উদ্বাস্তু সময় – ৬

উদ্বাস্তু সময় – ৫

সারাটা দিন একটা প্রচ্ছন্ন বেদনাতে কুঁকড়ে থেকেছে মালেকিন সন্ধ্যা হলে তারা অনেক ফুল সংগ্রহ করে রাখে। তাদের কেউ কেউ সেই ফুলে মালা গাঁথে। গাঁদা, ডালিয়া, কসমস, চন্দ্র মল্লিকা, জিনিয়া, মোরগ ফুল। সে সাথে আছে টগর, জবা। কেউ কেউ আবার ভোরে আসতে গোলাপ, রজনীগন্ধা নিয়ে আসবে। মালেকিন মুঠোভরে ফুলের গন্ধ নেয়। ফুলগুলো তার ভেতরের রক্তে উন্মাতাল অনুভূতি আনে। তার আত্মাকে এই ফুলের সাথে মিশিয়ে নেয়। প্রাণে স্পন্দন খেলে তার। এই যে, তিনটা মিনার দাঁড়িয়ে আছে, তাদের নত মাথা উঁচু করে। এ কি শুধু অর্থহীন দাঁড়িয়ে থাকা? এ কি এক সাগর আবেগকে ধরে রাখা নয়? এ কি শহীদানের স্মরণ নয়? এ কি শহীদানের আত্মদানের সাথে আমাদের আত্মিক যোগাযোগ নয়? এই মিনারের দিকে তাকিয়ে দাঁড়ালে আমাদের অস্তিত্ব ও চেতনা শাণিত হয়ে উঠে না? দেশ মাতৃকা কি প্রাণে এসে বসে না? আর এমন কী বা করণীয় আছে; যার কারণে দেশমাতৃকার চেতনা ও বোধ তীব্র হয়ে ফুটে উঠতে পারে।

খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে পড়ে মালেকিন। তখনও আজান দেয়নি। পাখিও ডাকেনি। পাখির ডাক মালেকিনের খুব পছন্দ। আজও সে তার শ্রুতিতে পাখির গান চায়। তার প্রাণে যে শোকাবহ আবেগ তৈরী হয়েছে, আছে তাতে দেশ প্রেমের উন্মাদনা। নিরবিচ্ছিন্ন পাখির কলতান তার খুব প্রয়োজন। তা না হলে এক অসামজ্ঞস্য প্রকৃতির ভারসাম্যহীনতা তাকে আরো অস্থির বিচলিত করে তুলবে।

কিছুক্ষণ পর পাখির ডাক শুরু হয়ে যায়। মুয়াজ্জীনের আজান ভেসে আসে দক্ষিণের মসজিদ থেকে। প্রাতঃক্রিয়াদি সম্পন্ন করে মালেকিন নিজেকে আরো শুদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করে। ফুপার শহর থেকে নিয়ে আসা মেরুনরঙের নতুন পাজ্ঞাবীটা শরীরে চাপায়। পাজ্ঞাবীর উপর সূতার নক্‌শা করা কাজ তার ভাল লাগে। এই নক্‌শা যে বাঙ্গালীর নিজস্ব পরিচিত। বাইরে এখনো আঁধার, ফর্সা হয়ে উঠেনি। বাঁশের বেড়ার জানালা দিয়ে যে আলো আসছে, তাতে নিজেকে তেমন দেখা না গেলেও, বাবা-মা-দের সময় থেকে ঘরে বাঁশের দেয়ালে ঠেস দিয়ে থাকা লম্বা আয়নায় নিজেকে সে আপাদ-মস্তক দেখে একবার। সাথে সাথে আবেগ এসে ভর করে মালেকিনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে।

হাঁ, বুইব্বাই তো। তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে এখন। আর মিটিমিটি মিষ্টি হাসছে। মালেকিন আয়নার ভেতর দিয়ে তা পরিষ্কার দেখছে। কখনো নতুন কোন শাড়ী পরলে নিজেকে আপাদমস্তক অনেকক্ষণ খুঁটে খুঁটে এই আয়নায় দেখতো বুইব্বা। আবার মাঝে মাঝে আলমিরা থেকে ভাঁজ করা মায়ের শাড়ী পরে নিজেকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতো। মালেকিন তখন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতো। সে সময় পেছনে আয়নায় মালেকিনকে দেখা গেলে, সে আয়নার দিকে তাকিয়ে বুইব্বা ভেংচি কাটতো। ঘুরে ঘুরে যখন নিজেকে দেখতো আয়নায়, তখন মালেকিনের এইরুপ তাকিয়ে থাকা দেখে বলতো, “কিরে শাড়ী পইড়বি? ঠোঁটে লাল লিপিস্টিক লাগাইবি? চোখে কালা কাজল?” মালেকিন মাথা কাৎ করে চোখে মুখে গোস্বাভাব দেখাতো। তখন বুইব্বা বলতো, “তোরে যা সোন্দর লাগবো না, এইরকম সাজাইলে।” তারপর হি হি করে হেসে উঠতো। ওই অবস্থায় মালেকিনের আর দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হতো না। অভিমানে রাগে দ্রুত সে কক্ষ ছেড়ে পাশের কক্ষে চলে যেতো।

মালেকিন দ্রুত পেছনে তাকায়। ফাঁকা ঘরে ওপাশের জানালা দিয়ে মৃদু আলো আসতে চায়। ঘর এখনো অন্ধকার। কেউ নেই। মালেকিনের চিন্তার তাল কেটে যায়। নতুন চিন্তা এসে ভর করে।

মানুষ মরে গেলে তাকে কোথাও পাওয়া যায় না। আর কোথাও! বাবা-ভাই মারা গেলেও সে প্রথম এত টের পায়নি। ধীরে ধীরে বুকের কোথাও যেন ব্যথার ক্ষরণ থেকে থেকে শুরু হয়েছিল ঠিকই। মা-কে দেখে ঠিকই বুঝতো, কেন ব্যথাটা হচ্ছে তারও। কিন্তু বুইব্বা চলে যাবার পর, সবকিছু তার কাছে শূন্য ফাঁকা মনে হয়। বাবা-ভাই-বুইব্বা, কোথায় যেন তার মাঝে এক নিখাদ শূন্যতা সৃষ্টি করে। মাকে দেখলে সে শূন্যতার একটা পরিমাপ করা চলে। কিন্তু তার তল যে ছুঁইতে পারে না মালেকিন।

মালেকিন আরো ভাবে, মৃত মানুষটা তো হারিয়ে যায়। এই মাটির পৃথিবীতে তার কোন অস্তিত্বই নেই। তাকে মনে রাখে আর কে? শুধু তারাই বাধ্য হয় মনে রাখতে, যাদের সাথে ছিল বা আছে তার নাড়ীর যোগাযোগ। তারা শত চেষ্টা করেও তাকে ভুলতে পারে না, যেহেতু সে মিশে থাকে জীবিত মানুষটার সত্ত্বায়। এভাবে যে যত মিশে থাকতে পারে, জীবিত মানুষের সত্ত্বায়, সে মৃত মানুষকে ভুলে থাকা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আর মা বোধ হয়, সে এক কঠিন পাথরের বোঝা মাথায় বয়ে বেড়ায়, আজও দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। মালেকিনের মনে হয়, গ্রামের মানুষেরই বা কেন এত দায় হবে, তার বাবা-ভাই-বুইব্বাকে মনে রাখার। এই দায়, একান্তই তাদের পরিবারেরই। এইজন্যই কি সে এত বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস বা ভাষা শহীদ দিবস পালন করে আসছে? একটা চিন্তা সেই মূহুর্তে মালেকিনকে ধাক্কা দেয়। স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসের সাথে না হয়, তার বাবা-ভাই-বুইব্বা ওতপ্রোতভাবে জড়িত আছে, কিন্ত ভাষা শহীদ দিবসের সাথে তো তাদের শহীদানের কোন সম্পর্কে নেই। তবুও এত আবেগ, এত বোধের তীব্রতা তাকে গ্রাস করে কেন এই দিনটি পালনের? তার চিন্তা কিছুক্ষণ থমকে যায়। সে কি তাহলে আজ ঘরে বসে থাকবে প্রভাত ফেরী বাদ দিয়ে?
‘ভাইজান’!’ ‘ভাইজান’!’
কে মোত্তালিব না? এমন হেঁড়ে গলায় চিৎকার করছে কেন? মালেকিনের চিন্তার জাল ছিন্ন হয়।
‘ভাইজান!’ আবারও আগের চাইতে উঁচু গলায় চীৎকার করে। ফুপার গলার আওয়াজ শোনা যায়। পাশের ভিটার ঘরের দরজা খোলার শব্দ আসে। মালেকিন ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।

এরই মধ্যে ৪/৫ জন গ্রামের ছেলে মালেকিনদের উঠানে ফুলের তোড়া ও মালা হাতে জড়ো হয়েছে। তারা মোত্তালিবের চিৎকার শুনে তার কাছে এগিয়ে গেছে। মালেকিন উৎসুক কৌতূহল নিয়ে মোত্তালিবের কাছে এসে দাঁড়ায়। মোত্তালিবদের বাড়ি স্কুলের দক্ষিণে। মালেকিনদের শহীদ স্মৃতি সংঘের সে এক নিবেদিত প্রাণ কর্মী। যে কোন অনুষ্ঠানের ভাল-মন্দ দিকগুলো সবার আগে, তার নজরে আসে। আর সে কারণে, সে সব অনুষ্ঠানের মধ্যমণি হয়ে উপস্থিত হয়। মালেকিন জানে, গত দু’বছরের একুশে শোভাযাত্রায় সে ছিল সামনের সারিতে মধ্যস্থলে। একপাশে মালেকিন নিজে, অন্য পাশে মোত্তালিব মিলে শহীদ মিনারে পুষ্প স্তবক অর্পণ করে। আজও যে ব্যত্যয় হবে না, এমনি সে আশা করে। কিন্তু মোত্তালিবের মানসিক অবস্থা দেখে সে কিছুই আঁচ করতে পারে না। সে শুধু চোখ দু’টো বড় করে কী যেন বলতে চাইছে। এই দেখে মালেকিন তাকে তড়িৎ জিজ্ঞেস করে, “কিরে কি অইছে?”
– “ভাইজান।”
– “হাঁ, কি অইছে ক!” মোত্তালিব কিছু বলতে যেয়ে থেমে যায় বলে মালেকিন সাথে সাথে বলে উঠে।
-“ভাই-জান…” মোত্তালিব তার কথা শেষ করতে পারছে না, অথচ সব চোখ তার উপর। এদিকে পারুল, বকুল, শিমুল পাশের বাড়ির তিন বোন এসে গেছে। ১২, ১০, ৭ তাদের বয়স। তারা প্রভাতফেরীতে গান ধরবে। “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো…”/ তাদেরকে অনুসরণ করে অন্যরা গান তুলবে গলায়। তিন বোন গান শিখে নিয়মিত। শহীদ স্মৃতি সংঘের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের প্রাণবিন্দু যেন।

কেমন যেন মনে হচ্ছে মোত্তালিবকে। কিছু বলে ফেললে সে আজকে, সব আয়োজন যেন এখানেই শেষ হয়ে যাবে। এমন একটা ভয় বা ধাক্কা তার মধ্যে কাজ করছে কি? সেই তো সবাইকে সবকিছুকে জড় করে সব অনুষ্ঠানে। তাহলে আজ তার কি হলো?

– “ক’ না, কী কইতে চাস, ক্‌। কিছুটা অসহিষ্ণু হয়ে, আবার কিছুটা সহানুভূতির স্বরেই বলে মালেকিন।
“ভাইজান, ভাইজান, ভাইঙ্গা ফেলাইছে।” থেমে থেমে এতটুকু বলে মোত্তালিব।
“কি ভাঙ্গছে?” এবারে মালেকিন কিছুটা তটস্থ হয়।
“সব ভাইঙ্গা ফেলাইছে। শহীদ মিনার।” মোত্তালিব সত্যি সত্যি কেঁদে ফেলে।

মালেকিন ভিটের বেড়ার পাশে সামান্য ভিটে জায়গাতে বসে পড়ে। একটু পরে মাথা দু’হাতে চেপে ধরে। কিছুই বুঝছে না সে। নিয়মিত পেপার পড়ে বলে, এইসব দু’একটা ঘটনা চোখে পড়েছে তার। কিন্তু আজ তাদের বাড়ির পাশে, তাদের জমি দান করা স্কুলে এমন ঘটনা ঘটবে, এটা ছিল তার ভাবনা-চিন্তার বাইরে। সে চুপ করে বসে থাকে অনেকক্ষণ। অন্যদের মাঝে এরই মধ্যে খানিক স্পন্দন কি আলোড়ন তৈরি হয়েছে। তাহলে আজ কি প্রভাত ফেরী হবে না? তারা কি মিনারে ফুল দেবে না? আলোও ফুটে উঠেছে কিছুটা। এখন তো বসে থাকা না। হয় যেতে হবে শহীদ মিনারে, নয়তো বাসায় ফিরতে হবে।

মালেকিন উঠে দাঁড়ায়। তীব্র একটা অবস্থার মুখোমুখি দাঁড়ায়। এর কোন প্রস্তুতি ছিল না তার। আজ তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কি প্রভাত ফেরি নিয়ে এগিয়ে যাবে শহীদ মিনারে, হাহ্‌ ভাঙ্গা শহীদ মিনারে? না কি যার যার কুলায় ফিরবে ব্যর্থতা পূঁজি করে। এগিয়ে যাওয়া কষ্টের হলেও শহীদানের কষ্টকে কি উপলব্ধি করাবে তাদের? না কি ঘরে বসে থেকে তারা ভাববে, ভেবে নেবে, কি করণীয় হতে পারে আগামীর জন্য। কিন্তু এই যে একদল শিশু-কিশোর তারুণ্যের জোয়ারের দিকে এগিয়ে যেতে আজ এই ঊষাগ্রে এসে উপস্থিত হয়েছে, তাদের এই নিষ্পাপ আগমন ও স্পন্দনকে কি এ মূহুর্তে সে থামিয়ে দেবে। অপেক্ষা করবে, কোন এক স্বর্ণালী ঊষার আগমন। কিন্তু ঘরে বসে থেকে কি সবটুকু আদায় সম্ভব? এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় তো প্রকাশ হওয়া উচিত। ঘরে বসে আর যা হোক ঐক্য কতটুকু তৈরি হতে পারে? এর জন্য প্রয়োজন উদ্যোগী হওয়া, নিজের ভাবনা-চিন্তাকে বাস্তবতার সাথে আরো নিবিড় করে তোলা। না হলে অগ্রগতি কি নিশ্চিত হবে? এত কিছু এই বয়সে বুঝে উঠবে কি করে? ফুপু বলে প্রায়, ‘তোর মন কি কয় তা শোন্‌। সেভাবে কাজ কর। হুট-হাট হুজুগের মত কিছু করিস্‌ না। তাইলে পরে পস্তাবি।’ কিন্তু এই মূহুর্তে কোন্‌ সিদ্ধান্ত নিয়ে সে আগাবে? এটা তো হুট-হাট তার উপলব্ধিতে আসা উচিত। নতুবা আজকের সবকিছু পন্ড হয়ে যায় যে! এক পা পিছিয়ে পড়ে, দু’পা এগিয়ে যাও। ইংরেজি স্যারকে বলতে শুনেছে মালেকিন, যখন তাদের বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান ঠিক জায়গায় ঠিক সময়ে করতে পারেনি।

এখন সে বুঝে উঠতে পারে না, কোথায় পিছাবে আর কোথায় আগাবে? এখন একটাই সিদ্ধান্ত, তারা কি প্রভাত ফেরি করবে, না কি ঘরে ফিরবে। সাত বছরের ছোট্ট শিমুল এগিয়ে এসে মালেকিনের হাত ধরে টান দেয়, “যাইবা না ভাইজান? ফুলগুলি তো শুকায় যাবে। তাড়াতাড়ি চলো।” আর কিছু ভেবে উঠতে পারে না মালেকিন। শিমুলের মৃদুভাষী আলতো কথার সুমিষ্ট স্রোতস্বিনী তার মধ্যে তড়িৎ উজান হাওয়া বইয়ে দেয়। সে বলে উঠে, “চলো সব। মিনার যেমনই থাক, আমরা ফুল দিবো।” সবার মধ্যে ক্ষুদ্র একটা সাড়া পড়ে। সব মিলে এতক্ষণে ১২/১৪ জনে এসে দাঁড়িয়েছে। মোত্তালিব চোখ দু’টো বড় হয়ে উঠে। তাকে দেখে মনে হয়েছিল, সব শেষ হয়ে গেছে। তার হাতে ফুলের স্তবক ভিটের কাছে দাঁড়া করানো ছিল। সেটাও একসময় মাটিতে গড়িয়ে গিয়েছিল। মোত্তালিব তা মাটি থেকে হাতে তুলে নেয়। ডান হাতে সে পুষ্পস্তবকের এক পাশ ধরলে, বাম হাতে মালেকিন পুষ্পস্তবকের আরেক পাশ ধরে। তাদের পিছনে দাঁড়িয়ে তিনবোন গাইতে শুরু করে, “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি …”/ অন্যেরা পাশে পেছনে দাঁড়িয়ে সুর মেলায়। সে সাথে মোত্তালিব, মালেকিনও।

শামান সাত্ত্বিক | জানুয়ারি ০৬, ২০১২ | ১১:৫৩ বিভাগ: গল্প, মুক্তিযুদ্ধ | ট্যাগ: টীনএজ গল্প

Advertisements
%d bloggers like this: