এ লে ফ্লে দ্যু মাল – ৫

এ লে ফ্লে দ্যু মাল – ৪

১৫

শহরের সর্বত্র উৎসব। মনে হচ্ছে, নাটকের শেষ দৃশ্য রূপায়নে সব কিছুর সন্নিবেশ ঘটে গেছে। শহরের মানুষেরা উৎসুক আনন্দে সে দিকে ধাবনোম্মুখ।

আজ যে শহর কন্যার বিয়ে। সাজ সাজ রব উঠে গেছে এরি মধ্যে। কী পোষাক হবে কন্যার! টক অব দা টাউন! ঠিক কন্যার শরীরের মাপে মাপ এক উজ্জ্বল গোলাপী গাউন এসে গেছে বিলেত হতে। শহরের মনুষ্য জীবদের আর অপেক্ষা সয় না। সাথে এসেছে বিলেত থেকে ব্রোঙ্কোর জন্য স্যূট, নটছাড়া ছোট টাই। ব্রোঙ্কোর নিত্য নতুন অদ্ভূদ ঘোষণায় শহর বাসীর নিত্যদিনের ঘুম তিরোহিত হয়ে গেছে। কী হবে কী হবে এমনতরো অদ্ভূদ আবেশে শহরটা ঢেকে গেছে। ব্রোঙ্কোর সাম্প্রতিক ঘোষণায় রয়েছে বিপুল চমক, শায়ানের নতুন যে বাড়িতে আলিশার এক রাত অতিবাহিত হয়েছে, ঠিক তার সামনেই সে জলাশয় বন বনানীর ঘেরা পরিবেশে তাদের বিবাহ অনুষ্ঠিত হবে।

শায়ানের অপেক্ষার সময় নেই। হাসপাতাল থেকে আসার পর শহরে তার মাতৃকবাসে সে আশ্রিত হয়। রুমে সামান্য ছিদ্র রাখার উপায় ছিল না। মায়ের কড়া আদেশ ছিল। বাইরের কোন সংবাদ শায়ানের কান অবধি না এসে পৌঁছয়। মুক্ত বিহঙ্গের মত শায়ান। কোন রকম অবরোধ তার অসহ্য। শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা তৈরি করে। বরং শায়ান নিজেই তো মুক্তি খুঁজে যাচ্ছে। আর তাই তার জানালা খুলে দিতে হলো। বাইরেরটা থমথমে মনে হলো। বাতাস খুঁজে পাচ্ছে না সে। এ পরিস্থিতির জন্য তৈরি ছিল না একেবারেই। এখনো তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা আলিশার প্রজাপতিগুলোও ছটফট করছে। তারাও কি মুক্তি চায়? আহ্‌, এ আবার কি রকম অবস্থা তৈরি হলো! সে বোঝার চেষ্টা করে। তার এই ভগ্ন দশায় প্রজাপতিগুলো আর কতদিন এভাবে বেঁচে থাকবে। প্রজাপতি মানেই তো মুক্তি। মুক্তি কে না চায়? আর কতদিন প্রজাপতি বেঁচে থাকে, তার শূন্য খাঁচায়? নিথর শরীরে? শরীরের শক্তি তার কিছু ফিরে এসেছে। সে শরীরে সে উঠে দাঁড়ায়।

বাইরের গুমোট হাওয়া তার জন্য কি কোন বাণী হয়ে আসছে? মেঘটাও ধূসর। এ আলো এ পরিবেশে প্রজাপতির উড়তে নেই। সুতরাং সেগুলো তার বুকেই চাপা পড়ে থাকে। হঠাৎ করে শায়ানের বুকে অজানিত এক দোলা জাগে। কিসের দোলা? বুকের ভেতরের প্রজাপতির ডানার? অজানিত আশঙ্কাও বটে। শায়ান আর অপেক্ষা করে না। দূর পাহাড় তাকে হাতছানি দিচ্ছে। শরীরের যে শক্তি ও সজীবতা ফিরে এসেছে, তা নিয়ে সে ছুটতে থাকে। এক সময় লোকালয়ের স্পর্শ এড়িয়ে ছুটতে থাকাবস্থায় এক যুবকের বিদ্রুপমাখা শ্লেষ উক্তি তার ভিতকে নাড়া দেয়। ‘শালা, বোধাই একটা। মাগীটা বিয়া করতাছে আরেকজনকে। আর হে এহানে মজনু হইয়া ঘুরতাছে। দুইনন্যার বোধাই আর কারে কয়!’ শায়ান ভড়কে উঠে সাথে সাথে। বেশ থতমত খায়। থেমে যায়। আর একজন তার দিকে এগিয়ে এসে ধারালো গলায় বলে, ‘কী আর করবেন! আর দুইটা দিন অপেক্ষা করেন। তাইলেই সব টের পাবেন। কাল মাইয়ার গায়ে হলুদ। তার একদিন পর তো আসল বিয়া।’ এই বলে লোকটা হাসতে থাকে। তার আশে-পাশের লোকগুলোও অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।

শায়ান আর টিকতে পারে না সেখানে। আবার ছুটতে থাকে। একটু খুঁড়িয়ে সে ছুটছে। কিছু পর পর সে থেমে থেমে চলে। বুকে ব্যথা অনুভব হয়। মনে হয়, প্রজাপতিগুলো মুক্তি খুঁজছে। তারা স্নিগ্ধ আলোর পানে ছুটতে চায়। কিন্তু বাইরে তো আলো নেই। গুমোট ধূসর। এই ধূসর সমুদ্রে প্রজাপতিরা কোথায় বেরিয়ে গিয়ে বাঁচবে। জোর করে তাদের শায়ান বুকের মাঝেই আটকা রাখে। অনেক কষ্টে হোঁচট খেয়ে ছুটতে ছুটতে সে পৌঁছে যায়, সেই নতুন বাড়িতে, যে বাড়িটি শুধু আলিশা এবং তার জন্য নির্মিত। সে বাড়ির ভেতরে ঢুকলে পাগলের মত দেয়ালে দেয়ালে হাহাকার বাড়ি খায়। শায়ান বুঝে উঠে না তার কি করার আছে? আগামীকাল গায়ে হলুদ। এটা কোন দুঃস্বপ্ন, তা তাকে চিন্তাগ্রস্থ করে রাখে। এ কি তাকে বিশ্বাস করতে হবে? ও আমার প্রেম, আলিশা। তুমি শুনছো কি, কি বলছে ওরা? ও মন কোথায় তুমি?

বাইরে এক সময় কোলাহল উঠে। কিছু লোকজনের গলার আওয়াজ পায় শায়ান। সে ধীর স্থির পায়ে এগিয়ে যায়। তাকে দেখে লোকজন বিস্মিত হয়। একজন তেজী গোছের লোক এগিয়ে এসে তাকে বলে, ‘ও আপনি এখানে? ভালই হইল। দু’দিন বাদে বিয়ে তো আপনার এই বাড়ির সামনের এই গাছতলায় হবে। আমরা সব দেইখা শুইনা যাইতাছি। যদি তেরপাল টাঙ্গাইতে হয়, তাও টাঙ্গামু। কিন্তু আপনার জন্য খাস দাওয়াত। কোথাও যাইবেন না, কইলাম।’ মাথা একটা ঝাড়ি খায় শায়ানের। কি বলে লোকগুলা? ওরা কে? উত্তেজিত হয়ে সে জিজ্ঞেস করে বসে, ‘এই তোমরা কারা? আমার এইখানে কি?’

”আপনার এখানে মানে? ব্রোঙ্কো ভাইরে কি বুইলা গেলেন এত তাড়াতাড়ি। ভুইলা যাবারই তো কতা। যা মাইরডা খাইছিলেন না। আমরা তো জানাযার জন্য রেডি অইয়া গেছিলাম। আল্লাহ আপনার প্রতি কত দয়ালু। এ যাত্রায় বাঁইচা গেলেন। যাউক গা – ব্রোঙ্কো ভাই আর আলিশা ভাবীর বিয়া এইখানেই পড়ানো অইব, এইটা ব্রোঙ্কো ভাইয়ের নির্দেশ। এই তো শুক্কুরবার দিন, জুমা বাদ। আপনিও থাকবেন। ব্রোঙ্কো ভাইয়ের পক্ষ থেইক্যা দাওয়াত। আপনেরেও আমরা চাই।” এই বলে, লোকগুলো জোরে সোরে এক পশলা হাসি দিলো। প্রচন্ড হতাশা শায়ানকে ছেয়ে ফেলে। জলাশয়ের পাশে চলে আসে সে।

১৬

সারা শহর জুড়ে না কি একটা দু’টা করে প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে। হলুদ রঙ মেখে নিয়ে। খুব ধুমধামে আলিশার গায়ে হলুদ চলছে। ছোট এই শহরের আকাশে বাতাসে তার খবর ছড়িয়ে পড়ছে। কব্জি অবধি যে হাত শায়ান কেটেছে গতকাল, তাতে সাদা ব্যান্ডেজ। তার যন্ত্রণাগুলো এখন হিংস্র হয়ে পড়ে। ভেতরের প্রজাপতিগুলো সব প্রতিক্রিয়া হারিয়ে ফেলেছে। তার ভেতরের তীব্র বেদনা হিংস্রত্বে রূপ নেয়।

১৭

বারগেন্ডি ওয়েডিং গাউনে সেজেছে কালো আলিশা। বিউটি পারলারের বিউটিশিয়ান তাকে সাজিয়েছে। মাথার চুল থেকে কাঁধে নেমে এসেছে হালকা ফিনফিনে বারগেন্ডি নেট। অপরূপা। জুমা শেষে পুরুষরা একে একে ফিরছে। একটু পরই এসে যাবে বর ব্রোঙ্কো তার দলবল আত্মীয় স্বজনসহ। কিন্তু ঠিক এই সময়ে এমন একটা মূহুর্তের জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না।

বাইরে গোলাবাজির শব্দ। ব্রোঙ্কো কি তার পুরোনো হিংস্রতায় আজ এই দিনে এভাবে আনন্দ প্রকাশ করছে? তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরীরা এতে একধরণের আতঙ্ক বুকে ধারণ করেও বিয়ের উত্তেজনার আনন্দে ধাবিত হয়ে বাড়ির বাইরে আসে বেরিয়ে। তাদের ভ্রম ভাঙ্গে সেই সাথে। শায়ানের এই ভয়ংকর ভয়াবহ রূপ একেবারেই অপ্রত্যাশিত তরুণ কিশোরী গন্যমান্য সবার কাছে। পেছনে এক জীপ গাড়ি। শায়ানের সারা শরীর আবৃত বুলেটের কার্তুযে। দু’হাতে আধুনিক অস্ত্র। যুদ্ধংদেহী সাজ। শায়ান অশান্ত আজ। সব কিছুকে চুরমার করে দেবে। বাতাসেও বারুদের গন্ধ। এখানে প্রজাপতিদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না।

বিয়ে বাড়িতে সবাই শংকিত। গুরুজনদের শংকাটা বড় ভয়ানক হয়ে উঠছে। কিংকর্তৃব্যবিমূঢ় হয়ে উঠে বিয়ে বাড়ি। যে কোন মূহুর্তে, যে কোন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। একবার ব্রোঙ্কো ও তার দল এ বাড়িতে এসে গেলে পরিস্থিতি যে কোন দিকে মোড় নিবে, তা সহজেই অনুমেয়। শায়ান বিয়ে বাড়ির ভেতর বীর দর্পে এগিয়ে যায়। ভয়ের মত এক মারাত্মক অনুভূতি সৃষ্টি করে আলিশার সাজ কক্ষের দিকে আগাতে থাকে। অস্ত্রধারী শায়ানের সামনে থেকে সবাই সরে যেতে থাকে। অশেষ আতংকে পুরো বিয়ে বাড়ি আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। এখনই মৃত্যুপুরীতে রূপান্তরিত হবে এই প্রাণবন্ত সরব বিবাহ অঙ্গন। কেউ কেউ চোখ বুজে ফেলে আশংকায়। শায়ানের এমন রূপ কারো সুদূর কল্পনায়ও নেই।

মূহুর্ত দেরী করেননি ফয়েজুর রশীদ বোনো। বিদ্যুৎবেগে চলে আসেন বিয়ে বাড়িতে। তিনি ছাড়া আর কেবা আছেন এই পরিস্থিতিকে কূটনৈতিকভাবে সমাধান দিতে পারেন। শায়ানকে তার জানা ছিল, জানা ছিল সব ঘটনাই। তার সন্তানের সাথে সংঘর্ষের ইতিবৃত্ত। কিন্তু ছেলেটা যে এভাবে গর্জে উঠবে, এটা ভাবেননি। কী আর করবেন তিনি। অনেক ভেবেও হদিস মেলেনি, কিভাবে এত অস্ত্র এলো এই ছেলেটার হাতে। কে আছে এমন এই শহরে অন্ততঃ তাকে না জানিয়ে একে এত অস্ত্র দেয়? ক্ষমতাসীন দলে তিনি এখন নেই। তাই বলে ক্ষমতার সাথে যিনি এখন জড়িয়ে, তার সব কর্মকান্ড নখদর্পণে নেই, এমন তো নয়। এ রকম কোন ইঙ্গিত তিনি পাননি। তাহলে কি? এই শহরের অন্য প্রান্তে সেনাদের একটা ছাউনি আছে। সেখানে হতে কি? কেউ কি আছে সেখানে শায়ানের সহানুভূতিশীল। নইলে এমন কাজ করার সাহস-ই বা কার? একটু থমকে যান ধূর্ত ফয়েজুর রশীদ বোনো। বুঝে উঠেন, এতে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে কিছু করতে নেই। এই ঘটনায় কোন প্রতিক্রিয়া দেখাতে নেই। ভাগ্যিস, ছেলেকে জানিয়েছিলেন, তিনি নিজে ঘটনাটা আগে বুঝে নেবেন। তারপরই যাবেন প্রয়োজনীয় একশানে। ছেলে যেভাবে অস্থির ও গোঁয়াড় হয়ে উঠেছে, তাকে সামলানোই তো ছিল অসম্ভব। ব্রোঙ্কোর সারা শরীরে কিছু ভীমরুল হুল ফুটাচ্ছিল। অগত্যা বোনো তার খুব কাছের কিছু মাসলম্যন দিয়ে পাহারায় রেখে এসেছে তাকে। বোনোর অনুমতি ছাড়া ব্রোঙ্কোর বাড়ি ছাড়া নিষেধ। ঠিক বিয়ের আসরের আগে এরকম হেস্ত-নেস্ত পরিস্থিতি, তার বিরুদ্ধাচরণ, শায়ানের ধৃষ্টতা, পুরো বিয়ের আনন্দঘন পরিবেশকে তছনছ করে দেয়া ব্রোঙ্কোকে উন্মাদ করে তুলছে। এমন একজন এই শহরে আছে, সে তার কল্পনারও ধরা ছোঁয়ার বাইরে। লন্ডনে থেকেও সে তার এই প্রিয় শহরকে প্রতি মূহুর্তে পর্যবেক্ষণে রেখেছিল। এই শহরের লোকের বা পরিবেশের সামান্য কিছু পরিবর্তনও তার না জানার বাইরে ছিল না। তার প্রচ্ছন্ন সায় ছাড়া কোন ধরণের ব্যবসা, অর্থ উপার্জন এখানে হালাল হয়ে উঠেনি, সেটা ক্ষমতাসীনই হোক বা ক্ষমতার বাইরের কারো দ্বারা হোক। নিয়মিতই তাকে এই শহর সম্পর্কে অভিহিত করে গেছে তার তৈরি করা ব্রোঙ্কো বাহিনীর একেবারেই ভেতরের গুরুত্ববাহী দায়িত্ববান লোকেরা, প্রভুভক্ত প্রাণীর মত। আজ কী না তার বিবাহের এই ক্লাইমেক্স মূহুর্তে এমন বৈরী বিদিকিচ্ছি আচরণ! ব্রোঙ্কোর ভেতরের আহত বাঘটা ফুসতে থাকে। গর্জন করার শক্তি সে হারিয়ে ফেলেছে। হাতের কাছে পেলেই শিকারীকে এক্কেবারে ছিঁড়ে খুঁড়ে তছনছ করে খাবে। ঘটনাটা তার সকল হিসেব-নিকেশকে মিথ্যে করে দিয়েছে। হাতের মুষ্টির এক প্রচন্ড শক্তিতে সে তার বসার ঘরের মাঝের ডিম্বাকৃতির কাঁচের টেবিলটা ভেঙ্গে ফেললো। বরের হাত আজ রক্তাক্ত। ডান হাতের কব্জি থেকে বাহুর কাছ অবধি রক্তাক্ত। অসাধারণ এক দ্বন্দ্ব ও বৈরীতা এই ছোট্ট শহরটাকে আচ্ছন্ন করে ফেললো। পুরো শহরজুড়ে কেউ আজ আর প্রজাপতির দেখা একেবারেই পাচ্ছে না।

শামান সাত্ত্বিক | ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০১১ | ১৫:০২ বিভাগ: গল্প

Advertisements

তথ্য কণিকা শামান সাত্ত্বিক
নিঃশব্দের মাঝে গড়ে উঠা শব্দে ডুবি ধ্যাণ মৌণতায়।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: