এ লে ফ্লে দ্যু মাল – ৪

এ লে ফ্লে দ্যু মাল – ৩

১১

স্কুল পথে মটর বাইকে ব্রোঙ্কোকে দেখে অথবা কলেজে যেতে আলিশার বুকের ভেতরের প্রজাপতিগুলোর কখনো ঘুম ছুটেনি, নির্ঘুম রাত কাটেনি। প্রজাপতিগুলো মাঝে মাঝে হাওয়ায় উড়েছে আলিশার সাথে হেঁটে যেতে যেতে। মুক্ত হাওয়ায় উড়ে বেড়াতে কার না মন চায়! যেই না শুনেছে ব্রোঙ্কোর মটর বাইকের গর্জন, ওরা দেরী না করে ভীত-ত্রস্ত হয়ে আলিশার বুকের গভীরে ডুবে গেছে। এই প্রথম এক কন্যাকে দেখে বড় অপরিচিত ঠেকে ব্রোঙ্কোর। কালো রূপের কন্যার ভেতরটাকে অদ্ভূদ ঠেকে। কন্যার রূপের গরিমা নাইবা থাকুক, মনের গরিমা যে ঠিকই বুঝে ফেলে চতুর চোখের ব্রোঙ্কো। মনের এই গরিমা তার কালো কুসুম রূপে যে ঝলক তুলতো, তাই ব্রোঙ্কোর চোখে ধাঁ ধাঁ লাগিয়ে দিতো। এই রূপকে কুক্ষিগত করার এক তীব্র স্পৃহা জেগে উঠতো তার মধ্যে। মাঝে মাঝে তাকে প্রচন্ড অস্থির করে তুলতো। কিন্তু পাত্রীর নিস্পৃহতা তার জ্বলন্ত রাগকে নির্বোধ করে তুলতো। কোন এক ক্ষিপ্রতায় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতো সে। করতো তার প্রতিহিংসাকে নিবৃত্ত। বংশ পরম্পরায় গড়ে উঠা তার এতদিনের সমৃদ্ধি একটা চ্যালেজ্ঞের মুখোমুখি। কি নেই তার? সামাজিক প্রভাব প্রতিপত্তি দাপট। আর কি চায়? প্রয়োজনে যুদ্ধে নেমে গেছে সে নিজ অধিকার আদায়ে। আর কি না এই পুরুষ্টু ঠোঁটের কালো গোলাপ কী এক দুর্বিনীত দৃষ্টিতে প্রতি দর্শনে তাকে গ্রাহ্যের বাইরে রেখে যায়! কিন্তু এখানে কোন সংগ্রামের অনুভব নেই। তার অধিকার আদায়ের তীব্রতা নেই, ব্রোঙ্কো ভালই জানে। মেয়েটার গ্রাহ্যের বাইরে তার অবস্থানকে সমীহ ভাবে নিয়ে নেয় ব্রোঙ্কো। এ পরোক্ষ বিতাড়ন তাকে ক্ষ্যাপাটে করে তোলে, সে সাথে তীব্র আকর্ষণ তৈরি করে কিশোরী ভাব অতিক্রমনরত এই তরুনী নারীর প্রতি। সে সাথে সৃষ্টি হয় এক দুর্বার ভাললাগাবোধ। এতদিন কোন কিছু দখলে আনার যে দুর্দমনীয় তীব্রতা কাজ করতো, আজ তা অন্য এক ভুবন জয়ের নেশায় তাকে উতল করে তোলে। এই প্রথম তার খেদ জমে নিজের প্রতি। নিজের মাঝে কিছু একটার অভাব তীব্রভাবে সে বোধ করে। তার অপ্রতিরোধ্য বাসনা যে কোন পূর্ণতার আশায়, যখন তখন যত্র তত্র ছুটেছে। আজ তার দমন সে মানতে চায় না। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে বসে, ‘তোমার জন্য যা যা প্রয়োজন, তার সব বাজিতেই আমি জিতবো। আমার বাবার ইচ্ছা সাত সমুদ্দর তেরো নদী পাড় থেকে নিয়ে আসার এক স্বর্ণাভ কাগজের সনদ, সম্মান করে যাকে সবাই ডিগ্রি লাভের সার্টিফিকেট বলে। যা না হলে না-কি মানুষের জীবনের কোন মূল্যই নেই। তার চেয়েও বড় স্বর্ণ হীরক বা মুক্তোর প্রয়োজনে গভীরে নেমে যেতে পারি আমি হাঙ্গরের সাথে যুদ্ধ হেনে, গহীন গুহার ভয়ংকর আঁধারে জীবন রেখে বাজি। তবুও চাই পেতে তোমাকে পাহাড় ঘেরা ঝর্ণার জলের গভীর দেশে। আমার চরণ সেবায় তোমায় নিয়োজিত হতে।’

স্থানীয় বেতারে ঘোষিত হয়ে গেছে বন্ধুমহল হয়ে এই ছোট শহরটাতে, ব্রোঙ্কোর পাত্রী ঠিক হয়ে গেছে। ব্রোঙ্কো বিলাতেও যাচ্ছে। বিলাত ফেরত হয়ে আসার পরই আলিশা-ই করবে তার ঘরকে রোশনাই। এই শহরের আর কোন রোমিও এখন পর্যন্ত পয়দা হয় নাই, আলীশার নজরকে তার দিকে ঘুরিয়ে দেয়। সেক্ষেত্রে একতরফা ডুয়েটে যেতে আপত্তি নেই ব্রোঙ্কো বাহিনীর। আলিশার প্রতি সামান্য কৌতূহলী যে কোন রোমিও বা অন্য কোন যুবকের জন্য যে দুঃসংবাদ তাও ছড়িয়ে আছে সংবাদের কানায় কানায় – তারা সব থাকবে কড়া গুপ্তা নজরদারীর। সেটা ব্রোঙ্কো থাকুক দেশে বা বিদেশে।

ছেলের এই জোরাজুরির ফয়েজুর রশীদ বোনোর কোন আপত্তি ছিল না। প্রথমতঃ অস্থিরমতি ছেলেকে শান্ত রাখার জন্য এতে তার চুপ থাকা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না। দ্বিতীয়তঃ আলিশার তেজোদীপ্তি গুণ আর বংশের খবর তার জানা ছিল। তৃতীয়তঃ বিলেত যেতে ছেলের নিদারুন অনীহার হঠাৎ পরিবর্তন বোনোকে উল্লসিত এবং উচ্ছ্বসিত করে তুলে। বোনোর ইচ্ছাই যখন এই শহরের ইচ্ছে। পুরো ব্যাপারটিতে আলিশার পিতার নীরবতা সারা শহরে এই সত্যকে একতরফা প্রতিষ্ঠিত করে। আলিশার শির সোজা থাকে। পায়ে হেঁটে এখন ভীত সখীদের হারিয়ে একা একা স্কুল যাতায়াত থেমে যায়নি। আর দূর থেকে তার আসা দেখে, তার চলার রাস্তা সভয়ে যুবকশূন্য হয়ে উঠে। এক দেমাগী নিঃসঙ্গ প্রিন্সেসের আগমন ও সড়ক পরিভ্রমণের নামান্তর হয়ে উঠে তা।

১২

শায়ান অস্থির হয়ে উঠে এ নন্দন অঙ্গনে। আলীশা তার সম্মুখে এসে দাঁড়িয়ে যায়। ভোরের বাতাসে যেন আলিশার সুবাস চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। এই বন বনানী তার চেতনায় তীব্র অনুরণন সৃষ্টি করছে। আলীশা সর্বত্র জেগে গেছে। এই আলোয়, দূর রৌদ্রে। আলীশার চিৎকার কি সে শুনতে পেলো? তার উচ্ছ্বাস, কলকল হাসির জোয়ার। হায় কোথাও কোন ঝর্ণা নেই। আলিশাও কি নেই? কান পেতে শব্দ শোনার চেষ্টা করে, কিন্তু স্বচ্ছ জলাশয়ের পানির কুল কুল ধ্বনি ছাড়া আর কিছুই শায়ানের কর্ণকুহরে পৌঁছালো না। কোথায় হঠাৎ চীৎকার উঠলো “শায়ান!” আবার তা মিলিয়ে যায়। এই বনানী, জলাশয়ের কুল কুল ধ্বনি শায়ানকে এর বাইরে যেতে দিচ্ছে না। দূরে ট্রেন যাবার আওয়াজ সে শুনতে পায়। কোথায় সে আলিশাকে খুঁজবে। ওরা ওকে কোথায় নিয়ে গেছে ধরে। চোখে অশ্রুর বাষ্প জেগে উঠে তার। ভাসমান চোখের জল বাঁ-ডান হাতে আলতো মুছে নেয়। যে সুরের নিক্কন আলিশা জাগিয়ে দিয়েছে তার প্রাণে, সে সুর সর্বত্র সম্প্রসারিত সুবিস্তৃত হয়ে গেছে। এ থেকে শায়ান আর নিজেকে চ্যূত করতে পারে না। এবার সে নিজে নিজে তার দু’কানের দু’পাশে দু’হাত মেলে গগণবিদারী চীৎকার করে উঠে, “আ-লি-শা!” কোথাও কেউ নেই। চারিদিকে এক কাঁপন উঠে। এই বসন্তে গাছপালা প্রকৃতিতে কেমন এক ভাঙনের সুর বাজে। জলাশয়ের পানিগুলোও ভেঙ্গে ভেঙ্গে আগাচ্ছে। তেষ্টা বোধ করে শায়ান। আজলা ভরে পানি তুলে প্রথমে চোখ মুখে মেখে নেয়। ভেজা চোখ মুখে এবার সে সূর্যের আলোর দিকে তাকায়। আলোকেরশ্মির কোমল তীব্র উষ্ণ ছিঁটা তার চোখ মুখে তুলে নেয়। কোথাও পাখি ডাকার আওয়াজ শুনে। আরেকবার চীৎকার করতে ইচ্ছে করে, “আ-লি-শা!” শায়ান সন্দিহান, এই চীৎকার আলিশার কানে গিয়ে পৌঁছুবে কি? এবার তার ভগ্ন হৃদয়ে হালকা বরফ ভাঙ্গার মোচড় তোলে। ঝুর ঝুর বরফ কিছুটা ঝরে পড়ে। নিজের এই ভগ্নতাকে সামলায় শায়ান। কিছু একটা করার তীব্রতা জেগে উঠে, এই নির্মল আকাশ সূর্যরশ্মি ও খোলা প্রকৃতিকে আরেকবার স্বাক্ষী রেখে। কিন্তু তা কী! শায়ান বুঝে উঠে না। রাতে যেখানে এসে নেমে থেমে ছিলো কিছু সময় তারা দু’জন, সেখানে ফিরে আসে সে। এবার তার আবেগের বাঁধ ভেঙ্গে যায়। যে আকাশ বাতাস প্রকৃতিকে স্বাক্ষী করে তারা যাত্রা শুরু করেছিল গতরাতে, তার প্রতি তীব্র এক ক্ষোভ তৈরি হয় তার। প্রচন্ড আক্রোশে ফেটে পড়ে সে। কী এমন আমি করেছি, আমাকে রেখেছো তার থেকে সুদূর! কান্নায় অবনত হয় সে। কাঁদতে কাঁদতে ছুটে যায়, জলাশয়ের পাড়ে। চোখের পানি জলাশয়ের পানির সাথে মেশে। শায়ান বুক ভরে হাওয়া নেয়।

জলাশয় বন বনানী ছেড়ে শায়ান অনিকেতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। এক সময় দূরে পাহাড়ের উপর হাঁটতে থাকে। দিগন্ত জুড়ে আকাশ। মেঘ। মেঘ তাকে স্পর্শ করে। শায়ান চলতে থাকে।

১৩

এভাবে কয়দিন ধরে পাহাড় থেকে পাহাড়ে সে হেঁটে চলেছে। শায়ান তা জানে না। আদৌ কি সে ঘরে ফিরেছে? কিছু খেয়েছে? এক সময় দূর থেকে পাহাড়ের ভিন্ন দিক থেকে একটা দলকে এগিয়ে আসতে দেখে তার সম্বিত কিছু ফেরে। লোকগুলো কেমন এক চাঞ্চল্য নিয়ে ছুটে আসছে কি তার দিকে? ভ্রু কুঁচকে ওই দিকে তাকায় শায়ান। কেমন পরিচ্ছন্ন চমৎকার সাজে একজন। উন্মাদ তেজোদীপ্ত পদক্ষেপ তার। তাকে ঘিরে অন্যরাও এগিয়ে আসছে। লোকগুলো এগিয়ে আসতেই শায়ানের চোখে পড়ে তাদের ক্ষিপ্রভাব । আরে, তাদের সবার হাতে হকিস্টিক কেন! কাছে এসেই বেদমভাবে তারা শায়ানকে মারতে থাকে। শরীরের সর্বত্র জুড়ে হকিস্টিকের আঘাতের পর আঘাত। শায়ান অল্পতেই ধরাশায়ী হয়ে পড়ে। এক সময় সে সংজ্ঞা হারায়।

১৪

শোনা যায়, মাস তিনেক ধরে শায়ান কমা-তে ছিল। এদিকে ব্রোঙ্কো ঘোষনা দিয়ে ছাড়ে, যেদিন শায়ান হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ঘরে আসবে, তার এক হপ্তার মধ্যে সে আলিশা-কে বিয়ে করবে। যে লেলিহান যাতনা বুকে নিয়ে সে এক হপ্তার মধ্যে লন্ডন ছেড়ে দেশে ফিরেছে, তখন প্রতিটি বিন্দু বিন্দু মুহুর্ত তাকে জ্বলে পুড়ে এসিডে কুকড়ে কুকড়ে যন্ত্রণায় নীল করেছে। ঠিকই একই দুঃসহ যন্ত্রণার লোবান সে শায়ানের মাঝে বিস্তৃত করতে চায়। বুঝুক, তার বুক থেকে প্রিয়াকে ছিনিয়ে নেবার নীল দংশন। ব্রোঙ্কোর এই নব ঘোষণায়, শহরের মানুষের মাঝে সিনেমা থিয়েটার উপভোগের মত এক বৈচিত্র্যময় অবস্থার সৃষ্টি হয়। মঞ্চের পর্দা কখন সরে আসবে, তা দেখার জন্য নীরব চাপা অপ্রকাশিত উত্তেজনা বিরাজ করে শহরময়। এই শহরের বাতাসও নাটকের আবহ তৈরিতে জড়িয়ে যেতে গোপন ইচ্ছে ব্যক্ত করে।

শামান সাত্ত্বিক | ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০১১ | ১৫:০৪ বিভাগ: গল্প

Advertisements
%d bloggers like this: