সুমনের একাত্তর

পুকুরে পানি দেখাটা বা পানির উপর হাঁসের সাঁতার কাটাটা নতুন হলেও সব কিছুই কেমন স্বাভাবিক ঠেকে সুমনের কাছে। সব ছিমছাম। গোছালো ভাব সর্বত্র। এখন যা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে, পরে তা তুলে নেয়া হচ্ছে। উঠোনটাকেও তাই ছিমছাম মনে হয়। নারকোল পাতার বাতাসে নড়া অথবা আম পাতার সৌরভ, কাঁচা আম, ঝুলন্ত কাঁঠাল সব তার কাছে নতুন। নারকেলের পানির চেয়ে, শ্বাসটা তার বেশি পছন্দ। আবার কাঁচা নারকেলের ভেতরের সাদা ঘন তরলটাও তার পছন্দ। পছন্দ কলার ভেলা ধরে পানিতে ধাপাধাপি। সুমন এর মাঝেই ডুবে থাকে। মার জোর করে বিছানায় পড়াতে বসিয়ে রাখাটা তার কাছে বেদনাকর। মাকে বোঝায় কে? এখন তো কারো কোন স্কুল নেই। যেদিন রাতে তাদের বেড়ে উঠা শহরের বাসা ছেড়ে, পরদিন কোন একসময় লঞ্চে করে শেষমেশ নানা বাড়ি হয়ে দাদার বাড়িতে আসা হলো গভীর রাতে, সেদিন থেকে তো আর পড়াশুনার প্রশ্ন উঠলো না। স্কুলে যাওয়ার কোন তাগাদা ছিল না। এখন আবার জোর করে পড়তে বসা কেন? মা-টাকে পছন্দ করতে পারে না সুমন। তার বড় দুই আপন ভাই বা তার থেকে সামান্য ছোটবড় চাচাতো-জ্যাঠাতো ভাইয়েরা তো বইয়ের ধারে কাছে নেই। তাহলে একা একা তাকেই কেন বা পড়াশুনোর শাস্তি ভোগ করতে হবে? তার ভাইয়েরা বা তার চেয়ে বেশ বড় চাচাতো-জ্যাঠাতো ভাইয়েরা তো দুরন্তপনায় কম যায় না। তারা পড়ে ক্লাস ফোরে, কেউ সিক্স, সেভেন-এইটে। ক্লাস ওয়ান পাস করা সুমনকে মাঝে মাঝে বড়দের দামালপনা ছুঁতে পেছনে পেছনে দৌঁড়াতে হয়। সবার পেছনে পরে থাকার যে কষ্ট আছে, এটা অন্যদের বোঝাবে কে? কখন যে বড় হবে!

মাকে মাঝে মাঝে বলতে শোনা যায়, “একবার সুযোগ পেলে, তবে সব ছেলেগুলোকে বন্দুক চালানো শেখাবো।” মাকে তখন উত্তেজিত মনে হয়। বন্দুক চালনা জানা থাকলে, অন্ততঃপক্ষে অস্তিত্ব রক্ষার দুঃশ্চিন্তা নিয়ে সর্বক্ষণ কাউকে থাকতে হবে না। এমন চিন্তা মাকে করতে দেখে কেউ তখন অবাক হয় না। সুমনরা চার ভাই। সুমন ভাইদের মধ্যে সবার ছোট।

বড় ভাইয়া গ্রামে এলেই মাকে বেশ উদ্বিগ্ন দেখাতো। ভাইয়াও বেশ গম্ভীর হয়ে থাকতো। ভাইয়া মোমেনশাহী ক্যাডেট কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে পরে। একবার দু’তিনজন জোয়ান মানুষ এসে সুমনের চাচা-জ্যাঠাদের ভিটে-বাড়িতে ঢুকে প্রত্যেকে প্রতিটি ঘরের খাটের তলাতে কি যেন খুঁজে বেড়াচ্ছিল। তাদের হাতে বন্দুক ছিল। সে সময় ভাইয়া বাড়িতে ছিল। এক গম্ভীর সলাজ তটস্থ একটা ভাব ভাইয়ার মধ্যে তখন বিরাজ করছিল। সুমন জানতে পারে, লোকগুলোকে রাজাকার বলা হতো। তারা খাটের নীচে বন্দুক খুঁজে বেড়াতো। এ কারণে মা চাইতো না, ভাইয়া বাড়িতে থাকুক। এরকম তিনজন লোক আরো একবার বাড়িতে এসে প্রতি ঘরে ঘরে গিয়ে খাটের নীচে বন্দুক খুঁজে বেড়িয়েছিল। সেবার ভাইয়া ক্যাডেট কলেজে ছিল। বাবা বাড়িতে থাকতেন না। রেলওয়েতে কর্মক্ষেত্রেই থাকতে হতো বাবাকে।

বন্দুক নিয়ে রাজাকারগুলো খাটের তলা খুঁজতে এলে এতটুকু সুমনের ভয় করতো। ভয় আরো করতো, যখন দক্ষিণ বাড়ির নূরালী সিদ্দিক চাচার ছেলে সুমনদের বাড়িতে এসে তার মেজো জ্যাঠার ভিটের উপর পিঁড়িতে বসে সারাদিন কাটিয়ে দিতো। ভিটের উপর তার পাশেই সে তার বন্দুকটা রাখতো। সুমনের এজন্যই ভয়টা বেশি হতো। লোকটা মাথা নীচু করে যেভাবে তাকায়, তাতেও সুমনের ভয় করে। উনি ছুটিতে ওনার বাড়ি এলে দিনের বেলা এ বাড়িতে এভাবে বসে কাটিয়ে দেন। একদিন এক চাচী তাকে জিজ্ঞেস করেছিলো, ‘কিরে দাউদ, তুই সারাদিন এইখানে বইসা থাকোস কেন্‌? কোন উত্তর দেয়নি সে। শুধু একটু নড়ে বসে, মাটিতে রাখা বন্দুকটাকে স্পর্শ করে। যেভাবে সে বন্দুক স্পর্শ করতো, তাতে সুমনের মনে হতো, লোকটি বন্দুককে স্পর্শ করছে, নাকি বন্দুকটির স্পর্শ পেয়ে লোকটি জোর ফিরে পাচ্ছে। সে সাথে নিজেকে শক্তিশালী ভাবছে। তাকে কি কেউ এখানে মারবে? তাহলে সে ভয় পাচ্ছে কি? এতসব বুঝে না সুমন। শুধু দূর থেকে আড়ালে লক্ষ্য করেছে, সামান্য একটু শব্দ হলেই লোকটার হাত বন্দুককে স্পর্শ করে। সুমন এও লক্ষ্য করেছে, রাজাকারদের সাথে কেউ কথা বলে না একদম। তারা এলে তখন সবকিছু থমকে যায়। রাজাকারদেরও কথা বলার চাইতে একরকম তটস্থ থাকতে দেখে ও।

কিন্তু যখন বাড়িতে প্রথম দু’জন মুক্তিযোদ্ধা এলো, উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিল বাড়ির লোকেরা। কড়কড়ে সূর্যতাপে গাছ থেকে সাথে সাথে ডাব পেড়ে খাইয়েছে। তাদের জন্য দুপুরে খাওয়ার আয়োজন করতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা থাকেনি। কাজ আছে বলে চলে গেছে। এই দু’জন লোককে বেশ প্রাণবন্ত লাগছিল, যদিও তাদের মাঝে একধরণের ক্লান্ত ভাব ছিল। চোখ দেখে মনে হতো, তারা এখনো ঘুমায়নি বা তাদের এখনো ঘুমোনোর সময় হয়নি। কাজ বোধ হয় এখনো বাকি রয়ে গেছে। একটা তাড়া ছিল তাদের মাঝে। সুমনের চোখে পড়েছিল, লম্বা লোকটির লুঙ্গিতে কোন সেলাই নেই। সে একটু পর পর তার সরে যাওয়া লুঙ্গির অংশটাকে সামনে নিয়ে আসছিলো। লোক দু’জনকে দেখে তার আরো মনে হয়েছিল, এদের ঘর নেই, বাড়ি নেই, দিন নেই রাত নেই। যখন যেখানে প্রয়োজন, তখন সেখানে ছুটে যাচ্ছে। বাড়ির এবং পাশের বাড়ির অন্য ছোটবড় ভাইদের সাথে সেও এই দুই মুক্তিযোদ্ধার সাথে হেঁটে বাড়ির সীমানা পর্যন্ত এসেছিল। তাদের কাঁধে সে বন্দুক দেখেছিলো। কিন্তু কারো মাঝে তেমন কোন ভয় দেখেনি এবং এমনকি সুমনের নিজের মাঝেও। কী যে সদর্পে লোক দু’টো হেঁটে যাচ্ছিল! কেমন এক সাহসী, শান্তি ভাব। ওইদিনটা অন্যদিনের চাইতে অন্যরকম ছিল।

একবার বাবা গ্রামে এলে সুমনরা তিনভাই মিলে বাবার সাথে জুমার নামাজ শেষে বাড়ি ফিরছিল। নূরালী সিদ্দিক চাচা বেশ ধার্মিক। জিন্নাহ্‌ টুপি পাঞ্জাবী-পাজামা সবসময় পরে থাকতেন। উনি নাকি শান্তি কমিটির মেম্বার ছিলেন। কথা বলাতে খুব চালু ছিলেন। বাবার ছোটকালের বন্ধু বলে বলছিলেন, “সাদেক দেইখো, এইসব জয় বাংলা, স্বাধীন বাংলা একদিন কোথায় চইলা যাইবো। শেষমেশ শুধু থাকবো, ইসলাম আর পাকিস্থান।” বাবার কাছ থেকে কোন উত্তর না পেয়ে বা ভাবান্তর না দেখে তিনি চীৎকার করে বলতে থাকেন, “আরে এগুলি তো হিন্দুদের চক্রান্ত, ইন্ডিয়ার ষড়যন্ত্র। আমাগো যদি ঈমান ঠিক থাকে, তবে ইনশাল্লাহ্‌ পাকিস্থানের কোন ক্ষতি কাফেররা করতে পারবো না।” বাবা সামনের দিকে মাথা নেড়ে সম্মতি দিতে দিতে দ্রুত সুমনদের নিয়ে বাড়ি ফেরেন।

যুদ্ধ শেষে দু’বছর বাদে সুমন তাদের গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যায়। লোকমুখে শুনে নূরালী সিদ্দিক চাচা বাবাকে ধরেছে তার ছেলে দাউদের জন্য রেলওয়েতে চাকরির ব্যবস্থা করার। বছরখানেক পর চাকরিতে প্রমোশনের পর বাবার বদলীর কারণে সুমনরা উত্তরবঙ্গের সৈয়দপুরে চলে আসে। এখানে প্রচুর অবাঙ্গালী আছে। ‘৭১-এ তারা পাকিস্থানের সমর্থনে ছিল। তাদের কিছু বাংলাদেশ রেলওয়েতে তখনও ছোট চাকরি করে। একদিন সুমন তার বাবার অফিসে গেলে রাজাকার দাউদকে দেখে। সে সৈয়দপুর রেলওয়েতে চাকরিতে যোগ দিতে এসেছে। লোকটাকে যুদ্ধের সময় সে মাথা নীচু করে থাকতে দেখেছে। এখন তার ঘাড়টাও সে সাথে নীচু হয়ে গেছে। তখনও যেমন সে কথা বলতো না, এখনো সে কথা বলে না, নিজের কাজ নিয়ে আছে। সুমনের ইচ্ছে হয়, একবার কি জিজ্ঞেস করবে, “আচ্ছা আপনি রাজাকার হয়েছিলেন কেন?” কিন্তু লোকটা কোনদিকেই তাকায় না। কাগজ হাতে এক অফিস থেকে আরেক অফিসে ছুটছে।

চাকরির প্রমোশন হওয়াতে বাবার কাজের পরিধি ও চাপও বেড়েছে অনেক। অনেক খাটতে হয় তাকে। একদিন খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। হাসপাতালে কাটাতে হয় বাবাকে কিছুদিন। এই সময় মা খুব অধৈর্য্য, উৎকন্ঠিত এবং অসহায় হয়ে পড়েছিলেন। বড় ভাইয়া যুদ্ধ শেষের বছর দুয়েক পর ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পড়ছে। সুমনরা বাকি তিনভাই। যুদ্ধের সময় মার ইচ্ছে ছিল সব ছেলেকে বন্দুক চালানোর ট্রেনিং দেবেন। তার ব্যবস্থা তিনি কোনদিনই করে উঠতে পারেন নি ঠিকই। কিন্তু বাবা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গেলে বলেছিলেন, “বড় ছেলে তো ডাক্তারি পড়লোই না, বাকি তিন ছেলের সবগুলিকে আমি ডাক্তার বানাবো।”

আর সবার ছোট বলে এই চাপটা সুমনের উপর বেশি পড়ছে। সেই যুদ্ধের বছরের মত তাকে জোর করে পড়তে বসানোটা মার এখনো চালু আছে।

শামান সাত্ত্বিক | মার্চ ০৬, ২০১২ | ০৪:৩২ বিভাগ: গল্প, মুক্তিযুদ্ধ

Advertisements

তথ্য কণিকা শামান সাত্ত্বিক
নিঃশব্দের মাঝে গড়ে উঠা শব্দে ডুবি ধ্যাণ মৌণতায়।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: