উদ্বাস্তু সময় – ৫

উদ্বাস্তু সময় – ৪

টেস্ট পরীক্ষায় মালেকিনের ফলাফল ভালই হয়। সে হয় প্রথম। সাতশ-র কাছাকাছি নম্বর। খবরটা শুনে মালেকিন খুব খুশী হয়। কিন্তু যার খুশী মুখ দেখার খুব ইচ্ছে হল, তাকে তো স্কুলে পাওয়া গেল না। খবর নিতেই বেরিয়ে আসে, ইংরেজী স্যারেরও বদলি হয়ে গেছে। এ কারণেই আজ স্কুলের দিকে পা মাড়ান নি। ভীষণ এক ব্যথায় কুকড়ে উঠে হৃদয়টা। বেদনায় নীল কি একে বলে? মনে মনে ভাবে সে। আস্তে আস্তে সে ছুটে যায় স্যারের বাসায় দিকে। স্যারের সেই আশংকা যে এত দ্রুত সত্য লাভ করবে, এ ছিল তার কল্পনার বাইরে। তার বুক ফেটে আর্তনাদ উঠে নীরবে, “আমরা কোথায় চলেছি স্যার?” সে আর্তনাদ কোথাও পৌঁছে না। নিজের ভেতরে ধুকড়ে ধুকড়ে মরে। স্যারকে সে বাসাতেই পায়। কেমন যেন চেহারা, অবনত দৃষ্টি। অনেকক্ষণ চুপ করে থাকেন স্যার। কোন কথা বলেন না। শেষে এক গভীর শ্বাস ছেড়ে বলেন, “গ্রামের পোলাপাইনরে পড়াইতে চাইছিলাম। পড়াইতে পারলাম না। ঘরের দুয়ারের স্কুল থুইয়া দূরে যাইয়া পড়াইতে হইবো আর কি?” তারপর একটু পরেই বলেন, “তুই এখন যা।” মালেকিন তখন তাড়াহুড়ো করে বলে, “স্যার আমার রেজাল্ট দিছে। আমি ফার্স্ট হইছি।” ইংরেজী স্যার কিছুক্ষণ অন্যমনস্কভাবে মালেকিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। কি যেন ভাবে। তারপর বলে, “তোরা ভাল করলে তো আমি খুশী। দেখ্‌ এখন কী হয় দিন দুনিয়ার। আগের মত আর কিছুই নাই রে। যার যার ভালা, তার তার কাছে এখন।” আর কিছু বলেন না স্যার। মালেকিন ভাবে, স্যারও জানি কেমন অন্যরকম হয়ে গেছেন। কেমন যেন দূর দূর, ছাড়া ছাড়া। তাহলে কার কাছে যাবে সে। হেডস্যারের কথা মনে পড়ে। তার রেজাল্টের খবর শুনলে খুব খুশী হতেন। কাছে ডেকে নিয়ে বলতেন, আমি জানি তুমি পারবা। এখন যে সে কাউকে কাছে পাচ্ছে না। প্রচন্ড জিদ চেপে বসে তার মাথায়। স্যারের বাসা থেকে ফিরতে ফিরতে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, যেমন করেই হোক, ভালভাবে পরীক্ষা শেষ করে সে এর বিহিত দেখে নেবে। কোথা থেকে কি হচ্ছে? কোথাকার পানি কোথায় গড়াচ্ছে? এখন আর সে কোন কিছুতেই মুখ-চোখ ঘুরিয়ে নিতে প্রস্তুত নয়। তাকে বুঝতে হবে। সবকিছুর উত্তর খুঁজতে হবে। নিশ্চয়ই কোথাও কিছু ঘটে যাচ্ছে। উত্তর জানা সত্ত্বেও এই স্যার দু’জন কিছু বলছেন না। আবার কিছু করতেও পারছেন না। সম্ভবতঃ সাংঘাতিক কিছুই। মালেকিন তার গোপন ইচ্ছাটা এই মূহুর্তে নিজের ভেতরে চেপে রাখে।

২১ শে ফেব্রুযারী এসে গেছে। তার সপ্তাহখানেক পরেই জাতীয় নির্বাচন। কেমন এক হুল-স্থুল, হুল-স্থুল অবস্থা। মানুষগুলো সব পাল্টে গেছে। কেউ কাউকে চিনে না। শোনা যাচ্ছে, টাকা নাকি অনেক কিছুই পাল্টে দেয়। সে সাথে স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও কামড়াকামড়ি। ইলেকশনের আন্দোলনে কম বেশি সবাই আন্দোলিত। পক্ষে-বিপক্ষে প্রচারও অসম্ভব এক তীব্রতায় রুপান্তরিত হয়েছে। সামান্যতেই দু’পক্ষের মধ্যে অসহিষ্ণুতা চরমে উঠছে। পরিচিত মানুষদের এমন যুদ্ধংদেহী ভাব দেখে মালেকিনকে এক ধরণের আতংকগ্রস্থতা চেপে ধরে। কি হতে যাচ্ছে সামনে? শুধু ছটফট করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই তার। পরীক্ষা ঘনিয়ে আসছে হাঁটি হাঁটি পা পা করে। পরীক্ষার প্রস্তুতিকে সে নিশ্ছিদ্র রেখে যাচ্ছে। কিন্তু একুশে ফেব্রুযারী উদযাপন থেকে তো সে দূরে সরে থাকতে পারে না। ইলেকশানের ডামাঢোলের মাঝেও সে এগিয়ে আসে। স্কুলের নতুন হেড স্যারের সাথে সে দেখা করে। প্রতিবছরের একুশে ফেব্রুযারীর প্রভাত ফেরীর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। স্কুলের শহীদ মিনার নির্মিত হবার পর বিগত বছর তিনেক হতে তা রীতিমত হয়ে আসছে। স্যার আঁতকে উঠেন বিষধর সাপ দেখার মত, ” নাউজুবিল্লাহ এ তুমি কি কও? আমারে পাপের ভাগীদার করতে চাও। তোমাদের হেড স্যার হইয়া তো দেখি আমার ঈমান নিয়ে টানাটানি শুরু হয়ে গেছে। এসব বেদাতি কাজ আমারে করতে কও। মূর্তি পূজা আমি করমু? বাবারে, তোমার যা ভাল মনে হয় করো। আমারে এরই মাঝে ঢুকাইও না।” মালেকিন স্যার-কে একটু বোঝানোর চেষ্টা করে, “স্যার, আমরা তো শুধু শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবো ফুল দিয়ে। তাদেরকে স্মরণ করবো। ভাষা শহীদদের অবদানের জন্যই তো আজ আমরা এই স্বাধীন বাংলাদেশ পেলাম। এতে তো খারাপ কিছু দেখি না স্যার।” স্যারের আঁতে ঘা লাগলো। তিনি বলতে শুরু করলেন, “এই দেখো তোমার দাদা, ঔ যে দেখো মসজিদ, তার ইমাম ছিলেন না? তারও দাদা, এই গ্রামের মানুষদের শরিয়তী শিখাইছে। আর তাদের আওলাদ হইয়া তুমি এই বেদাতি, গুনাহ্‌গারী কাজ করবা? তুমি যদি চাও, এই ভাষা শহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনার জন্য আমি এই মসজিদে দোয়া কালামের ব্যবস্থা করতে পারি। তাদের জন্য দরকার হইলে কাঙ্গালী ভোজও দিতে পারি। তবু বাবা, তুমি এসব কাজ থেকে দূরে না থাকলেও, আমার এই কাজ করতে কইও না। নাউজুবিল্লাহ!

বাড়ি ফিরে এসে অনেকক্ষণ ধরে ঝিম মেরে বসে থেকে মালেকিন। শহীদরা এই পৃথিবীতে নেই। তাদের রুহের মাগফেরাত কামনা তো পরকালের জন্য। এতে তো আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু বর্তমানের জন্য, মানুষের চেতনাকে শাণিত, সমৃদ্ধ করার জন্য, যে কারণে শহীদরা তাদের জীবন বিসর্জন দিয়েছেন, তাকে সমুন্নত রাখার জন্য, তাকে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া ও টিকিয়ে রাখার মাঝেই তো শহীদদের প্রতি উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শণ। তারা পরজগতে চলে গিয়েছে, এই ইহজগতে একটা সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে যেয়ে। সে সত্যের শিখাকে প্রজ্জ্বলিত রাখাই তো বর্তমানের দায়িত্ব। আর তা করার জন্যই আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে শহীদ মিনারে এসে মিলিত হই। অনেক কাছাকাছি এসে শহীদদের অনুভব করি। তাদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করি। ফুল দিয়ে তাদের সম্মান জানাই। আবার নতুন কোন অঙ্গীকারে শপথাবদ্ধ হই। শহীদরা এই ইহজগতে আমাদের সত্ত্বা ও অস্তিত্বকে সম্মানের সাথে বাঁচিয়ে রাখতে এক জীবনপণ সংকল্পে ব্রতী হন। ইহজগতের এই বেঁচে থাকাকে সুষম ও কন্টকহীন করতেই শহীদ স্মরণে বাংলাদেশ নামক এই ভূ-খন্ডের মানুষের এই আচার। যে আচার আর কৃষ্টির রয়েছে বহুমাত্রিকতা। এর সাথে পরজগত বা ধর্মের সাথে কোন দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে, তা মালেকিনের কাছে বিস্ময়কর ঠেকে। মালেকিনের পড়াশুনা খুব বেশী নয়। কিন্তু এতটুকু উপলব্ধি তার কাছে কোন কঠিন মনে হয় না। মানুষ যদি তার অন্তরকে উন্মুক্ত রাখে আলো প্রবেশে, তাহলে সে আলোয় সে সহজে আলোকিত হতে পারে। সে তার পূর্ব পুরুষদের প্রতি ভীষণ কৃতজ্ঞতা বোধ করে। তার পূর্ব-পুরুষেরা ধর্মের এত কাছাকাছি ছিল বলেই, আজ সে উন্মুক্তচিত্তেই এই সত্যাসত্য উপলব্ধি করতে পারছে। ধর্মের উদ্দেশ্য যদি মানুষকে আলোকিত করা হয়, সেখানে ধর্মান্ধতা কোন ক্ষেত্রেই সে মেনে নিতে পারে না। সত্যাসত্য উপলব্ধিতে নিজের অন্তরকে উন্মুক্ত রাখাই কি ধর্মের উদ্দেশ্য নয়? নতুবা ধর্মের মাহাত্ম্যই বা কোথায়? মালেকিন সে উপলব্ধিতে নিজের জীবনকে পুরোপরি সংস্কারহীনভাবে উন্মুক্ত রাখতে চায়।

শামান সাত্ত্বিক | ডিসেম্বর ২৩, ২০১১ | ০২:২৩ বিভাগ: গল্প, মুক্তিযুদ্ধ | ট্যাগ: টীনএজ গল্প

উদ্বাস্তু সময় – ৬

Advertisements

উদ্বাস্তু সময় – ৪

উদ্বাস্তু সময় – ৩

স্কুলের পেছনদিকে তাদের বাড়ির বাইরের বড় পুকুর। পাশের বাড়ির লোকেরাও এখানে আসে গোসল সারতে। পুকুরের পূর্বপাশের উঁচু পাড়ে তাদের পরিবারিক কবর। কবরের পাশে পুকুর পাড়ে বিরাট শিমুল গাছটার নীচে এক প্রশস্ত জায়গা। মালেকিন সে গাছটার নীচে বসে। বাবা, ভাইজান, বুইব্বার কথা ভাবে। সামনের কবরে বাবা ভাইজান আছে। আর বুইব্বা? নিজের ভেতরে কেমন এক গোস্বা চাপে তার। এরা তিনজনই জড়িয়ে আছে তার অস্তিত্বের সাথে। আর সে নিজে কি না গ্রামের সবার কাছে তাদের স্মরণ করিয়ে দিতে পারছে না। তাদের নিজের অস্তিত্ব কেমন কেমন কেঁপে উঠে। ভেতরটা হু হু করে উঠে। সে উঠে দ্রুত বাড়িতে ফুপুর কাছে যায়। ফুপুকে জড়িয়ে ধরে তার কোলে মুখ লুকিয়ে অঝোরে কেঁদে উঠে। তারপর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, যে করেই হোক, অন্য বারের মত সে স্কুল চত্বরে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান করবে। অথচ তার হাতে সময় মাত্র চারদিন। ফুপু শুনে এবারে এ অনুষ্ঠান বাদ দিতে বলে। সেই সাথে উপদেশও দেয়। “মনে রাইখ্যো, পড়াশুনা কইরা বড় কিছু না হইতে পারলে, এখন তুমি যা করছো, একসময় তাও করতে পারবা না।” মালেকিনের তা হৃদয়ঙ্গম হয় না। সে উঠে পড়ে লাগে তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে।

কিন্তু ১৬ ডিসেম্বরের সকাল হতে না হতেই অন্য ঘটনা এসে দাঁড়ায়। রাত জেগে অনুষ্ঠানের কাজ করাতে আজ একটু দেরীতে ঘুম থেকে উঠে সে। ঘুম থেকে উঠতে না উঠতেই মালেকিন খবর পায়, সাংস্কৃতিক সংঘের ছেলেরা এবারে বিজয় দিবস উদযাপন করতে স্কুল চত্ত্বরে সাজ গোছ শুরু করেছে। ভীষন আশ্চর্য হয় সে। বছর দু’য়েক আগে সাংস্কৃতিক সংঘ যখন কাজ শুরু করে, তখন একসাথে বিজয় দিবস পালনের জন্য তাদের স্কুল চত্ত্বরের আয়োজনের সাথে সম্পৃক্ত হতে বলে। অথচ তখন তারা বলেছিল, তারা স্কুলের প্রোগ্রামের সাথে নেই। নিজেরা নিজেদের মতো করে করবে। দু’গ্রামের অর্থসম্পন্ন দু’চার পরিবারের সন্তান মিলে এই অনুষ্ঠান শুরু করেছে। তাদের সদস্য সংখ্যা এখন অনেক। কিন্তু আজ বলা নেই, কথা নেই অনুষ্ঠান করতে স্কুল চত্ত্বরে এসে উপস্থিত হয়েছে। ভারী বিরক্ত হয় মালেকিন। নাস্তা না সেরেই বাড়ি থেকে ঝড়ের গতিতে মিনিট খানেকে পৌঁছে যায় স্কুলে। বেশ তর্কাতর্কি হয় সেখানে। কিন্তু মীমাংসার কোন পথই খোলা পায় না। সাংস্কৃতিক সংঘ জানায়, তারা স্কুলের হেড স্যারের পারমিশান নিয়েছে। আবেদনের কাগজে তার সীলসহ দস্তখত দেখায়। আর এ অনুমতি যে স্যারের বাসায় গিয়ে নেয়া, তা ছেলেদের কথাবার্তায় বেরিয়ে আসে, যদিও সিগনেচারে তারিখ তিনদিন আগের ডিসেম্বরের ১৩ তারিখ, স্কুল খোলা দিনে। মালেকিন কিছু বুঝে না। তার মাথা ঘুরতে থাকে। স্বাধীনতার পর পরই সে এই স্কুল চত্ত্বরে অনুষ্ঠান করে এসেছে। আজ সে এখানেই হচ্ছে পরবাসী। সমস্যা সমাধানে তাকে কিনা সকাল সকাল অনুষ্ঠান শেষ করে ফেলার কথা বলে তারা। আর বিকেল থেকে সন্ধ্যা অবধি এ স্কুল প্রাঙ্গনে সাংস্কৃতিক সংঘ অনুষ্ঠান করবে, যা কিনা মালেকিনদের এতো বছর ধরে গড়ে তোলা নিজস্ব ঐতিহ্য। প্রচন্ড ক্রোধে মালেকিন ফেটে পড়ে। সে মূহুর্তে সাংস্কৃতিক সংঘের অনুষ্ঠানের মাইকিং শুনে স্কুলের কাঁচা রাস্তার উল্টোদিকের বাড়ি থেকে ইংরেজি স্যার এসে উপস্থিত হয়। তিনি মালেকিনকে স্হির, শান্ত হতে বলেন। শেষে উত্তেজিত মালেকিনকে স্কুলের একপাশে নিয়ে গিয়ে বলেন, “তোমার এখন ঝগড়া করে কোন লাভ নাই। তারা জেনেশুনে গোপনে পরিকল্পনা করে এই অনুষ্ঠান করতে এসেছে। তোমার কথায় তো আর তারা তাদের অনুষ্ঠান এখান থেকে সরাবে না। তুমি এক কাজ করো। আগামীকাল স্কুল শেষে যেমন করে পারো তোমাদের অনুষ্ঠানটা করো। আমি তো তোমাদের রিহার্সেল দেখছি। আরেকটু রিহার্সেল করতে যদি পারো তোমাদের অনুষ্ঠানটা আরেকটু ভাল হবে। আজ এতো দমি গেলে কি হয়? কাল তো আছে।” মালেকিন স্যারের কথায় কিছুটা স্থিত হতে চায়। সেও জানে, এ ছাড়া আর কোন উপায় বের করা কষ্টকর। শুধু বলে, “কিন্তু দেখলেন তো স্যার……..।” স্যার তাকে কথা বাড়াতে দেয় না। শুধু বলেন, “আমি জানি।”

মালেকিনদের অনুষ্ঠান শেষ হলো আজ দু’দিন। কিন্তু এখনও সে পড়াশুনায় পুরো মনোযোগ দিতে পারছে না। এদিকে ফুপুর চাপ ভালভাবে পড়াশুনা চালিয়ে যাবার। তিনি একদমই পছন্দ করেননি মালেকিনের এবারের এই ঝামেলার সাথে জড়িয়ে পড়ার। শুধু বলেন, “দেখো বাবা, আমারও বয়স হইছে। তোমারে বিয়া করাইয়া ঘরে বউ আনতে চাই। আর তো আমি এতকিছু দেখাশুনা করতে পারি না। তোমার ফুপার তো ব্য়স বাড়তেছে। আর তোমার মায়ের অবস্থা তো নিজের চোখে দেখতেছো। আজকাল তো ঔষুধ-টষুধ খেতে চায় না। কয়দিন যে আর বাঁচে সে খোদায় জানে। তোমাদের আর কি বলবো, তোমার চাচা……….।” কথা শেষ না করে ফুপু বলেন, “আর কতদিন যে, তোমার ফুপারে ঢাকায় যেতে হবে, তা আল্লায় মালুম।” মালেকিন একটু থমকে যায়। ফুপুকে জিজ্ঞেস করে, “চাচার কথা কি বললেন?” “কিছু না বাবা। সবকিছুই তুমি জানবে, সময় হলে। তোমাকেও তোমার ফুপার সাথে একসময় ঢাকা যেতে হবে। সে তো আজকাল চোখে ভাল দেখে না।” ফুপুর এই কথার কোন অর্থ মালেকিন বুঝে উঠতে পারে না। গ্রামে কেউ কেউ বলে, তার একমাত্র চাচা যুদ্ধে মারা গেছে। আবার চাচার সাথে যুদ্ধে যাওয়া বশীর চাচা বলেছেন, অন্য কথা। একবার নাকি নিজেদের ক্যাম্প ছেড়ে কাউকে কিছু না বলে রাতের আঁধারে চাচা বেরিয়ে পড়েন। তখন এখানকার কয়েক গ্রাম পাকিস্থানীদের নিয়ন্ত্রণে। শোনা যায়, গ্রামভিমুখী আসতে গিয়ে পাকিস্থানীদের সাথে তার একক সংঘর্ষ হয় এবং ফলশ্রুতিতে তিনি ধরা পড়েন। শেষে একদিন রাতের আঁধারে পালাতে গিয়ে ভীষন গুলিবিদ্ধ হন। এরপর চাচা বেঁচে ছিলেন কি না কেউ জানে না। গ্রামের বশীর চাচা বলেছেন, এসব কথা মুক্তিযুদ্ধের সময় এক সোর্সের মুখে শোনা। এ ব্যাপারে যুদ্ধ শেষে কেউ তাকে কোন খবর দিতে পারে নি। ফুপা ঢাকা যায় বছরে দু’চারবার। মালেকিন জানে। ঢাকার ফুপার কোন এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের সাথে ব্যবসা-পাতির ব্যাপার আছে বলে গ্রামের মানুষের মত মালেকিনও জানে। কিন্তু সে ব্যবসার কোন কূল কিনারা সম্পর্কে কেউ জানে না। মালেকিন শুধু দেখে, ফুপা ঢাকা যাবার সময় ফুপু পিঠা-নারিকেল নাড়ু, মুড়ি-মোয়া, দু’চারটা ডাব মিলে একটা বড় পোটলা তৈরি করে ফুপাকে দেয়। প্রতিবার ঢাকা থেকে ফিরে এলে ফুপাকে খুব বিমর্ষ দেখায়। ফুপু-ফুপা কয়েকটা দিন কেমন গম্ভীর কাটায়। মালেকিন তখন তাদের আশপাশে ঘুরে বেড়ালেও কোন কিছু প্রশ্ন করার সাহস পায় না। মানুষের শোকের সময়ে প্রশ্ন করতে নেই। এইসব এখন গা সওয়া হয়ে গেছে মালেকিনের। তবে গ্রামের মানুষ সময়ে সময়ে ফুপার কাছে ব্যবসা কেমন হয়েছে জানতে চাইলে, ফুপা শুধু উত্তর দিতো, ভাল না। ‘কি ব্যবসা করো’, ‘কখন ব্যবসা ভাল হবে’, এসব প্রশ্ন করলে ফুপা শুধু বলতেন, ‘ব্যবসা ভাল হইলে তো জানবাই।’ আর কিছু না বলে কেটে পড়তো। তাতে করে গ্রামের মানুষের আরো সন্দেহ জাগতো, ‘নিশ্চয় বড় কোন ব্যবসা আছে, টাকা জমাচ্ছে বছর বছর। নতুবা তাদের জানায় না কেন?’ মালেকিনের এসবে কান দেবার ইচ্ছা নেই। ভাল কিছু হলে তো তাদের জন্যও ভাল। সে এ ব্যাপারে ফুপা-ফুপুকে ঘাটতে যেতো না।

বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান নিয়ে যে সংঘর্ষ বাধে, তা তাকে একেবারেই স্বস্থি দিচ্ছে না। আগের হেড স্যারের কথাগুলো কানে বাজে। ইংরেজী স্যারও নাকি বিষয়গুলো জানে, বুঝে। সে-তো বুঝে না। খুব দ্রুতই সবকিছুই পাল্টাতে শুরু করেছে। সামনের ফেব্রুয়ারীতে ইলেকশান। সবাই যেন কেমন দলাদলিতে নেমে যাচ্ছে। সবকিছু কেমন ছাড়া ছাড়া বিষণ্ণ বিষণ্ণ। মালেকিনের মনে হয়, তারই যেন ঝাঁজ এসে পড়েছে তাদের এই স্কুলেও। মানুষগুলো এমন দ্রুত পাল্টাতে পারে? স্বাধীনতা যুদ্ধে শত্রুর সাথে লড়তে নিজেদের পাল্টানো। সে পাল্টানোতে কোন দোষ বা অস্বাভাবিক কিছু দেখে না মালেকিন। কিন্তু এখন তো নিজেরা নিজেদের বিরুদ্ধে-ই পাল্টাচ্ছি আমরা। বিজয় দিবসে তাকে স্কুল চত্ত্বরে অনুষ্ঠান করতে না দেয়া তো তারই প্রমাণ। তাহলে তাকেও কি কোন এক দলভুক্ত হতে হবে। সামনে পরীক্ষা। এত কিছু সে ভাবতে পারে না। সাংস্কৃতিক সংঘের অনুষ্ঠান কুরআন তেলাওয়াত দিয়ে শুরু হয়েছে। এ নিয়ে মালেকিনরা কখনো ভাবে নি। জাতীয় সংগীত দিয়ে তারা করতো অনুষ্ঠান শুরু। কিন্তু এ কি? বরাবরের মতই সিনেমার প্রেমের গান বিজয়ের অনুষ্ঠানে মিশে গেছে। কেউ একজন গানের তালে নাচলো, ‘যে জন প্রেমের ভাব জানে না, তার সাথে নাই লেনা-দেনা’, আবার কেউ একজন গাইলো, ‘দমাদম মাস ক্যালেন্ডার, আলী কা পয়লা নম্বর।’ বাড়িতে বসে যতদূর পারে রিহার্সাল করতে করতে মালেকিনরা লাউড স্পীকারে সেসব শুনতে থাকে। মুচকি মুচকি হাসে কেউ কেউ। মালেকিন কোন রকমে রিহার্সেল শেষ করে। এইসব সাত-পাঁচ ভেবে ভেবে মালেকিনের পরীক্ষা প্রস্তুতি আগায় না। কিছু একটা করার জন্য সে ছটফট করে। কিন্তু বেশি কিছু করা যে তার জন্য সম্ভব হচ্ছে না। রাজনীতির কেমন এক দুর্গন্ধ মালেকিনের নাকে এসে লাগে। এক অদৃশ্য চক্রান্তে মানুষগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব সংঘাত শুরু হয়ে গেছে। এই দ্বন্দ্বের মাঝে পড়ে অনেক কষ্টে নিজেকে সামলিয়ে নেয় মালেকিন। ইংরেজীর স্যারের কড়া নির্দেশই বলতে হয়, “আর যা করো, টেস্টে যে রেজাল্ট করবে, ফলাফল তার থেকে নীচে যেন না হয় বোর্ডের পরীক্ষায়।” স্যারের পরম আত্মীয়ের মত আন্তরিক আচরণে চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে মালেকিনের। সে কি পারবে স্যারের কথা রাখতে? যে করেই হোক স্যারের উপদেশ তাকে মেনে চলতেই হবে।

শামান সাত্ত্বিক | ডিসেম্বর ২১, ২০১১ | ১০:৫৭ বিভাগ: গল্প, মুক্তিযুদ্ধ | ট্যাগ: টীনএজ গল্প

উদ্বাস্তু সময় – ৫

উদ্বাস্তু সময় – ৩

উদ্বাস্তু সময় – ১
উদ্বাস্তু সময় – ২

কিন্তু যেন হঠাৎ করেই সব পাল্টে গেল। স্কুলে আর শহীদ দিবস, স্বাধীনতা দিবস বা বিজয় দিবস আগের মত উদযাপিত হয় না। বরং লাউড স্পীকারে রেকর্ডকৃত সিনেমার গানই বেশি বাজে। স্কুলের ছেলে-মেয়েদেরও সে গানের প্রতি অন্য এক রকমের আকর্ষণ। কে কার চেয়ে এসকল গান ভাল গায় এ নিয়েও চলতো এক ধরণের দ্বন্দ্ব। এরি মাঝে মাঝে দু’চারটা মুক্তিযুদ্ধের গান শোনা যেত না, তা অবশ্য নয়। কিন্তু স্বাধীনতার গান গাওয়ার মত আবেগ বা উৎসাহ স্কুলের ছেলেমেয়েদের মাঝে তেমন খুঁজে পাওয়া যেত না। এটাই ভেতরে ভেতরে ক্ষুব্ধ করে তুলতো মালেকিনকে। যতই সে উপরের শ্রেণীতে উঠতো, ততই সে এই জাতীয় দিবসগুলো পালনে স্বক্রিয় হতো। শিক্ষকদেরও এই দিবসগুলো পালনে ধীরে ধীরে উদ্যম হারিয়ে ফেলাটা সে দেখতে থাকে। অনুষ্ঠানের জন্য সাহায্য পেতে চাইলে, কেউ কেউ বিরক্তি দেখাতো। সবাই জানি কেন স্বাধীনতা, শহীদদের প্রতি তাদের দায় বা দায়িত্ব হারিয়ে যেতে বসলো। মালেকিন ভাবতো, তাহলে কি দেশের প্রতি আমরা আমদের আনুগত্য বিসর্জন দিচ্ছি? যে স্বাধীনতার জন্য সে তার পরিবারকে হারিয়েছে, আজ যদি সে স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে উঠে তবে সে কোথায় তার বিচ্ছেদ-বেদনার স্বান্তনা খুঁজে নেবে। কোথাই বা তার মানসিক প্রশস্তি খুঁজে পাবে। এক ধরণের অস্থিরতা মালেকিনকে তাড়া করতে শুরু করে।

একমাত্র স্কুলের হেডস্যারকেই সে অন্যরকম দেখেছে। যখনই সে স্যারের চোখাচোখি হয়েছে, স্যার তাকে তার কুশল জিজ্ঞেস করেছে। পড়াশুনার ব্যাপারে উৎসাহ যুগিয়েছে। হেডস্যারকে দেখলে ভাইজানের কথা মনে হয়েছে তার খুব। ভাইজান হয় ডাক্তার নয় ব্যারিষ্টার হতো। কিন্তু সে কি তার কোনটা হয়ে উঠতে পারবে? নিজের মাঝে সে বিশ্বাসের প্রচন্ডতার একটা সংকট চলতে থাকে। যতই উপর শ্রেণীতে সে উঠছে, ততই সে ভেতরে ভেতরে টের পাচ্ছে – একাগ্র বা পুরো মনোযোগী হতে না পারলে, তার বেশিদূর পড়াশুনা এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। ভাইজানকে নিয়ে বাবার ইচ্ছার কথাও তার মনে পড়ে। মালেকিন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, যাই হোক না কেন, সে প্রাণপণে তার পড়াশুনা ভালভাবে চালিয়ে নিয়ে যাবে।

স্কুলের হেডস্যার মালেকিনের পড়াশুনায় একাগ্রতা দেখে বেশ খুশি হয়। মালেকিন এস. এস. সি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হতে থাকে। আর মাস দুয়েক পরই তার টেস্ট পরীক্ষা। এমন সময় সে খবর পায়, স্কুলের হেডস্যার বদলি হয়ে যাচ্ছেন। মালেকিনের মনটা কেমন যেন ছ্যাঁৎ করে উঠে। বাড়িতে এক ফুপু আর স্কুলে হেডস্যারই তাকে পড়াশুনায় উৎসাহ যোগাতো। সে কেমন মর্মাহত হয়। একবার মনে করে হেডস্যারের সাথে দেখা করে আসে। কিন্তু স্যারের মুখ দিয়ে তার চলে যাবার কথা শোনার মত তার মনের অবস্থা নেই। হেডস্যারের জন্য ফেয়ারওয়েলের আয়োজন দ্রুত হয়। তিনি নিজেই না-কি বদলীর খবরের পর স্কুল ত্যাগে দেরি করতে চান নি। পরীক্ষার প্রস্তুতির আগে এ মন খারাপ করা ঘটনার জন্য মালেকিন তৈরি ছিল না। প্রায় সপ্তাহ তিনেক পর তার টেস্ট পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। আজ স্যারের ফেয়ারওয়েল। দু’দিন পরেই নতুন হেড স্যার এসে যাবেন। নতুন স্কুল কমিটি হওয়ার সাথে সাথে হেড স্যারের বদলিও হয়ে গেছে। কেমন জানি লাগে মালেকিনের। সে স্কুলের বড় রুমের বাইরে বারান্দায় জানলার পাশে দাঁড়িয়ে বিরস মনে হেড স্যারের ফেয়ারওয়েল অনুষ্ঠান পর্যবেক্ষণ করে। ফেয়ারওয়েল শেষে যাবার পথে সে হেড স্যারের মুখোমুখি হয়। হেড স্যার তাকে বলে, “দিন যায় তো ভালই, খারাপ দিন তো আসছে বাবা। তোমার পড়াশুনা ঠিক রাখো। যত কষ্টই আসুক, বাধা আসুক পড়াশুনা বন্ধ কইরো না। কোন দিকে তাকাইও না, কোন কিছু চিন্তা কইরো না বাবা। শুধু পড়াশুনাটা ঠিক রাখো। আর তো আমার কিছু বলার নাই বাবা।” শেষে ধরা গলায় গভীর এক শ্বাস ছেড়ে স্যার তিরোহিত হন। তেমন কিছু না বুঝে মালেকিন ফ্যাল ফ্যাল করে স্যারের গমন পথের দিকে তাকিয়ে থাকে।

দিন দশেক পরে এক ছুটির দিনে মালেকিন ইংরেজি স্যারের বাসায় যায়। ইংরেজি তার কাছে কঠিনই লাগে। স্যার বলে দিয়েছে, সমস্যা হলেই সে তার সাথে যোগাযোগ করতে পারে। সে যে নোট তৈরি করেছে, তা সম্পর্কে সে স্যারের মন্তব্য জানতে চায়। সে সাথে জানতে চায় এবারের প্রশ্ন-পত্রের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে। কি ধরনের প্রস্ত্তুতি নিলে, কিভাবে সে ইংরেজির এই বিভীষিকা থেকে বাঁচতে পারে। আশ্চর্য, ইংরেজি স্যারকেও তার কেমন বিমর্ষ দেখায়। মালেকিন ভয় পেয়ে উঠে। তার মুখ দিয়ে সরাসরি বের হয়ে আসে, “কি হইছে স্যার?” কাতর স্বরে স্যার বলে উঠেন, “আমারো বোধ হয় এই স্কুলে আর থাকা অইলো না। তোর হেড স্যার তো অন্য গ্রাম থেকে এই স্কুলে পড়াইতে আইতো। আর আমিতো আমার নিজের গ্রামেই আছি। কি করি ক তো?” নিজের মনেই যেন স্যার কথাগুলো বলতে থাকেন। আঁতকে উঠে কেমন এক ভয়ে সে ফ্যাল ফ্যাল করে স্যারের দিকে তাকিয়ে থাকে। “নতুন পার্টি আসছে দেশে, সবকিছু এখন তাদের মত হবে। যাদের পছন্দ হবে, তারে তারা রাখবে। যারে পছন্দ হবে না, তারে তারা রাখবে না। আমি তো আর সগ্গলের মত সবকিছুতে তাল মিলাইতে পারি না। সে শিক্ষাটা নাই যে। ” মালেকিন টের পায়। কী এক বিষাক্ত তীর বাণে স্যার জর্জরিত হচ্ছে। ইংরেজির ব্যাপারে যেখানে সে নিজে স্বান্তনা নিতে এসেছিল স্যারের কাছে, সেখানে স্যারেরই স্বান্তনার বাণীর প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। স্যার নিজে থেকে উঠে ঘরের ভেতরে যায় এবং কিছুক্ষণ পর যেন সব ভুলে আবার ফিরে আসে। পড়াশুনার কাজ শেষে ফিরে আসার সময় মালেকিনকে শুধু বলে, “সব বুঝবা আস্তে আস্তে। এখন তো মাত্র শুরু হইছে।”

বাসায় ফিরেও মালেকিন স্বস্তি পায় না। হেড স্যার, ইংরেজি স্যারের কথা তার মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে। “দিন যায় তো ভালই, খারাপ দিন তো আসছে বাবা।” “সব বুঝবা আস্তে আস্তে। এখন তো মাত্র শুরু হইছে।” মালেকিন অনেক চেষ্টায় নিজেকে সামলাতে চায়। তাকে তার পড়াশুনা শেষ করতে হবে। হেড স্যার তাকে মনোযোগ হারাতে নিষেধ করেছে। ফুপু তার ভাল একটা পাশের জন্য অপেক্ষা করছে। মালেকিন নিজেকে সংযত রাখে। টেস্ট পরীক্ষা শুরু হয়। ভালভাবে সে শেষ করে। বুদ্বিজীবি দিবস, বিজয় দিবস আসন্ন প্রায়। এবারেই সে এতে উদ্যোগী হতে পারে নি। স্কুল থেকে কোন উদ্যোগ না দেখে মালেকিন আহত হয়। আগের হেড স্যার হলে সামান্য কিছু হলেও করতেন। তার কারণেই স্কুলের শহীদ মিনার আছে। অন্ততঃপক্ষে বুদ্ধিজীবি হত্যা দিবস বা বিজয় দিবসের প্রাক্কালে মধ্যাহ্ন বিরতির আগের ক্লাসে সব ছাত্রকে স্কুলের বড় রুমে নিয়ে এসে বুদ্ধিজীবি হত্যা দিবস, বিজয় দিবসের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতেন। কেউ কেউ স্বাধীনতার কবিতা আবৃত্তি বা গানও গাইতো এসময়। এই অনুষ্ঠানের ব্যাপারে ডিসেম্বর মাস এলেই সবাই জেনে যেত। যাদের ইচ্ছে হতো তারা গান বা আবৃত্তির জন্য তৈরি হয়ে নিত। মালেকিন ও তার বন্ধুরা উদ্যোগী হত বলেই প্রতিবছর বিকেল থেকে সন্ধ্যা অবধি ১৬ই ডিসেম্বরের বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান তারা করে গেছে এই স্কুল চত্ত্বরে। চাঁদা তুলে শব্দ যন্ত্র ভাড়া করেছে। বিজয়ের গান বাজিয়েছে। দেশাত্মবোধক গান-নাচ-আবৃত্তি, এমনকি নাটকও হয়েছে সন্ধ্যায়। তাছাড়া সিনেমার চটুল গানও বেজেছে এইদিনে এই গ্রামের সাংস্কৃতিক সংঘ-এর আয়োজনে। সেখানেও ভীড় হয়েছে। দু’চারটা মুক্তিযুদ্ধ বা দেশাত্মবোধক গান গেয়েই বিজয় দিবস উদযাপিত করেছে তারা।

এবারের বিজয় দিবসের চিন্তা মাথায় রেখে মালেকিন নতুন হেড স্যারের মুখোমুখি হয়। স্যার কতক্ষণ আপাদ-মস্তক তাকে দেখেন। তারপর বলেন, “তুমি না এবার এস.এস. সি. দিবা? টেস্ট কেমন দিলা? ভাল দিছো তো?” মালেকিন মাথা নাড়ে। “বাবা, হুনছি, তুমি প্রতিবছরই স্কুলে অনুষ্ঠান করো। এবার না হয়, একটু বেশি কইরা পড়াশুনা করলা। সামনে বোর্ডের পরীক্ষা না?” “আমি বলছিলাম স্যার, এবার তো আমাদের দ্বারা বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান করা হবে না। আপনারা যদি স্কুলে কিছু করতেন।” সে হেড স্যারের কাছে আবেদনের ভঙ্গিতে বলে। হেড স্যার একটু থতমত খান, বাবা, “আমি তো এই নতুন আসলাম। এখনো তো গুছায়ে উঠতে পারি নাই। এবারে আমারে একটু বাদ রাখা যায় না?” মালেকিন বুঝতে পারে, এবারে আর স্কুলে বিজয় দিবসের কোন অনুষ্ঠান হচ্ছে না। সে অগত্যা আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত হেড স্যারের রুম থেকে বেরিয়ে আসে।

শামান সাত্ত্বিক | ডিসেম্বর ১৯, ২০১১ | ১৫:৫১ বিভাগ: গল্প, মুক্তিযুদ্ধ | ট্যাগ: টীনএজ গল্প

উদ্বাস্তু সময় – ৪

%d bloggers like this: