উদ্বাস্তু সময় – ৩

উদ্বাস্তু সময় – ১
উদ্বাস্তু সময় – ২

কিন্তু যেন হঠাৎ করেই সব পাল্টে গেল। স্কুলে আর শহীদ দিবস, স্বাধীনতা দিবস বা বিজয় দিবস আগের মত উদযাপিত হয় না। বরং লাউড স্পীকারে রেকর্ডকৃত সিনেমার গানই বেশি বাজে। স্কুলের ছেলে-মেয়েদেরও সে গানের প্রতি অন্য এক রকমের আকর্ষণ। কে কার চেয়ে এসকল গান ভাল গায় এ নিয়েও চলতো এক ধরণের দ্বন্দ্ব। এরি মাঝে মাঝে দু’চারটা মুক্তিযুদ্ধের গান শোনা যেত না, তা অবশ্য নয়। কিন্তু স্বাধীনতার গান গাওয়ার মত আবেগ বা উৎসাহ স্কুলের ছেলেমেয়েদের মাঝে তেমন খুঁজে পাওয়া যেত না। এটাই ভেতরে ভেতরে ক্ষুব্ধ করে তুলতো মালেকিনকে। যতই সে উপরের শ্রেণীতে উঠতো, ততই সে এই জাতীয় দিবসগুলো পালনে স্বক্রিয় হতো। শিক্ষকদেরও এই দিবসগুলো পালনে ধীরে ধীরে উদ্যম হারিয়ে ফেলাটা সে দেখতে থাকে। অনুষ্ঠানের জন্য সাহায্য পেতে চাইলে, কেউ কেউ বিরক্তি দেখাতো। সবাই জানি কেন স্বাধীনতা, শহীদদের প্রতি তাদের দায় বা দায়িত্ব হারিয়ে যেতে বসলো। মালেকিন ভাবতো, তাহলে কি দেশের প্রতি আমরা আমদের আনুগত্য বিসর্জন দিচ্ছি? যে স্বাধীনতার জন্য সে তার পরিবারকে হারিয়েছে, আজ যদি সে স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে উঠে তবে সে কোথায় তার বিচ্ছেদ-বেদনার স্বান্তনা খুঁজে নেবে। কোথাই বা তার মানসিক প্রশস্তি খুঁজে পাবে। এক ধরণের অস্থিরতা মালেকিনকে তাড়া করতে শুরু করে।

একমাত্র স্কুলের হেডস্যারকেই সে অন্যরকম দেখেছে। যখনই সে স্যারের চোখাচোখি হয়েছে, স্যার তাকে তার কুশল জিজ্ঞেস করেছে। পড়াশুনার ব্যাপারে উৎসাহ যুগিয়েছে। হেডস্যারকে দেখলে ভাইজানের কথা মনে হয়েছে তার খুব। ভাইজান হয় ডাক্তার নয় ব্যারিষ্টার হতো। কিন্তু সে কি তার কোনটা হয়ে উঠতে পারবে? নিজের মাঝে সে বিশ্বাসের প্রচন্ডতার একটা সংকট চলতে থাকে। যতই উপর শ্রেণীতে সে উঠছে, ততই সে ভেতরে ভেতরে টের পাচ্ছে – একাগ্র বা পুরো মনোযোগী হতে না পারলে, তার বেশিদূর পড়াশুনা এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। ভাইজানকে নিয়ে বাবার ইচ্ছার কথাও তার মনে পড়ে। মালেকিন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, যাই হোক না কেন, সে প্রাণপণে তার পড়াশুনা ভালভাবে চালিয়ে নিয়ে যাবে।

স্কুলের হেডস্যার মালেকিনের পড়াশুনায় একাগ্রতা দেখে বেশ খুশি হয়। মালেকিন এস. এস. সি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হতে থাকে। আর মাস দুয়েক পরই তার টেস্ট পরীক্ষা। এমন সময় সে খবর পায়, স্কুলের হেডস্যার বদলি হয়ে যাচ্ছেন। মালেকিনের মনটা কেমন যেন ছ্যাঁৎ করে উঠে। বাড়িতে এক ফুপু আর স্কুলে হেডস্যারই তাকে পড়াশুনায় উৎসাহ যোগাতো। সে কেমন মর্মাহত হয়। একবার মনে করে হেডস্যারের সাথে দেখা করে আসে। কিন্তু স্যারের মুখ দিয়ে তার চলে যাবার কথা শোনার মত তার মনের অবস্থা নেই। হেডস্যারের জন্য ফেয়ারওয়েলের আয়োজন দ্রুত হয়। তিনি নিজেই না-কি বদলীর খবরের পর স্কুল ত্যাগে দেরি করতে চান নি। পরীক্ষার প্রস্তুতির আগে এ মন খারাপ করা ঘটনার জন্য মালেকিন তৈরি ছিল না। প্রায় সপ্তাহ তিনেক পর তার টেস্ট পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। আজ স্যারের ফেয়ারওয়েল। দু’দিন পরেই নতুন হেড স্যার এসে যাবেন। নতুন স্কুল কমিটি হওয়ার সাথে সাথে হেড স্যারের বদলিও হয়ে গেছে। কেমন জানি লাগে মালেকিনের। সে স্কুলের বড় রুমের বাইরে বারান্দায় জানলার পাশে দাঁড়িয়ে বিরস মনে হেড স্যারের ফেয়ারওয়েল অনুষ্ঠান পর্যবেক্ষণ করে। ফেয়ারওয়েল শেষে যাবার পথে সে হেড স্যারের মুখোমুখি হয়। হেড স্যার তাকে বলে, “দিন যায় তো ভালই, খারাপ দিন তো আসছে বাবা। তোমার পড়াশুনা ঠিক রাখো। যত কষ্টই আসুক, বাধা আসুক পড়াশুনা বন্ধ কইরো না। কোন দিকে তাকাইও না, কোন কিছু চিন্তা কইরো না বাবা। শুধু পড়াশুনাটা ঠিক রাখো। আর তো আমার কিছু বলার নাই বাবা।” শেষে ধরা গলায় গভীর এক শ্বাস ছেড়ে স্যার তিরোহিত হন। তেমন কিছু না বুঝে মালেকিন ফ্যাল ফ্যাল করে স্যারের গমন পথের দিকে তাকিয়ে থাকে।

দিন দশেক পরে এক ছুটির দিনে মালেকিন ইংরেজি স্যারের বাসায় যায়। ইংরেজি তার কাছে কঠিনই লাগে। স্যার বলে দিয়েছে, সমস্যা হলেই সে তার সাথে যোগাযোগ করতে পারে। সে যে নোট তৈরি করেছে, তা সম্পর্কে সে স্যারের মন্তব্য জানতে চায়। সে সাথে জানতে চায় এবারের প্রশ্ন-পত্রের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে। কি ধরনের প্রস্ত্তুতি নিলে, কিভাবে সে ইংরেজির এই বিভীষিকা থেকে বাঁচতে পারে। আশ্চর্য, ইংরেজি স্যারকেও তার কেমন বিমর্ষ দেখায়। মালেকিন ভয় পেয়ে উঠে। তার মুখ দিয়ে সরাসরি বের হয়ে আসে, “কি হইছে স্যার?” কাতর স্বরে স্যার বলে উঠেন, “আমারো বোধ হয় এই স্কুলে আর থাকা অইলো না। তোর হেড স্যার তো অন্য গ্রাম থেকে এই স্কুলে পড়াইতে আইতো। আর আমিতো আমার নিজের গ্রামেই আছি। কি করি ক তো?” নিজের মনেই যেন স্যার কথাগুলো বলতে থাকেন। আঁতকে উঠে কেমন এক ভয়ে সে ফ্যাল ফ্যাল করে স্যারের দিকে তাকিয়ে থাকে। “নতুন পার্টি আসছে দেশে, সবকিছু এখন তাদের মত হবে। যাদের পছন্দ হবে, তারে তারা রাখবে। যারে পছন্দ হবে না, তারে তারা রাখবে না। আমি তো আর সগ্গলের মত সবকিছুতে তাল মিলাইতে পারি না। সে শিক্ষাটা নাই যে। ” মালেকিন টের পায়। কী এক বিষাক্ত তীর বাণে স্যার জর্জরিত হচ্ছে। ইংরেজির ব্যাপারে যেখানে সে নিজে স্বান্তনা নিতে এসেছিল স্যারের কাছে, সেখানে স্যারেরই স্বান্তনার বাণীর প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। স্যার নিজে থেকে উঠে ঘরের ভেতরে যায় এবং কিছুক্ষণ পর যেন সব ভুলে আবার ফিরে আসে। পড়াশুনার কাজ শেষে ফিরে আসার সময় মালেকিনকে শুধু বলে, “সব বুঝবা আস্তে আস্তে। এখন তো মাত্র শুরু হইছে।”

বাসায় ফিরেও মালেকিন স্বস্তি পায় না। হেড স্যার, ইংরেজি স্যারের কথা তার মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে। “দিন যায় তো ভালই, খারাপ দিন তো আসছে বাবা।” “সব বুঝবা আস্তে আস্তে। এখন তো মাত্র শুরু হইছে।” মালেকিন অনেক চেষ্টায় নিজেকে সামলাতে চায়। তাকে তার পড়াশুনা শেষ করতে হবে। হেড স্যার তাকে মনোযোগ হারাতে নিষেধ করেছে। ফুপু তার ভাল একটা পাশের জন্য অপেক্ষা করছে। মালেকিন নিজেকে সংযত রাখে। টেস্ট পরীক্ষা শুরু হয়। ভালভাবে সে শেষ করে। বুদ্বিজীবি দিবস, বিজয় দিবস আসন্ন প্রায়। এবারেই সে এতে উদ্যোগী হতে পারে নি। স্কুল থেকে কোন উদ্যোগ না দেখে মালেকিন আহত হয়। আগের হেড স্যার হলে সামান্য কিছু হলেও করতেন। তার কারণেই স্কুলের শহীদ মিনার আছে। অন্ততঃপক্ষে বুদ্ধিজীবি হত্যা দিবস বা বিজয় দিবসের প্রাক্কালে মধ্যাহ্ন বিরতির আগের ক্লাসে সব ছাত্রকে স্কুলের বড় রুমে নিয়ে এসে বুদ্ধিজীবি হত্যা দিবস, বিজয় দিবসের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতেন। কেউ কেউ স্বাধীনতার কবিতা আবৃত্তি বা গানও গাইতো এসময়। এই অনুষ্ঠানের ব্যাপারে ডিসেম্বর মাস এলেই সবাই জেনে যেত। যাদের ইচ্ছে হতো তারা গান বা আবৃত্তির জন্য তৈরি হয়ে নিত। মালেকিন ও তার বন্ধুরা উদ্যোগী হত বলেই প্রতিবছর বিকেল থেকে সন্ধ্যা অবধি ১৬ই ডিসেম্বরের বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান তারা করে গেছে এই স্কুল চত্ত্বরে। চাঁদা তুলে শব্দ যন্ত্র ভাড়া করেছে। বিজয়ের গান বাজিয়েছে। দেশাত্মবোধক গান-নাচ-আবৃত্তি, এমনকি নাটকও হয়েছে সন্ধ্যায়। তাছাড়া সিনেমার চটুল গানও বেজেছে এইদিনে এই গ্রামের সাংস্কৃতিক সংঘ-এর আয়োজনে। সেখানেও ভীড় হয়েছে। দু’চারটা মুক্তিযুদ্ধ বা দেশাত্মবোধক গান গেয়েই বিজয় দিবস উদযাপিত করেছে তারা।

এবারের বিজয় দিবসের চিন্তা মাথায় রেখে মালেকিন নতুন হেড স্যারের মুখোমুখি হয়। স্যার কতক্ষণ আপাদ-মস্তক তাকে দেখেন। তারপর বলেন, “তুমি না এবার এস.এস. সি. দিবা? টেস্ট কেমন দিলা? ভাল দিছো তো?” মালেকিন মাথা নাড়ে। “বাবা, হুনছি, তুমি প্রতিবছরই স্কুলে অনুষ্ঠান করো। এবার না হয়, একটু বেশি কইরা পড়াশুনা করলা। সামনে বোর্ডের পরীক্ষা না?” “আমি বলছিলাম স্যার, এবার তো আমাদের দ্বারা বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান করা হবে না। আপনারা যদি স্কুলে কিছু করতেন।” সে হেড স্যারের কাছে আবেদনের ভঙ্গিতে বলে। হেড স্যার একটু থতমত খান, বাবা, “আমি তো এই নতুন আসলাম। এখনো তো গুছায়ে উঠতে পারি নাই। এবারে আমারে একটু বাদ রাখা যায় না?” মালেকিন বুঝতে পারে, এবারে আর স্কুলে বিজয় দিবসের কোন অনুষ্ঠান হচ্ছে না। সে অগত্যা আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত হেড স্যারের রুম থেকে বেরিয়ে আসে।

শামান সাত্ত্বিক | ডিসেম্বর ১৯, ২০১১ | ১৫:৫১ বিভাগ: গল্প, মুক্তিযুদ্ধ | ট্যাগ: টীনএজ গল্প

উদ্বাস্তু সময় – ৪

Advertisements

তথ্য কণিকা শামান সাত্ত্বিক
নিঃশব্দের মাঝে গড়ে উঠা শব্দে ডুবি ধ্যাণ মৌণতায়।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: