এ লে ফ্লে দ্যু মাল – ২

এ লে ফ্লে দ্যু মাল – ১

বত্রিশ বছর শায়ানের। বাইশে দেশ ছেড়েছিল। মা জিজ্ঞেস করেছিল, বাইরে যাচ্ছিস কেন? সে বলেছিল, সে এক স্বপ্নপুরীতে এক পরীর দেখা পেয়েছিল। পরী তাকে বলেছিল, তাকে না কি সাত সমুদ্দর তের নদী পার হতে হবে। মা বলেছিল, পাগল! কিন্তু এক নাগাড়ে প্রায় দীর্ঘ ন’বছর দেখে কোন পরীর দেখা না পেয়ে, সে শুধু শ্বেত উর্বশীদের গল্প শুনেছিল বৃদ্ধদের মুখে। কেমন এক আকর্ষণ তার ভেতর কাজ করছিল। সে নেশায় থেকে এত বছর কেটে গেছে। একসময় মনে হলো, পরীর স্বপ্ন দেখার জায়গায় সে ফিরে যাবে। মাও তাড়া দিচ্ছিল। বলছিল, তার মনের মত পরীর সে দেখা পেয়েছে। ফিরে আয় বাছা। কিন্তু ফিরে এসে পরে মনের মত পরী তো দূরে থাক, তার স্বপ্ন শয্যায় ঘুমিয়ে থেকেও আগের সেই পরী বা স্বপ্নের খোঁজ সে পায়নি। এমন বিক্ষুব্ধ বা যন্ত্রণাকর অবস্থা শায়ানের কখনো হয়নি। এই প্রথম তার মনে হলো, বাসার কাঁচগুলো সব ভেঙ্গে ফেলতে। টেবিলের খালি চায়ের কাপ আছাড় মেরে খান খান করতে। ঘরের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে দেয়ালের মাঝখানের লম্বা সুদৃঢ় ঘোলাটে কাঁচ ঘুষি মেরে ভেঙ্গে ফেলতে। শায়ান দেখে তার দু’হাতের মুঠোর পিঠে কাঁচের ভাঙ্গা কিছু টুকরো এলোপাতাড়ি ঢুকে রক্তের সাথে মিশে যাচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্য তার হাতে কোন যন্ত্রণাই নেই। কিন্তু সাথে সাথে চমকে উঠে, মাকে উপরে সিঁড়ির, মাথায় দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে। শায়ান তার হাতের মুঠোবদ্ধ কব্জির দিকে তাকায়। না সেখানে কোন রক্তের চিহ্ন নেই, ভাঙ্গা কাঁচের টুকরোও নেই। দেয়ালের মাঝের লম্বালম্বি লাগানো কাঁচে কোন ভাঙ্গা ক্ষত নেই।

বিয়ে। শোয়েবের বিয়ে। শায়ানের খালার ছেলে। একসময়ের কাছের বন্ধু। এখন প্রতিষ্ঠিত ব্যাঙ্কার। সুন্দরী এক রমণীর খোঁজ পেয়েছে। তাই আত্মীয় বন্ধু সবাইকে তার খোঁজ জানিয়ে দিয়ে মহাসমারোহে তার ঘরে নিয়ে আসার আয়োজন করছে। বিয়ে বাড়ীর চারদিকে সাজ সাজ। শান্ত ধীর ছোট শহর। এখানে হাতে গোনা দু’চার উঁচু-অর্থ ঘর। পুরো শহর কোন এক মায়ায় আবেশে শায়িত সটান। কোন এক মায়ার যাদুর কাঠিতে সবকিছু বয়ে চলে নিরবিচ্ছিন্ন সাবলীল শীতল।

পুরো ঠোঁটের মেয়ে সরল কালো পরশ পাথর গোলাপ। কাছে এসেও দূরে থাকে। গায়ে হলুদ কনের পশ্চাতে দাঁড়ানো উর্বশীর মুখে চোখে রহস্যের চাদর। ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে জায়গা হয় না তার। হাত কাঁপে শায়ানের, ইতস্ততঃ ভাব। চমক থেমে থাকে না আর। এসে গেছে সেই পরী সলাজ। সাবলীল সাহসী প্রেমময় প্রেমাস্পদ। হা, ভাঙ্গা কাঁচের কণাগুলো দু’হাতের মুঠোর উল্টো পিঠে ভীষণ যাতনা দিচ্ছে আবার। কাঁচের টুকরোগুলো তার ধমনী শিরায় ঢুকে গেছে মিহি মিহি দানায়। মনে হচ্ছে, একেবারে হৃদপিন্ডে এসে তার কাঁপন থামিয়ে দেবে। শায়ান হয়ে উঠবে অসাড় মৃত। শায়ানের হৃদপিন্ড থেমে যায়। কিন্তু আশ্চর্য কী এক লাস্যময়ী প্রজাপতি ছুটে আসে একের পর একে আলিশার মুখ, পুরু ঠোঁট থেকে। প্রথমে প্রজাপতিগুলো বসে শায়ানের মেরুন শার্টের মখমলে কলারের চারপাশে, তারপর গলার নীচের বোতামের ফাঁক গলে। একে একে ঢুকে পরে একেবারে পৌঁছে যায় তার হৃদপিন্ডে। শায়ান তার বাঁ হাত নড়াতে পারে না। ডান হাতে ধরা তার ক্যামেরা। আলিশার মিহি হাসি মুচকি হয়ে পুরো মুখ জুড়ে প্রসারিত হয়। সে ঘর ছেড়ে পাশের রুমে চলে যায়। শায়ান ঢোক গিলে উঠে পড়ে। এই মাত্র জীবিত শরীরখানি কোনক্রমে টলেমলে পাশের জানালা গলে বেরিয়ে রাতের আঁধারে মিশে চলে। তারপর সটান নেমে এলো তাদের চারতলা বাড়ির ছাদে, যেভাবে প্যারাসুটে নেমে পড়ে আকাশে উড়ে বেড়ানোর সাধে বিভোর আকাশচারী। শায়ানের গা থেকে আলোর দ্যুতি ছুটছে। তাকে ঘরের মাঝে দেখে মা তো রীতিমত অবাক হতভম্ব। তার শরীরের দ্যূতিতে মায়ের চোখ ঝলসে দেয়। গৃহকর্মী ভয়ে হাঁটার জায়গা ছেড়ে দেয়। শায়ান নিজের ঘরে যেয়ে উপরের ছাদের ভেতরের দেয়ালে নিজেকে সেঁটে রাখে, যেভাবে বিছানায় শুয়ে থাকে মানুষ। আর তার নীচে নামার ইচ্ছে নেই।

ধোঁয়া উড়ছে হাঁড়ি থেকে, বিরাট বিরাট হাঁড়ি। রান্নার বিবিধ গন্ধে মৌ মৌ করছে সে দিকটা। মানুষ জন যার যার মত বসে আছে টেবিলের পাশে। কেউ কেউ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জটলা তৈরি করে আলাপে মত্ত, হাসি ঠাঁট্টা, তামাশা, যদিও এক ভাব গভীরতা বজায় রয়েছে সর্বত্র। আজ তো বিয়ের দিন। শোয়েব আসবে বর বেশে গাড়ী করে। শায়ানের সেই অপেক্ষা নেই। তার ভেতরের প্রজাপতি তাকে উড়াতে শিখিয়েছে। এমন মুক্তি তার আসবে সে কখনো ভাবে নি। কিন্তু তার প্রজাপতিগুলো তো তাদের উৎপত্তির মূলের দিকে তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। আসলে কি এই মুক্তি সে চেয়েছিল? এভাবে কালো উর্বশীর প্রতি ধাবমানতা তাকে কোন্‌ স্বপ্নীল পুরীতে ভাসাবে সে জানে না। শায়ান ভেসে যেতে চায়। দীর্ঘ জীবনে এই ভেসে যাওয়াই তার নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পেছনে ফেরার সব দ্বার, ইচ্ছাই বন্ধ হয়ে আছে। তাকে সেই পরশ পাথর গোলাপটার স্পর্শ নিতেই হবে। শায়ান বিয়ে বাড়ির আকাশে বাতাসে ভাসতে থাকে। নীচের সেই মাহেন্দ্র ক্ষণের অপেক্ষা এবং তা পাবার নিশ্চিত আনন্দ বা বেদনা তার মাঝে নেই। সে হাওয়ায় উড়তে থাকে বিয়ের বাড়ির মাঝ আকাশে স্থির ভেসে থেকে। হঠাৎ তার দৃষ্টি নিবব্ধ হয়, বাড়ির লাগোয়া পুষ্প কাননে বসে থাকা সেই কালো উর্বশীর প্রতি। আশ্চর্য হয়ে পড়ে সে। মাত্র দু’চারটে প্রজাপতি তার শরীর ছুঁয়ে বসে আছে। প্রজাপতিগুলো তাদের উজ্জ্বলতাও যেন হারিয়ে বসেছে। কেমন মন মরা মুখ প্রিয় উর্বশীর। তার পুতুল খেলার প্রিয় প্রজাপতিগুলি হারিয়ে এখন নিঃস্বতায় আক্রান্ত। ছ্যাঁৎ করে উঠে ভেতরটা তার। হা প্রিয়া! হা প্রাণ! অস্থির হয়ে পড়ে শায়ান। ডানা মেলে নীচে নেমে আসতে চায় এবার সে। তার ভেতরের প্রজাপতিগুলোও চঞ্চল হয়ে উঠছে যে! প্রজাপতির ডানায় ভর করে সে নীচে নেমে এলো, দাঁড়াতে গেল প্রিয় প্রেয়সীর সম্মুখ। তার আগেই কে যেন ডেকে তুলে নিয়ে গেল তারে বাড়ির ভেতর। শায়ানের ভেতরের প্রজাপতিগুলো তাকে অস্থির করে তুললো। কোন ক্রমেই তারা তাদের মূল আবাস থেকে বিচ্ছিন্ন হতে আর পারছে না। কোথাকার কোন এক আবাসে এত সময় অজ্ঞানে কাটিয়ে দিয়ে এখন তাদের ধৈর্যচ্যূতি ঘটার উপক্রম। ঘুর ঘুর করতে থাকে শায়ান বাড়ির আশপাশ। কোন ঘরে তার প্রেয়সী লুকিয়ে বুঝে উঠে না সে। প্রজাপতিগুলি তার ভেতরে তীক্ষ্ণ কামড় বসায়। সে দিক বিদিক জ্ঞানহারা হয়ে ছুটতে থাকে বাড়ির সর্বত্র। হঠাৎ তার ধাক্কায়, গুতোগুতিতে বাড়ির অতিথিদের বিস্ময় বিরক্তি দুই ঘটে যুগপৎ। হা করে তাকিয়ে থেকে, এই উন্মাদনার অর্থ খুঁজে তারা পায় না। বিয়ে বাড়িতে নাচের হুল্লোড় উঠে। সেখানেও আলিশা নাই। আবার কাঁচ ভাঙ্গার যন্ত্রণা জেগে উঠে তার ভেতর। এক দৌড়ে সে অতিথিদের জন্য জড়ো করা অসংখ্য গ্লাস একবারে যেই ভেঙ্গে ফেলতে উদ্যত হয়, তখনই দেখে দূরে দাঁড়িয়ে দ্বারে প্রাণেশ্বরী তার। ঠিক তখনই পাশের পানির ভরা ড্রাম উল্টে গিয়ে স্লো মোশানে সব পানি ড্রাম থেকে বের হয়ে শায়ানের আশপাশ ভাসিয়ে দিতে থাকে। তার সাদা চোশতের নীচ এবং নাগড়া পানিতে ভিজে সয়লাব। এক সময় সে তার কাছে টেবিলের পাশে রাখা চেয়ারটায় দপ করে বসে পড়ে। কে যেন টেবিলটায় রাখা বুরহানী ভরা জগটা ধাক্কা দেয়। ছলাৎ করে সব সাদা বুরহানী শায়ানের সবুজ পাঞ্জাবীর দখল নিতে ছুটে পড়ে। শায়ানের ঘাড় আর গলার দু’পাশ এবং চিবুক বুরহানীর সাথে কিঞ্চিৎ সখ্যতা গড়ে তোলে এক ভিন্নরূপে সাজিয়ে তুলে তাকে। চারিদিকে পিন পতন নীরবতা। তাকিয়ে দেখছে তামাশা নীরব বাঁয়ে-ডানের অতিথিগণ। তারই মধ্যে দূরের দ্বার থেকে উচ্চৈঃস্বরে গলায় খিলখিল আওয়াজ উঠলো। আলিশা এইমাত্র জেগে উঠলো। খানিক নীরব ভাব। শায়ানের ভেতরের প্রজাপতিও প্রশান্ত ছন্দে উড়াউড়ি শুরু করে দিলো। এ সময় আশপাশের পুরো অঙ্গন এক নিমিষে উধাও হয়ে সেখানে এক শূন্য প্রান্তর তৈরি করলো। সে প্রান্তরের সর্বত্র জুড়ে শুধু রঙিন প্রজাপতি, তা্রা ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়। সবুজ গাছ ও বনানী প্রজাপতিতে ছেয়ে যায়। আর প্রজাপতিগুলো এগুলোর আড়ালে লুকিয়ে নির্বিঘ্নে নিরিবিলিতে ছায়াময় প্রশান্তিতে নিমগ্ন হয়। শায়ান ছুটছে, সামনে ছুটছে আলিশা। আলিশা ছুটে যায় সরল আঁকাবাঁকায়। শায়ান প্রানান্তকর প্রয়াসে তাকে ছুঁয়ে দিতে ছুটে।

দৃশ্যান্তর ঘটে। কাঠ ও মাটির সমন্বয়ে গড়া ভেতরের অন্দরমহলে মিষ্টি কোমল আলো খেলা করছে। বড় ড্রেসিং আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলের পরিপাটি রূপটি আরেকবার দেখে নিচ্ছে শায়ান। হালকা ফর্সা সৌষ্ঠব গড়নের শায়ানের মুখে পাতলা খোঁচা দাড়ি। উদোম শরীর। শুধু কোমরের নীচটা সদ্য স্নান সারা হালকা নীল টাওয়েলে জড়ানো। পাশের বিছানায় বিছানো মখমলের মেরুন রঙটা একটু আগে আলিশার খোলা বুক জড়িয়ে ছিল। সে এখন সেটাকে দিয়ে যতদূর সম্ভব তার অনাবৃত সারা শরীরকে জড়িয়ে নিয়ে এক পা এক পা করে ভীরু মায়াবী প্রেমময়তায় আয়নার সামনে দাঁড়ানো শায়ানের কাছে এগিয়ে আসে। একসময় প্রজাপতিগুলো সারা ঘরময় হঠাৎ উড়তে থাকে। মনে হলো, এতক্ষণ তারা মাটি-কাঠের অন্দরের প্রতিটি অংশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুমিয়ে ছিলো। আলিশা শায়ানের কাঁধে মাথা রাখে। অমনি রঙ-বেরঙের প্রজাপতিগুলো সব উড়ে এসে তাদের দুয়ের পুরো শরীর ছেয়ে যায়। শায়ান তার বাঁ হাতে আলিশার কোমড় জড়িয়ে রাখে। এভাবে তাদের কতক্ষণ কাটে তারা জানে না। ভোরের আলো ফুটি ফুটি করছে। বাইরের দরজায় প্রচন্ড কশাঘাত শোনা যাচ্ছে। প্রচন্ড আঘাতে দরজা ভেঙ্গে পড়ে। ভয়ে প্রজাপতিগুলো আচমকা তাদের শরীর ছেড়ে কাঠের ছাদে পৌঁছে পথ খুঁজে পালাতে চায়। ছিটকে সরে আসে আলিশা। তার আগেই লোকগুলো ঘরে এসে ঢুকে। কোন একজন আলতো করে আলিশাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নেয়। বিদ্যুৎ গতিতে তাকে আক্রমণে শায়ান এগিয়ে আসে। তার আগেই মাথায় প্রচন্ড এক আঘাত শায়ানকে মাটিতে ধরাশায়ী করে। আর কিছু তার চেতনায় নেই।

প্রজাপতিগুলো সারা ঘরময় প্রাণে বাঁচার অস্থিরতায় দিকবিদিক ছুটে চলে। তারা আলোর মুখ দেখতে চায়। ভেতরটা অন্ধকার ঠেকে। কিন্তু আলো নেই। রুপালী আঁধার। ক্লান্ত হয়ে আসে এই প্রজাপতিগুলো।

শামান সাত্ত্বিক | ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০১১ | ১১:৩১ বিভাগ: গল্প

এ লে ফ্লে দ্যু মাল – ৩

Advertisements

তথ্য কণিকা শামান সাত্ত্বিক
নিঃশব্দের মাঝে গড়ে উঠা শব্দে ডুবি ধ্যাণ মৌণতায়।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: