লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] মেন্টর: শেষ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার

লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] মেন্টর: ১ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার
লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] মেন্টর: ২ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার
লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] মেন্টর: ৩ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার

মেন্টর আর্কিটাইপের নমনীয়তা

অন্য আর্কিটাইপ (মৌল আদর্শ রুপ)-দের মত, মেন্টর বা দাতা একটা অনমনীয় চরিত্র সদৃশ নয়। বরং তা একটা দায়িত্ব-কর্তব্য, যা কয়েকটি ভিন্ন চরিত্র গল্পের সময়কালে পালন করে। একটা চরিত্র প্রাথমিকভাবে প্রকাশ করে একটা আর্কিটাইপকে – নায়ক, রুপ-পরিবর্তক (shapeshifter), ছলচতুর (trickster), এমনকি দুরাত্মা (villain) কখনো কখনো মেন্টরের মুখোশ নিতে পারে নায়ককে শিখাতে বা কিছু দিতে।

রাশান রুপকথার গল্পে, ডাইনী বাবা ইয়াগার বিস্ময়কর চরিত্র হলো ছায়া-রুপ যে কখনো কখনো মেন্টরের মাস্ক পরিধান করে। উপরিপৃষ্ঠে সে হলো ভয়ংকর, রাক্ষুসে ডাইনী যে বনের কালো দিকের প্রতিনিধিত্ব করে, তার গ্রাস করার ক্ষমতাকে প্রকাশ করে। কিন্তু বনের মতই তাকে সন্তুষ্ট করা যায় এবং বনের মতই সে ভ্রমণকারীদের প্রতি উপহার বর্ষণ করে। কখনো কখনো যদি প্রিন্স আইভান দয়ালু হয় এবং সৌজন্যবোধ দেখান, বাবা ইয়াগা তাকে যাদুদকরী সম্পদ দেয় যা তার রাজকন্যা ভেসিলিসাকে উদ্ধারে প্রয়োজন।

যদিও ক্যাম্পবেল এই মেন্টর রুপকে বলেন জ্ঞানী বৃদ্ধ পুরুষ বা নারী, তারা কখনো কখনো জ্ঞানীও নয় আবার বৃদ্ধও নয়। তরুণরা তাদের নির্মল, নিষ্পাপ ভাবনায় প্রায় ক্ষেত্রেই জ্ঞানী এবং প্রবীণদের শেখাতে সক্ষম। গল্পের সবচেয়ে বোকা ব্যক্তি থেকে খুব সম্ভবতঃ আমরা সবচেয়ে বেশি শিখি। শুধুমাত্র শারীরিক বর্ণনার চাইতে অন্য আর্কিটাইপের তুলনায় মেন্টর দায়-দায়িত্ব বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোন বিশেষ মূহুর্তে চরিত্রের কর্মকান্ড দ্বারাই তার আর্কিটাইপের স্বরুপ নির্ধারিত হবে।

অনেক গল্পে কোন বিশেষ চরিত্র নেই যে মেন্টর হিসেবে পরিচিত হবে। সেখানে কোন সাদা শ্মশ্রুমন্ডিত, যাদুকরী ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যক্তি নেই যে জ্ঞানী বৃদ্ধের মত আচরণ করে ঘুরে বেড়ায়। তা সত্ত্বেও প্রায় সব গল্পে, কোন না কোন মূহুর্তে আমরা এই আর্কিটাইপের শক্তি বা ক্ষমতার সাক্ষাৎ পাই।

অভ্যন্তরীণ মেন্টর

কিছু ওয়েস্টার্ন্স এবং ফিল্ম নোয়ার (film noir) গল্পে নায়ক হলো একজন অভিজ্ঞ, শক্ত-কঠোর চরিত্রের যার কোন মেন্টর বা গাইডের প্রয়োজন নেই। সে মেন্টর আর্কিটাইপটাকে নিজের করে নিয়েছে এবং তা এখন তার নিজের আচরণের অন্তর্নিহিত তাড়না হিসেবে বসবাস করছে। মেন্টর বন্দুকবাজদের না বলা কোন সংকেত হতে পারে, অথবা স্যাম স্পেড (Sam Spade) বা ফিলিপ মারলো (Philip Marlowe)-র মনে স্থান পাওয়া কোন গোপন ধারণা। নৈতিক আচরণের নীতিমালা মেন্টর আর্কিটাইপের সুস্পষ্ট বিদেহীকরণ, যা নায়কের কর্মকান্ডকে পরিচালিত করে। গল্পে একজন সত্যিকারের মেন্টর চরিত্র না থাকা সত্ত্বেও, একজন নায়কের জন্য কোন মেন্টরের উল্লেখ বিরল কিছু নয়, যদি সে মেন্টর নায়কের জীবনের প্রথমেই বিশেষ কোন অর্থ হয়ে আসে। একজন নায়ক হয়তো স্মরণ করতে পারে, “আমার মা/বাবা/পিতামহ/মাতামহ/অনুশীলন কর্মকর্তা (drill sergeant) বলতো……” এবং তারপর প্রজ্ঞার দিকে মনোযোগ দিতে আহবান জানায় যা গল্পের সমস্যা সমাধানে উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠবে। মেন্টর আর্কিটাইপের ক্ষমতা বইয়ের মত কোন এক বস্তুতে অথবা অন্য কোন সৃষ্টি বস্তুতেও আরোপ করা হতে পারে, যা নায়ককে তার অনুসন্ধানে পরিচালিত করবে।

মেন্টরের অবস্থান

যদিও নায়কের পরিভ্রমণ প্রায়ই মেন্টরের উপস্থিতি প্রথম অংকে দেখে থাকে, গল্পে মেন্টরের অবস্থান হবে বাস্তবতায় বিবেচনাধীন। এই চরিত্রের প্রয়োজন হতে পারে যে কোন মূহুর্তে, যে রহস্যের গূঢ়ার্থ জানে, যার আছে অজানা গন্তব্যের রুপরেখা, অথবা নায়ককে সঠিক সময়ে সংকট থেকে উদ্ধারের সঠিক পথ দেখাতে পারে। মেন্টর গল্পের প্রথমেই অবতীর্ণ হতে পারে, অথবা দ্বিতীয় বা তৃতীয় অংকের কোন সংকটকালীন সময়ের জন্য অপেক্ষার ডানায় ভর করে থাকতে পারে।

মেন্টররা নায়ককে পরিভ্রমণে উদ্বুদ্ধ করে, উৎসাহিত করে, পরিচালিত করে, প্রশিক্ষণ এবং উপহার প্রদান করেন। প্রত্যেকটা নায়ক কোন কিছুর দ্বারা পরিচালিত এবং এ ধরণের শক্তির স্বীকৃতি ছাড়া একটি গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বাস্তবিক চরিত্র হিসেবে প্রকাশিত হোক বা নিজের অন্তর্নিহিত আচরণের তাড়না হিসেবে হোক, মেন্টর আর্কিটাইপ লেখকের দক্ষতা প্রকাশের একটি শক্তিশালী অস্ত্র।

লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] নায়ক:শেষ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার

লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] মেন্টর: ৩ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার

লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] মেন্টর: ১ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার
লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] মেন্টর: ২ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার

বিভিন্ন ধরণের মেন্টর

নায়কদের মতই দায়িত্ব পালনে ইচ্ছুক বা অনিচ্ছুক মেন্টর রয়েছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও কখনো কখনো তারা শিক্ষা দেয়। অন্যক্ষেত্রে তারা তাদের খারাপ দৃষ্টান্তের দ্বারা শিক্ষা দেয়। দুর্বল এবং বিয়োগান্তক ত্রুটিগুণসম্পন্ন মেন্টরের পরিণতি সমধরণের ত্রুটি-বিচ্যুতির ফাঁদ এড়িয়ে চলতে উৎসাহিত করে। মেন্টরের এই ধরণের মৌলরুপ আদর্শ (আর্কিটাইপ) নায়কের অন্ধকার বা না-বোধক দিককে প্রকাশ করে।

অন্ধকাররুপের মেন্টররা

কোন নির্দিষ্ট গল্পে মেন্টর আর্কিটাইপের ক্ষমতা শ্রোতা-দর্শককে ভুলপথে ধাবিত করতে ব্যবহৃত হতে পারে। রোমাঞ্চকর গল্প বা থ্রিলারে মেন্টরের মুখোশ কখনো কখনো ফাঁদ হয়ে নায়ককে বিপদের দিকে প্রলুব্ধ করে। অথবা দি পাবলিক এনিমি(The Public Enemy) বা গুডফেলাস (Goodfellas) ধরণের অনায়কোচিত (anti-heroic) সন্ত্রাসী চক্রাবৃত (gangster) চলচ্চিত্র, যেখানে প্রত্যেকটি গতানুগতিক নায়কসুলভ মূল্যবোধের মাঝে বৈপরীত্য আছে, সেখানে একজন অ-মেন্টর (anti-mentor) অপরাধ এবং ধ্বংসের পথে অ-নায়ককে (anti-hero) পরিচালিত করতে উপস্থিত হয়।

এই ধরণের আর্কিটাইপ ক্ষমতার আরেক বৈপরীত্য হলো বিশেষ ধরণের প্রবেশদ্বারের অভিভাবক (Threshold Guardian, পরবর্তীতে এই আর্কিটাইপকে নিয়ে আলোচনা আসছে। রোমান্সিং দা স্টোন (Romancing the Stone)-এ যার উদাহরণ রয়েছে, যেখানে জোন ওয়াইল্ডার (Joan Wilder)-এর ডাইনীসুলভ কর্কশ স্বরের প্রতিনিধি বা এজেন্ট, যার উপস্থিতি পুরোদস্তুরের একজন মেন্টর, যে জোনের পেশার বিকাশে নির্দেশনা দিচ্ছে এবং তাকে পুরুষ সম্পর্কে পরামর্শ দিচ্ছে। কিন্তু যখন জোন রোমাঞ্চকর অভিযানের প্রারম্ভ প্রান্ত প্রায় অতিক্রম করতে যাবে, তার প্রতিনিধি তাকে থামাতে উদ্যত হয়; বিপদ সম্পর্কে তাকে সতর্ক করে এবং জোনের মনে সন্দেহের সৃষ্টি করে। সত্যিকারের মেন্টরের মতো জোনকে উদ্বুদ্ধ করার পরিবর্তে ম প্রতিনিধিটি নায়কের পথে একটা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। জীবনের ক্ষেত্রে মনস্তাত্ত্বিকভাবে এটা সত্য। জীবনে উন্নতির পরবর্তী পর্যায়ে উপনীত হবার স্বার্থেই প্রায়ই আমাদের সর্বোৎকৃষ্ট শিক্ষকদের অবশ্যি অতিক্রম করতে হয় বা ছাড়িয়ে যেতে হয়।

পতিত মেন্টর

কিছু মেন্টর নিজেরাই তাদের নায়কের পরিভ্রমণ পর্যায়ে রয়েছে। তারা হয়তো তাদের দায়িত্ব পালনে আত্মু-বিশ্বাসের সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। খুব সম্ভবতঃ তারা তাদের বয়োবৃদ্ধি হওয়ার সমস্যাকে মোকাবিলা করছে, এবং মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে উপনীত হচ্ছে। অথবা নায়কের পথ হতে সরে গেছে। নায়কের প্রয়োজন মেন্টরের আর একবার উঠে দাঁড়ানোর। সে যে তা করতে পারবে এই ব্যাপারে মারাত্মক সন্দেহ আছে। এ লিগ অফ দিয়ার ওউন (A League of Their Own)-এ টম হ্যানক্সস (Tom Hanks) একজন প্রাক্তন নায়ক খেলোয়াড়ে অভিনয় করে। আহত হওয়ার কারণে তাকে মাঠের বাইরে বসে থাকতে হয় এবং খারাপভাবে মেন্টরত্বের দিকে তার রুপান্তর ঘটে। তার মর্যাদা ও সন্মানের পতন ঘটে এবং দর্শক-শ্রোতা তাকে শিরদাঁড়া করে দাঁড়ানোর জন্য সর্বোত সমর্থন জোগাচ্ছে। সে সাথে নায়ককে সহায়তা করতে তার কাজকে সন্মান জানাচ্ছে। এই ধরণের মেন্টর তার নিজের মুক্তির পথে নায়কের যাত্রাপথের সব পর্যায় অতিক্রমণের ভেতর দিয়ে যেতের পারে।

ধারাবাহিক মেন্টররা

মেন্টররা দায়িত্ব নির্দিষ্টকরণে উপকারী ভূমিকা পালন করে এবং গল্পের গতিশীলতা বজায় রাখে। গল্পের ধারাবাহিকতার স্বার্থে তারা প্রায়ই লেখায় নির্বাচিত হোন। পুনরাবর্তিত মেন্টররা হলেন দি ম্যান ফ্রম ইউ. এন. সি. এল. ই. (The Man from U.N.C.L.E.)-র মিঃ ওয়াভারলি (Mr. Waverly), বন্ড ছায়াছবির (Bond pictures)-র “এম” (“M”), গেট স্মার্ট (Get Smart)-এর দি চীফ (The Chief), দি ওয়াল্টন্স (The Waltons)-এ পিতামহ-পিতামহী/মাতামহ-মাতামহী হিসেবে উইল গীর (Will Geer), এবং ইলেন করবি (Ellen Corby), ব্যাটম্যান (Batman)-এ আলফ্রেড (Alfred), পেট্রিয়ট গেমস (Patriot Games) এবং দি হান্ট ফর রেড অক্টোবর (The Hunt for Red October)-এ জেমস আর্ল জোন্স (James Earl Jones)-এর সিআইএ (CIA) কর্মকর্তা।

বহুবিধ মেন্টররা

বিশেষ কিছু দক্ষতা অর্জন করতে একজন নায়ক ধারাবাহিকভাবে কিছু মেন্টর দ্বারা প্রশিক্ষিত হতে পারে। সবচেয়ে ভাল প্রশিক্ষিত নায়কদের মধ্যে হারকিউলেস (Hercules) নিশ্চিতভাবে একজন, যে সুদক্ষ মেন্টরদের দ্বারা প্রশিক্ষিত হয়েছিল মল্লযুদ্ধে, তীর নিক্ষেপে, ঘোড়া চালনায়, অস্ত্র চালনায়, কুস্তিতে, জ্ঞানে, সদ্গুণে, গানে, মিউজিকে। সে এমনকি কোন এক মেন্টর থেকে রথ চালনায় প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। আমাদের সকলে কিছু ধারাবাহিক মেন্টরদের কাছ থেকে শিখছি, যারা হলো পিতা-মাতা, বড় ভাই-বোনরা, বন্ধুরা, প্রেমিক/প্রেমিকারা, শিক্ষকরা, কাজের কর্তাব্যক্তি ও সহকর্মীরা, চিকিৎসকরা এবং অন্য আদর্শরা।

বহুবিধ মেন্টরদের প্রয়োজন হতে পারে আর্কিটাইপের বিভিন্ন কার্যকারণ প্রকাশের জন্য। জেমস বন্ডের চলচ্চিত্রগুলোতে, 007 সব সময় তার নিজস্ব গন্ডিতে ফিরে আসে তার প্রধান জ্ঞানী বৃদ্ধ লোকের কাছে পরামর্শের জন্য। গুপ্তচরদের প্রধান (spymaster) “এম” (“M”) তাকে দায়িত্ব ও উপদেশ দেয় এবং সতর্ক করে। কিন্তু মেন্টরের নায়ককে উপহার দেয়ার কর্মকান্ড অস্ত্র-শস্ত্রের প্রধান “কিউ” (Q)-র কাছে অর্পণ করা হয়। মেন্টরের অন্য একটি দিকের প্রতিনিধিত্বকারী মিস মনিপেনি (Miss Moneypenny) নির্দিষ্ট পরিমাণের আবেগী সমর্থন, সে সাথে উপদেশ এবং গুরুত্ববহ তথ্য সরবরাহ করে গেছেন।

হাস্যোদ্রেককর মেন্টর

রোমান্টিক কমেডিতে এক বিশেষ ধরণের মেন্টর দৃষ্ট হয়। এই ব্যক্তিটি সাধারণতঃ নায়কের সমলিঙ্গের বন্ধু অথবা প্রায়শঃই অফিসের সহকর্মী হয়ে থাকে। সে নায়ককে প্রেম সম্পর্কে কিছু উপদেশ দিয়ে থাকে: হারানো প্রেমের বেদনা ভুলতে নায়ককে তার সাথে ঘুরতে নিয়ে যায়। এমন ভাব করে বোঝায় যে, নায়িকার সাথে এমন কোন সম্পর্ক আছে, যাতে নায়িকার স্বামীর মাঝে ঈর্ষাবোধ তৈরি হয়। প্রেমাস্পদের পছন্দগুলোর প্রতি আগ্রহের ভাব দেখায়। প্রেমাস্পদকে ফুল উপহার বা তোষামোদ করে। অথবা কখনো কখনো আরো আক্রমনাত্মক ভাব দেখায়। উপদেশগুলো নায়ককে প্রায় মনে হয় অস্থায়ী বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু পরিশেষে এটা সর্বদা সঠিক হয়ে উঠে। এই বৈশিষ্ট্যসমূহ হাস্যরসাত্মক (comedy) রোমান্টিক নাটকের। বিশেষ করে ওইগুলো ১৯৫০-সের যখন পিলো টক (Pillow Talk) এবং লাভার কাম ব্যাক (Lover Come Back) মত চলচ্চিত্রগুলোতে থেলমা রিটার (Thelma Ritter) এবং টনি র‍্যান্ডেল (Tony Randall)-এর মত চলচ্চিত্রাভিনেতাদের যথেষ্ট কাজ করার ছিল। যারা মেন্টরের রসময় বুদ্ধিদীপ্ত শ্লেষাত্মক রুপের সুন্দর চিত্রণ সমাধা করতো।

শামান হিসেবে মেন্টর

গল্পে মেন্টরের ধারণা শামানের ধারণার সাথে খোলাখুলিভাবে জড়িত। শামান হলো উপজাতীয় সংস্কৃতিতে নিরাময়কারী বা উপশমকারী, চিকিৎসক পুরুষ বা মহিলা। যেমন, মেন্টর নায়ককে বিশেষ পৃথিবী (Special World)-র পথে পরিচালিত করে, শামান তেমনি তাদের জনগণকে জীবনের পথে পরিচালিত করে। তারা স্বপ্নে এবং দর্শনে অন্য জগতে ভ্রমণ করে এবং গল্প নিয়ে ফিরে তাদের উপজাতির উপশমে। প্রায়শঃই একজন মেন্টরের কর্মকান্ড হলো অন্য জগতের অনুসন্ধানকল্পে নায়ককে পরিচালিত করার একটা দর্শন অর্জনে সাহায্য করা।

লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] মেন্টর:২ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার

লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] মেন্টর:১ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার

উদ্ভাবক হিসেবে মেন্টর

কখনো কখনো মেন্টর একজন বিজ্ঞানী বা উদ্ভাবক হিসেবে কাজ করেন। তার উপহারগুলো হলো, কলা-কৌশল, রুপরেখা অঙ্কন বা উদ্ভাবন। উচ্চাঙ্গ (ক্ল্যাসিকাল) পুরাণের মহৎ উদ্ভাবক হলেন ডেডেল্যাস (Daedalus), যে ক্রিট (Crete) শাসকদের জন্য ল্যাবিরিন্থ (Labyrinth) এবং অন্যান্য বিস্ময়গুলোর রুপরেখা এঁকেছিলেন। থিসিয়াস (Theseus) এবং মাইনোটোওর (Minotaur) গল্পের সুদক্ষ শিল্পী হিসেবে রাক্ষস মাইনোটোওর সৃষ্টিতে এবং তার জন্য খাঁচা হিসেবে ল্যাবিরিন্থের রুপরেখা অঙ্কনে ডেডেল্যাসের হাত ছিল। মেন্টর হিসেবে ডেডেল্যাস আরিয়াদনি (Ariadne)-কে সুতার বল দিয়েছিল, যার দ্বারা থিসিয়াস প্রাণ নিয়ে ল্যাবিরিন্হের ভেতর ঢুকেছে এবং বেরিয়েছে।

থিসিয়াসকে সাহায্যের জন্য শাস্তিস্বরুপ নিজস্ব গোলক ধাঁধাঁয় আবদ্ধ হয়ে, ডেডেল্যাস বিখ্যাত মোম-এবং-পালকের ডানা (wax-and-feather wings) উদ্ভাবন করেছিলেন। যার দ্বারা সে এবং তার পুত্র ইকারাস (Icarus) পালিয়েছিল। ইকারাসের মেন্টর হিসেবে সে তার পুত্রকে সূর্যের খুব কাছাকাছি না উড়তে উপদেশ দিয়েছিল। ল্যাবিরিন্থের পিচের মত গাঢ় অন্ধকারে বড় হওয়ায়, সূর্যের প্রতি অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণের কারণে ইকারাস পিতার উপদেশকে উপেক্ষা করেছিল। পরিণতিতে মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছিল যখন তার ডানার মোম গলে গেল। সবচেয়ে ভাল উপদেশই হলো অর্থহীন যদি তুমি তাকে না মানো।

নায়কের বিবেক

কিছু মেন্টর একটি বিশেষ কাজ করে থাকে নায়কের বিবেক হয়ে। পিনোচ্চিও (Pinocchio)-তে জিমিনি ক্রিকেট (Jiminy Cricket), অথবা রেড রিভার (Red River)-এ ওয়াল্টার ব্রেনান (Walter Brennan)-এর গ্রুট (Groot) একজন বিভ্রান্ত নায়ককে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক নীতিমালা মনে করিয়ে দেবার চেষ্টা করেছে। যাহাই হোক, একজন নায়ক তার খুঁতখুঁতে বিবেকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে পারে। যারা মেন্টর হয়ে উঠবে তাদের স্মরণ রাখা উচিত যে, মূল কল্লোডি (Collodi) গল্পে পিনোচ্চিও ক্রিকেটের মুখ বন্ধ করতে তাকে যোগ্য উত্তর দিয়েছিল। নায়কের কাঁধের ফেরেশতা বা দেবদূত বিপরীত মেরুর শয়তানের মত কখনো রঙিন তর্কে লিপ্ত হয় না।

উদ্বুদ্ধকরণ

মেন্টর আর্কিটাইপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নায়ককে উদ্বুদ্ধ করা, এবং ভয় কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করা। কখনো কখনো উপহারই হয়ে উঠে যথেষ্ট নিশ্চয়তা এবং উদ্বুদ্ধকরণ। তাছাড়া অন্যক্ষেত্রে, মেন্টর নায়ককে কিছু দেখায় অথবা কিছুর আয়োজন করে, যাতে নায়ক তার দায়িত্ব পালনে এবং রোমাঞ্চপূর্ণ যাত্রায় অঙ্গীকারে উদ্বুদ্ধ হয়।

কোন কোন ক্ষেত্রে, নায়ক এতই অনিচ্ছুক অথবা ভীত থাকে যে, তাকে রোমাঞ্চকর যাত্রায় যেতে বাধ্য করা হয়। আর তাই মেন্টরকে নায়কের পশ্চাদ্দেশে লাথি ছুঁড়তে হয় যেন রোমাঞ্চকর অগ্রযাত্রায় এগিয়ে যায়।

রোপন

প্রায়ই মেন্টর আর্কিটাইপের একটি কাজ হলো কোন সংবাদ বা সরজ্ঞাম রোপন করা, যা পরবর্তীতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। জেমস বন্ড (James Bond) চলচ্চিত্রগুলোতে একটি বাধ্যবাধক দৃশ্য থাকে যাতে বন্ডের পর্যায়ক্রমিক মেন্টরদের একজন, অস্ত্র ওস্তাদ (weapons master) “কিউ” (“Q”) কিছু নতুন ব্রিফকেস-অস্ত্রের (briefcase gadget) কলাকৌশল বর্ণনা করে একঘেঁয়েমীতে আক্রান্ত 007-এর কাছে। এই তথ্যটা বীজ বপনের মতই। দর্শক-শ্রোতাদের মনে টুকে নেয়ার মতই। কিন্তু এটা সম্পর্কে ভুলে যাওয়া হয় যতক্ষণ না চরম মূহুর্তের সৃষ্টি না হয়, যেখানে ব্রিফকেস- অস্ত্র জীবন রক্ষাকারী হয়ে উঠে। এই রকম গঠন গল্পের শুরু এবং শেষকে একত্রে বাঁধতে সাহায্য করে, এবং দেখায় যে, কোন না কোন মূহুর্তে আমরা আমাদের মেন্টর থেকে যা শিখি তা কাজে আসে।

যৌনতার সূত্রপাত

প্রেমের ক্ষেত্রে, মেন্টর আমাদের প্রেম ও যৌনতার রহস্যময়তাকে উন্মোচন করার দীক্ষা দিতে পারে। ভারতে যাকে বলে শক্তি – এক যৌনদীক্ষক বা অভিমন্ত্রক, একজন সঙ্গী যে আপনাকে উচ্চ চেতনায় উন্নয়নের বাহন হিসেবে যৌ্ন ক্ষমতার অভিজ্ঞতা অর্জনে সাহায্য করে। এই শক্তি হলো ঈশ্বরের প্রকাশ, একজন মেন্টর প্রেমিক নায়ককে ঐশ্বরিকতা উপলব্ধিতে পরিচালনা করে।

অজ্ঞ প্রলোভক বা চোর, নায়ককে কঠিন পথে পাঠ শিক্ষা দেয়। মেন্টরের কোন মন্দ ছায়ারুপ থাকতে পারে যে নায়ককে প্রেম বা প্রেমহীন তমসাচ্ছন্নতা বা যৌন প্রলুব্ধতার বিপদজনক পথে পরিচালিত করতে পারে। তাই বলা যায়, শেখার আছে অনেক পথ।

লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] মেন্টর:১ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার

    বিজ্ঞ পরামর্শদাতা (মেন্টর): জ্ঞানী বৃদ্ধ পুরুষ বা নারী

বল (শক্তি) তোমার সাথে থাকুক!
– জর্জ লুকাস (George Lucas)-এর স্টার ওয়ার্স (Star Wars) থেকে

একটি মৌল আদর্শরুপ (আর্কিটাইপ) প্রায় স্বপ্নে, পুরাণে এবং গল্পে পাওয়া যায়, তাহলো বিজ্ঞ পরামর্শদাতা বা মেন্টর। সাধারণতঃ একটা ইতিবাচক চরিত্র যে নায়ককে শিক্ষা ও সহযোগীতা দিয়ে প্রস্তুত করে। ক্যাম্পবেল এই শক্তিটির নাম দিয়েছেন জ্ঞানী বৃদ্ধ পুরুষ বা জ্ঞানী বৃদ্ধ নারী। এই মৌল আদর্শরুপ ঐ সকল চরিত্রগুলোতে প্রকাশ পেয়েছে যারা নায়ককে শেখায়, রক্ষা করে এবং উপহার দেয়। এমন যে, ঈশ্বর আদমের সাথে হাঁটছে ইডেনের বাগানে, মারলিন (Merlin) কিং আর্থার কে গাইড করছে, রুপকথার দেবমাতা (Godmother) সিন্ডেরেলাকে সাহায্য করছে, অথবা, ঝানু সার্জেন্ট কোন এক নতুন অনভিজ্ঞ পুলিশকে উপদেশ দিচ্ছে। নায়ক এবং মেন্টরের সম্পর্ক হলো সাহিত্য এবং চলচ্চিত্রের বিনোদনের সর্বোৎকৃষ্ট উৎস বা উপাদান।

‘মেন্টর’ (“Mentor”) শব্দটি আমাদের কাছে আসে দি ওডেসি (The Odyssey) থেকে। মেন্টর নামে একটি চরিত্র তরুণ নায়ক, টেলিমেকাস (Telemachus)-কে তার নায়কের ভ্রমণ (Hero’s Journey)-এ পরিচালিত করেছিল। বাস্তবিকই, এটা হলো দেবী এথেনা যে মেন্টরের প্রতিকৃতিতে টেলিমেকাসকে সাহায্য করে। মেন্টর প্রায়ই এক ঐশ্বরিক কন্ঠে কথা বলে এবং স্বর্গীয় জ্ঞান দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়। ভাল শিক্ষকরা এবং মেন্টররা আক্ষরিক অর্থে উৎসাহিত (enthused)। ‘এনথুজিয়াজম’ (“Enthusiasm”) গ্রীক এন থোজ (en theos) থেকে এসেছে, যার অর্থ ঈশ্বর-অনুপ্রাণিত (god-inspired), নিজের মাঝেই আছে এক ঈশ্বর, অথবা ঈশ্বর উপস্থিতিতে অনুপ্রাণিত।

    মনস্তাত্ত্বিক কার্যকলাপ:

মানুষের অন্তরাত্মা (psyche)-র ব্যবচ্ছেদে, মেন্টর আমিত্ব-কে প্রতিনিধিত্ব করে, আমাদের ভেতরের ঈশ্বরকে। ব্যক্তিত্বের এই দিকটা সবকিছুর সাথে জড়িত। এই উচ্চতর আমিত্ব হলো আরো জ্ঞানী, মহত্ত্বর, আমাদের ঈশ্বররুপ অংশ। যেমন, পিনোচ্চিও (Pinocchio)-র ডিজনী ভার্সান জিমিনি ক্রিকেট (Jiminy Cricket)। যার আমিত্ব বিবেক হিসেবে জীবনের পথে আমাদের পরিচালিত করেছে যখন কোন ব্লু ফেইরী (Blue Fairy) অথবা দয়ালু গেপেট্টো (gepetto) নেই সেখানে, যে আমাদের রক্ষা করতে পারে এবং বলতে পারে ভুল থেকে ঠিক কোনটা। [এই লিংকে উইকিপিডিয়া দেখুন, http://en.wikipedia.org/wiki/The_Fairy_with_Turquoise_Hair] ।

স্বপ্নে, রুপকথায়, পুরাণে অথবা চিত্রনাট্যে যেখানেই মেন্টর চরিত্র দেখা গেছে, সবসময়ই তারা নায়কের সর্বোচ্চ আকাঙ্খা পূরণে এগিয়ে গেছে। নায়কের যাত্রায় (Road of Heroes) নায়ক যা হয়ে উঠতে পারে, মেন্টর হলো তারই জন্য। মেন্টররা প্রায় পুরোনো কোন নায়ক হয়ে থাকে, যারা জীবনের প্রথমদিককার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। এখন সেই জ্ঞান ও প্রজ্ঞা নিয়ে এগুচ্ছেন।

পিতামাতার রুপকল্পের সাথেই মেন্টর আর্কিটাইপ খুব অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। যেমন, “সিন্ডেরেলা” (“Cinderella”) গল্পের রুপকথার গডমাতাকে মেয়েটার মৃত মার রক্ষাকারী আত্মা বলে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। মারলিন পিতৃহীন তরুণ কিং আর্থার (King Arthur)-এর বিকল্প অভিভাবক। অনেক নায়কই মেন্টর খুঁজে বেড়ায়, কারণ তাদের নিজেদের পিতামাতারা তাদের আদর্শ হিসেবে যথেষ্ট নয়।

    নাটকীয় কার্যকলাপসমূহ:

শিক্ষাদান

শেখা যেমন নায়কের একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ, তেমনি শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ দেয়া মেন্টরের একটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। প্রশিক্ষণদাতা সার্জেন্ট, সৈন্যদলের প্রশিক্ষক, অধ্যাপক, দুর্গম প্রান্তরের বিজ্ঞ ওস্তাদ, পিতা-মাতা, পিতামহ-পিতামহী/মাতামহ-মাতামহী, বৃদ্ধ কঠোর বক্সিং প্রশিক্ষক এবং এইরকম সকলে যারা একজন নায়ককে তার কর্তব্য, নিয়মকানুন এবং পদ্ধতিসমূহ শেখায়, তারা মেন্টরের মৌল আদর্শরুপকে সুস্পষ্ট করে তোলে। অবশ্যই এই রকম শিক্ষা উভমুখী হতে পারে। যিনি শেখাচ্ছেন তিনি জানেন যে, তিনি তার ছাত্র থেকে ততটুকু শিখতে পারেন, যতটুকু ছাত্ররা তার কাছ থেকে শিখছে।

উপহার-দেয়া

উপহার দেয়াও এই মৌল আদর্শরুপ বা আর্কিটাইপের একটা গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। ভ্লাদিমির প্রপ (Vladimir Propp) তার রাশান রুপকথার গল্পের বিশ্লেষণ, মরফোলজি অফ দা ফোকটেল (Morphology of the Folktale)-এ, এই কার্যকলাপকে “দাতা” বা সরবরাহকারী হিসেবে চিহ্নিত করে। সাধারণতঃ কিছু উপহার দিয়ে যে অস্থায়ীভাবে একজন নায়ককে সাহায্য করে। এই উপহার হতে পারে এক যাদুকরী অস্ত্র, একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা ইঙ্গিত, কোন যাদুকরী ঔষধ বা খাদ্য, অথবা জীবন রক্ষার্থে গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ। রুপকথার গল্পে দাতা খুব সম্ভবতঃ একজন ডাইনীর বিড়াল (witch’s cat), যে ছোট্ট বালিকার দয়ায় কৃতার্থ হয়ে তাকে একটা তোয়ালে এবং একটি চিরুনী উপহার দেয়। পরবর্তীতে বালিকা যখন ডাইনীর দ্বারা তাড়িত হয়, তোয়ালেটা একটা বিক্ষুদ্ধ নদী এবং চিরুনীটি এক বনে রুপান্তরিত হয়ে ডাইনীর তার পশ্চাদ্ধাবনটাকে বাধাগ্রস্থ করে।

এইরকম উপহার দেয়ার উদাহরণ চলচ্চিত্রে প্রচুর – দি পাবলিক এনিমি (The Public Enemy)-তে ছোটখাট মাস্তান বা দাঙ্গাবাজ পুটিনোজ (Puttynose) জেমস ক্যাগনি (James Cagney)-কে তার প্রথম বন্ধুকটি দেয়া থেকে শুরু করে, স্টার ওয়ারস (Star Wars)-এ ওবি ওয়ান কেনোবি (Obi Wan Kenobi) ল্যুক স্কাইওয়াকার (Luke Skywalker)-কে তার পিতার আলোর তরবারী (light-saber) দেয়া পর্যন্ত, এইরকম অসংখ্য উদাহরণ। আজকাল উপহার হয়ে থাকে সম্ভবতঃ কোন কম্পিউটার কোড। যেমন, ড্রাগনের বাসস্থান (dragon’s lair)-এর কোন কম্পিউটার কোড। [Dragon’s Lair সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে উইকিপিডিয়া দেখুন।]

পুরাণে উপহার

পুরাণে মেন্টরের দানশীল কার্যকলাপের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অনেক নায়কই তাদের মেন্টর, দেবতাদের কাছ থেকে উপহার পেয়ে থাকে। পেন্ডোরা (Pandora), যার নামের অর্থ “সব -উপহারলভ্য” (“all-gifted”), সেও উপহার দ্বারা আচ্ছাদিত হয়েছিল, যেখানে ছিল জিউস(Zeus)-এর প্রতিহিংসাতুল্য উপহারের বাক্স, যা তার খোলার কথা ছিল না। হারকিউলেস (Hercules)-এর মত নায়কেরা তাদের মেন্টর থেকে কিছু উপহার পেয়েছিল, কিন্তু গ্রীকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উপহার প্রাপ্য নায়ক ছিল পারসিয়াস (Perseus)।

পারসিয়াস

নায়কের গ্রীক আদর্শ পারসিয়াসের মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে, পারসিয়াসকে রাক্ষস হত্যাকারী (monster-slayer) বলা হয়। তার আছে একজন সর্বগুণে গুণান্বিত নায়ক হবার স্বাতন্ত্র্য বা বিশিষ্টতা। সে ক্ষমতাধর উঁচু পর্যায় থেকে উপহারের বোঝায় এতই কূঁজো যে, কিভাবে এইসব নিয়ে সে হাঁটতে পারে তাই বিস্মিত হওয়ার মত। হারমিস (Hermes) এবং এথেনা (Athena)-র মেন্টরের সময়মত সহায়তায় সে পাখাযুক্ত স্যান্ডেল, অদৃশ্য হেলমেট, যাদুর তরবারী, কাস্তে এবং আয়না অর্জন করে। সে সাথে অর্জন করে মেডুসার মাথা (the head of Medusa), [যার বৈশিষ্ট্য হলো, এই মাথার দিকে যে তাকায়, সেই পাথরে পরিণত হয়।] এবং মাথা আবৃত করার যাদুর থলে। পারসিয়াস গল্পের চলচ্চিত্র রুপ, ক্ল্যাশ অফ দা টাইটানস (Clash of the Titans)-এ যেন এতসব কিছু অর্জন যথেষ্ট ছিল না। তাই পারসিয়াসকে উড়ন্ত ঘোড়া (pegasus)-ও দেয়া হয়।

বেশিরভাগ গল্পে, এ বিষয়টাকে অতিরজ্ঞন করা হতে পারে। কিন্তু পারসিয়াসের অর্থ হলো, নায়কের পরমোৎকর্ষের মূর্তরুপ। সুতরাং যাত্রাপথের অনুসন্ধানে তার মেন্টর দেবতার বর লাভই হবে যথোপযুক্ত।

উপহার অবশ্যই অর্জিত হওয়া উচিত

প্রপের রাশান রুপকথার বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, সাধারণতঃ শুধুমাত্র তখনই দাতা চরিত্ররা নায়কদের যাদুকরী উপহার প্রদান করে, যখন নায়করা কোন ধরণের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। এটা খুবই সাধারণ নিয়ম যে, উপহার পাওয়া অথবা দাতার সাহায্য লাভ, শেখার মাধ্যমে অথবা উৎসর্গ বা প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে অবশ্যই অর্জন করতে হবে। রুপকথার নায়কেরা জীব-জন্তুর অথবা যাদুকরী ধরণের প্রাণী বা সৃষ্টির সহযোগিতা পেয়ে থাকে। শুরুতেই এই প্রাণীদের প্রতি সদয় হয়ে নায়করা তাদের সাথে খাদ্য ভাগাভাগি করে, অথবা প্রাণীদেরকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। এসবের বদৌলতে তারা প্রাণীদের কাছ থেকে উপযুক্ত সহযোগিতা পায়।

লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] নায়ক -ক্রিস্টোফার ভগ্লার

লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] নায়ক:শেষ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার

লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] নায়ক:১ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার
লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] নায়ক:২ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার
লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] নায়ক:৩ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার

দল-সম্পৃক্ত নায়কেরা

সমাজের সাথে সম্পৃক্ততার সুবাদে নায়কের আরো একটা স্বাতন্ত্র্য তৈরি হয়ে উঠে। প্রথম গল্পকারদের মত, পূর্বতম মানুষেরা যারা শিকারে গিয়েছিল এবং আফ্রিকার সমতলে জড় হয়েছিল, তাদের মতই বেশির ভাগ নায়কের আছে দল-সম্পৃক্ত পরিচিতি। গল্পের শুরুতেই দেখা যায়, তারা সমাজেরই অংশ। কিন্তু তাদের যাত্রা তাদেরকে বাড়ী থেকে অনেক দূরে কোন এক অপরিচিত জায়গায় নিয়ে যায়। যখন আমরা প্রথম তাদের সাথে পরিচিত হই , তখন তারা কোন বংশ, গোত্র, গ্রাম, শহর বা পরিবারের অংশ। তাদের গল্প হলো, সেই গ্রুপ থেকে আলাদা হওয়ার গল্প (প্রথম অংক)।
তারপর একাকী রোমাঞ্চকর অভিযান চলে অপরিচিত অঙ্গন বা ঊষর জনহীন প্রান্তরে (দ্বিতীয় অংক)।
এবং পরিণামে সচরাচর দলের সাথে পূণঃএকত্রীকরণ (তৃতীয় বা শেষ অংক)।

দল-সম্পৃক্ত নায়কেরা প্রায়ই একটা পছন্দের মুখোমুখি হয়। তাহলো আদৌ কি তারা প্রথম অংকের সাদামাটা পৃথিবীতে ফিরে আসবে? না কি দ্বিতীয় অংকের বিশেষ পৃথিবীতে থেকে যাবে? পশ্চিমী কালচারে, নায়কের বিশেষ পৃথিবীতে থেকে যাওয়া খুবই ব্যতিক্রম। কিন্তু উচ্চাঙ্গের এশীয় এবং উত্তর এমেরিকার ইন্ডিয়ান গল্প-উপ্যাখানে তা খুবই স্বাভাবিক।

নিঃসঙ্গ নায়কেরা

দল-সম্পৃক্ত নায়কের বিপরীতে আছে নিঃসঙ্গ পশ্চিমী নায়ক যেমন শেন (Shane), ক্লিন্ট ইস্টউড (Clint Eastwood)-এর ম্যান ইউথ নো নেম (Man with No Name), দি সার্চারস (The Searchers)-এর জন ওয়েন (John Wayne)-এর ইথান (Ethan) অথবা দি লোন রেঞ্জার (The Lone Ranger)। এ ধরণের নায়কের গল্পগুলোতে, সমাজ থেকে নায়কের বিচ্ছেদ দিয়েই গল্প শুরু হয়। তাদের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র হলো ঊষর জনহীন প্রান্তর এবং তাদের স্বাভাবিক প্রকৃতি হলো নির্জন একাকিত্ব। তাদের ভ্রমণ হলো দলে পূনঃপ্রবেশের একটি (প্রথম অংক)।
দলের স্বাভাবিক ভূখন্ডে দলের মাঝে অভিযান (দ্বিতীয় অংক)।
তারপর আবার বিচ্ছিন্ন জনহীন প্রান্তরে ফিরে যাওয়া (তৃতীয় অংক)।
এইসব নায়কদের জন্য দ্বিতীয় অংকের বিশেষ পৃথিবী হলো তাদের গোত্র বা গ্রাম, যেখানে তারা সংক্ষিপ্তভাবে ভ্রমণ করে, এবং সবসময় অস্বস্থিবোধ করে। দি সার্চারস-এর সমাপ্তিতে জন ওয়েনের সেই অপূর্ব শট এই ধরণের নায়কের ক্ষমতার উপসংহার টানে। পরিবারের আরাম এবং আনন্দ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে একজন চিরকালের বহিরাগত হিসেবে ওয়েন কেবিনের দরজার প্রবেশপথে ফ্রেম বন্দী হয়। এই ধরণের নায়ক ওয়েস্টার্ণগুলোতে সীমাবদ্ধ থাকা প্রয়োজন। এটা নাটক এবং একশানধর্মী চলচ্চিত্রগুলোতে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে, যেখানে একজন নিঃসঙ্গ ডিটেকটিভ রোমাঞ্চকর অভিযানে প্রলুব্ধ হতে পারে, যেখানে একজন তপস্বী বা অবসরপ্রাপ্ত লোক সমাজে ফিরে আসতে পারে, অথবা যেখানে একজন আবেগায়িত বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিকে আত্মীয়তার জগতে পূণঃপ্রবেশের জন্য চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়।

দল-সম্পৃক্ত নায়কদের মতো, নিঃসঙ্গ নায়কদেরও চূড়ান্ত পছন্দ রয়েছে তাদের প্রাথমিক পর্যায়ে ফিরে যাওয়ার (এখানে নিঃসঙ্গতায়)।
অথবা দ্বিতীয় অংকের বিশেষ পৃথিবীতে থেকে যাওয়ার। কিছু নায়ক নিঃসঙ্গতা দিয়ে শুরু করে এবং দল-সম্পৃক্ত নায়ক হয়ে শেষতক দলের সাথে থেকে যায়।

অনুঘটক নায়কেরা

নিয়মের ব্যতিক্রম হয় এক নির্দিষ্ট শ্রেণীর নায়কের ক্ষেত্রে, যেখানে নায়কই সেই চরিত্র যে সাধারণতঃ পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যায়। এরা হলো অনুঘটক নায়ক, কেন্দ্রীয় চরিত্র, যারা নায়কোচিতভাবে ক্রিয়াশীল হতে পারে। কিন্তু তারা নিজেদের যথেষ্ট পরিবর্তন করে না, কারণ তাদের মূল কাজ হলো অন্যদের মধ্যে রুপান্তর নিয়ে আসা। রসায়নের সত্যিকারের অনুঘটকের মতো তারা নিজেদের পরিবর্তন না করে সিস্টেম বা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনে।

একটা ভাল উদাহরণ হলো, বেভারলি হিলস কপ (Beverly Hills Cop)-এ এডি মারফি (Eddie Murphy)- র চরিত্র এক্সেল ফোলে (Axel Foley)। তার ব্যক্তিত্ব আগে থেকেই তৈরি হয়ে আছে এবং গল্পের শুরু থেকেই স্পষ্ট ও আলাদা হয়ে আছে। তার চরিত্রের মাঝে তেমন কোন পরিণতি (character arc) নেই, কেননা তার তো কোন অভিযানে যাওয়ার নেই। সে কিছু শিখেনি বা গল্পের ব্যপ্তিতে তার তেমন পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু সে তার বেভারলি হিলস পুলিশ বন্ধু, টেগার্ট (Taggart) ও রোজউড (Rosewood)-এর মাঝে নিশ্চিত পরিবর্তন এনেছে। তার বন্ধুদের চরিত্রের পরিণতি (character arc) তুলনামূলকভাবে অনেক শক্তিশালী। গতানুগতিকতার পথে চলা পুলিশ বন্ধুদ্বয় এক্সলের প্রভাবে, বিচলিত এবং অস্বস্থিকর অবস্থা হতে কঠিন ও বিপদজনক পরিস্থিতি মোকাবেলা করা রপ্ত করে ফেলে। বাস্তবিকই যদিও এক্সেল হলো কেন্দ্রীয় চরিত্র, খলনায়কের প্রধান বিরুদ্ধ পক্ষ, এবং চলচ্চিত্রের বেশি সময় জুড়ে থাকা খুব ভাল এক চরিত্রের। তবুও তর্ক করা যায়, সে সত্যিকারের নায়ক কি না। কিন্তু গল্পের বিজ্ঞ পরামর্শদাতা (mentor), যখন জাজ রেইনহোল্ড (Judge Reinhold) অভিনীত যুবক রোজউড-ই প্রকৃত নায়ক। কারণ সেই গল্পের অগ্রগতিতে সবচেয়ে বেশি শিখে।

বলিউড মুভি থ্রী ইডিয়টস (3 idiots)-এ আমির খান অভিনীত রেঞ্চো চরিত্র অনুঘটক নায়ক হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছে। সে তার দু’বন্ধু ফারহান এবং রাজুর চরিত্রসহ তার প্রেমিকা এবং প্রেমিকার বিদ্‌ঘুটে কঠোর বাবা, ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলের পরিচালকের জীবনেও পরিবর্তন সাধন করে।

অনুঘটক নায়কেরা বিশেষভাবে উপকারী ধারাবাহিক গল্প বলার টিভি এপিসোড বা পর্বসমূহে। দি লোন রেঞ্জার (The Lone Ranger) অথবা সুপারম্যানের (Superman) মতো এই নায়কেরা কিছু অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যায়। কিন্তু প্রাথমিকভাবে অন্যদের সাহায্য করতে বা বেড়ে উঠাতে নির্দেশনা দিতে কাজ করে থাকে। অবশ্যই এটা খুবই ভাল ধারণা, কখনো কখনো এইসব চরিত্রগুলোকে বেড়ে উঠার বা পরিবর্তনের কিছু সময় দেয়া হোক, যা তাদের সতেজ ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে সাহায্য করে।

নায়কের পথ

নায়কেরা হলো আত্মার রুপান্তরের প্রতীক এবং সে সাথে প্রত্যেক মানুষ তার জীবনে যে যাত্রাপথে নামে। এই অগ্রগতির পর্যায়গুলো, জীবন এবং বৃদ্ধির প্রাকৃতিক পর্যায়গুলো নায়কের পরিভ্রমণকে গড়ে তোলে। নায়কের মৌলরুপ বা আর্কিটাইপ লেখক এবং আত্মার অনুসন্ধানীদের উদঘাটনের উর্বর ক্ষেত্র। ক্যারল এস. পিয়ারসন্স (Carol S. Pearson)-এর বই আওয়েকেনিঙ্গ দা হিরোস উইদিন (Awakening the Heroes Within) নায়কের ধারণাকে আরো উপকারী মৌলরুপে ভেঙ্গেছে। মৌলরুপগুলো হলো যেমন, নির্দোষ, এতিম, শহীদ, পথভ্রষ্ট, লালনকারী, অনুসন্ধানী, প্রেমিক, ধ্বংসকারী, সৃষ্টিকারী, শাসক, যাদুকর, ঋষি এবং বোকা। সেইসাথে প্রত্যেকটির আবেগায়িত অগ্রগতির গ্রাফ তৈরি করেছে। নায়কের অনেক রুপের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক বোঝাপড়ার এটা একটা ভাল নির্দেশিকা। কিছু মহিলা নায়কের বিশেষ এভিনিউতে ভ্রমণ মোওরীন মারডক (Maureen Murdock)-এর দি হিরোইন’স জার্নি: ইউমেন’স কোয়েস্ট ফর হোলনেস (The Heroine’s Journey: Woman’s Quest for Wholeness)-এ বিধৃত হয়েছে।

লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] নায়ক:৩ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার

লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] নায়ক:১ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার
লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] নায়ক:২ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার

অন্য আর্কিটাইপে (মৌলরুপে) নায়কত্ব

কখনো কখনো নায়কের মৌলরূপ প্রধান চরিত্রে প্রতীয়মান নয়, যে মুখ্য চরিত্র সাহসিকতার সাথে খারাপদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়ী হয়। নায়কের মৌলরুপ অন্য কোন চরিত্রে সুস্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে, যখন তারা নায়কোচিতভাবে সক্রিয় হয়। একটি অনায়কসুলভ চরিত্র নায়ক হয়ে উঠতে পারে। গুঙ্গা ডিন (Gunga Din)-এর নাম ভূমিকায় অভিনীত চরিত্র সবমিলিয়ে ভাঁড় বা জোকারের আর্কিটাইপে আরম্ভ করে, কিন্তু প্রাণপণে নায়কে উন্নীত হয়ে উদ্যমী হয়ে উঠে। খুবই সংকটকালীন মূহুর্তে নিজের বন্ধুদের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে, সে নায়ক হওয়ার অধিকার অর্জন করে। স্টার ওয়ারস (Star Wars)-এ ওবি ওয়ান কেনোবি (Obi Wan Kenobi) গল্পের বেশিরভাগ অংশে সুস্পষ্টভাবে বিজ্ঞ পরামর্শদাতা (mentor)-র ভূমিকা পালন করে। যাহাই হক, সে নায়কোচিত আচরণ করে এবং অস্থায়ীভাবে নায়কের মুখোশ পরিধান করে যখন সে লিউক (Luke)- কে ডেথ স্টার (Death Star) থেকে পালাতে সাহায্য করতে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে।

এটা খুবই কার্যকরী হতে পারে যদি কোন খলচরিত্রে বা শত্রুভাবাপন্ন চরিত্রে অনাকাঙ্খিতভাবে নায়কের গুণাবলী প্রতীয়মান হয়ে উঠে। আমেরিকার টিভির এক ধারাবাহিক কমেডিতে (সিটকম), ড্যানি ডেভিটো-র তুচ্ছ “ট্যাক্সি” প্রেরক লুই হঠাৎ উন্মোচন করে যে, তার একটা কোমল হৃদয় আছে অথবা সে মহৎ কিছু করেছে, তখনই সিটকমের এই এপিসোডটি এমি এওয়ার্ড জয় করে। এক দুঃসাহসী খলনায়ক, কোন না কোন ভাবে নায়কোচিত, আবার অন্যদের কাছে তুচ্ছ হয়েও খুবই আবেদনময় হয়ে উঠতে পারে। আদর্শগতভাবে, প্রত্যেক পরিপূর্ণ ও সামঞ্জস্যপূর্ণ চরিত্রে সব ধরণের মৌলরূপ প্রতিভাত হওয়া উচিত, কারণ মৌলরূপগুলো পরিপূর্ণ ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠার বিচ্ছিন্ন অভিব্যক্তিসমূহ।

চরিত্রের ত্রুটিসমূহ

কোন চরিত্রের আকর্ষণীয় ত্রুটিগুলো চরিত্রটিকে মানবিক করে তুলে। নায়কের অবস্থানে এলে আমরা নিজেদের কিছু কিছু করে চিনতে পারি। কেননা, তখন আমরা আমাদের অন্তর্নিহিত সন্দেহবাদিতা, ভুল চিন্তাধারা, অতীতের অপরাধবোধ, মানসিক আঘাত, অথবা ভবিষ্যত আশংকা অতিক্রম করার চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। দুর্বলতা, ত্রুটিপূর্ণতা, অদ্ভুদ আচরণ, বদভ্যাস তাৎক্ষণিকভাবে নায়ক বা অন্য কোন চরিত্রকে আরো বেশি বাস্তব ও আকর্ষণীয় করে তোলে। এটা মনে হয় যে, চরিত্র যত বেশি দ্বন্দ্বগ্রস্থ ও মানসিক স্থৈর্যহীন হবে, ততবেশি শ্রোতা-দর্শক তাদের পছন্দ করবে এবং চরিত্রে মাঝে নিজেদের খুঁজে পাবে।

কোন চরিত্রের ত্রুটি চরিত্রটিকে কোথাও নিয়ে যাবে – যাকে বলা যায় চরিত্রটিকে পরিণতি (character arc) দেবে। চরিত্রটি ‘A’ অবস্থান হতে উত্তীর্ণ হয়ে ‘Z’ অবস্থানে পৌঁছবে পর্যায়ক্রমে ধারাবাহিক পদক্ষেপে। ত্রুটিই হলো অসম্পূর্ণতা বা অপূর্ণতার শুরুর পর্যায়, যা থেকে চরিত্র উত্তরণের দিকে ধাবিত হয়। কোন চরিত্রের মধ্যে অসম্পূর্ণতা থাকতে পারে। সম্ভবতঃ নায়ক (নায়িকা)-র কোন রোমান্টিক সঙ্গী নেই এবং সে তার জীবন পূর্ণ করতে সে অসম্পূর্ণ অংশটা খুঁজছে। এটা রূপকথার গল্পে প্রায়ই রূপকায়িত হয় যে, নায়ক তার পরিবারে কাউকে হারানো বা মৃত্যুর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছে। অনেক রূপকথার গল্প শুরু হয় পিতার মৃত্যু অথবা ভাই বা বোনের অপহরণের মধ্য দিয়ে। পরিবারের একক থেকে পরিবারের সদস্যের এই বিয়োগ গল্পের উত্তেজনাময় ভিত্তিকে গতিশীল করে তোলে। এবং এই গতিশীলতা থেমে যায় না, যতক্ষণ না নতুন পারিবারিক বন্ধন বা পুরনো সদস্যদের পুনর্মিলনের মাধ্যমে পূর্বের পারিবারিক ভারসাম্য পুনঃস্থাপন হয়।

সবচেয়ে আধুনিক গল্পে নায়কের ব্যক্তিত্বই পরিপূর্ণভাবে পুনঃর্নিমাণ বা পুনঃস্থাপিত হয়। হারানো বা অসম্পূর্ণ অংশ হতে পারে ব্যক্তিত্বের সংকটপূর্ণ উপাদান যেমন, ভালবাসতে পারা অথবা বিশ্বাস করার সামর্থ্য। নায়ককে কিছু সমস্যা অতিক্রম করতে হতে পারে যেমন, ধৈর্যহীনতা বা সিদ্ধান্তহীনতা। দর্শক-শ্রোতা নায়কের ব্যক্তিত্বের সমস্যায় হিমসিম খেতে দেখা যেমন পছন্দ করে, তেমনি পছন্দ করে এই সমস্যা হতে উত্তরণ হতে দেখতে। প্রেটি ওমেন (Pretty Woman) ছায়াছবির ধনী এবং শীতল হৃদয়ের ব্যবসায়ী, বিল এডওয়ার্ড (Will Edward), প্রাণবন্ত ভিভিয়ান (Vivian)-এর প্রভাবে উষ্ণ হয়ে উঠে এবং পরবর্তীতে বিল ভিভিয়ানের চার্মিং প্রিন্স-এ রুপায়িত হয়। ভিভিয়ান কি কিছু আত্ম-সন্মান অর্জন করবে এবং তার পতিতা জীবন থেকে বেরিয়ে আসবে? অর্ডিনারী পিওপল (Ordinary People)-এর অপরাধে নিমজ্জিত কিশোর কনরাড কি ভালবাসা গ্রহণ এবং ঘনিষ্ঠ হওয়ার হারানো সামর্থ্য পুনরুদ্ধার করবে? আসলেই কি তাই নয়!

বিবিধ ধরণের নায়ক

নায়কেরা আসে বিভিন্ন রূপে – ইচ্ছুক বা অনিচ্ছুক নায়ক হয়ে, দলবদ্ধভাবে বা একাকী নায়ক হয়ে, প্রতিনায়ক হয়ে, ট্রাজিক নায়ক হয়ে, অনুঘটক নায়ক হয়ে। অন্য সব মৌলরূপের মত, নায়ক হলো একটা নমনীয় ধারণা, যা বিভিন্ন ধরণের ক্ষমতাই প্রকাশ করতে পারে। নায়কেরা অন্য আর্কিটাইপ বা মৌলরূপগুলোকে সমন্বয় করতে পারে সংকরধর্মী ছলনাকারী প্রতারক (Trickster) নায়কে পরিণত হতে। অথবা তারা অস্থায়ীভাবে অন্য আর্কিটাইপের মুখোশ পড়ে হয়ে উঠতে পারে, বিভিন্ন রূপ-পরিগ্রাহী (Shapeshifter), বিজ্ঞ পরামর্শদাতা (mentor) থেকে অন্যকিছু, অথবা এমনকি কোন প্রতিচ্ছায়া।

যদিও সচরাচর ইতিবাচক চরিত্র হিসেবে নায়ক চিত্রায়িত হয়, কিন্তু সে তার অহংবোধের (ego) অন্ধকার বা নেতিবাচক দিককে প্রকাশ করতে পারে। নায়কের মৌলরূপ সাধারণতঃ মানুষের আত্মার ইতিবাচক দিকের প্রতিনিধিত্ব করে, আবার দেখাতে পারে দুর্বলতার পরিণতি এবং নিজের ভূমিকা গ্রহণের অনিচ্ছুকতা।

ইচ্ছুক এবং অনিচ্ছুক নায়কেরা

দেখা যাচ্ছে, নায়কেরা দুই জাতের। প্রথম জাত হলো ইচ্ছুক, সক্রিয়, প্রবল উৎসাহী স্বভাবের। দুঃসাহসিক রোমাঞ্চকর অভিযানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, সন্দেহহীন। সাহসিকতার সাথে সবসময় সামনে এগিয়ে যায়। আত্মপ্রণোদিত। দ্বিতীয় জাত হলো অনিচ্ছুক, সন্দেহবাদী, দ্বিধাগ্রস্থ এবং নিস্ক্রিয় জড় স্বভাবের। এই জাতের নায়কদের আত্মপ্রণোদনা (self-motivation) অর্জন আবশ্যক, এবং শুধুমাত্র বাহ্যিক শক্তির প্রভাবের কারণেই তারা রোমাঞ্চকর অভিযানে প্রবেশ করে। উভয় জাতের নায়কই বিনোদনধর্মী গল্প সৃষ্টি করে, যদিও যে নায়ক সবসময় জড় স্বভাবের সে কোন অসংলগ্ন উটকো নাটকীয় অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে পারে। অনিচ্ছা পোষণকারী নায়কের জন্য উত্তম হলো গল্পের কোন এক মূহুর্তে তার মাঝে পরিবর্তন আসা, প্রয়োজনীয় প্রণোদনা প্রাপ্তির পর তার রোমাঞ্চকর অভিযানের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া।

প্রতিনায়কেরা

প্রতিনায়ক হলো খুবই বিপদজনক একটা শব্দ যা প্রচুর বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। সোজা কথায় বললে, একজন প্রতিনায়ক নায়কের বিপরীত কেউ নয়, কিন্তু এক বিশেষ ধরণের নায়ক, যে আইনের চোখে অপরাধী বা সমাজের দৃষ্টিতে দুর্বৃত্ত। কিন্তু যার প্রতি দর্শক-শ্রোতাদের মুলতঃ সহানুভূতি আছে। আমরা এই ধরণের সমাজ বহির্ভূত লোকের সাথে পরিচিত, কারণ আমরা সবাই জীবনের কোন না কোন সময় নিজেদের সমাজ বহির্ভূত মনে করি।

দুই জাতের প্রতিনায়ক আছে। প্রথম জাতের হলো, সে চরিত্ররা, যারা বড় বেশি গতানুগতিক নায়কদের মত আচরণ করে। কিন্তু তাদের আছে নৈরাশ্যবাদের তীব্র ছোঁয়া অথবা হতোদ্যম অনুভূতি। যেমন, দি বিগ স্লিপ (The Big Sleep) এবং ক্যাসাব্লাঙ্কা (Casablanca)-য় বোগার্ট (Bogart)-এর অভিনীত চরিত্ররা। দ্বিতীয় ধারার হলো, ট্রাজিক নায়কেরা – গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র, যে পছন্দনীয় বা আকর্ষণীয় নাও হতে পারে। এমনকি যার কর্মকান্ডকে আমরা নিন্দা করি। যেমন, ম্যাকবেথ (Macbeth) অথবা স্কারফেস (Scarface), অথবা মামী ডিয়ারেস্ট ((Mommie Dearest)-এর জোওন ক্রফোর্ড (Joan Crawford)।

হতোদ্যম প্রতিনায়ক কখনো বা নিস্প্রভ বীরযোদ্ধা, এক নিঃসঙ্গ মানুষ, যে কি না সমাজ ত্যাগ করেছে বা সমাজ তাকে ত্যাগ করেছে। এই চরিত্রগুলো শেষতক জিতে যেতে পারে এবং পুরো সময় জুড়ে দর্শক-শ্রোতার পুরো সহানুভূতি পেতে পারে। সমাজের চোখে তারা হলো রবিন হুড (Robin Hood)-এর মতই জাতিচ্যুত, শঠ দস্যু অথবা ডাকাতদের নায়ক, অথবা বোগার্ট অভিনীত চরিত্রগুলো। তারা হলো প্রায়ই সন্মানিত ব্যক্তি, যারা সমাজের কলুষ থেকে মুক্ত। তারা সম্ভবতঃ প্রাক্তন পুলিশ বা সৈন্য, যাদের মোহমুক্তি ঘটেছে এবং আইনের ছত্রচ্ছায়ায় বর্তমান কর্মকান্ড চালাচ্ছে , হয় ব্যক্তিগত তদন্তকারী হিসেবে, বা চোরাকারবারী হিসেবে, বা জুয়াড়ী হিসেবে, অথবা রোমাঞ্চ-প্রিয় সৈনিক হিসেবে। আমরা এই চরিত্রগুলোকে ভালবাসি, কেননা তারা বিদ্রোহী এবং তারা সমাজের অনিয়ম, অসংগতির বিরুদ্ধাচরণ করে, যা আমরাও করে থাকি। এই ধরণের অন্য আর্কিটাইপ রিবেল উইদাউট এ কস (Rebel Without a Cause) এবং ইস্ট ইডেন (East of Eden)-এ জেমস ডীন অভিনীত চরিত্রে মূর্ত হয়ে উঠেছে। দি ওয়াইল্ড ওয়ান (The Wild One)-এ যুবক মার্লোন ব্রান্ডো (Marlon Brando) অভিনীত চরিত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক নতুন প্রজন্মের পুরাতনের প্রতি অসন্তুষ্টি ফুটেছে। এই ঐতিহ্য বর্তমানে বয়ে নিয়ে চলেছে মিকে রুউরক (Mickey Rourke), ম্যাট ডিলোন (Matt Dillon), শন পেন (Sean Penn)-এর মত অভিনেতারা।

দ্বিতীয় জাতের প্রতিনায়ক হলো অনেকটা ট্রাজিক নায়কের ক্লাসিক বা উচ্চাঙ্গ ধারণা। এরা হলো ত্রুটিপূর্ণ নায়ক, যারা কখনো অতিক্রম করতে পারে না তাদের ভেতরের অশুভ সত্ত্বাকে এবং নিজেরাই নিজেদের পতন এবং ধ্বংসকে অনিবার্য করে তোলে। তারা হতে পারে আকর্ষণীয় বা মনোমুগ্ধকর গুণবিশিষ্ট। কিন্তু তাদের ত্রুটিগুলোই শেষমেশ জয়ী হয়। কিছু ট্রাজিক প্রতিনায়ক এত আকর্ষণীয় গুণবিশিষ্ট নয়। কিন্তু আমরা তাদের পতনকে মোহাবিষ্ট হয়ে দেখি কারণ সেখানে, ঈশ্বরের ইচ্ছায় আমি যাচ্ছি (there, but for the grace of God, go I.). প্রাচীন গ্রীকদের মত, যারা অদিপাস (Oedipus)-এর পতন প্রত্যক্ষ করেছে, তাদের মত আমরা আমাদের আবেগকে পরিশোধিত করি এবং আমরা একই ধরণের পতন এড়িয়ে যেতে শিখি, যখন আমরা স্কারফেস (Scarface)-এ আল পাচিনো (Al Pacino)-র চরিত্র, গরিলা ইন দা মিস্ট (Gorillas in the Mist)-এ ডায়ান ফোসি (Dian Fossey) চরিত্রে সিগোরনি ওয়েবার (Sigourney Weaver), অথবা লুকিং ফর মিস্টার গুডবার (Looking for Mr. Goodbar)-এ ডায়ান কিটোন (Diane Keaton) অভিনীত চরিত্রের ধ্বংস বা বিনাশ দেখি।

লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] নায়ক:২ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার

লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] নায়ক:১ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার

আগের পর্বের ধারাবাহিকতায়:

নাটকীয় বৃত্তিসমূহ

দর্শক-শ্রোতার সাথে নায়কের পরিচিতিকরণ

নায়কের নাটকীয় উদ্দেশ্য হলো শ্রোতাকে গল্পে প্রবেশের জন্য জানালার কপাট খুলে দেয়া। যারা গল্প শুনছে অথবা নাটক বা চলচ্চিত্র দেখছে, তাদেরকে গল্পের প্রথম পর্বেই আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে নায়কের সাথে পরিচিত হতে, তার সাথে এগিয়ে যেতে, এবং নায়কের চোখেই গল্পে বর্ণিত বিশ্বটাকে দেখতে। গল্পকারেরা এটা করছে তাদের নায়কদের মাঝে চমৎকার গুণের সমন্বয় ঘটিয়ে, সর্বজনীন এবং অনন্যসাধারণ চারিত্রিক গুণে নায়ককে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করে।

নায়কদের যে ধরণের বৈশিষ্ট্য আছে, সেগুলো আমাদের কাছে পরিচিত এবং স্বীকৃত। সেগুলোর আছে সর্বজনীনতা ও সকলেই তা বুঝতে পারি। যেমন, নিজের ভালবাসা পাওয়ার আকাঙ্খা, নিজেকে অন্যের বুঝতে পারা, নিজের সফলতা অর্জন করা, অস্তিত্ব রক্ষা করা, মুক্তি পাওয়া, প্রতিশোধ নেওয়া, নিজের ভুলকে শোধরানো, অথবা নিজেকে প্রকাশের প্রয়াস পাওয়া।

গল্প পাঠের সময় আমাদের ব্যক্তিগত জানাশোনাকে নায়ক অনুধাবনের অভিজ্ঞতায় আংশিকভাবে গল্পে নিয়োজিত করি। এইভাবে ক্ষণিকের জন্য হলেও আমরা গল্পের নায়কে রূপান্তরিত হই। আমরা নায়কের অন্তরাত্মায় প্রবেশ করি এবং নায়কের চোখেই বিশ্বকে দেখি। নায়কদের কিছু বিস্ময়-বিমুগ্ধ গুণের প্রয়োজন, যার কারণে আমরা তাদের মত হয়ে উঠতে চাই। আমরা ক্যাথেরিন হেপবার্ণ (Katharine Hepburn)-এর মত আত্মবিশ্বাস, ফ্রেড এসটাইয়ার (Fred Astaire)-এর মত আভিজাত্য, ক্যারি গ্রান্ট (Cary Grant)-এর মত উচ্ছল, মেরিলিন মনরো (Marilyn Monroe)-র মত যৌন-আবেদনময়তার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চাই।

নায়কদের সর্বজনীন গুণ থাকা চাই, থাকা চাই আবেগ, অভিপ্রায়, যেসব অভিজ্ঞতা প্রত্যেক মানুষই কখনো না কখনো অর্জন করে। যেমন, প্রতিশোধ, ক্রোধ, লালসা, প্রতিযোগিতা, আঞ্চলিকতা, দেশপ্রেম, আদর্শবাদিতা, হতাশা বা নৈরাশ্যবাদ। কিন্তু নায়কদের হতে হবে অনন্যসাধারণ বৈশিষ্ট্যের মানুষ, ধরাবাঁধা চরিত্রের বাইরে। অথবা নায়ক এমন কেউ নন, যিনি হবেন ত্রুটিহীন, ধারণাহীন মিথ্যা দৈবতূল্য কেউ। যে কোন অর্থপূর্ণ ফলপ্রসূ শিল্পের মতই নায়করা হবেন সর্বজনীন স্বকীয় মৌলিক। কেউই বিমূর্তগুণসম্পন্ন মানুষের গল্প পড়তে বা চলচ্চিত্র দেখতে আগ্রহী না। আমরা চাই বাস্তব মানুষের গল্প, একটি বাস্তব চরিত্র। কোনক্রমেই একজন বাস্তব মানুষের মত শুধুমাত্র একক কোন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নয়। অনেক গুণ এবং তাড়না ও প্রেরণার এক অনন্য সমন্বয়ে কোন চরিত্র। আবার এই গুণ বা তাড়নাগুলোর মধ্যে রয়েছে পরস্পর বিরোধীতা, এবং এই তীব্র পরস্পর বিরোধীতার মধ্যে রয়েছে সৌন্দর্য। একদিকে প্রেমের প্রতি বিশ্বস্ততা এবং অন্যদিকে কর্তব্য পরায়ণতা এই দু’য়ের দ্বন্দ্বে জর্জরিত চরিত্র স্বাভাবিকভাবেই দর্শক শ্রোতাদের জন্য আগ্রহ উদ্দীপক। যে চরিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে আবেগ উত্তেজনার দ্বন্দ্ব এবং বৈপরীত্য – বিশ্বাসের পাশাপাশি সন্দেহ, আশার পাশাপাশি নিরাশা – সেগুলো মনে হয় বেশ বাস্তবিক এবং মানবিক, অন্য চরিত্রগুলোর চেয়ে যাদের মাঝে দু’য়ের দ্বন্দ্ব এবং বৈপরীত্য নেই।

একজন সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিপূর্ণ নায়ক হবেন একইসাথে দৃঢ়, অনিশ্চিত, আকর্ষণীয়, ভুলোমনা, অধৈর্য, শারীরিকভাবে শক্তিধর এবং দুর্বল হৃদয়ের। গুণগুলোর মাঝে এমনই সুনির্দিষ্ট সমন্বয় থাকতে হবে, যাতে করে দর্শক-শ্রোতা এমন ধারণা পেতে পারে যে, নায়ক গতানুগতিক ধাঁচের বাইরে বাস্তবিকই এক বিশেষ চরিত্রের।

নায়কের বেড়ে উঠা

নায়কের গল্পের আরেক বৃত্তি হলো নায়কের শিক্ষা এবং তার বেড়ে উঠা। একটা পান্ডুলিপি মূল্যায়ন করে কখনো কখনো এটা বলা কঠিন, কে মূল চরিত্র অথবা কার মূল চরিত্র হওয়া উচিত। সবচেয়ে ভাল উত্তর হলো প্রায়ই, সেই চরিত্র যে শিখে এবং বৃদ্ধি পায় সবচেয়ে বেশি গল্পের গতিপথে এগিয়ে যাবার প্রক্রিয়ায়। নায়কেরা বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে তার লক্ষ্যে পৌঁছে যায়। কিন্তু এই চলার পথে তারা নতুন জ্ঞান অর্জন করে বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ হয়ে উঠে।

অনেক গল্পের হৃদস্পদনই হলো শেখা, যে শিক্ষা আমরা পাই নায়ক ও তার বিজ্ঞ বিশ্বস্ত পরামর্শদাতার (mentor) কার্যকলাপ থেকে, নায়ক এবং তার প্রেম থেকে, এমনকি নায়ক এবং খলনায়কের মধ্যকার আচার-ব্যবহার থেকে। আমরা সকলেই যে একে অন্যের শিক্ষক।

নায়কের সক্রিয়তা

আরেকটি নায়কোচিত বৃত্তি হলো নায়কের সক্রিয়তা। পান্ডুলিপিতে নায়কই সাধারণতঃ খুব সক্রিয় ব্যক্তি হয়ে থাকেন। তার ইচ্ছা এবং আকাঙ্খাই বেশিরভাগ গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যায়। পান্ডুলিপিগুলোতে প্রায়ই যে ত্রুটি দেখা যায়, তাহলো, গল্প জুড়ে নায়ককে বেশ গতিশীল দেখা যায়। কিন্তু সবচেয়ে সংকটকালে সে হয়ে উঠে নিস্ক্রিয় এবং সময়মত বাইরের কোন শক্তির আগমন তাকে উদ্ধার করে। এরকম মূহুর্তে সবকিছুর উর্ধ্বে, নায়ককে হওয়া উচিত খুবই সক্রিয়, তার নিজের ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক। গল্পে নায়ককে নেয়া উচিত সুস্পষ্ট ভূমিকা, যাতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি নিয়ে তার দায়িত্ব পালন।

নায়কের নিজেকে উৎসর্গীকরণ

সাধারণতঃ মানুষ ভাবে যে, নায়ক হলো সাহসী ও শক্তিশালী। কিন্তু নিজেকে বিসর্জনের কাছে নায়কের এই গুণ দু’টো গৌণ। সত্যিকারের নায়ক নিজেকে বিসর্জনের জন্য প্রস্তুত। মূল্যবান কিছু ত্যাগের মাধ্যমে সে নিজেকে উৎসর্গ করে। এমনকি কোন আদর্শ বা দলের স্বার্থে নিজের জীবনকে দেয় বিসর্জন। বিসর্জন অর্থ ‘পবিত্র করে তোলা’। ,আদিকালে মানুষ বিসর্জন দিতো, এমনকি দিতো মানুষের জীবনও, আত্মিক পৃথিবীর কাছে নিজেদের ঋণ স্বীকার করার প্রয়োজনে; দেব-দেবী বা প্রকৃতির মত ক্ষমতাবান শক্তিধরদের সন্তুষ্ট করতে এবং তাদের প্রতিদিনের জীবন প্রক্রিয়াকে পবিত্র করার মানসে। মৃত্যু হয়ে উঠে তখন পাপ থেকে মুক্তির এক পবিত্র ধর্মীয় কর্তব্য।

মৃত্যুর সাথে বোঝাপড়া

প্রত্যেকটা গল্পের হৃদয়মূলে আছে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া। যদি নায়ক সত্যিকারে মৃত্যুর মুখোমুখি না হয়, তবে সেখানে জীবন বাজী রেখে কোন কিছু খেলতে নামে বা প্রেম করে, অথবা রোমাঞ্চকর দুঃসাহসিক অভিযানে অংশ নেয়ার মাঝে মৃত্যু ভয় বা প্রতীকি মৃত্যু রয়েছে। এসব পরিস্থিতিতে হয়তো নায়ক সফল হয়ে বেঁচে যাবে অথবা ব্যর্থ হয়ে মারা যাবে।

নায়কেরা আমাদের দেখায় কিভাবে মৃত্যুর মোকাবেলা করতে হয়। তারা মৃত্যু থেকে বেঁচে যেতে পারে, প্রমাণ করে দেখাতে পারে যে মৃত্যু এমন কঠিন কিছু না। তারা মারাও যেতে পারে (প্রতীকি মৃত্যু হিসেবে) এবং আবার জন্ম নিতে পারে, এটা প্রমাণ করতে যে, মৃত্যুকে অতিক্রম বা জয় করা সম্ভব। তারা মরতে পারে নায়কোচিতভাবে, মৃত্যুকে অতিক্রম করে স্বেচ্ছায় নিজেদের জীবন উৎসর্গের মাধ্যমে, কোন এক মহৎ উদ্দেশ্যে, আদর্শের জন্য অথবা তার দলের জন্য।

গল্পে সত্যিকারের নায়কত্ব দেখানো হয়, যখন নায়করা নিজেদের উপযুক্ত সময়ে উৎসর্গ করে। তাদের রোমাঞ্চকর অভিযান ধ্বংস, মৃত্যু বা বিপদ বয়ে আনলেও তারা স্বেচ্ছায় জীবনের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। দেশের জন্য সৈনিকরা যেমন তাদের জীবন দান করতে রাজী থাকে, ঠিক তেমনি নায়কেরা নিজেদের বিসর্জনের সম্ভাবনাকে গ্রহণ করে।

সবচেয়ে কার্যকর নায়ক তারাই, যারা কোন না কোন কিছু উৎসর্গ করেছে। এই কারণে তাদের হয়তো বন্ধু বা ভালবাসার কাউকে হারাতে হয়েছে। তাদের হয়তো নতুন জীবনে প্রবেশের স্বার্থে সযত্নে লালিত কিছু বদ-অভ্যাস বা খামখেয়ালীপনা পরিত্যাগ করতে হয়েছে। সম্ভবতঃ তারা তাদের কিছু জয় বা অর্জন নিয়ে ফিরে আসে অথবা ভাগাভাগি করে নেয়, যা তারা বিশেষ জগৎ (নায়কের কাছে সম্পূর্ণ নতুন ও অপরিচিত, তার নিজস্ব জগৎ হতে ভিন্ন, যেখানে তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী, চ্যালেঞ্জিং পরিবেশ বা শক্তির মুখোমুখি হতে হয়) হতে অর্জন করে। নায়কেরা হয়তো তাদের শুরুর স্থানে ফিরে যায়, তাদের গোত্র বা গ্রামে, এবং দলের অন্যদের সাথে ভাগ করে নেয় তাদের নিয়ে আসা আনন্দ সুখ-সুধা, খাদ্য অথবা জ্ঞান। মার্টিন লুথার কিং অথবা মহাত্মা গান্ধীর মতো মহান সাংস্কৃতিক নায়কেরা তাদের পরোপকারী আদর্শ বাস্তবায়িত করতে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে।

%d bloggers like this: