণ। তারা পরজগতে চলে গিয়েছে, এই ইহজগতে একটা সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে যেয়ে। সে সত্যের শিখাকে প্রজ্জ্বলিত রাখাই তো বর্তমানের দায়িত্ব। আর তা করার জন্যই আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে শহীদ মিনারে এসে মিলিত হই। অনেক কাছাকাছি এসে শহীদদের অনুভব করি। তাদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করি। ফুল দিয়ে তাদের সম্মান জানাই। আবার নতুন কোন অঙ্গীকারে শপথাবদ্ধ হই। শহীদরা এই ইহজগতে আমাদের সত্ত্বা ও অস্তিত্বকে সম্মানের সাথে বাঁচিয়ে রাখতে এক জীবনপণ সংকল্পে ব্রতী হন। ইহজগতের এই বেঁচে থাকাকে সুষম ও কন্টকহীন করতেই শহীদ স্মরণে বাংলাদেশ নামক এই ভূ-খন্ডের মানুষের এই আচার। যে আচার আর কৃষ্টির রয়েছে বহুমাত্রিকতা। এর সাথে পরজগত বা ধর্মের সাথে কোন দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে, তা মালেকিনের কাছে বিস্ময়কর ঠেকে। মালেকিনের পড়াশুনা খুব বেশী নয়। কিন্তু এতটুকু উপলব্ধি তার কাছে কোন কঠিন মনে হয় না। মানুষ যদি তার অন্তরকে উন্মুক্ত রাখে আলো প্রবেশে, তাহলে সে আলোয় সে সহজে আলোকিত হতে পারে। সে তার পূর্ব পুরুষদের প্রতি ভীষণ কৃতজ্ঞতা বোধ করে। তার পূর্ব-পুরুষেরা ধর্মের এত কাছাকাছি ছিল বলেই, আজ সে উন্মুক্তচিত্তেই এই সত্যাসত্য উপলব্ধি করতে পারছে। ধর্মের উদ্দেশ্য যদি মানুষকে আলোকিত করা হয়, সেখানে ধর্মান্ধতা কোন ক্ষেত্রেই সে মেনে নিতে পারে না। সত্যাসত্য উপলব্ধিতে নিজের অন্তরকে উন্মুক্ত রাখাই কি ধর্মের উদ্দেশ্য নয়? নতুবা ধর্মের মাহাত্ম্যই বা কোথায়? মালেকিন সে উপলব্ধিতে নিজের জীবনকে পুরোপরি সংস্কারহীনভাবে উন্মুক্ত রাখতে চায়।

শামান সাত্ত্বিক | ডিসেম্বর ২৩, ২০১১ | ০২:২৩ বিভাগ: গল্প, মুক্তিযুদ্ধ | ট্যাগ: টীনএজ গল্প

উদ্বাস্তু সময় – ৬

উদ্বাস্তু সময় – ৪

উদ্বাস্তু সময় – ৩

স্কুলের পেছনদিকে তাদের বাড়ির বাইরের বড় পুকুর। পাশের বাড়ির লোকেরাও এখানে আসে গোসল সারতে। পুকুরের পূর্বপাশের উঁচু পাড়ে তাদের পরিবারিক কবর। কবরের পাশে পুকুর পাড়ে বিরাট শিমুল গাছটার নীচে এক প্রশস্ত জায়গা। মালেকিন সে গাছটার নীচে বসে। বাবা, ভাইজান, বুইব্বার কথা ভাবে। সামনের কবরে বাবা ভাইজান আছে। আর বুইব্বা? নিজের ভেতরে কেমন এক গোস্বা চাপে তার। এরা তিনজনই জড়িয়ে আছে তার অস্তিত্বের সাথে। আর সে নিজে কি না গ্রামের সবার কাছে তাদের স্মরণ করিয়ে দিতে পারছে না। তাদের নিজের অস্তিত্ব কেমন কেমন কেঁপে উঠে। ভেতরটা হু হু করে উঠে। সে উঠে দ্রুত বাড়িতে ফুপুর কাছে যায়। ফুপুকে জড়িয়ে ধরে তার কোলে মুখ লুকিয়ে অঝোরে কেঁদে উঠে। তারপর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, যে করেই হোক, অন্য বারের মত সে স্কুল চত্বরে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান করবে। অথচ তার হাতে সময় মাত্র চারদিন। ফুপু শুনে এবারে এ অনুষ্ঠান বাদ দিতে বলে। সেই সাথে উপদেশও দেয়। “মনে রাইখ্যো, পড়াশুনা কইরা বড় কিছু না হইতে পারলে, এখন তুমি যা করছো, একসময় তাও করতে পারবা না।” মালেকিনের তা হৃদয়ঙ্গম হয় না। সে উঠে পড়ে লাগে তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে।

কিন্তু ১৬ ডিসেম্বরের সকাল হতে না হতেই অন্য ঘটনা এসে দাঁড়ায়। রাত জেগে অনুষ্ঠানের কাজ করাতে আজ একটু দেরীতে ঘুম থেকে উঠে সে। ঘুম থেকে উঠতে না উঠতেই মালেকিন খবর পায়, সাংস্কৃতিক সংঘের ছেলেরা এবারে বিজয় দিবস উদযাপন করতে স্কুল চত্ত্বরে সাজ গোছ শুরু করেছে। ভীষন আশ্চর্য হয় সে। বছর দু’য়েক আগে সাংস্কৃতিক সংঘ যখন কাজ শুরু করে, তখন একসাথে বিজয় দিবস পালনের জন্য তাদের স্কুল চত্ত্বরের আয়োজনের সাথে সম্পৃক্ত হতে বলে। অথচ তখন তারা বলেছিল, তারা স্কুলের প্রোগ্রামের সাথে নেই। নিজেরা নিজেদের মতো করে করবে। দু’গ্রামের অর্থসম্পন্ন দু’চার পরিবারের সন্তান মিলে এই অনুষ্ঠান শুরু করেছে। তাদের সদস্য সংখ্যা এখন অনেক। কিন্তু আজ বলা নেই, কথা নেই অনুষ্ঠান করতে স্কুল চত্ত্বরে এসে উপস্থিত হয়েছে। ভারী বিরক্ত হয় মালেকিন। নাস্তা না সেরেই বাড়ি থেকে ঝড়ের গতিতে মিনিট খানেকে পৌঁছে যায় স্কুলে। বেশ তর্কাতর্কি হয় সেখানে। কিন্তু মীমাংসার কোন পথই খোলা পায় না। সাংস্কৃতিক সংঘ জানায়, তারা স্কুলের হেড স্যারের পারমিশান নিয়েছে। আবেদনের কাগজে তার সীলসহ দস্তখত দেখায়। আর এ অনুমতি যে স্যারের বাসায় গিয়ে নেয়া, তা ছেলেদের কথাবার্তায় বেরিয়ে আসে, যদিও সিগনেচারে তারিখ তিনদিন আগের ডিসেম্বরের ১৩ তারিখ, স্কুল খোলা দিনে। মালেকিন কিছু বুঝে না। তার মাথা ঘুরতে থাকে। স্বাধীনতার পর পরই সে এই স্কুল চত্ত্বরে অনুষ্ঠান করে এসেছে। আজ সে এখানেই হচ্ছে পরবাসী। সমস্যা সমাধানে তাকে কিনা সকাল সকাল অনুষ্ঠান শেষ করে ফেলার কথা বলে তারা। আর বিকেল থেকে সন্ধ্যা অবধি এ স্কুল প্রাঙ্গনে সাংস্কৃতিক সংঘ অনুষ্ঠান করবে, যা কিনা মালেকিনদের এতো বছর ধরে গড়ে তোলা নিজস্ব ঐতিহ্য। প্রচন্ড ক্রোধে মালেকিন ফেটে পড়ে। সে মূহুর্তে সাংস্কৃতিক সংঘের অনুষ্ঠানের মাইকিং শুনে স্কুলের কাঁচা রাস্তার উল্টোদিকের বাড়ি থেকে ইংরেজি স্যার এসে উপস্থিত হয়। তিনি মালেকিনকে স্হির, শান্ত হতে বলেন। শেষে উত্তেজিত মালেকিনকে স্কুলের একপাশে নিয়ে গিয়ে বলেন, “তোমার এখন ঝগড়া করে কোন লাভ নাই। তারা জেনেশুনে গোপনে পরিকল্পনা করে এই অনুষ্ঠান করতে এসেছে। তোমার কথায় তো আর তারা তাদের অনুষ্ঠান এখান থেকে সরাবে না। তুমি এক কাজ করো। আগামীকাল স্কুল শেষে যেমন করে পারো তোমাদের অনুষ্ঠানটা করো। আমি তো তোমাদের রিহার্সেল দেখছি। আরেকটু রিহার্সেল করতে যদি পারো তোমাদের অনুষ্ঠানটা আরেকটু ভাল হবে। আজ এতো দমি গেলে কি হয়? কাল তো আছে।” মালেকিন স্যারের কথায় কিছুটা স্থিত হতে চায়। সেও জানে, এ ছাড়া আর কোন উপায় বের করা কষ্টকর। শুধু বলে, “কিন্তু দেখলেন তো স্যার……..।” স্যার তাকে কথা বাড়াতে দেয় না। শুধু বলেন, “আমি জানি।”

মালেকিনদের অনুষ্ঠান শেষ হলো আজ দু’দিন। কিন্তু এখনও সে পড়াশুনায় পুরো মনোযোগ দিতে পারছে না। এদিকে ফুপুর চাপ ভালভাবে পড়াশুনা চালিয়ে যাবার। তিনি একদমই পছন্দ করেননি মালেকিনের এবারের এই ঝামেলার সাথে জড়িয়ে পড়ার। শুধু বলেন, “দেখো বাবা, আমারও বয়স হইছে। তোমারে বিয়া করাইয়া ঘরে বউ আনতে চাই। আর তো আমি এতকিছু দেখাশুনা করতে পারি না। তোমার ফুপার তো ব্য়স বাড়তেছে। আর তোমার মায়ের অবস্থা তো নিজের চোখে দেখতেছো। আজকাল তো ঔষুধ-টষুধ খেতে চায় না। কয়দিন যে আর বাঁচে সে খোদায় জানে। তোমাদের আর কি বলবো, তোমার চাচা……….।” কথা শেষ না করে ফুপু বলেন, “আর কতদিন যে, তোমার ফুপারে ঢাকায় যেতে হবে, তা আল্লায় মালুম।” মালেকিন একটু থমকে যায়। ফুপুকে জিজ্ঞেস করে, “চাচার কথা কি বললেন?” “কিছু না বাবা। সবকিছুই তুমি জানবে, সময় হলে। তোমাকেও তোমার ফুপার সাথে একসময় ঢাকা যেতে হবে। সে তো আজকাল চোখে ভাল দেখে না।” ফুপুর এই কথার কোন অর্থ মালেকিন বুঝে উঠতে পারে না। গ্রামে কেউ কেউ বলে, তার একমাত্র চাচা যুদ্ধে মারা গেছে। আবার চাচার সাথে যুদ্ধে যাওয়া বশীর চাচা বলেছেন, অন্য কথা। একবার নাকি নিজেদের ক্যাম্প ছেড়ে কাউকে কিছু না বলে রাতের আঁধারে চাচা বেরিয়ে পড়েন। তখন এখানকার কয়েক গ্রাম পাকিস্থানীদের নিয়ন্ত্রণে। শোনা যায়, গ্রামভিমুখী আসতে গিয়ে পাকিস্থানীদের সাথে তার একক সংঘর্ষ হয় এবং ফলশ্রুতিতে তিনি ধরা পড়েন। শেষে একদিন রাতের আঁধারে পালাতে গিয়ে ভীষন গুলিবিদ্ধ হন। এরপর চাচা বেঁচে ছিলেন কি না কেউ জানে না। গ্রামের বশীর চাচা বলেছেন, এসব কথা মুক্তিযুদ্ধের সময় এক সোর্সের মুখে শোনা। এ ব্যাপারে যুদ্ধ শেষে কেউ তাকে কোন খবর দিতে পারে নি। ফুপা ঢাকা যায় বছরে দু’চারবার। মালেকিন জানে। ঢাকার ফুপার কোন এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের সাথে ব্যবসা-পাতির ব্যাপার আছে বলে গ্রামের মানুষের মত মালেকিনও জানে। কিন্তু সে ব্যবসার কোন কূল কিনারা সম্পর্কে কেউ জানে না। মালেকিন শুধু দেখে, ফুপা ঢাকা যাবার সময় ফুপু পিঠা-নারিকেল নাড়ু, মুড়ি-মোয়া, দু’চারটা ডাব মিলে একটা বড় পোটলা তৈরি করে ফুপাকে দেয়। প্রতিবার ঢাকা থেকে ফিরে এলে ফুপাকে খুব বিমর্ষ দেখায়। ফুপু-ফুপা কয়েকটা দিন কেমন গম্ভীর কাটায়। মালেকিন তখন তাদের আশপাশে ঘুরে বেড়ালেও কোন কিছু প্রশ্ন করার সাহস পায় না। মানুষের শোকের সময়ে প্রশ্ন করতে নেই। এইসব এখন গা সওয়া হয়ে গেছে মালেকিনের। তবে গ্রামের মানুষ সময়ে সময়ে ফুপার কাছে ব্যবসা কেমন হয়েছে জানতে চাইলে, ফুপা শুধু উত্তর দিতো, ভাল না। ‘কি ব্যবসা করো’, ‘কখন ব্যবসা ভাল হবে’, এসব প্রশ্ন করলে ফুপা শুধু বলতেন, ‘ব্যবসা ভাল হইলে তো জানবাই।’ আর কিছু না বলে কেটে পড়তো। তাতে করে গ্রামের মানুষের আরো সন্দেহ জাগতো, ‘নিশ্চয় বড় কোন ব্যবসা আছে, টাকা জমাচ্ছে বছর বছর। নতুবা তাদের জানায় না কেন?’ মালেকিনের এসবে কান দেবার ইচ্ছা নেই। ভাল কিছু হলে তো তাদের জন্যও ভাল। সে এ ব্যাপারে ফুপা-ফুপুকে ঘাটতে যেতো না।

বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান নিয়ে যে সংঘর্ষ বাধে, তা তাকে একেবারেই স্বস্থি দিচ্ছে না। আগের হেড স্যারের কথাগুলো কানে বাজে। ইংরেজী স্যারও নাকি বিষয়গুলো জানে, বুঝে। সে-তো বুঝে না। খুব দ্রুতই সবকিছুই পাল্টাতে শুরু করেছে। সামনের ফেব্রুয়ারীতে ইলেকশান। সবাই যেন কেমন দলাদলিতে নেমে যাচ্ছে। সবকিছু কেমন ছাড়া ছাড়া বিষণ্ণ বিষণ্ণ। মালেকিনের মনে হয়, তারই যেন ঝাঁজ এসে পড়েছে তাদের এই স্কুলেও। মানুষগুলো এমন দ্রুত পাল্টাতে পারে? স্বাধীনতা যুদ্ধে শত্রুর সাথে লড়তে নিজেদের পাল্টানো। সে পাল্টানোতে কোন দোষ বা অস্বাভাবিক কিছু দেখে না মালেকিন। কিন্তু এখন তো নিজেরা নিজেদের বিরুদ্ধে-ই পাল্টাচ্ছি আমরা। বিজয় দিবসে তাকে স্কুল চত্ত্বরে অনুষ্ঠান করতে না দেয়া তো তারই প্রমাণ। তাহলে তাকেও কি কোন এক দলভুক্ত হতে হবে। সামনে পরীক্ষা। এত কিছু সে ভাবতে পারে না। সাংস্কৃতিক সংঘের অনুষ্ঠান কুরআন তেলাওয়াত দিয়ে শুরু হয়েছে। এ নিয়ে মালেকিনরা কখনো ভাবে নি। জাতীয় সংগীত দিয়ে তারা করতো অনুষ্ঠান শুরু। কিন্তু এ কি? বরাবরের মতই সিনেমার প্রেমের গান বিজয়ের অনুষ্ঠানে মিশে গেছে। কেউ একজন গানের তালে নাচলো, ‘যে জন প্রেমের ভাব জানে না, তার সাথে নাই লেনা-দেনা’, আবার কেউ একজন গাইলো, ‘দমাদম মাস ক্যালেন্ডার, আলী কা পয়লা নম্বর।’ বাড়িতে বসে যতদূর পারে রিহার্সাল করতে করতে মালেকিনরা লাউড স্পীকারে সেসব শুনতে থাকে। মুচকি মুচকি হাসে কেউ কেউ। মালেকিন কোন রকমে রিহার্সেল শেষ করে। এইসব সাত-পাঁচ ভেবে ভেবে মালেকিনের পরীক্ষা প্রস্তুতি আগায় না। কিছু একটা করার জন্য সে ছটফট করে। কিন্তু বেশি কিছু করা যে তার জন্য সম্ভব হচ্ছে না। রাজনীতির কেমন এক দুর্গন্ধ মালেকিনের নাকে এসে লাগে। এক অদৃশ্য চক্রান্তে মানুষগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব সংঘাত শুরু হয়ে গেছে। এই দ্বন্দ্বের মাঝে পড়ে অনেক কষ্টে নিজেকে সামলিয়ে নেয় মালেকিন। ইংরেজীর স্যারের কড়া নির্দেশই বলতে হয়, “আর যা করো, টেস্টে যে রেজাল্ট করবে, ফলাফল তার থেকে নীচে যেন না হয় বোর্ডের পরীক্ষায়।” স্যারের পরম আত্মীয়ের মত আন্তরিক আচরণে চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে মালেকিনের। সে কি পারবে স্যারের কথা রাখতে? যে করেই হোক স্যারের উপদেশ তাকে মেনে চলতেই হবে।

শামান সাত্ত্বিক | ডিসেম্বর ২১, ২০১১ | ১০:৫৭ বিভাগ: গল্প, মুক্তিযুদ্ধ | ট্যাগ: টীনএজ গল্প

উদ্বাস্তু সময় – ৫

উদ্বাস্তু সময় – ৩

উদ্বাস্তু সময় – ১
উদ্বাস্তু সময় – ২

কিন্তু যেন হঠাৎ করেই সব পাল্টে গেল। স্কুলে আর শহীদ দিবস, স্বাধীনতা দিবস বা বিজয় দিবস আগের মত উদযাপিত হয় না। বরং লাউড স্পীকারে রেকর্ডকৃত সিনেমার গানই বেশি বাজে। স্কুলের ছেলে-মেয়েদেরও সে গানের প্রতি অন্য এক রকমের আকর্ষণ। কে কার চেয়ে এসকল গান ভাল গায় এ নিয়েও চলতো এক ধরণের দ্বন্দ্ব। এরি মাঝে মাঝে দু’চারটা মুক্তিযুদ্ধের গান শোনা যেত না, তা অবশ্য নয়। কিন্তু স্বাধীনতার গান গাওয়ার মত আবেগ বা উৎসাহ স্কুলের ছেলেমেয়েদের মাঝে তেমন খুঁজে পাওয়া যেত না। এটাই ভেতরে ভেতরে ক্ষুব্ধ করে তুলতো মালেকিনকে। যতই সে উপরের শ্রেণীতে উঠতো, ততই সে এই জাতীয় দিবসগুলো পালনে স্বক্রিয় হতো। শিক্ষকদেরও এই দিবসগুলো পালনে ধীরে ধীরে উদ্যম হারিয়ে ফেলাটা সে দেখতে থাকে। অনুষ্ঠানের জন্য সাহায্য পেতে চাইলে, কেউ কেউ বিরক্তি দেখাতো। সবাই জানি কেন স্বাধীনতা, শহীদদের প্রতি তাদের দায় বা দায়িত্ব হারিয়ে যেতে বসলো। মালেকিন ভাবতো, তাহলে কি দেশের প্রতি আমরা আমদের আনুগত্য বিসর্জন দিচ্ছি? যে স্বাধীনতার জন্য সে তার পরিবারকে হারিয়েছে, আজ যদি সে স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে উঠে তবে সে কোথায় তার বিচ্ছেদ-বেদনার স্বান্তনা খুঁজে নেবে। কোথাই বা তার মানসিক প্রশস্তি খুঁজে পাবে। এক ধরণের অস্থিরতা মালেকিনকে তাড়া করতে শুরু করে।

একমাত্র স্কুলের হেডস্যারকেই সে অন্যরকম দেখেছে। যখনই সে স্যারের চোখাচোখি হয়েছে, স্যার তাকে তার কুশল জিজ্ঞেস করেছে। পড়াশুনার ব্যাপারে উৎসাহ যুগিয়েছে। হেডস্যারকে দেখলে ভাইজানের কথা মনে হয়েছে তার খুব। ভাইজান হয় ডাক্তার নয় ব্যারিষ্টার হতো। কিন্তু সে কি তার কোনটা হয়ে উঠতে পারবে? নিজের মাঝে সে বিশ্বাসের প্রচন্ডতার একটা সংকট চলতে থাকে। যতই উপর শ্রেণীতে সে উঠছে, ততই সে ভেতরে ভেতরে টের পাচ্ছে – একাগ্র বা পুরো মনোযোগী হতে না পারলে, তার বেশিদূর পড়াশুনা এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। ভাইজানকে নিয়ে বাবার ইচ্ছার কথাও তার মনে পড়ে। মালেকিন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, যাই হোক না কেন, সে প্রাণপণে তার পড়াশুনা ভালভাবে চালিয়ে নিয়ে যাবে।

স্কুলের হেডস্যার মালেকিনের পড়াশুনায় একাগ্রতা দেখে বেশ খুশি হয়। মালেকিন এস. এস. সি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হতে থাকে। আর মাস দুয়েক পরই তার টেস্ট পরীক্ষা। এমন সময় সে খবর পায়, স্কুলের হেডস্যার বদলি হয়ে যাচ্ছেন। মালেকিনের মনটা কেমন যেন ছ্যাঁৎ করে উঠে। বাড়িতে এক ফুপু আর স্কুলে হেডস্যারই তাকে পড়াশুনায় উৎসাহ যোগাতো। সে কেমন মর্মাহত হয়। একবার মনে করে হেডস্যারের সাথে দেখা করে আসে। কিন্তু স্যারের মুখ দিয়ে তার চলে যাবার কথা শোনার মত তার মনের অবস্থা নেই। হেডস্যারের জন্য ফেয়ারওয়েলের আয়োজন দ্রুত হয়। তিনি নিজেই না-কি বদলীর খবরের পর স্কুল ত্যাগে দেরি করতে চান নি। পরীক্ষার প্রস্তুতির আগে এ মন খারাপ করা ঘটনার জন্য মালেকিন তৈরি ছিল না। প্রায় সপ্তাহ তিনেক পর তার টেস্ট পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। আজ স্যারের ফেয়ারওয়েল। দু’দিন পরেই নতুন হেড স্যার এসে যাবেন। নতুন স্কুল কমিটি হওয়ার সাথে সাথে হেড স্যারের বদলিও হয়ে গেছে। কেমন জানি লাগে মালেকিনের। সে স্কুলের বড় রুমের বাইরে বারান্দায় জানলার পাশে দাঁড়িয়ে বিরস মনে হেড স্যারের ফেয়ারওয়েল অনুষ্ঠান পর্যবেক্ষণ করে। ফেয়ারওয়েল শেষে যাবার পথে সে হেড স্যারের মুখোমুখি হয়। হেড স্যার তাকে বলে, “দিন যায় তো ভালই, খারাপ দিন তো আসছে বাবা। তোমার পড়াশুনা ঠিক রাখো। যত কষ্টই আসুক, বাধা আসুক পড়াশুনা বন্ধ কইরো না। কোন দিকে তাকাইও না, কোন কিছু চিন্তা কইরো না বাবা। শুধু পড়াশুনাটা ঠিক রাখো। আর তো আমার কিছু বলার নাই বাবা।” শেষে ধরা গলায় গভীর এক শ্বাস ছেড়ে স্যার তিরোহিত হন। তেমন কিছু না বুঝে মালেকিন ফ্যাল ফ্যাল করে স্যারের গমন পথের দিকে তাকিয়ে থাকে।

দিন দশেক পরে এক ছুটির দিনে মালেকিন ইংরেজি স্যারের বাসায় যায়। ইংরেজি তার কাছে কঠিনই লাগে। স্যার বলে দিয়েছে, সমস্যা হলেই সে তার সাথে যোগাযোগ করতে পারে। সে যে নোট তৈরি করেছে, তা সম্পর্কে সে স্যারের মন্তব্য জানতে চায়। সে সাথে জানতে চায় এবারের প্রশ্ন-পত্রের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে। কি ধরনের প্রস্ত্তুতি নিলে, কিভাবে সে ইংরেজির এই বিভীষিকা থেকে বাঁচতে পারে। আশ্চর্য, ইংরেজি স্যারকেও তার কেমন বিমর্ষ দেখায়। মালেকিন ভয় পেয়ে উঠে। তার মুখ দিয়ে সরাসরি বের হয়ে আসে, “কি হইছে স্যার?” কাতর স্বরে স্যার বলে উঠেন, “আমারো বোধ হয় এই স্কুলে আর থাকা অইলো না। তোর হেড স্যার তো অন্য গ্রাম থেকে এই স্কুলে পড়াইতে আইতো। আর আমিতো আমার নিজের গ্রামেই আছি। কি করি ক তো?” নিজের মনেই যেন স্যার কথাগুলো বলতে থাকেন। আঁতকে উঠে কেমন এক ভয়ে সে ফ্যাল ফ্যাল করে স্যারের দিকে তাকিয়ে থাকে। “নতুন পার্টি আসছে দেশে, সবকিছু এখন তাদের মত হবে। যাদের পছন্দ হবে, তারে তারা রাখবে। যারে পছন্দ হবে না, তারে তারা রাখবে না। আমি তো আর সগ্গলের মত সবকিছুতে তাল মিলাইতে পারি না। সে শিক্ষাটা নাই যে। ” মালেকিন টের পায়। কী এক বিষাক্ত তীর বাণে স্যার জর্জরিত হচ্ছে। ইংরেজির ব্যাপারে যেখানে সে নিজে স্বান্তনা নিতে এসেছিল স্যারের কাছে, সেখানে স্যারেরই স্বান্তনার বাণীর প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। স্যার নিজে থেকে উঠে ঘরের ভেতরে যায় এবং কিছুক্ষণ পর যেন সব ভুলে আবার ফিরে আসে। পড়াশুনার কাজ শেষে ফিরে আসার সময় মালেকিনকে শুধু বলে, “সব বুঝবা আস্তে আস্তে। এখন তো মাত্র শুরু হইছে।”

বাসায় ফিরেও মালেকিন স্বস্তি পায় না। হেড স্যার, ইংরেজি স্যারের কথা তার মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে। “দিন যায় তো ভালই, খারাপ দিন তো আসছে বাবা।” “সব বুঝবা আস্তে আস্তে। এখন তো মাত্র শুরু হইছে।” মালেকিন অনেক চেষ্টায় নিজেকে সামলাতে চায়। তাকে তার পড়াশুনা শেষ করতে হবে। হেড স্যার তাকে মনোযোগ হারাতে নিষেধ করেছে। ফুপু তার ভাল একটা পাশের জন্য অপেক্ষা করছে। মালেকিন নিজেকে সংযত রাখে। টেস্ট পরীক্ষা শুরু হয়। ভালভাবে সে শেষ করে। বুদ্বিজীবি দিবস, বিজয় দিবস আসন্ন প্রায়। এবারেই সে এতে উদ্যোগী হতে পারে নি। স্কুল থেকে কোন উদ্যোগ না দেখে মালেকিন আহত হয়। আগের হেড স্যার হলে সামান্য কিছু হলেও করতেন। তার কারণেই স্কুলের শহীদ মিনার আছে। অন্ততঃপক্ষে বুদ্ধিজীবি হত্যা দিবস বা বিজয় দিবসের প্রাক্কালে মধ্যাহ্ন বিরতির আগের ক্লাসে সব ছাত্রকে স্কুলের বড় রুমে নিয়ে এসে বুদ্ধিজীবি হত্যা দিবস, বিজয় দিবসের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতেন। কেউ কেউ স্বাধীনতার কবিতা আবৃত্তি বা গানও গাইতো এসময়। এই অনুষ্ঠানের ব্যাপারে ডিসেম্বর মাস এলেই সবাই জেনে যেত। যাদের ইচ্ছে হতো তারা গান বা আবৃত্তির জন্য তৈরি হয়ে নিত। মালেকিন ও তার বন্ধুরা উদ্যোগী হত বলেই প্রতিবছর বিকেল থেকে সন্ধ্যা অবধি ১৬ই ডিসেম্বরের বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান তারা করে গেছে এই স্কুল চত্ত্বরে। চাঁদা তুলে শব্দ যন্ত্র ভাড়া করেছে। বিজয়ের গান বাজিয়েছে। দেশাত্মবোধক গান-নাচ-আবৃত্তি, এমনকি নাটকও হয়েছে সন্ধ্যায়। তাছাড়া সিনেমার চটুল গানও বেজেছে এইদিনে এই গ্রামের সাংস্কৃতিক সংঘ-এর আয়োজনে। সেখানেও ভীড় হয়েছে। দু’চারটা মুক্তিযুদ্ধ বা দেশাত্মবোধক গান গেয়েই বিজয় দিবস উদযাপিত করেছে তারা।

এবারের বিজয় দিবসের চিন্তা মাথায় রেখে মালেকিন নতুন হেড স্যারের মুখোমুখি হয়। স্যার কতক্ষণ আপাদ-মস্তক তাকে দেখেন। তারপর বলেন, “তুমি না এবার এস.এস. সি. দিবা? টেস্ট কেমন দিলা? ভাল দিছো তো?” মালেকিন মাথা নাড়ে। “বাবা, হুনছি, তুমি প্রতিবছরই স্কুলে অনুষ্ঠান করো। এবার না হয়, একটু বেশি কইরা পড়াশুনা করলা। সামনে বোর্ডের পরীক্ষা না?” “আমি বলছিলাম স্যার, এবার তো আমাদের দ্বারা বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান করা হবে না। আপনারা যদি স্কুলে কিছু করতেন।” সে হেড স্যারের কাছে আবেদনের ভঙ্গিতে বলে। হেড স্যার একটু থতমত খান, বাবা, “আমি তো এই নতুন আসলাম। এখনো তো গুছায়ে উঠতে পারি নাই। এবারে আমারে একটু বাদ রাখা যায় না?” মালেকিন বুঝতে পারে, এবারে আর স্কুলে বিজয় দিবসের কোন অনুষ্ঠান হচ্ছে না। সে অগত্যা আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত হেড স্যারের রুম থেকে বেরিয়ে আসে।

শামান সাত্ত্বিক | ডিসেম্বর ১৯, ২০১১ | ১৫:৫১ বিভাগ: গল্প, মুক্তিযুদ্ধ | ট্যাগ: টীনএজ গল্প

উদ্বাস্তু সময় – ৪

উদ্বাস্তু সময় – ২

উদ্বাস্তু সময় – ১

বিজয় ব্যানার

সেদিনের আর কিছু তার মনে পড়ে না। ভোর রাতে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে ঘুম থেকে উঠে মালেকিন ফুপুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। অন্ধকার উঠোনের পুরোটা তার চোখে পড়ে না। প্রাকৃতিক কাজ সেরে এসে সে উঠোনের দিকে ভালভাবে তাকায়। বাবা-ভাইকে তার আর চোখে পড়ে না। কোথায় গেল তাদের লাশ। সে উঠোনের মাঝামাঝি এসে দাঁড়ায়। এদিক ওদিক করে। কিছু চোখে পড়ে না। অন্ধকার কিছু কমে এলে, সে উঠোনের চারপাশে বেশ কিছু পায়ের ছাপ দেখে। উঠোনে বাবার শরীরের বড় ছাপটাও তার চোখে পড়ে। সিঁড়ির উপরে পড়ে থাকা ভাইয়ের শরীরের ছাপটা তার কাছে তেমন পরিস্কার মনে হয় না। তাদের ভিটেয় বসে থাকা মাকেও তার চোখে পড়ে না। পরবর্তী সময়ে মালেকিন জানতে পারে রাতের আঁধারে তার চাচা ও গ্রামের দু’চারজন শক্ত-সামর্থ্য মানুষ এসে বাবা ভাইয়ের লাশের সদগতি করে। তাদের ও আশে-পাশের গ্রাম তখন রাজাকার-শান্তিবাহিনী ও পাক হানাদারদের কবলে। গ্রামের জোয়ান ও যুবকদের জীবনের কোন নিরাপত্তা সেখানে ছিল না। যে যেখানে পেরেছে লুকিয়ে থেকেছে। আর তাই উপায়ান্তর না দেখে লাশের দাফন-কাফন রাতের আঁধারেই করতে হয়েছে।

দুঃসময় অতিক্রান্ত হলে, মালেকিন পরবর্তীতে আরো কিছু তথ্য লাভ করে। তার বাবা ও ভাইয়ের হত্যা নিছক সম্পত্তি-সম্পর্কিত বিবাদ ছাড়া আর কিছু নয়। এই গ্রামেরই পল্টু রাজাকারের সাথে বাবার সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছিল অনেক দিন থেকে। কোর্ট-কাচারী, উকিল-আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। মামলা মোকদ্দমায় কোন সুযোগ সুবিধাই করতে পারেনি মজুমদার পল্টু রাজাকার। আর সুযোগ পেয়েই এই নৃশংস প্রতিশোধ। এসব শুনে আঁতকে উঠে মালেকিন। বুকের মাঝে হাহাকার বাজে তার। সবই হারিয়েছে সে। বাবা, ভাই ……..। আর কিছুই সে ভাবতে পারে না। বুইব্বার কথা ভেবে সব চেয়ে বেশি কষ্ট পায় সে। মন ভেতরে ডুকরে কেঁদে উঠে, “বুইব্বা তুই যে কই!” প্রতিটা দিনকেই তার কেমন মৃত মনে হয়। মাকে আর তার মা মনেই হয় না। মায়ের স্নেহ ভালবাসার কাঙ্গাল মালেকিন, মায়ের মাঝে আর মাতৃত্ব খুঁজে পায় না।

সে কবে যে সে বুইব্বাকে দেখেছে মালেকিন তা মনে করার চেষ্টা করে। বাবা-ভাইয়ের মারা যাবার পর থেকে, তাকে সে কখনো সালোয়ার-কামিজ পরা আর দেখেনি। অথচ কতই হবে তার বয়স তখন। মালেকিন শুনতো নাহার আপা তখন কলেজে যেতো। আর বুইব্বারও নাকি কলেজে যেতে বছর দুই বাকি ছিল। মালেকিন থেকে ১৪/১৫ বছরের বুইব্বা তখন অনেক দূরে সরে গেছে। তাকে সে হাসতে আর দেখেছে বলেও মনে করতে পারে না। ক’দিন-ই বা ছিল সে বাসায়। ওই ঘটনার সপ্তাহ খানেক পরে, তিন/চারজন যুবক এসে বুইব্বাকে নিয়ে গেছে। মালেকিন এখন এসব বুঝতে পারে। যুদ্ধ শেষে সে ঠিকই বাড়ি ফিরে আসে। কিন্তু বাড়িতে তখন কেমন এক অস্বস্থিদায়ক পরিবেশ বিরাজ করছিল। বুইব্বার আশে-পাশে কাউকে আসতে দেখেনি মালেকিন। সে তার কাছে গেলে বুইব্বার কাছে থেকে কোন সাড়া মেলেনি। যুদ্ধ থেকে ফেরত আসে পাশের বাড়ির ইলিয়াস ভাই। বুইব্বাকে সে দেখতে আসে বাড়িতে। বাড়ির ভেতরে অনেকক্ষণ নাকি সে বসে ছিল তার কাছে। শেষে ইলিয়াস ভাই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বুইব্বা বেড়িয়ে আসে। ইলিয়াস ভাইয়ের শার্টের কোণা ধরে ভিটের দাওয়ায় অনেকক্ষণ নীরবে কানতে থাকে। একসময় ইলিয়াস ভাই ছুটে চলে যায়। মাসখানেক পর খবর আসে, ইলিয়াস ভাই তার এক সহযোদ্ধা পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধার বোনকে বিয়ে করে রাজধানীর অদূরে সাভার বলে এক এলাকায় বসবাস করছে। সে আর তাদের গ্রামে ফিরে আসেনি। এরপরের একদিন সন্ধ্যার কথা মালেকিনের মনে পড়ে। বুইব্বার বাড়ির ভেতর থেকে বের হওয়া তখন বন্ধ হয়ে গেছে। এক সন্ধ্যার আঁধারে পুকুর ঘাট থেকে শাড়ি পরা বুইব্বাকে স্নান করে ফিরতে দেখে। সে যেন তখন বৃষ্টিতে ভেজা নেতিয়ে ঝুলে থাকা বাসী কুমড়ো ফুল। ঝরে পড়ার অপেক্ষা। তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে সাহস বা ইচ্ছে হয় নি মালেকিনের। কেমন এক কান্না তাকে কামড়ে ধরে। “বুইব্বারে কিছু কথা ক, আবার আগের মতো আমার লগে লাগ্‌, আবার আগের মতো তুই সালোয়ার-কামিজ পর্‌, আবার আগের মতো হাস্‌”। আরো অনেক কিছু মনে পড়লো মালেকিনের। কিন্তু কিছুই বলা হলো না তার বুইব্বাকে। পরদিন সকাল হলে জানাজানি হলো, তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

মুক্তিযুদ্ধের এক বছর ঘুরতে না ঘুরতেই একদিন নাহার আপারও বিয়ে হয়ে অন্য গ্রামে চলে গেল। মালেকিন বাড়িতে খুবই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়লো। সে বাড়ির কাছের স্কুলে যেতে থাকে। দিন যেতে থাকে, আর ভেতরে ভেতরে কেমন এক প্রতিশোধ স্পৃহা তার মাঝে দানা বাঁধতে থাকে। না সে ফিরে পাবে তার বাবা-ভাই, বুইব্বাকে, না সেই সময়কে, না সেই পল্টু রাজাকারকে। তাদের এলাকা হানাদার মুক্ত হবার পর পল্টু রাজাকারকে গ্রামের মানুষ মেরে ফেলে। গ্রামের মানুষ না বলে মুক্তিযোদ্ধাই বলা উচিত। বিনা অপরাধে যে অত্যাচার, নিপীড়ন, নির্যাতন এই রাজাকার, পাক হানাদার বাহিনীরা করেছে, তাতে গ্রামের বেঁচে থাকা প্রায় সব সক্ষম সবল মানুষরাই এক সময় দল বেঁধে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নিতে বাধ্য হয়েছে। নারীরাও বসে থাকেনি। নেমে পড়েছে চুপি চুপি মুক্ত হওয়ার স্বপ্নে – অস্ত্র লুকিয়ে রেখে, সময়মত পুরুষ যোদ্ধাদের সহযোগী হয়ে। বড় হতে হতে মালেকিন এসব শুনেছে, বুঝেছে। কিন্তু মনের ছটফটানি তার দূর হয় নি। সে তো নিজ হাতে এখনও কিছু করে উঠতে পারে নি। নীরবে নিভৃতে কেমন এক প্রতিশোধ স্পৃহা তার মধ্যে দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে।

নিঃসন্তান ফুপুই এখন তার সব। স্কুলের পড়ার খরচ থেকে শুরু করে, বইপত্র, তার কাপড় চোপড় কেনা বা অন্য যে-কোন খরচই ফুপু মিটিয়েছে। কখনও আর্থিক দৈন্যতার মুখোমুখি তাকে হতে হয়নি। তাদের জমি্-জমা দেখাশোনার ব্যাপারটাও ফুপু-ফুপার উপর। আর কোন বিকল্প ছিল না একেবারে। মা হারিয়েছে এই ইহকাল বা সংসারের মায়া। সেখানে ফুপুর উপর নির্ভর করা ছাড়া বিশ্বাস-অবিশ্বাসের চিন্তা মনে জন্ম না আসাই স্বাভাবিক। বরং ফুপুর ভালবাসা ও আদরের মায়া মালেকিনকে জমি-জমার ব্যাপারে অন্য কোন চিন্তামুখী হতে দেয়নি। মালেকিন ভাবে, পল্টু রাজাকার মারা যাওয়াতে লাভের লাভ হয়েছে একটাই – তাদের জমিগুলোকে নিষ্কন্টক ও নিরাপদভাবে চাষাবাদের সুযোগ মেলা। কিন্তু তার চোখের সামনে পরিবারের প্রতিটি মানুষের পরিণতির ছবি তার মনের যন্ত্রণা ও ব্যথার আগুণে ঘি ঢেলে যেতে থাকে। মাঝে মাঝে সহপাঠি ও সহযোগীদের দিকে সে কৌতূহলী হয়ে তাকায়। কই তাদের মাঝে তো সে সময়ের তেমন কোন অনুভব তার চোখে পড়ে না। চেতনা বাড়ার সাথে সাথে স্কুলের স্বাধীনতা, বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে সে সবসময় এক অত্যন্ত উদ্দ্যমী কর্মী হয়ে উঠে। তার মনে পড়ে ‘৭১-র পরবর্তী দু’চার বছর কী আদর-ই না সে পেয়েছে এ দিনগুলোতে। স্কুলের হেডস্যার থেকে শুরু করে অন্যসব শিক্ষকরাই তখন তার প্রতি কি রকম সহানুভূতিশীল হয়ে উঠতো, সে দেখেছে। তার বাবা-ভাইয়ের নাম উচ্চারিত হয়েছে শহীদ সম্ভাষণে। ফুপুর কাছে মালেকিন শুনেছে, তার বাবার ইচ্ছে ছিল তার ভাই সাদেকিনকে বড় এক উকিল-ব্যারিষ্টার বানাবে। তাহলে আর জমি-জমা নিয়ে বাবাকে এত রেশারেশিতে পড়তে হবে না। আবার কোট-কাচারীতে দৌড়াদৌড়ি করে নাস্তানুবাদ হতে হবে না। ভাইজান যে এস্কুলের চৌহদ্দি পেরিয়ে মফস্বল শহরের কলেজে পড়তো, সে মালেকিন জানে। এও জানে, কলেজ ব্ন্ধ হয়ে পড়াতে ভাইজানকে যুদ্ধের সময় মফস্বল শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরে আসতে হয়েছে। এই ফিরে আসাটাই যে তার কাল হয়েছে। ফেরার দিন দুই কি তিনদিনের মাথায় ভাইজান শহীদ হন। স্কুলের স্বাধীনতা বা বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র শহীদ সালেকিন আহমেদের স্মৃতিচারণকালে বক্তারা এ কথাটা কয়েকবার বলেন। আরো বলেন, সাদেকিনের পড়াশুনার প্রতি নিদারুন আন্তরিকতা, এই গ্রামের প্রতি ভালবাসা, শিক্ষকদের গুরুজনের মত সম্মান করা, দরিদ্র ছাত্র ও সহপাঠিদের প্রতি সহমর্মী হওয়া এবং সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া। ইংরেজি স্যার এও বলেন, গ্রামের দুঃখী-দরিদ্র মানুষের সুচিকিৎসার জন্য সাদেকিন ডাক্তার হতে চেয়েছিল। হেডস্যার সভায় জানালো, এই গ্রামের মুষ্টিমেয় যে কয়জন স্কুলের বেড়া ডিঙ্গিয়ে কলেজ গিয়েছে, সাদেকিন তার মধ্যে অন্যতম। এসব কথা শুনে মালেকিনের বুক গর্ভে ভরে যেত। নিজেকে মনে হতো অন্য জগতের অন্য এক মাপের মানুষ। এসব কথা শুনে তার চোখে পানিও গড়িয়ে পড়তো। সে কখনো ডুকরে বা কখনো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতো। তখন তার আশেপাশে বসা শিক্ষক বা অভিভাবকরা তাকে জড়িয়ে ধরতো।

শামান সাত্ত্বিক | ডিসেম্বর ১৬, ২০১১ | ১৬:৪২ বিভাগ: গল্প, মুক্তিযুদ্ধ | ট্যাগ: টীনএজ গল্প

উদ্বাস্তু সময় – ৩

উদ্বাস্তু সময় – ১

[সাধারণতঃ গল্প পুরো শেষ না করে, আমি ব্লগে গল্পের ধারাবাহিকভাবে পোস্ট দেয়া শুরু করি না। এই ক্ষেত্রে এই গল্পটা ব্যতিক্রম। এর কয়েকটা পর্ব শেষ হয়েছে, মানে অনেকখানি লেখা হয়েছিল ২০০৯-এর ডিসেম্বরের শেষ এবং ২০১০-এর জানুয়ারীর প্রথমদিকের এখানকার চিরাচরিত ছুটির সময়ে। তারপর প্রতিবছর ডিসেম্বর থেকে মার্চ অবধি এই গল্পটা শেষ করার চেষ্টা করে আসছি। এখন পর্যন্ত ৬ পর্ব হয়েছে। আর সম্ভবতঃ ৩টি পর্ব শেষ হলে এই গল্পটা শেষ হয়ে যাবে। হয়তো এটা একটা মুক্তিযুদ্ধের উপর ছোটখাট টিনএজ উপন্যাস হয়ে যেতে পারে। তা না হলে, একটা বড় গল্প।]

মালেকিন। বুঝে উঠতে পারে না, কি ঘটতে যাচ্ছে তার। সেই ‘৭১ তার স্মৃতিতে আবার ভেসে আসে। কত বয়স ছিল তার তখন ৮ কি ১০! গ্রামের ছেলের বয়স কী আর ঠিকমত মনে থাকে। স্কুলে ভর্তির সময়ে শিক্ষক আর গুরুজনে যে বয়স বসিয়ে দেন, সেই তো তার বয়স। সে হিসেবে ৮ বছর। কিন্তু মালেকিনের তা মনে হয় নি, তার অন্য সহপাঠি বা চাচাতো ভাই-বোনদের সাথে তুলনা করে। মা-কে জিজ্ঞেস করেও তেমন কিছু বুঝে উঠতে পারে নি মালেকিন। মা কি আর মা আছে? নিজের পৃথিবীটা এক আল্লাহ-র কাছে যেন নিজ হাতে সঁপে দিয়েছেন। নিজের মত করেই আল্লাহ-কে নিয়ে তার পৃথিবী। সুতরাং ইহজাগতিক কোন বিষয়-আশয় বা আন্দোলন তাকে কোন আঁচড় কাটে না। এ জগৎ হলো মিথ্যে দু’দিনের। এ জগতের মায়া থাকতে নেই। মা যে তার সেই সাক্ষাৎ প্রতিমূর্তি। মালেকিনের বয়স যত বাড়তে থাকে আর সে মায়ের কাছ থেকে তত দূরে সরে আসে।

সে বিষণ্ণ বীভৎস সময়টা মালেকিনের মনে পড়ে। সে ছোট বেলাতেই বড়শিতে মাছ ধরা তার পছন্দ। তাদের বাড়ী থেকে একটু পেছনে জংলার ভেতর একটা পুকুর। বাড়ীর মেয়েদেরই সেই পুকুরে একটু বেশি আনাগোনা। আরো অল্প বয়সেই মায়ের নেওটা মালেকিন, মার সাথেই খুব ভোরে এই পুকুরে আসতো। ছাই দিয়ে দাঁত ঘষতো বোকার মত ঘাটের পাড়ে দাঁড়িয়ে। মা রাতের এঁটো হাড়ি-পাতিল পরিস্কার করে নিতো। তার একমাত্র বোনটাও সলজ্জ মুখে মালেকিনের দিকে তাকিয়ে ভেংচি কাটতো। মাঝে মাঝে মালেকিনকে নকল করে করে দাঁত ঘষার অনুকরণ করতো। বোনটাকে বেশ ভাল লাগলেও, প্রতিদিন সাত সকালে তার এই খুনসুটি মালেকিনের ভাল লাগতো না। পুকুর পারেই সে মাকে বিচার দিতো, “এই মা দেখো না বুইব্বা আমারে ভেংচি মারে।” বোনটা তখন খিল খিল করে হাসতো। এতক্ষণে বোনটা তার হাত মুখ ওজু শেষ করে বুকে মাথায় ওড়না পেঁচিয়ে পুকুর ঘাটে উঠে দাঁড়িয়েছে। বোনের খিল খিল হাসি শুনে মা শুধু বলতো, “এই মাজু, ওর লগে লাগিস না।” বুইব্বা উত্তর করতো, “তোমার পোলাটা এখনও লেদা রই গেছে, মা।” এই বলে মাজু মক্তবে যাবার জন্য ঘাট ছেড়ে উঠে যায়। মাজু বুবুর সাথে মক্তবে যেতে আরো কিছু বোন আসে – রাহেলা, মিতা, মারজান,বিউটি, আলেয়া। এরা কেউ চাচাতো বোন নয়তো পাড়াতো বোন। এরা এলেই মালেকিন একটু দমে যায়। মাথাটা নীচের দিকে হেঁট করে থাকে। কেউ যদি আবার তাকে কিছু বলে। মাঝে মাঝে মালেকিনকে দেখে মিতা বা মারজান মুচকি মুচকি হাসে। তখন হয়তো মালেকিনের ঠোঁটের দু’পাশ দিয়ে কয়লার গুড়া মুখের লালার সাথে গড়িয়ে পড়ছে। মা মালেকিনের হাত টান দিয়ে কুলি করিয়ে মুখ ধুয়ে দেয়।

একটু বড় হলেও মালেকিনের সাত সকালে পুকুরে আসা থেমে যায় না। এতদিনে বড়শীতে মাছ ধরার একটা নেশা তার তৈরি হয়ে গেছে। জ্যাঠার মেয়ে নাহার আপাকে সে সাত সকালেই মুখ ধোয়ার সময়েই বড়শি ফেলে মাছ ধরতে দেখতো। একদিন নাহার আপার কাছে এসে বড়শিতে মাছ ধরতে কৌতূহলী হলো। নাহার আপা তার হাবভাব বুঝে কিভাবে মাছ ধরতে হয় তা শিখিয়ে দেয়। বড়শিটা বাড়িয়ে দেয় মালেকিন কে। বড়শীর টোপ কিভাবে লাগাতে হয়, তাও দেখিয়ে দেয়। মালেকিন ছিপ পুকুরে ফেলে বসে থাকে। নাহার আপাই টের পায় কিছু একটা বড়শীতে আটকা পড়েছে। সে টেনে তুলতে বলে মালেকিনকে। নিজে হাত লাগায়। একটা বড় ট্যাংরা বড়শিতে ধরা পড়ে। নাহার আপা সাবধানে মাছটাকে পিতলের ঘটিতে রাখে। মালেকিন এক ধরণের তীব্র উল্লাসে ভেতরে ভেতরে রোমাঞ্চিত হয়। বড়শিতে মাছ আটকানো খেলায় সে মেতে উঠে – পুঁটি, ট্যাংরা, কখনো কখনো টাকি। আর পায় কে তাকে। সময় পেলেই বড়শি নিয়ে সে পুকুরে ছুটে যায়।

এমনি এক সাত সকালেই বাড়ির ভেতরে হঠাৎ চিৎকার হৈ-চৈ গোলাগুলির শব্দ শুনতে পায়। হতচকিত মালেকিন কিছু বুঝার আগেই শংকিত নাহার আপা মালেকিনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে যেন সে কোথাও ছুটে যেতে না পায়। মনে হচ্ছিল, যে কোন শব্দকেই নাহার আপার তখন বড় ভয়। মূর্তির মত মিনিট বিশেক ওই অবস্থায় থাকার পর, নাহার আপাই তাকে ছেড়ে দেয়। ভয়ে থরথর নাহার আপার হৃদকম্পনের উঠানামা মালেকিন ঠিকই টের পাচ্ছিল। মৃত্যুপথযাত্রী রোগী থেকে যেমন পুরো পৃথিবী দূরে সরে যায়। বেশ কিছু পর চিৎকার হৈ-চৈ শব্দ সব থেমে গেলে, মালেকিন ধীর ভীরুপায়ে ঘাট ছেড়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়।

নাহার আপার আতংকের কারণ উপলব্ধি করতে তার আর বেগ পেতে হয় নি। বাবাকে বোঝাই যাচ্ছিল, কাজে যেতে তৈরি হয়েছিল। কাঁধের গামছাখানা বুকের রক্তে জবুথুবু হয়ে গেছে। বাবার প্রিয় গাঢ় নীল-মেটে রঙয়ের পাজ্ঞাবীও রক্তে সয়লাব হয়ে গেছে। মা ভিটের বারান্দায় বসে বাবার মৃত দেহের উপর নিথর চেয়ে আছে। উঠোনে একটু আগাতেই ভাইজানের লাশ চোখে পড়ে মালেকিনের। ভিটে উঠার সিঁড়ির উপর উপুড় হয়ে কাৎ হয়ে পড়ে আছে। ভাইজান কি তাহলে উঠোন হতে ঘরের ভিতর পালাতে যাচ্ছিল? আঁতকে উঠে মালেকিন অন্যপাশ থেকে ভিটেয় উঠে মাকে জড়িয়ে ধরে। এতক্ষণে সে ভয়াবহ রকমের এক ভয়ের সম্মুখীন হয়। মানুষ মারা যাবার কথা সে শুনেছে। পাশের বাড়ীর দাদীর মৃত্যুতে সে ও বাড়ীতে ভয়ে ভয়েই গিয়েছিল বছর খানেক আগের একদিন। তখন সে জানতো, মানুষ খুব বুড়ো হলেই মারা যায়। শরীরে যখন তার কোন জোর থাকে না। মৃত্যুকে তার মনে হয়েছিল, এক দূর গ্রহ বাসী। সে মানুষের বুড়ো সময় এলেই তাকে তুলে নিয়ে যায়। এখন মৃত্যুকে একটু আগেই পানিতে নিঃশংকচিত্তে ভেসে বেড়ানো মাছের হঠাৎ বড়শীতে আটকা পড়ে ডাঙ্গায় উঠে আসার মতই মনে হলো। কী যে মিহি পর্দার মত বিভাজন এই জীবন ও মৃত্যুর মাঝে। আজও তা ভেবে মালেকিন শিহরে উঠে। আর এ পাড়ের জীবন নামের এই জীবিত মানুষগুলো কী যন্ত্রণা না বয়ে বেড়ায়। কেউ কেউ আবার জীবন্মৃত হয়ে পড়ে। তার মা কি তা নয়? মালেকিন তার বুইব্বাকেও সেভাবে দেখতে চায়নি। যে বুইব্বার প্রতিমূহুর্তের উপস্থিতি তাকে জাগিয়ে রাখতো। বুইব্বার সাথে কোনদিন কোন কিছুতে চটাং চটাং না লেগে গেলে, তার সে দিনটাকে অর্থহীন মনে হতো। সে বুইব্বার কোন সাড়া না পেয়ে মালেকিন প্রাণাবেগহীন মাকে ছেড়ে বাড়ীর ভেতরে ভীরু পায়ে এগিয়ে গেলো। দূর থেকে আধো খোলা দরজা দিয়ে বুইব্বার যে দৃশ্য সে দেখলো, তা দেখার কথা সে কখনো ভাবেনি। তা তার ভাবনার জগতে কখনো উদয় হয়নি। উদয় হওয়ার প্রশ্নই আসে নি। মাথা নীচু করে কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে থেকে ছুটে বেরিয়ে আসে মালেকিন। জীবন্মৃত মা। স্পন্দনহীন। পৃথিবীর কোন কিছুতে তার আর অবিশ্বাস নেই। নরপশুতে রুপান্তরিত হলে নিষিদ্ধ দ্বার বলতে কিছুই থাকে না। সব নিষিদ্ধ দ্বারের চাবি যেন তার হাতে অবলীলায় উঠে আসে। মালেকিন আর কিছু ভেবে উঠতে পারেনি। সে আবার পুকুর ঘাটে ছুটে যায়। সেখানে নাহার আপা নেই। কিন্তু তাদের ধরা মাছগুলো পিতলের ছোট বালতিতে পানির মাঝে কিল বিল করে ভেসে বেড়াচ্ছে। কিছু না ভেবে মালেকিন বালতিতে আধো লাথি মেরে মাছগুলোকে পুকুরে ফেলে দেয়। সে নাহার আপার খোঁজে এদিক সেদিক ছুটে যায়। কিন্তু কোথাও নাহার আপার দেখা মেলে না।

ঝির ঝির করে বৃষ্টির পানি নামে পুকুরে। পুকুর জলে কাঁপন উঠে। সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বাড়ন্ত বৃষ্টি মাথায় নিয়ে মালেকিন ধীর পায়ে উঠোনের দিকে এগিয়ে আসে। উঠোনে এসেই সে একটু থমকে দাঁড়ায়। কে যেন বাবার গা-মাথা চাটাই দিয়ে ঢেকে দিয়ে গেছে। সে চাটাইয়ের তল থেকে থকথকে রক্ত বৃষ্টির পানির তোড়ে ও ঝামটা খেয়ে মাটির উঠোনময় বিস্তৃতি পাচ্ছে। অনতিদূরে মাটির ভিটের সিঁড়িতে ভাইজানের শরীরের উপরও জায়নামাজ পড়ার আর একটা পাটি বিছানো। ভিটে বেয়ে ভাইয়ার রক্ত ধীর গতিতে চুঁইয়ে পড়তে দেখে মালেকিন ব্যথিত হয়ে উঠে। চোখে পানি এসে পড়ে তার। মা যেন আগের সেই পাথরের মূর্তি। বাতাসে বৃষ্টির ছিঁটে এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে তাকে। তার স্নেহমাখা কোমল শাড়িটাকে। কিন্তু কোন ভ্রুক্ষেপ নেই তার। চোখের পাতাও যেন পড়ছে না আর। মালেকিনের উপস্থিতিও তার মাঝে কোন নড়া-চড়া বা সাড়া শব্দের সৃষ্টি করেনি। উঠোনের এক পাশে বাবা ভাইয়ের রক্ত এসে মিশে যাচ্ছে। বৃষ্টিতে নরম মাটি তা শুষে নিচ্ছে। মালেকিনের উঠোনের সামনের দিকে এগুতে ভয় হচ্ছে। আকাশ আরো কালো হয়ে উঠেছে। কাউকে কাছে না দেখে সে সত্যি সত্যি ফুঁপিয়ে কান্না শুরু করে। তাদের ভিটের উল্টোদিকের ভিটে বাড়ি থেকে সে আরেক গোঙানীর শব্দ শুনতে পায়। কে কানছে সেখানে? ফুপু! ফুপু না? মালেকিন আর দেরী না করে বাবাকে পাশ কাটিয়ে সে বাড়িতে ঢুকে পড়ে।

শামান সাত্ত্বিক | মার্চ ২৬, ২০১১ | ১৮:৫৪ বিভাগ: গল্প, মুক্তিযুদ্ধ | ট্যাগ: টীনএজ গল্প

উদ্বাস্তু সময় – ২

%d bloggers like this: