মার কন্ঠ

আমার কোন জ্বর করেনি। রোদে গা-ও পুড়েনি। তবে ঘুমানোর অসুবিধা ছিল। ঘুম আমার ভাল লাগে। ঘুমাতে ভালবাসতাম। ঘুম যেন আমার রসের নাগরী, যার সাথে চলতো জলাজলি, ঢলাঢলি। ও আমাকে জড়িয়ে নিতো। আবেশায়িত হতে হতো। আবেশ ছড়াতে আমিও ভালবাসতাম। মুচকি মুচকি হাসাহাসি করতাম ঘুম ঢুলু ঢুলু দু’চোখ।

আমার ঘুম কখনো আমাকে নিয়ে এসেছে সাগর পাড়ে। বিশাল জলরাশির মাঝে আঁধারে আমার দৃষ্টি চলে যেতো দূরে। মনে হতো এই বিপুল জলরাশি মাড়িয়ে আমি তখন ওপার আঁধারে পৌঁছে যাবো। আঁধার আমায় করেছে গো বরণ। আমি তো আছি ডুবে তারই মাঝে।

আমার মা ছিল এক। যেমন, অনেকের থাকে। আমার ঘুমের ভেতর উনি আমার পিছু নিতেন। ঘুমালে উনাকে চোখে পড়তো না আমার কখনো। আমি তাতে অবাকই হতাম। এই যে দেখুন, আমি গ্রামের পুকুর পাড়ে হেঁটে চলে এসেছিলাম। পুকুরের টলটলে জল আমাকে আলিঙ্গনে হাত বাড়ালো। আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না। চতুর্দিক আঁধার শুধু পুকুরের উপর এক ছাইরঙা নীলাভ আলো। কেমন ভয় ভয় হচ্ছে। বেশিক্ষণ কিন্তু না। বোধ হয়, গভীর জলের বড় এই পুকুরটা আমার মনের কথা বুঝলো। সে কী তার পানি ছিটিয়ে আমাকে চুমুতে ভিজিয়ে দিয়ে গেলো! না, আমি তো খটখটে শুকনো। তাহলে এমন বোধ হলো কেন? জেলে পাড়ার বুড়ো নিবারণ দাদু বলেছে, জলের সাথে বেশি মাখামাখি হলে এমনই হয়। তবে কি আমি জলে ডুবে যাচ্ছি?

তা হবে কেমন করে? আরে এই আঁধারেই আমার সামনে জলের বিশাল পুকুরটা এক নিমিষে শুকিয়ে কটকটে হয়ে গেলো। দেখো দেখো এর মাঝের গভীর ফাটলে পানি উঁকি দিচ্ছে। কে চুষে নিলো নিমিষে এই তরল পানীয়, মায়ের বুকের দুধ যেমন সন্তান চেপে চুষে নেয়। মনে হলো, আমি নির্বিঘ্ন এক কিশোর পাড়ি দিতে পারবো এই জলের গভীর শুকনো পথ। কী জানি, মাঝের গভীর ফাটলে পৌঁছে গেলে, সেখানে হয়তো কোন এক পথ এসে খুলে যাবে। আমাকে নিয়ে নেবে অতল গভীরে, হয়তো গভীর জলের কোন এক দেশে। সেখানে থাকবে কারা? রুপবতী সখীরা? তাদের মধ্যমণি হয়ে থাকবে তিলোত্তমা মৎস্য এক কন্যা। বেশি ভাবতে পারে না সদ্য কিশোর উড়ু মনটা।

আমি যেই জলে ঝাঁপ দেবো, পেছন থেকে কে যেন আমার শার্ট ধরে টান দিলো। আর বলে উঠলো, “এ্যাই।” আমি কিছুই দেখতে পাইনি। জানি শুধু, আমার চেতনা লুপ্ত হলো। পতিত হচ্ছিলাম ভূমিতে আমি। পুকুর পাড়ের ভেজা ঘাসের অস্তিত্ব অনুভব করিনি আমি এতটুকু। আর জানি, “এ্যাই” বলা কন্ঠটা আর কারোর নয়, আমার মায়ের।

Advertisements
%d bloggers like this: