উদ্বাস্তু সময় – ৪

উদ্বাস্তু সময় – ৩

স্কুলের পেছনদিকে তাদের বাড়ির বাইরের বড় পুকুর। পাশের বাড়ির লোকেরাও এখানে আসে গোসল সারতে। পুকুরের পূর্বপাশের উঁচু পাড়ে তাদের পরিবারিক কবর। কবরের পাশে পুকুর পাড়ে বিরাট শিমুল গাছটার নীচে এক প্রশস্ত জায়গা। মালেকিন সে গাছটার নীচে বসে। বাবা, ভাইজান, বুইব্বার কথা ভাবে। সামনের কবরে বাবা ভাইজান আছে। আর বুইব্বা? নিজের ভেতরে কেমন এক গোস্বা চাপে তার। এরা তিনজনই জড়িয়ে আছে তার অস্তিত্বের সাথে। আর সে নিজে কি না গ্রামের সবার কাছে তাদের স্মরণ করিয়ে দিতে পারছে না। তাদের নিজের অস্তিত্ব কেমন কেমন কেঁপে উঠে। ভেতরটা হু হু করে উঠে। সে উঠে দ্রুত বাড়িতে ফুপুর কাছে যায়। ফুপুকে জড়িয়ে ধরে তার কোলে মুখ লুকিয়ে অঝোরে কেঁদে উঠে। তারপর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, যে করেই হোক, অন্য বারের মত সে স্কুল চত্বরে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান করবে। অথচ তার হাতে সময় মাত্র চারদিন। ফুপু শুনে এবারে এ অনুষ্ঠান বাদ দিতে বলে। সেই সাথে উপদেশও দেয়। “মনে রাইখ্যো, পড়াশুনা কইরা বড় কিছু না হইতে পারলে, এখন তুমি যা করছো, একসময় তাও করতে পারবা না।” মালেকিনের তা হৃদয়ঙ্গম হয় না। সে উঠে পড়ে লাগে তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে।

কিন্তু ১৬ ডিসেম্বরের সকাল হতে না হতেই অন্য ঘটনা এসে দাঁড়ায়। রাত জেগে অনুষ্ঠানের কাজ করাতে আজ একটু দেরীতে ঘুম থেকে উঠে সে। ঘুম থেকে উঠতে না উঠতেই মালেকিন খবর পায়, সাংস্কৃতিক সংঘের ছেলেরা এবারে বিজয় দিবস উদযাপন করতে স্কুল চত্ত্বরে সাজ গোছ শুরু করেছে। ভীষন আশ্চর্য হয় সে। বছর দু’য়েক আগে সাংস্কৃতিক সংঘ যখন কাজ শুরু করে, তখন একসাথে বিজয় দিবস পালনের জন্য তাদের স্কুল চত্ত্বরের আয়োজনের সাথে সম্পৃক্ত হতে বলে। অথচ তখন তারা বলেছিল, তারা স্কুলের প্রোগ্রামের সাথে নেই। নিজেরা নিজেদের মতো করে করবে। দু’গ্রামের অর্থসম্পন্ন দু’চার পরিবারের সন্তান মিলে এই অনুষ্ঠান শুরু করেছে। তাদের সদস্য সংখ্যা এখন অনেক। কিন্তু আজ বলা নেই, কথা নেই অনুষ্ঠান করতে স্কুল চত্ত্বরে এসে উপস্থিত হয়েছে। ভারী বিরক্ত হয় মালেকিন। নাস্তা না সেরেই বাড়ি থেকে ঝড়ের গতিতে মিনিট খানেকে পৌঁছে যায় স্কুলে। বেশ তর্কাতর্কি হয় সেখানে। কিন্তু মীমাংসার কোন পথই খোলা পায় না। সাংস্কৃতিক সংঘ জানায়, তারা স্কুলের হেড স্যারের পারমিশান নিয়েছে। আবেদনের কাগজে তার সীলসহ দস্তখত দেখায়। আর এ অনুমতি যে স্যারের বাসায় গিয়ে নেয়া, তা ছেলেদের কথাবার্তায় বেরিয়ে আসে, যদিও সিগনেচারে তারিখ তিনদিন আগের ডিসেম্বরের ১৩ তারিখ, স্কুল খোলা দিনে। মালেকিন কিছু বুঝে না। তার মাথা ঘুরতে থাকে। স্বাধীনতার পর পরই সে এই স্কুল চত্ত্বরে অনুষ্ঠান করে এসেছে। আজ সে এখানেই হচ্ছে পরবাসী। সমস্যা সমাধানে তাকে কিনা সকাল সকাল অনুষ্ঠান শেষ করে ফেলার কথা বলে তারা। আর বিকেল থেকে সন্ধ্যা অবধি এ স্কুল প্রাঙ্গনে সাংস্কৃতিক সংঘ অনুষ্ঠান করবে, যা কিনা মালেকিনদের এতো বছর ধরে গড়ে তোলা নিজস্ব ঐতিহ্য। প্রচন্ড ক্রোধে মালেকিন ফেটে পড়ে। সে মূহুর্তে সাংস্কৃতিক সংঘের অনুষ্ঠানের মাইকিং শুনে স্কুলের কাঁচা রাস্তার উল্টোদিকের বাড়ি থেকে ইংরেজি স্যার এসে উপস্থিত হয়। তিনি মালেকিনকে স্হির, শান্ত হতে বলেন। শেষে উত্তেজিত মালেকিনকে স্কুলের একপাশে নিয়ে গিয়ে বলেন, “তোমার এখন ঝগড়া করে কোন লাভ নাই। তারা জেনেশুনে গোপনে পরিকল্পনা করে এই অনুষ্ঠান করতে এসেছে। তোমার কথায় তো আর তারা তাদের অনুষ্ঠান এখান থেকে সরাবে না। তুমি এক কাজ করো। আগামীকাল স্কুল শেষে যেমন করে পারো তোমাদের অনুষ্ঠানটা করো। আমি তো তোমাদের রিহার্সেল দেখছি। আরেকটু রিহার্সেল করতে যদি পারো তোমাদের অনুষ্ঠানটা আরেকটু ভাল হবে। আজ এতো দমি গেলে কি হয়? কাল তো আছে।” মালেকিন স্যারের কথায় কিছুটা স্থিত হতে চায়। সেও জানে, এ ছাড়া আর কোন উপায় বের করা কষ্টকর। শুধু বলে, “কিন্তু দেখলেন তো স্যার……..।” স্যার তাকে কথা বাড়াতে দেয় না। শুধু বলেন, “আমি জানি।”

মালেকিনদের অনুষ্ঠান শেষ হলো আজ দু’দিন। কিন্তু এখনও সে পড়াশুনায় পুরো মনোযোগ দিতে পারছে না। এদিকে ফুপুর চাপ ভালভাবে পড়াশুনা চালিয়ে যাবার। তিনি একদমই পছন্দ করেননি মালেকিনের এবারের এই ঝামেলার সাথে জড়িয়ে পড়ার। শুধু বলেন, “দেখো বাবা, আমারও বয়স হইছে। তোমারে বিয়া করাইয়া ঘরে বউ আনতে চাই। আর তো আমি এতকিছু দেখাশুনা করতে পারি না। তোমার ফুপার তো ব্য়স বাড়তেছে। আর তোমার মায়ের অবস্থা তো নিজের চোখে দেখতেছো। আজকাল তো ঔষুধ-টষুধ খেতে চায় না। কয়দিন যে আর বাঁচে সে খোদায় জানে। তোমাদের আর কি বলবো, তোমার চাচা……….।” কথা শেষ না করে ফুপু বলেন, “আর কতদিন যে, তোমার ফুপারে ঢাকায় যেতে হবে, তা আল্লায় মালুম।” মালেকিন একটু থমকে যায়। ফুপুকে জিজ্ঞেস করে, “চাচার কথা কি বললেন?” “কিছু না বাবা। সবকিছুই তুমি জানবে, সময় হলে। তোমাকেও তোমার ফুপার সাথে একসময় ঢাকা যেতে হবে। সে তো আজকাল চোখে ভাল দেখে না।” ফুপুর এই কথার কোন অর্থ মালেকিন বুঝে উঠতে পারে না। গ্রামে কেউ কেউ বলে, তার একমাত্র চাচা যুদ্ধে মারা গেছে। আবার চাচার সাথে যুদ্ধে যাওয়া বশীর চাচা বলেছেন, অন্য কথা। একবার নাকি নিজেদের ক্যাম্প ছেড়ে কাউকে কিছু না বলে রাতের আঁধারে চাচা বেরিয়ে পড়েন। তখন এখানকার কয়েক গ্রাম পাকিস্থানীদের নিয়ন্ত্রণে। শোনা যায়, গ্রামভিমুখী আসতে গিয়ে পাকিস্থানীদের সাথে তার একক সংঘর্ষ হয় এবং ফলশ্রুতিতে তিনি ধরা পড়েন। শেষে একদিন রাতের আঁধারে পালাতে গিয়ে ভীষন গুলিবিদ্ধ হন। এরপর চাচা বেঁচে ছিলেন কি না কেউ জানে না। গ্রামের বশীর চাচা বলেছেন, এসব কথা মুক্তিযুদ্ধের সময় এক সোর্সের মুখে শোনা। এ ব্যাপারে যুদ্ধ শেষে কেউ তাকে কোন খবর দিতে পারে নি। ফুপা ঢাকা যায় বছরে দু’চারবার। মালেকিন জানে। ঢাকার ফুপার কোন এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের সাথে ব্যবসা-পাতির ব্যাপার আছে বলে গ্রামের মানুষের মত মালেকিনও জানে। কিন্তু সে ব্যবসার কোন কূল কিনারা সম্পর্কে কেউ জানে না। মালেকিন শুধু দেখে, ফুপা ঢাকা যাবার সময় ফুপু পিঠা-নারিকেল নাড়ু, মুড়ি-মোয়া, দু’চারটা ডাব মিলে একটা বড় পোটলা তৈরি করে ফুপাকে দেয়। প্রতিবার ঢাকা থেকে ফিরে এলে ফুপাকে খুব বিমর্ষ দেখায়। ফুপু-ফুপা কয়েকটা দিন কেমন গম্ভীর কাটায়। মালেকিন তখন তাদের আশপাশে ঘুরে বেড়ালেও কোন কিছু প্রশ্ন করার সাহস পায় না। মানুষের শোকের সময়ে প্রশ্ন করতে নেই। এইসব এখন গা সওয়া হয়ে গেছে মালেকিনের। তবে গ্রামের মানুষ সময়ে সময়ে ফুপার কাছে ব্যবসা কেমন হয়েছে জানতে চাইলে, ফুপা শুধু উত্তর দিতো, ভাল না। ‘কি ব্যবসা করো’, ‘কখন ব্যবসা ভাল হবে’, এসব প্রশ্ন করলে ফুপা শুধু বলতেন, ‘ব্যবসা ভাল হইলে তো জানবাই।’ আর কিছু না বলে কেটে পড়তো। তাতে করে গ্রামের মানুষের আরো সন্দেহ জাগতো, ‘নিশ্চয় বড় কোন ব্যবসা আছে, টাকা জমাচ্ছে বছর বছর। নতুবা তাদের জানায় না কেন?’ মালেকিনের এসবে কান দেবার ইচ্ছা নেই। ভাল কিছু হলে তো তাদের জন্যও ভাল। সে এ ব্যাপারে ফুপা-ফুপুকে ঘাটতে যেতো না।

বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান নিয়ে যে সংঘর্ষ বাধে, তা তাকে একেবারেই স্বস্থি দিচ্ছে না। আগের হেড স্যারের কথাগুলো কানে বাজে। ইংরেজী স্যারও নাকি বিষয়গুলো জানে, বুঝে। সে-তো বুঝে না। খুব দ্রুতই সবকিছুই পাল্টাতে শুরু করেছে। সামনের ফেব্রুয়ারীতে ইলেকশান। সবাই যেন কেমন দলাদলিতে নেমে যাচ্ছে। সবকিছু কেমন ছাড়া ছাড়া বিষণ্ণ বিষণ্ণ। মালেকিনের মনে হয়, তারই যেন ঝাঁজ এসে পড়েছে তাদের এই স্কুলেও। মানুষগুলো এমন দ্রুত পাল্টাতে পারে? স্বাধীনতা যুদ্ধে শত্রুর সাথে লড়তে নিজেদের পাল্টানো। সে পাল্টানোতে কোন দোষ বা অস্বাভাবিক কিছু দেখে না মালেকিন। কিন্তু এখন তো নিজেরা নিজেদের বিরুদ্ধে-ই পাল্টাচ্ছি আমরা। বিজয় দিবসে তাকে স্কুল চত্ত্বরে অনুষ্ঠান করতে না দেয়া তো তারই প্রমাণ। তাহলে তাকেও কি কোন এক দলভুক্ত হতে হবে। সামনে পরীক্ষা। এত কিছু সে ভাবতে পারে না। সাংস্কৃতিক সংঘের অনুষ্ঠান কুরআন তেলাওয়াত দিয়ে শুরু হয়েছে। এ নিয়ে মালেকিনরা কখনো ভাবে নি। জাতীয় সংগীত দিয়ে তারা করতো অনুষ্ঠান শুরু। কিন্তু এ কি? বরাবরের মতই সিনেমার প্রেমের গান বিজয়ের অনুষ্ঠানে মিশে গেছে। কেউ একজন গানের তালে নাচলো, ‘যে জন প্রেমের ভাব জানে না, তার সাথে নাই লেনা-দেনা’, আবার কেউ একজন গাইলো, ‘দমাদম মাস ক্যালেন্ডার, আলী কা পয়লা নম্বর।’ বাড়িতে বসে যতদূর পারে রিহার্সাল করতে করতে মালেকিনরা লাউড স্পীকারে সেসব শুনতে থাকে। মুচকি মুচকি হাসে কেউ কেউ। মালেকিন কোন রকমে রিহার্সেল শেষ করে। এইসব সাত-পাঁচ ভেবে ভেবে মালেকিনের পরীক্ষা প্রস্তুতি আগায় না। কিছু একটা করার জন্য সে ছটফট করে। কিন্তু বেশি কিছু করা যে তার জন্য সম্ভব হচ্ছে না। রাজনীতির কেমন এক দুর্গন্ধ মালেকিনের নাকে এসে লাগে। এক অদৃশ্য চক্রান্তে মানুষগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব সংঘাত শুরু হয়ে গেছে। এই দ্বন্দ্বের মাঝে পড়ে অনেক কষ্টে নিজেকে সামলিয়ে নেয় মালেকিন। ইংরেজীর স্যারের কড়া নির্দেশই বলতে হয়, “আর যা করো, টেস্টে যে রেজাল্ট করবে, ফলাফল তার থেকে নীচে যেন না হয় বোর্ডের পরীক্ষায়।” স্যারের পরম আত্মীয়ের মত আন্তরিক আচরণে চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে মালেকিনের। সে কি পারবে স্যারের কথা রাখতে? যে করেই হোক স্যারের উপদেশ তাকে মেনে চলতেই হবে।

শামান সাত্ত্বিক | ডিসেম্বর ২১, ২০১১ | ১০:৫৭ বিভাগ: গল্প, মুক্তিযুদ্ধ | ট্যাগ: টীনএজ গল্প

উদ্বাস্তু সময় – ৫

Advertisements

তথ্য কণিকা শামান সাত্ত্বিক
নিঃশব্দের মাঝে গড়ে উঠা শব্দে ডুবি ধ্যাণ মৌণতায়।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: