পুরোনো কাব্য সম্ভার

স্বচ্ছ জল আলপনা

গোলাকার বৃত্তে লেগে আঁঠালো
একটুও সরতে চাইছে না দানা দানা মানুষগুলো
কী করে যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলো মহাশূন্যে হঠাৎ
কীসের আলোড়নে হলো বৃন্তচ্যূত
সে এক রহস্য।

রাস্তায় নেমে এলো জোয়ারের ঢল
পানি কেটে সাঁই সাঁই ছুটছিল টগবগে লিমো এস.ইউ.বি টয়োটা ফোর্ড
এখানে হেঁটেছিল সুতন্বী সুষমাময়ী সুশ্যামা বা সু-উন্নতা শ্বেতাঙ্গী
সুবক্ষা কৃষ্ণকলি রগরগিয়ে দুলকি চালে বসেছিল নগ্ন সফেদ অশ্বের ‘পর
ছুটছিল ধোঁয়া, জড়ানো প্রভাত প্রহরকাল নিঝ্‌ঝুম নিরন্ন ভালে
কেঁপে গেছে তুষারে সিক্ত পানি, হিমবাহে শৈত্য ধ্বনি
পতঙ্গ মরেনি এখনো, ঘনত্ব বেড়েছে তার সুষম
গর্জে ছিল আকাশ তুষার জলের সান্নিধ্যে
জলের ত্বরণে নেমেছিল আজ রাজন্যের রাজকীয় মায়া
বসে আছি আমি বরফ ধোয়া চোখে এঁকে স্বচ্ছ জল আলপনা।

দাঁড়াই জলের অতলে

আকাশের নৃত্য; নৃত্যময় আকাশে নিত্য নতুন খবর –
জলদকণা সিঞ্চিত ও অসঞ্চিত।
বারতা পাঠায় মেঘ জীবন থাকুক সোল্লাসে

ঘ্রাণে মত্ত মাতাল মৌতাতে
পূর্ণিমা রাত সশব্দে থমকে
হাইহিল স্কার্টে উথলে উঠে নগ্ন সজীব কৈশোর কোলাহল

ওদিকে দাঁড়ায় মসলিন চাতক পাতক ইশারায়
বুকের কিনারায় সরু সরু মাস্তুল খর শাবল চালায়
রৌদ্র আকাশে ঝিরঝির হাওয়া বহে মৃদু দু’কূল
ছন্দহারানো বণিক নেবে কি করা বাকিতে ভুল?

আমি আদিগন্ত ছুটি মাঠে জোনাক জ্বলানো পথে
অন্ধ আর্তনাদ ভাসাই প্লাবনে মধ্যাহ্নে আঁধার দেহে
প্রাণান্ত বাঁচতে দিই লম্ফ গভীরে খাই খাবি
ডুবে মরা জলে দেখা মেলে আলোর অতলে দাঁড়াই আসি।

ছায়া কায়া

সেখানে আমি উত্থিত হয়েছিলাম
নীরব নিঃস্তরঙ্গ নির্বাণমুখ
শুধু তাকালাম সম্মুখ
ঘেরা কাঁচের বন্ধন
আমার বিপরীত প্রতিচ্ছবি ভাসে
ভাঙ্গে চমক

একজন কাছে ছিলো
বেঁচে থাকার যন্ত্রণা মুখে নাকে গিলে
দু’চোখ বিস্ফোরিত সর্বক্ষণ,
মৃত্যু এসে ভুল বুঝে তাকে করে বরণ

সে মস্তিষ্ক হেলিয়ে চোখ উপরে নিয়ে
কী যেন কী দেখলো এক
অতঃপর নিথর নিস্তেজ শয্যায়
আশাভঙ্গের পতন হলো চিরন্তন।

শূন্যে সে দেখলো তার কায়া
চমকানোর কিছু কী ছিল, নেই জানা
পতন –
দেখে পতন আমার আমারই ছায়া।।

সোনালী আকাশে মেলে পেখম

by Shaman Shattik on Tuesday, June 21, 2011 at 9:52pm

সোনালী আকাশে পেখম মেলে উড়ে যেতে চেয়েছিল দুরন্ত এক সৈনিক
নোনাজল তুলে মুখে
কড়কড়ে নোটের গন্ধ মেখে শরীর মনে
ডুব দিতে চেয়েছিল সমুদ্র গহীনে
মুক্ত সেঁচে আনেনি

শিয়রে এসে বসেছিল এক এঞ্জেল তার
ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল
ডানা ঝাপটাতো তারই মত
পৌঁছে যেতো নদীর ভরা তীর
তর তর করে পানি কেটে বয়ে চলে নৌকো সুস্থির
ধূ ধূ ধূসর দু’প্রান্তর পিছু সরে চলে, দূর দূরে ধীর

বিমর্ষ ছবি হয়ে কেন এলে তুমি দিলে দেখা
গাঢ় বিষণ্ণ দীপ্তি শান্ত দৃঢ় বাষ্পিত অবয়বে
ত্রিশ বছরের পথ খুলে গেল সমানে সামনে
সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে এলে পর
মিশে গেলো স্বর
ঘুম ঘুম স্বপ্নে অদৃষ্টে ওপর

কি দাপট দেখাবো বলো
স্রোত-বিপরীত ধরি হাল, শীর্ণ ছিন্ন লোপাট পাল
মস্তিষ্ক উদ্গীরিত ঘাম, রক্তে মিশে ফর্মালিন ঘ্রাণ

অঙ্গীকারের পালা ঘুচে স্বপ্নীল আকাশ ছোঁয় হাত
রঙিন প্রজাপতি ভাসছে আলোয় খুব বিষণ্ণ আজ
বিস্তৃত বিশাল লেকের জল স্পন্দনহীন – সময় অসময়
ডানা ঝাপটিয়ে ছুটে বাজ চতুর চোখ যেন নিরীহ প্রণয়।।

না বাঁচার ক্ষোভ

by Shaman Shattik on Tuesday, June 21, 2011 at 9:52pm

স্পর্শের উপর স্পর্শ তুলে শূন্যে মেলে চোখ
সে এক চতুর রোগ
ক্ষরিত হৃদয় আলো ফেলে নিপুণ অবিরত
খুঁজে নিতে পাখির রেশম পালক
এ বড় এক শখ।

পানিতে হেঁটে হেঁটে মাছের আসে ক্লান্তি।
ক্লান্তি আসে আমারও সাঁতারে জলপুলে
ক্ষণিকে মিলায় জল শিহরণ তুলে তুলে
সেও তো জলেরই তলে

ক্লান্ত দেহ অবদমিত হলে
দেখে উর্ধ্বে মূর্ত ছায়াপথ
স্মিত শখ
ঘোরের মাঝে ডুবে নিয়তির রথ
ভুলে সৃষ্ট হাতের নিপুণ গৌরব
অবশেষে পড়ে থাকে পেছনে
ফেলে রাখা হতাশার আসব।

অতৃপ্ত ক্ষুধা মরে নি যদিও
ভেসে উঠে তা রাত্রি ভোর
শূন্য বাড়ি ফিরে নিমেষেই
বিষণ্ণ অবয়ব, না বাঁচার ক্ষোভ।।

ছুঁয়ে যায় শক্তিমান ঈশ্বর

by Shaman Shattik on Tuesday, June 21, 2011 at 9:52pm

আমার ভেতরে ঢোকার সময় হয়েছে
গড়ে দেয়া পদক্ষেপ এগিয়ে যাচ্ছে
পৃথিবীর আন্দোলন প্রশমিত হচ্ছে।

সুড়ঙ্গ দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ট্রেন আঁধার পেরিয়ে
ম্রিয়মান আকাশ শীষ তুলছে ভোরের বাতাসে
ব্যস্ত পথিক রাজপথ ছেড়ে উড়ে ঝড় ও জড়তায়
গন্তব্যে পৌঁছা বাকি, সময় সময়ই শুধু হাতড়ায়।

একটা হাতল খুঁজে বেড়াই আমি
জীবনভর যুঁতসই তো মেলেনি এক
কার ড্রাইভের হাতল – মানুষ ঘুরায় ডান বাঁয়
নৌকার মাঝি তার বৈঠা বায়

শরৎ আকাশে সাদা কাশফুলও হেলে দুলে ডান বাঁয়
রাখালিয়া বাঁশিতে শঙ্খ নদ পাল তুলে সুরে সুরে গায়
চোখের কোণায় চিক চিক করে জলের রুপোলি আঁচ
প্রখর রোদের সাথে মানিয়ে গেলো রোদগ্লাসের ধাঁচ।

বিরহ, বিষাদ, বিষণ্ণ ডুবে গেছে জলের শরীর তলে
অরুদ্ধ মন জেগে উঠছে রাত্রির ভরা দ্বি-প্রহরে
চেতনার সিঁড়ি বেয়ে নামে বৃষ্টি, কুয়াশামাখা আলোর ঝড়
নীল আসমান ফুঁড়ে ধাবমান তীর ছুঁয়ে যায় শক্তিমান ঈশ্বর।।

বনের আঁধার ছিল লুকিয়ে

শামান সাত্ত্বিক | জুন ১৯, ২০১১ | ০৭:৪৯ বিভাগ: কবিতা

একটা সমুদ্রাকাঙ্খা নিয়ে আমরা এগিয়ে যেতে চেয়েছিলাম
মনন মগজকে শূন্য রেখে আলোর মাঝে সাঁতরিয়ে ছিলাম
আমাদের যৌবণদীপ্তি হাঁটছিল জলের উপর
হাতের স্পর্শে আমাদের হৃদপিন্ড খুঁজে পাইনি।

বৃষ্টির ঝাঁজ আছে কুয়াশাকে কৌতুক করার
সেও জানে
আচ্ছন্নতা ঢাকে কিভাবে প্রিয় নারীর শরীর
শিমুল তুলার উড়াউড়ি তুষারেরও আছে
জলের প্লাবন ধারায় তুষার নেয় আড়ি

আমরা তখন বনের মাঝখানে এসে গেছি
জলকলোচ্ছ্বাসের শব্দ শুনছি।
আমরা বাঘকে কাছে এসে বসে
থাকতে দেখি।
জলের রাজা সে, জলের মাছের ভোগ তার
জলদেবতার সঙ্গে চলে রঙ্গিলা মধুর জারি-সারি

বনের মেয়ে ছুটে আসে বিধ্বস্ত ক্লান্ত চকিত
ঘুমরাঙা চোখ দেখে আতংকিত শব সুহৃদ
বনের আঁধার লুকিয়ে ছিল সুকঠিন প্রহরায়
নখর বাড়িয়ে ছিন্নভিন্ন করে ঘুমন্ত স্তন ঈশারায়
ঘুমরাঙা চোখে পড়ে কচকচে বালুর সীমাহীন আঁচড়
ঝাঁঝালো ঠোঁট নীল আসমান খোঁজে বহে রক্তগ্নি নহর।

মগ্ন চৈতন্যের সমুদ্র উচ্ছ্বাস

শামান সাত্ত্বিক | মে ১০, ২০১১ | ০৮:১৯ বিভাগ: কবিতা

কিভাবে যে বিচূর্ণ হয়েছি আমি মা আমার জানতেন না।
উনি জানতেন এক সত্য: যা ঘরে বসে কর লেখাপড়া।
আমি শামুকের চলা দেখেছি, জানালা গড়িয়ে প্রায় পুকুর দুপুর
নাহার আপার স্নিগ্ধতা মেখেছি ভরা বৃষ্টিতে স্নাত কুয়োর অদূর

মাকে কিছু বলিনি কখনো
দিব্যি ভোরে বিছানা ছেড়ে ছুটে গিয়ে কুড়িয়েছি ফুল
প্রিয় শিউলি অথবা বকুল।
প্রথম যেদিন পাহাড়ে উঠেছি
নিয়েছি ফুসফুসে বাতাস, শৈশব প্রাণে প্রদীপ্ত প্রবাল

দর্পভরে তাকিয়ে চারপাশ
পাহাড় শীর্ষ চূড়ে দাঁড়িয়ে
প্রতিজ্ঞায় শাণিত হয়েছি
দৃষ্টিসীমায় থাকা বাড়িঘর সব হয়ে গেছে ছোট খুব।
ছোট হয়ে গেছে আমার দূরের দোতলা স্কুল স্বরুপ।

আমি আদিগন্ত বিস্তৃত সমুদ্র গর্জনে
পাহাড় ছেড়ে এসে দাঁড়াই
ঢেউ উচ্ছ্বাসে নিমগ্ন হই
ভেসে আসা মার ভৎর্সনায়
সম্বিত ফিরে এলে শুনি
মা ডাকছেন আমায়
স্কুল ঘরের খুব কাছে বসে থেকে ঝিমধরা দাওয়ায়
মগ্ন চৈতন্যের সমুদ্র উচ্ছ্বাস দূরের হাওয়াতে মিলায়।

সাগর রাতের রুদ্ধ জলোচ্ছ্বাস

শামান সাত্ত্বিক | মে ০১, ২০১১ | ০৯:০৪ বিভাগ: কবিতা

চলমান তাপকে আমি বুকে তুলে নিয়েছি
উপলব্ধি করিনি সে তপ্ত তাপের আঁচ
শিউলী ফুলে ঢেকেছে মরুর শ্যামা শরীর
পোঁচ তুলে হৃদয়ে দিপালীর রক্ত আভ।

সফেদ শুভ্র শাড়ীর ভাঁজে জল জোৎস্না বিম্বিত
আমাকে গ্রাস হতে দেয়নি সে –
কলস নিতম্ব লুকিয়ে তার জরী ঝলমল সাজ

কী করে জানবো জোৎস্না জল খেলছিল খেলা
রূপালী বুকের কুমুদ, অনল অধরে ছোঁয়া
তৃষিত হাহাকার দেখো যদি সাররিয়েল দুপুর
ডালিম রসে সিক্ত হৃদয় স্বচ্ছ কাঁচ তিক্ত ভঙ্গুর

গোলাপ চাও নিতে তুমি? ক্রিমজন গ্লোরী? কোরাল বিউটি?
হুল ফোঁটাবো তবে আজ আমি – পিংকিশ, বিউটি কেয়ারফ্রি

বুঝি, পাখা মেলে উড়ে যাও কবিতার মুক্ত নীলাঞ্চলে
গুণ টানি বুক খুলে নিঃশেষে আমি, বালুময় তট ঘেঁষে

চাও কি নিতে কিছু আরো
কোরো না দেরী আর
দেখো সূর্য এখনো প্রক্ষেপিত বিষুব উত্তর কর্কট।
আসুক নেমে চাঁদ, সাগর রাতের রুদ্ধ জলোচ্ছ্বাস।

কে তুমি এলে রাত দুপুর

শামান সাত্ত্বিক | এপ্রিল ২৩, ২০১১ | ১৭:৪৬ বিভাগ: বিবিধ

কিছু ঘটে কিছু ঘটে না
কিছু ঘটে মাঝে মাঝে
ঘটে হৃদয় তেপান্তরে –
কবিতা হারায় ছুঁয়ে দেখার আগে
বিস্ময় জাগে
জেগে উঠি দিন শেষে রাতে
হৃদয় বিলোপ কবে হলো শরত শুভ্র কারাগারে

সিদ্ধ শীতে –
হিম যন্ত্রণা নিয়ে উপভোগ করি শীতল বিষণ্ণতা
অন্ধ ঘরে কপাট খুলে জেনে নিই, ছিলাম মানুষ কি না?
মানুষ ছিলাম কি না?

হে বিধৌত বিষাদ অন্তর –
আমাকে বিদীর্ণ বিচূর্ণ বিতাড়িত করেছে সে এক মোহন মায়া
আমাকে ভস্মীভূত করেছে জল অনলে এক ত্রিকাল দীর্ঘ ছায়া
আমাকে উন্মূল করেছে স্বদেশ, এক বিরহী প্রিয়া কাজল কায়া

আমি হাঁটি, হেঁটে যাই, চলি হেঁটে
আমি খুঁড়ি, খোঁড়াই, চলি খুঁড়িয়ে
আমি দৌঁড়াতে গিয়ে হোঁচট খাই, মুখ থুবড়ে পড়ার আগে উঠি, দাঁড়াই

ঘোরের মাঝে আমাকে সেঁধিয়ে দেয় নেমে আসা ছান্দিক তু্ষারের তুলো
অনিকেত করে তুলে আমাকে গাঢ় গহীন আঁধার লুক্কায়িত ধূসর আলো

আমি স্ট্রেটচারে শায়িত, সারা শরীর কাটাছেঁড়া হয়
পিত্ত লাল রক্ত চুঁইয়ে চুঁইয়ে গড়ায় ধবল তুষারময় –

ঋণে জর্জরিত আমার শাপান্ত শীর্ণ জীবন
দুপুর রাতে এলে কে তুমি
আমাকে জাগিয়ে তুলে রেখেছো চরম
দুর্মুখ দুর্দান্ত দুরন্ত হে মাধুরী যৌবন।।

শ্রাবণে পৌঁছি রাঙামাটির বন

শামান সাত্ত্বিক | মার্চ ৩০, ২০১১ | ২২:৪১ বিভাগ: কবিতা

কী নেশা! এক থেকে অন্য, অনন্য এক –
অবিনাশ অনন্তকাল অনড় অবশেষ।

কুন্ডলী পাকায় ধোঁয়া
হেলান দেয় দেলানে
নদীর জলে কাঁপন দ্রুত
পোকামাকড়ে হা পিত্যেশ।

জলের আঁচড়ে লন্ড-ভন্ড
প্রাণহীন দু’দিগন্ত দ্বিপ্রহর।
বিচ্ছুরিত আলোয় হৃদয় কোমল স্পন্দন
জল জ্বলে না এখন –
লুকায়িত মিথ্যা অনর্থক অসাড় আলাপন

স্তিমিত আকাশ শিখা বহ্নিমান
বিস্তীর্ণ বিশাল ধূ ধূ খর প্রান্তর
রক্তিম আলোক বিকিরণ
বিরূপ উচ্চারণ শীত কুয়াশার আবাহন
সেই
শ্রাবণ ছুঁয়ে পৌঁছে যাই রাঙামাটির বন।।

বুকে ধম ধমা ধম মাদল

শামান সাত্ত্বিক | মার্চ ২৩, ২০১১ | ২৩:২২ বিভাগ: কবিতা

মরা পচা মৃত
চারিদিকে শত শত।
চোখ খুললেই দেখি

উত্তাপ উল্লাসে মাতি
হাওয়ায় দুলে শ্বেত শুভ্র বাড়ি
চাঁদকে হাতের কাছে ছাড়ি।

ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে স্বর্গীয় সুধা
নারীর চোখের পাতা, ঠোঁট – মুখের কোমলতা
নিঝ্‌ঝুম ঝুম বৃষ্টিতে কাঁপা
তারপর

শূন্যে সকাল ভাসা
অথৈই নিঃসঙ্গ নীরবতা
নিজেকে নিয়ে খেলি
নিঃশব্দে চাবির গোছা তুলি
আবার

জল জোছনা জল
টসটসে নদীর ছল
ঝিলিক তুলে ছুটে মাছ পল পল
বুকে বাজে বড় ধম ধমা ধম মাদল।।

উড়ে যায় পালাকার বিস্মিত যমুনায়

শামান সাত্ত্বিক | মার্চ ২০, ২০১১ | ২২:৩৮ বিভাগ: কবিতা

ফাগুন আকাশ বরফে ঢাকা
মৃত শব ঢেউ তুলে আঁকা বাঁকা

ধূসর মগ্ন প্রভাত কোমল শীতলমাখা
গর্জিত প্রান্তরে স্রোতস্বিনীর থমকে থাকা

রয়েছে বিক্ষেপ, দর্পচূর্ণ আমার, অরুদ্ধ অশ্লেষ
কাঁপে ফাঁপে স্ফুলিঙ্গ পড়ে চাপা ঢাকে গতিবেগ

আজ আমার স্বর উচ্চারিত তোমার স্বরে
মুছে দিলে না ক্লান্তি গহীন রাত্রির স্পর্শে

হবো না বিবাগী আমি অমৃত জোছনায়
বিষণ্ণ অশব্দ আনন্দে
উড়ে যায় পালাকার ঘর ছেড়ে বিস্মিত যমুনায়।।

ঈশ্বর প্রেমে পড়েছিল

শামান সাত্ত্বিক | নভেম্বর ২৯, ২০১০ | ১৩:১৪ বিভাগ: বিবিধ

শোনো ঈশ্বর না কি প্রেমে পড়েছিল সেদিন
পেড়েছিল দু’টো ফল –
ইভ এবং অ্যাপল
বাঁ মুঠোয় তার ইভ
আর অ্যাপলটা সে খেলো
সাথে সাথে এ পৃথিবীর জন্ম হলো।

তাহলে ইভ?
ঈশ্বর প্রেমে পড়েছিলো বাঁধা?
লেখা ছিলো না কোথাও তা
পবিত্র গ্রন্থ হৃদয়ে গাঁথা।

সত্যি ঈশ্বরের প্রেম ছিল
তিনি জানতেন বলে প্রেম
আদমের সাথে মিশে ছিল হাওয়া
হাতালে ধর্মগ্রন্থ খুঁজে যায় পাওয়া।

শেষে একদিন ঈশ্বরের কাছে
আদম এলো হাওয়াও এলো
প্রেমের হিসেব পেতে চাইলে
আদম থেকে ঈশ্বর
সে হিসেবে ফাঁকা কোন পেলো না
হাওয়া থেকে নালিশ বা অভিযোগ

ঈশ্বর পড়লো বিপাকে বড়
ধ্বংসের ধ্বজা উড়লো আকাশে
উড়ে প্রজাপতি মরে চাপা পড়ে।

আমি আমার পূর্বপুরুষ

শামান সাত্ত্বিক | নভেম্বর ২২, ২০১০ | ১৩:২৯ বিভাগ: কবিতা

হলুদ রঙ। হলুদ ধূসর কটকটে সবুজাভ।
মাকে আমার করেছে বেষ্টন।
উন্মূল স্মৃতি হারানো বিরূপ বদ্ধ রাতের ঘোর মাহেন্দ্র ক্ষণ।
ঘুমন্ত বিভোর দন্ডায়মান মা স্বপ্নভূত জাগরণ
খুঁজে ফেরেন কোন এক পবিত্র সময় সন – অরণ্য রোদন।
ধরায় নেমে আসুক তারচে’ আঁধার ঘোর শ্রাবণ।।

আমার পিতৃব্য ও পিতার ক্ষুণ্ণ মন
ঠাসা ব্যর্থতায় অন্তরাত্মার কাঁপন
জলোচ্ছ্বাস প্লাবন মন্বন্তর ধ্বস ধ্বংস দুর্ভিক্ষ দহন
পারে নি নিতে তুলে হাত সবল
কাস্তে কোদাল কুড়াল লাঠি সড়কি বা বল্লম
কুঁপির আলোয় চোখ মেলে কমনীয় নারী তার অপরূপ লাবণ
অগ্নি স্নানে শুচি হন পিতা পিতৃব্য প্রতাপ পুরুষ পরম
ছোপ ছোপ অন্ধকারে নিমজ্জিত ঘরের কোণ আমার জন্মগ্রহণ
সোঁদা গন্ধে মিশে থাকে সকাল দুপুর রাতের তীক্ষ্ণ বুনো রণন

একদা দা টা উঁচিয়ে ছিল। কৃপাণটা নেমে এলো দৃঢ়
পাখিটা উড়ছিল, ঝাপটালো হাওয়া
ডাকে না পাখি আর। অদীপ্ত ভঙ্গির দীপ্ত চিৎকারে চতুর্পাশ জ্বলে খাক
খালটা ছিল চওড়া। থাকেনি থেমে স্বচ্ছ পানির বহমান লোহিত ধারা
লেগে থেকে সবুজ শ্যামলে পাতায় ফুলে মাড়ি মড়কে আবারও খরা।

এক সময় নেমে এলো রূপালী চাঁদ হাতের তালুয়, সানকির পানি গড়াগড়ি খায়
যেখানে মিশবে এসে মাগুরের ঝোল সীম, শীতের আলু – ঢেঁকি ছাটা আউশ দলা
কুয়াশার চাদর জড়িয়ে নেবে আমার ধমনীর নিরুদ্দীপ্ত শোণিত ধারা
উষ্ণ রক্ত হিমানী শির শির স্পর্শ পায়, তারপর আবেশায়িত কোন মায়াবী
রাতে ঝির ঝির বসন্তের গান শোনায়। সেখানে আমার শৈশব নতুনের দেখা পায়।

সব ভূতুড়ে জঙ্গল

২২ অক্টোবর ২০১০, ১৮:০১

আগুনের দিকে ছুটে চলা – আগুনমুখো
শসা সদৃশ লম্বা সার্কাসের সেই তরুণী
টলটল চোখ জলজল চাহনি
উর্ধ্বে বিচ্ছুরিত অগ্নি নিঃসৃত মুখোগহবর
সাউথ’মেরিকান ব্রাজিলীয় তীব্রতা
কাঁচের স্বচ্ছ গড়ন।

ছুটে জোৎস্নায় সে সমুদ্র মন্থন
ঢেলে দেয় বিষ দেহ দহন
চেতনারা বিলুপ্ত, নির্বোধ নিস্তেজ নিথর মৌণ কথন।
অবশ শরীর, বলে গেলে না বলে গানে
সেই রাত্রির ঝাঁঝালো ক্ষণে
দেখা হবে আবার সাগর সঙ্গমে
মাছেরা খেলে গভীর সংগোপনে
সঁপে সব দেহ মন।
উড়ে গেল সে –

ভয়াবহ গর্জন তুলে ছুটে চলে
মেলে ডানা আকারহীন তস্কর
খুঁজে তার ছায়া পলে পলে
মোহাচ্ছন্ন রাতের নগ্ন প্রহর
সে এখুনি বসাবে কাপুরুষ ছোবল –
শুভ্র শুদ্ধ সফেদ শত্রু, সহজ সরল।

নিথর শরীর সাহসে শক্ত কম্পমান
দক্ষিণ সাগরমুখো সবলে ধাবমান
যেতে পথে দেখে অসার সারি তস্কর উলঙ্গ দঙ্গল
ঝুঁকে উঁকি দেয় এই বিস্তৃত আকাশ লেলিহান ফসল
হোক সরানো, এখনই –
পরগাছে থরে থরে ভরে গেছে সব ভূতুড়ে জঙ্গল।

প্রকোষ্ঠ গভীর আন্ধার

০৫ জুন ২০১০, ১১:৪৫

লেলিহান শিখায় প্রোজ্জ্বল নিটোল ফুসফুস
লোহিত কণায় মেশে আলকাতরা তরল

মধুমাস মধু কই
বিকারহীন রৌদ্রঝিম আকাশ।
ঋণ দিলে না
ছায়াশীতল স্নিগ্ধ কাঁঠালকোণ ঘুরঘুর ঘুঘু দোয়েল কইতর।

কাঠের কয়লা খন্ড অখন্ড
সোনালী স্ফটিক আগুণকুন্ড
জ্বলজ্বলে জ্বলে জ্বালা
গরম চিমনি নির্গম ধোঁয়া
লিচু রঙ চোখ টসটসে আম রসে ভরপুর গাল
জাম রঙ রঙিন ঠোঁট কোষ কাঁঠাল।

ভূতুড় নৃত্যে কালের কন্ঠ চেপে হাসে বিজয়বেশ পিচাশ
ঝুলন্ত কুকুর জিভ কম্পমান কালচে লোহিতে উষ্ণ উদগিরণ
ধমকে ধমকে তোলে ধমক বাদুড় ছোটে গাঢ় আঁধার
এখনো হয়নি জন্ম আমার

টপ টপ বৃষ্টি ঝরে ঝির ঝির
গজে উঠে ছাতা এধার অধীর
পরাজয় জানে না আর –
সারি সারি কাতার কাতার
নীরবে দাঁড়ায় দুয়ার –
প্রকোষ্ঠ গভীর আন্ধার।

অহংকারের শূন্য জালে

Facebook Note by Shaman Shattik on Tuesday, July 26, 2011 at 2:51am

গভীর জলে খেলছে শুয়ে দোর্দন্ড রোদ আলো
সাঁতার পুলের দুপুর শরীর আবছা আবছা চতুর কালো
কন্যা মৎস্য, তুমি তিমি হয়ে খেলছো খেলো

আমার শরীর জুড়ে লম্বালম্বি উঁইয়ের উঁচু ঢিবি
অবিরাম বৃষ্টি ঝরে কামড়ে ত্বক উঁইয়ের সারি
নেও না কেন আমায় তুমি ছোঁ মেরে জলের তলে
দিচ্ছো ফেলে ধাক্কা মেরে অহংকারের শূন্য জালে।।

সাম্প্রতিক সময়ের কবিতাগুচ্ছ

এ লে ফ্লে দ্যু মাল – ৩


সম্বিত ফিরে পায় শায়ান। অদ্ভূদ আঁধার এক জড়িয়ে আছে ঘরটাকে। ঝিম ঝিম মাথা নিয়ে মেঝে থেকে উঠে পড়ে। কেমন টলমল লাগছে সব। প্রজাপতিগুলো তার চোখে পড়ছে না। ছটফট করতে লাগলো সে। কোথায় মিলিয়ে গেল এরা। তাদের ছাড়া সে চলবে কিভাবে? তারাই তো তাকে ঘোরতর এক স্বপ্নলোকে উপনয়ন ঘটিয়েছে। যন্ত্রণাটা সুতীব্র হতে থাকে খুব কলজে জুড়ে। ভেতর থেকে চিৎকার উঠে, “আলিশা।” আলিশা নেই। তার প্রজাপতি নেই। পঙ্গুত্ব তাকে জাপটে ধরে আষ্টেপৃষ্ঠে। তার হৃদপিন্ড টেনে বের করে আনছে কে? হাহ্‌।

হঠাৎ অন্য প্রান্ত থেকেও সে চিৎকার শুনতে পায়, “শায়ান। শায়ান।” আলিশা বিছানার যেখানে শুয়ে ছিল, সেখানে বসে তার বালিশে মাথা উপুড় করে রেখে শায়ান যন্ত্রণাকে সামাল দিচ্ছিল। ডাক শুনে চমকে সে মজনুর মত উদভ্রান্ত দৃষ্টিতে ফাঁকা ঘরে এদিক সেদিক তাকায়। তারপর দীপ্ত উগ্র ভঙ্গিতে শরীরে যতটুকু শক্তি সম্ভব জমা করে বীর্যবানের মত ঘরের মূল দ্বারে উপনীত হয়। ঠিক সে সময় ভোরের সব আলো তার খোলা ঋজু দেহটাকে আনন্দে পরিপূর্ণ গ্রাস করে। সূর্যরশ্মি তার দীপ্ত চেতনাকে বিস্ফোরিত করে। ভেতর থেকে ফুঁসে উঠে শায়ান। সে শরীরে কাপড় জড়িয়ে নিতে দ্রুত ঘরের ভেতর প্রবেশ করে।

ভোরের আলো জলাশয়ের এ ধারে এখনো পৌঁছে নি। পত্র-পত্রালীর আড়ালে গাছ গাছড়ার তলে এখানে নিবিড় প্রকৃতি। শায়ান সেখানে মূহুর্ত খানেক অপেক্ষা করে। গতরাতে তারা তো শূন্যে উড়ে এখানে এসে নেমেছিল। বাম বাহুতে আলিশার নিতম্ব পেঁচিয়ে একেবারে প্যারাসুটে করে নেমে এসেছিল উর্ধ্বলোক থেকে এ নন্দন অঙ্গনে।

আলিশা কালো ভ্রমর হয়ে গুঞ্জন তুলছিল বিয়ে বাড়িতে। শাড়ি পড়া কনের সইয়ের বেশভূষ কনেকে ছাড়িয়ে বিয়ে বাড়ির সব আলো কালো রূপের বন্যায় শুষে নিচ্ছিল প্রতিক্ষণ। যুবকরা তার দিকে তাকিয়ে নিজেদের সংযত করে পরক্ষণ। এক আতঙ্ক তাদের স্তব্ধ করে দেয়। আলিশার আশ-পাশ থেকে তারা দূরে ধাবিত হয়। সব আলোকে নিজের কাছে এনে আলিশা তার চতুর্দিকে শূন্যের এক পরিস্কার বৃত্ত তৈরি করে। বৃত্তের চক্রে এসে কে তার বাকি প্রজাপতিদের উড়িয়ে নেবে সে প্রতীক্ষার অবসান হয়ে গেছে। অপেক্ষা এখন শুধু বৃত্তাবদ্ধ হওয়া। এই বৃত্তে যুগলবন্ধী হয়ে উর্ধ্বমুখী হওয়া। বিয়ের মূল আসনে বর কনের সলাজ আসন। আয়নায় একে অপরকে দর্শন। কনের পেছনে দাঁড়ানো আলিশার চোখের পলক আর পড়ে না। সে এক বড় আয়না দেখে তার চোখে। সে আয়নায় ভাসে একটি মুখ, আত্মীয় অতিথি ভীড়ের শেষ প্রান্তে দাঁড়ানো শায়ান। আলিশা সে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে প্রগাঢ়। সে মুখের চোখের পাতা নড়ে একবার। দেখে মুখটাও গভীর সম্মোহনে উলটো মেরু হতে। সে একই আয়নায় গম্ভীর প্রগাঢ় আলিশার প্রেমময় সুখ। তারপর এক এক করে প্রজাপতিগুলো বেরিয়ে আসতে থাকে আলিশা ও শায়ানের শরীরের সর্বত্র থেকে। আলিশা প্রেরিত শায়ানের প্রজাপতিগুলো নেচে নেচে উর্ধ্বে ধাবিত হয়। তাদেরকে অনুসরণ করে আলিশার কাছে থাকা বাকিগুলো। তারপর রঙীন প্রজাপতিগুলো যুগলে যুগলে উর্ধ্বমুখী হয় ছন্দে তালে।

ঠিক সে মূহুর্তে বিয়ে বাড়ির সব আনন্দ উত্তেজনাকে স্তব্ধ করে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। যুবকরা কেঁপে উঠে। ভীত-সন্ত্রস্থ হয়ে উঠে প্রবীণরা। কিন্তু কোন দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে এক ট্যাঙ্গো নাচের ধ্বনি সুর ছন্দ নেমে আসে সব কিছু ছাপিয়ে। সেই পূর্বের সেই শূন্য প্রান্তর যেখানে সর্বত্র রঙিন প্রজাপতি উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। একদিক থেকে সে প্রান্তরে ছুটে আসে শায়ান ট্যাঙ্গো নাচের প্রস্তুতিতে, অন্য প্রান্তরে হতে আলিশা এসে দাঁড়িয়ে গেছে শরীরে তার সব মুদ্রা তুলে। তুমুল চলতে থাকে নাচ। দূরে দাঁড়িয়ে সেই বিয়ের অতিথি মনুষ্যজন। চরম বিস্ময়ে বিস্ফোরিত হয়ে তাকিয়ে দেখছে। তাদের কষ্ট কল্পনায় এমন দৃশ্য নেই। নাচের শেষ দৃশ্যে আলিশা ধনুর মত তার শরীরকে উর্ধ্বমুখী বাঁকা করে শায়ানের বাঁ বাহুতে লুটিয়ে পড়ে। ঠিক সে মূহুর্তে আরেক অদ্ভূত দৃশ্যের অবতারণা হয়। উর্ধ্বলোক থেকে প্রজাপতি সব দ্রুত নেমে এসে এই যুগল মূর্তিকে সম্পূর্ণ পরিবৃত করে ফেলে। একসময় বিয়ে বাড়ির অতিথিরা এই পরিপূর্ণ আসর হতে আলিশা ও শায়ানকে সম্পূর্ণ উধাও হয়ে যেতে দেখে। এই ঘটনায় প্রবীণরা স্তব্ধ হয়ে পড়ে। আর যুবকরা আতংকে তটস্থ হয়ে এক দুঃসহ আগামীর দেখা পেতে আরম্ভ করে।

১০

ব্রোঙ্কো লন্ডনে। শোনা যায় তার একটা এমবিএ চাই। ল’-তে পড়া সম্ভব হয় নি। মানায় না তার সাথে। বাবার ব্যাবসা-সম্পত্তির দেখাশোনা করতে হবে তাকেই। একদিন সব তারই হবে। বাবা ফয়েজুর রশীদ বোনোর রাজনীতি আর ব্যবসার প্রসার, দু’জন দুজনার। গল্প প্রচলিত আছে এক। সেটা অবশ্য স্বামী-স্ত্রীর জীবন মেলানোর গল্প। গল্পটা এমন। কুরবানীর হাট থেকে একটা খাসী কিনে তাকে হাঁটিয়ে বাড়িতে নিয়ে চলুন। দেখুন খেলাটা জমে কেমন। খাসিটা একসময় ঘাড় ত্যাঁড়া করে খুঁটি গেড়ে বসবে। শত টানাটানিতেও নড়চড় নেই। কিন্তু আরেক সময় ভোঁ দৌঁড়। আর যদি খাসির গলায় বাঁধা দড়িটা আপনার হাতে থাকে, তবে তো কথাই নেই। এবার আপনাকেও তার পিছু পিছু ছুটতে হবে ভোঁ পড়ি-মরি করে, যতক্ষণ পাজিটা না থামে। কেমন গ্যাঁড়াকলে অবস্থা। দেখুন। ফয়েজুর রশীদ বোনোর রাজনীতি যদি ছাগল হয়, এবার বলুন, ব্যবসাটা কখন অচল থাকে। আর কখন ভোঁ দৌঁড় দেয়। ঝানু আদমি ফয়েজুর রশীদ বোনো, রক্তের উত্তরাধিকারী ছেলে আফসার রশীদ ব্রোঙ্কোকে তার রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অর্জনে যোগ্য উত্তরসূরী করে উঠাতে চান। ভালই জানেন, পরিবর্তনশীল এই রাষ্ট্র ও সে সাথে পরিবর্তিত এই সমাজে বিদ্যা অর্জনের চেয়ে ডিগ্রীর মূল্য অনেকখানি। আর সে অর্জন যদি পশ্চিম থেকে ঘটে, তবে তোফা বড়ই।

ব্রোঙ্কো ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল। শৈশব থেকে ভয়ংকর কান্ড ঘটাতেই সে পটু। তার কথার বাইরে সমবয়সীদের যাবার অবকাশ নেই। তাতে হিতে বিপরীত। শত্রুকে মাটিতে ফেলে বুকের উপর পা তুলে দিয়ে মা কালীর লজ্জাটাকে আরো বাড়িয়ে তুলতো। কি রকম দন্ত বিদারী উল্লাস বাবা! বাবাকে হার মানাতো। কে জানি বললো, এ ছেলেটা পারলে, যে কাউকে নরমাংসের স্বাদ ভক্ষণ করাতে জানে। নর রক্ত পান না করেও নিজেকে রক্তপায়ী ভ্যাম্পায়ার থেকে কম দূরে সে ভাবে না। হ্যাঁ, অন্ধকার তার প্রিয়। অন্ধকারে চমৎকার চক্র আছে তার, যাদের দিয়ে গুটি চালা সহজ। ভোর হতেই সে ঘুমে মিলিয়ে যায়। কখনো কখনো ঘুম থেকে উঠে শুনে কিছু ভয়াবহ সংবাদ। শহর জুড়ে অথবা পত্রিকার পাতায় নৃশংসতায় আর্ত চিৎকার। তখন তার চোখের ঢুলু ঢুলু নিদ তিরোহিত। মটর বাইকে করে শহর প্রদক্ষিণ। পেছনে আরো কয়েক জোড়া বাইকে এক তরফের প্রাণের বন্ধুরা, নৃশংসতার সখারা। পুরো শহর সংবাদের ভেতরের সংবাদটা পেয়ে যায়। দোকানপাট, ব্যবসা বাণিজ্য অফিস আদালত চলে তার নিজস্ব গতিতে। কোন কিছুর বন্ধ থাকার কথা নয় আজ। সব নির্মল স্বাভাবিক। শহর জুড়ে ব্রোঙ্কোর টহল সব নিশ্চিত করে যায় । কোথাও কিছুই ঘটেনি। এই শহরে পটকাও ফাটে আবার তার ঘুমিয়ে থাকার সময়। এতে নিদ্রা আরো গাঢ় হয়। বিশেষ করে যখন শহরে চলে ধ্বংস যজ্ঞ ও রক্তের হোলি খেলা বিষন্ন। বন্ধ দোকানপাট ব্যবসা বাণিজ্য, যানবাহন অফিস আদালত। সেদিন ব্রোঙ্কো আর ঘর থেকে বের হয় না। ঘুম থেকে জেগে কার্ড খেলাটাকে বেছে নেয়, একতরফা প্রাণের বন্ধুদের বা তার পিস্তল বন্দুক ছোঁড়ার খেলার সখাদের নিয়ে ধীরে মেতে। অর্জন যা হয়েছে, ভাড়াটে ক্যাডারদের দ্বারা তা হয়ে গেছে। নিজেদের এখন আর বন্ধুক পিস্তল নিয়ে খেলার দরকার পড়ে কি?

ব্রোঙ্কোর এই মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়া অশান্ত অবস্থা কিন্তু বাবা বোনোর মেনে নেয়া সম্ভব হয় না। তার অনুপস্থিতে ব্রোঙ্কোকে টিকে থাকতে হলে, নতুন সময়ের নতুন ফর্মূলাতে পদার্পণ করতে হবে। নিজের অর্জিত বিদ্যা ও প্রতিষ্ঠা দিয়ে এখনই তাকে হিমসিম খেতে হচ্ছে। ব্রোঙ্কোর চাই নতুন ডাইমেনশান। নতুন সময়ে খেলতে জুয়া একটা শিক্ষা, জ্ঞান এবং গর্বের আবরণ চাই, যা হবে ব্রোঙ্কোর নিতান্ত নিজস্ব অর্জন। অস্থিরমতি ব্রোঙ্কোকে এই দেশে রেখে কোনক্রমে শান্ত মনে, বেঁধে রেখে জ্ঞানার্জনে নিয়োজিত রাখা সম্ভব নয়। সে বাস্তবতা অনেক আগেই তিরোহিত এই দেশে। এখন প্রয়োজন তাকে তার পরিচিত শেকড় এবং পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করা। যে আতঙ্কের এক সাক্ষাৎ ইমেজ ব্রোঙ্কো, তাকে যে দিনে দিনে উর্ধ্বমুখী করছে সে, তাকে থামাতে হবে, মানুষের বোধ বুদ্ধি বিবেচনার অন্তরে ব্রোঙ্কোকে এবার জায়গা করে নিতে হবে। ব্রোঙ্কোর বিদ্যা শিক্ষায় নিয়োজিত না হলে, তার আর কোন বিকল্প ফয়েজুর রশীদ বোনো খুঁজে বের করতে পাচ্ছেন না। এখনকার এবং আগামীদিনের তরুণ প্রজন্মের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতাকে প্রতিষ্ঠা করতে, সুশীল শিক্ষায় পশ্চিমী চিন্তাধারায় আলোকিত হয়ে উঠুক ব্রোঙ্কো, পঞ্চাশোর্ধ্ব বোনো ঠিকই উপলব্ধি করছেন। ব্রোঙ্কোর যে আতঙ্কের মূর্তি সারা শহরে জেগে আছে, তার পাশে পশ্চিমী বিদ্যা অর্জন হবে, পরিপূর্ণ সোহায় সোহাগা। শেষমেশ ব্রোঙ্কোকে তাই লন্ডন যেতেই হয় কাঁচা অংকের বিনিময়ে। শোনা গেছে, প্রচুর অর্থের শ্রাদ্ধ করছে ব্রোঙ্কো। কিন্তু পড়াশুনা কতদূর এগিয়েছে, তা কারো তেমন জানা নেই।

শামান সাত্ত্বিক | ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১১ | ০৭:১১ বিভাগ: গল্প

এ লে ফ্লে দ্যু মাল – ৪

এ লে ফ্লে দ্যু মাল – ২

এ লে ফ্লে দ্যু মাল – ১

বত্রিশ বছর শায়ানের। বাইশে দেশ ছেড়েছিল। মা জিজ্ঞেস করেছিল, বাইরে যাচ্ছিস কেন? সে বলেছিল, সে এক স্বপ্নপুরীতে এক পরীর দেখা পেয়েছিল। পরী তাকে বলেছিল, তাকে না কি সাত সমুদ্দর তের নদী পার হতে হবে। মা বলেছিল, পাগল! কিন্তু এক নাগাড়ে প্রায় দীর্ঘ ন’বছর দেখে কোন পরীর দেখা না পেয়ে, সে শুধু শ্বেত উর্বশীদের গল্প শুনেছিল বৃদ্ধদের মুখে। কেমন এক আকর্ষণ তার ভেতর কাজ করছিল। সে নেশায় থেকে এত বছর কেটে গেছে। একসময় মনে হলো, পরীর স্বপ্ন দেখার জায়গায় সে ফিরে যাবে। মাও তাড়া দিচ্ছিল। বলছিল, তার মনের মত পরীর সে দেখা পেয়েছে। ফিরে আয় বাছা। কিন্তু ফিরে এসে পরে মনের মত পরী তো দূরে থাক, তার স্বপ্ন শয্যায় ঘুমিয়ে থেকেও আগের সেই পরী বা স্বপ্নের খোঁজ সে পায়নি। এমন বিক্ষুব্ধ বা যন্ত্রণাকর অবস্থা শায়ানের কখনো হয়নি। এই প্রথম তার মনে হলো, বাসার কাঁচগুলো সব ভেঙ্গে ফেলতে। টেবিলের খালি চায়ের কাপ আছাড় মেরে খান খান করতে। ঘরের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে দেয়ালের মাঝখানের লম্বা সুদৃঢ় ঘোলাটে কাঁচ ঘুষি মেরে ভেঙ্গে ফেলতে। শায়ান দেখে তার দু’হাতের মুঠোর পিঠে কাঁচের ভাঙ্গা কিছু টুকরো এলোপাতাড়ি ঢুকে রক্তের সাথে মিশে যাচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্য তার হাতে কোন যন্ত্রণাই নেই। কিন্তু সাথে সাথে চমকে উঠে, মাকে উপরে সিঁড়ির, মাথায় দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে। শায়ান তার হাতের মুঠোবদ্ধ কব্জির দিকে তাকায়। না সেখানে কোন রক্তের চিহ্ন নেই, ভাঙ্গা কাঁচের টুকরোও নেই। দেয়ালের মাঝের লম্বালম্বি লাগানো কাঁচে কোন ভাঙ্গা ক্ষত নেই।

বিয়ে। শোয়েবের বিয়ে। শায়ানের খালার ছেলে। একসময়ের কাছের বন্ধু। এখন প্রতিষ্ঠিত ব্যাঙ্কার। সুন্দরী এক রমণীর খোঁজ পেয়েছে। তাই আত্মীয় বন্ধু সবাইকে তার খোঁজ জানিয়ে দিয়ে মহাসমারোহে তার ঘরে নিয়ে আসার আয়োজন করছে। বিয়ে বাড়ীর চারদিকে সাজ সাজ। শান্ত ধীর ছোট শহর। এখানে হাতে গোনা দু’চার উঁচু-অর্থ ঘর। পুরো শহর কোন এক মায়ায় আবেশে শায়িত সটান। কোন এক মায়ার যাদুর কাঠিতে সবকিছু বয়ে চলে নিরবিচ্ছিন্ন সাবলীল শীতল।

পুরো ঠোঁটের মেয়ে সরল কালো পরশ পাথর গোলাপ। কাছে এসেও দূরে থাকে। গায়ে হলুদ কনের পশ্চাতে দাঁড়ানো উর্বশীর মুখে চোখে রহস্যের চাদর। ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে জায়গা হয় না তার। হাত কাঁপে শায়ানের, ইতস্ততঃ ভাব। চমক থেমে থাকে না আর। এসে গেছে সেই পরী সলাজ। সাবলীল সাহসী প্রেমময় প্রেমাস্পদ। হা, ভাঙ্গা কাঁচের কণাগুলো দু’হাতের মুঠোর উল্টো পিঠে ভীষণ যাতনা দিচ্ছে আবার। কাঁচের টুকরোগুলো তার ধমনী শিরায় ঢুকে গেছে মিহি মিহি দানায়। মনে হচ্ছে, একেবারে হৃদপিন্ডে এসে তার কাঁপন থামিয়ে দেবে। শায়ান হয়ে উঠবে অসাড় মৃত। শায়ানের হৃদপিন্ড থেমে যায়। কিন্তু আশ্চর্য কী এক লাস্যময়ী প্রজাপতি ছুটে আসে একের পর একে আলিশার মুখ, পুরু ঠোঁট থেকে। প্রথমে প্রজাপতিগুলো বসে শায়ানের মেরুন শার্টের মখমলে কলারের চারপাশে, তারপর গলার নীচের বোতামের ফাঁক গলে। একে একে ঢুকে পরে একেবারে পৌঁছে যায় তার হৃদপিন্ডে। শায়ান তার বাঁ হাত নড়াতে পারে না। ডান হাতে ধরা তার ক্যামেরা। আলিশার মিহি হাসি মুচকি হয়ে পুরো মুখ জুড়ে প্রসারিত হয়। সে ঘর ছেড়ে পাশের রুমে চলে যায়। শায়ান ঢোক গিলে উঠে পড়ে। এই মাত্র জীবিত শরীরখানি কোনক্রমে টলেমলে পাশের জানালা গলে বেরিয়ে রাতের আঁধারে মিশে চলে। তারপর সটান নেমে এলো তাদের চারতলা বাড়ির ছাদে, যেভাবে প্যারাসুটে নেমে পড়ে আকাশে উড়ে বেড়ানোর সাধে বিভোর আকাশচারী। শায়ানের গা থেকে আলোর দ্যুতি ছুটছে। তাকে ঘরের মাঝে দেখে মা তো রীতিমত অবাক হতভম্ব। তার শরীরের দ্যূতিতে মায়ের চোখ ঝলসে দেয়। গৃহকর্মী ভয়ে হাঁটার জায়গা ছেড়ে দেয়। শায়ান নিজের ঘরে যেয়ে উপরের ছাদের ভেতরের দেয়ালে নিজেকে সেঁটে রাখে, যেভাবে বিছানায় শুয়ে থাকে মানুষ। আর তার নীচে নামার ইচ্ছে নেই।

ধোঁয়া উড়ছে হাঁড়ি থেকে, বিরাট বিরাট হাঁড়ি। রান্নার বিবিধ গন্ধে মৌ মৌ করছে সে দিকটা। মানুষ জন যার যার মত বসে আছে টেবিলের পাশে। কেউ কেউ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জটলা তৈরি করে আলাপে মত্ত, হাসি ঠাঁট্টা, তামাশা, যদিও এক ভাব গভীরতা বজায় রয়েছে সর্বত্র। আজ তো বিয়ের দিন। শোয়েব আসবে বর বেশে গাড়ী করে। শায়ানের সেই অপেক্ষা নেই। তার ভেতরের প্রজাপতি তাকে উড়াতে শিখিয়েছে। এমন মুক্তি তার আসবে সে কখনো ভাবে নি। কিন্তু তার প্রজাপতিগুলো তো তাদের উৎপত্তির মূলের দিকে তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। আসলে কি এই মুক্তি সে চেয়েছিল? এভাবে কালো উর্বশীর প্রতি ধাবমানতা তাকে কোন্‌ স্বপ্নীল পুরীতে ভাসাবে সে জানে না। শায়ান ভেসে যেতে চায়। দীর্ঘ জীবনে এই ভেসে যাওয়াই তার নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পেছনে ফেরার সব দ্বার, ইচ্ছাই বন্ধ হয়ে আছে। তাকে সেই পরশ পাথর গোলাপটার স্পর্শ নিতেই হবে। শায়ান বিয়ে বাড়ির আকাশে বাতাসে ভাসতে থাকে। নীচের সেই মাহেন্দ্র ক্ষণের অপেক্ষা এবং তা পাবার নিশ্চিত আনন্দ বা বেদনা তার মাঝে নেই। সে হাওয়ায় উড়তে থাকে বিয়ের বাড়ির মাঝ আকাশে স্থির ভেসে থেকে। হঠাৎ তার দৃষ্টি নিবব্ধ হয়, বাড়ির লাগোয়া পুষ্প কাননে বসে থাকা সেই কালো উর্বশীর প্রতি। আশ্চর্য হয়ে পড়ে সে। মাত্র দু’চারটে প্রজাপতি তার শরীর ছুঁয়ে বসে আছে। প্রজাপতিগুলো তাদের উজ্জ্বলতাও যেন হারিয়ে বসেছে। কেমন মন মরা মুখ প্রিয় উর্বশীর। তার পুতুল খেলার প্রিয় প্রজাপতিগুলি হারিয়ে এখন নিঃস্বতায় আক্রান্ত। ছ্যাঁৎ করে উঠে ভেতরটা তার। হা প্রিয়া! হা প্রাণ! অস্থির হয়ে পড়ে শায়ান। ডানা মেলে নীচে নেমে আসতে চায় এবার সে। তার ভেতরের প্রজাপতিগুলোও চঞ্চল হয়ে উঠছে যে! প্রজাপতির ডানায় ভর করে সে নীচে নেমে এলো, দাঁড়াতে গেল প্রিয় প্রেয়সীর সম্মুখ। তার আগেই কে যেন ডেকে তুলে নিয়ে গেল তারে বাড়ির ভেতর। শায়ানের ভেতরের প্রজাপতিগুলো তাকে অস্থির করে তুললো। কোন ক্রমেই তারা তাদের মূল আবাস থেকে বিচ্ছিন্ন হতে আর পারছে না। কোথাকার কোন এক আবাসে এত সময় অজ্ঞানে কাটিয়ে দিয়ে এখন তাদের ধৈর্যচ্যূতি ঘটার উপক্রম। ঘুর ঘুর করতে থাকে শায়ান বাড়ির আশপাশ। কোন ঘরে তার প্রেয়সী লুকিয়ে বুঝে উঠে না সে। প্রজাপতিগুলি তার ভেতরে তীক্ষ্ণ কামড় বসায়। সে দিক বিদিক জ্ঞানহারা হয়ে ছুটতে থাকে বাড়ির সর্বত্র। হঠাৎ তার ধাক্কায়, গুতোগুতিতে বাড়ির অতিথিদের বিস্ময় বিরক্তি দুই ঘটে যুগপৎ। হা করে তাকিয়ে থেকে, এই উন্মাদনার অর্থ খুঁজে তারা পায় না। বিয়ে বাড়িতে নাচের হুল্লোড় উঠে। সেখানেও আলিশা নাই। আবার কাঁচ ভাঙ্গার যন্ত্রণা জেগে উঠে তার ভেতর। এক দৌড়ে সে অতিথিদের জন্য জড়ো করা অসংখ্য গ্লাস একবারে যেই ভেঙ্গে ফেলতে উদ্যত হয়, তখনই দেখে দূরে দাঁড়িয়ে দ্বারে প্রাণেশ্বরী তার। ঠিক তখনই পাশের পানির ভরা ড্রাম উল্টে গিয়ে স্লো মোশানে সব পানি ড্রাম থেকে বের হয়ে শায়ানের আশপাশ ভাসিয়ে দিতে থাকে। তার সাদা চোশতের নীচ এবং নাগড়া পানিতে ভিজে সয়লাব। এক সময় সে তার কাছে টেবিলের পাশে রাখা চেয়ারটায় দপ করে বসে পড়ে। কে যেন টেবিলটায় রাখা বুরহানী ভরা জগটা ধাক্কা দেয়। ছলাৎ করে সব সাদা বুরহানী শায়ানের সবুজ পাঞ্জাবীর দখল নিতে ছুটে পড়ে। শায়ানের ঘাড় আর গলার দু’পাশ এবং চিবুক বুরহানীর সাথে কিঞ্চিৎ সখ্যতা গড়ে তোলে এক ভিন্নরূপে সাজিয়ে তুলে তাকে। চারিদিকে পিন পতন নীরবতা। তাকিয়ে দেখছে তামাশা নীরব বাঁয়ে-ডানের অতিথিগণ। তারই মধ্যে দূরের দ্বার থেকে উচ্চৈঃস্বরে গলায় খিলখিল আওয়াজ উঠলো। আলিশা এইমাত্র জেগে উঠলো। খানিক নীরব ভাব। শায়ানের ভেতরের প্রজাপতিও প্রশান্ত ছন্দে উড়াউড়ি শুরু করে দিলো। এ সময় আশপাশের পুরো অঙ্গন এক নিমিষে উধাও হয়ে সেখানে এক শূন্য প্রান্তর তৈরি করলো। সে প্রান্তরের সর্বত্র জুড়ে শুধু রঙিন প্রজাপতি, তা্রা ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়। সবুজ গাছ ও বনানী প্রজাপতিতে ছেয়ে যায়। আর প্রজাপতিগুলো এগুলোর আড়ালে লুকিয়ে নির্বিঘ্নে নিরিবিলিতে ছায়াময় প্রশান্তিতে নিমগ্ন হয়। শায়ান ছুটছে, সামনে ছুটছে আলিশা। আলিশা ছুটে যায় সরল আঁকাবাঁকায়। শায়ান প্রানান্তকর প্রয়াসে তাকে ছুঁয়ে দিতে ছুটে।

দৃশ্যান্তর ঘটে। কাঠ ও মাটির সমন্বয়ে গড়া ভেতরের অন্দরমহলে মিষ্টি কোমল আলো খেলা করছে। বড় ড্রেসিং আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলের পরিপাটি রূপটি আরেকবার দেখে নিচ্ছে শায়ান। হালকা ফর্সা সৌষ্ঠব গড়নের শায়ানের মুখে পাতলা খোঁচা দাড়ি। উদোম শরীর। শুধু কোমরের নীচটা সদ্য স্নান সারা হালকা নীল টাওয়েলে জড়ানো। পাশের বিছানায় বিছানো মখমলের মেরুন রঙটা একটু আগে আলিশার খোলা বুক জড়িয়ে ছিল। সে এখন সেটাকে দিয়ে যতদূর সম্ভব তার অনাবৃত সারা শরীরকে জড়িয়ে নিয়ে এক পা এক পা করে ভীরু মায়াবী প্রেমময়তায় আয়নার সামনে দাঁড়ানো শায়ানের কাছে এগিয়ে আসে। একসময় প্রজাপতিগুলো সারা ঘরময় হঠাৎ উড়তে থাকে। মনে হলো, এতক্ষণ তারা মাটি-কাঠের অন্দরের প্রতিটি অংশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুমিয়ে ছিলো। আলিশা শায়ানের কাঁধে মাথা রাখে। অমনি রঙ-বেরঙের প্রজাপতিগুলো সব উড়ে এসে তাদের দুয়ের পুরো শরীর ছেয়ে যায়। শায়ান তার বাঁ হাতে আলিশার কোমড় জড়িয়ে রাখে। এভাবে তাদের কতক্ষণ কাটে তারা জানে না। ভোরের আলো ফুটি ফুটি করছে। বাইরের দরজায় প্রচন্ড কশাঘাত শোনা যাচ্ছে। প্রচন্ড আঘাতে দরজা ভেঙ্গে পড়ে। ভয়ে প্রজাপতিগুলো আচমকা তাদের শরীর ছেড়ে কাঠের ছাদে পৌঁছে পথ খুঁজে পালাতে চায়। ছিটকে সরে আসে আলিশা। তার আগেই লোকগুলো ঘরে এসে ঢুকে। কোন একজন আলতো করে আলিশাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নেয়। বিদ্যুৎ গতিতে তাকে আক্রমণে শায়ান এগিয়ে আসে। তার আগেই মাথায় প্রচন্ড এক আঘাত শায়ানকে মাটিতে ধরাশায়ী করে। আর কিছু তার চেতনায় নেই।

প্রজাপতিগুলো সারা ঘরময় প্রাণে বাঁচার অস্থিরতায় দিকবিদিক ছুটে চলে। তারা আলোর মুখ দেখতে চায়। ভেতরটা অন্ধকার ঠেকে। কিন্তু আলো নেই। রুপালী আঁধার। ক্লান্ত হয়ে আসে এই প্রজাপতিগুলো।

শামান সাত্ত্বিক | ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০১১ | ১১:৩১ বিভাগ: গল্প

এ লে ফ্লে দ্যু মাল – ৩

এ লে ফ্লে দ্যু মাল – ১

“এ লে ফ্লে দ্যু মাল” – সেরাহ ব্রাইটম্যান

এই প্রথম জলাশয়ের পাশে বসে আছে শায়ান। এখন বিকেল। দূরে বিস্তৃত পাহাড়, তার উপর মেঘ। ভেসে যেতে থাকে তার গভীরতা নিয়ে। কিন্তু শায়ানের মনের গভীরতা বোঝার উপায় কি? একটু আগে ট্রেনটা তার গতিতে শব্দস্বরে এগিয়ে গেছে। শায়ানকে সামান্যই নাড়া দিতে পেরেছে। সেই শান্ত ধীর জলাশয় ঘিরে প্রকৃতিতে কেমন এক স্বর্গীয় সরসতা। এতে মরে গেলে কি হয়! কত মানুষই তো মরেছে! কীভাবে মরে মানুষ! রোগ শোকে কাতর হয়ে? না, এ মৃত্যু শায়ানের নয়। এখানে শোকও নেই। তবে কি? হারানোর বেদনা আছে, না আছে পাবার যাতনা। সেরাহ ব্রাইটম্যানের আরাবিয়ান নাইটস নয়, একেবারে এ লে ফ্লে দ্যু মাল (the flower of evil)। শায়ান উঠে দাঁড়ায়। একবার পেছনে ফেরে। তার চোখ বাষ্পায়িত হয়ে আছে। সামনে তাকায় সে। রেল লাইনের পরে দূর আকাশ। সেদিকে বাষ্পমাখা অসহায় কাঁদন। থর থর করে কাঁদতে থাকে শায়ান। সে ঘুরে বসে আবার জলাশয়ের ধারে। জলাশয়ের স্বচ্ছ শীতল জল তাকে প্রাণপনে ডেকে যেতে থাকে। পানিগুলোও থর থর করে কেঁপে কেঁপে এগিয়ে চলে। শীতল জলাধারের পাড়ে বসে পড়ে শায়ান। শক্ত হাইকিং বুট তার পায়। পা-টাকে জলে নামিয়ে আনে কিছুটা। বসে থাকে পা ছাড়িয়ে হতাশ। তারপর হাঁটু ভাজ করে। প্যান্টের পকেট থেকে বের করে আনে ছুরি, যেটা জ্যাক নাইফ। ছুরির ফলাটা টেনে বের করে। তারপর কোন কিছু না ভেবেই একটানে বাঁ হাতের মাঝের মাস্যল থেকে কব্জির উপর অবধি ধারালো ফলা দিয়ে কেঁটে যেতে থাকে সমানে। রক্ত বেরুতে থাকে অনবরত। কাঁটা অংশটার যতটুকু পারা যায়, তা ডান হাতে চেপে ধরে এবার স্বচ্ছ জলাশয়ের পাড়ের পানিতে নামিয়ে আনে। সাথে সাথে হাতের আশ-পাশের জলাশয়ের পানি লাল হয়ে উঠে। রক্তিম পানি ছড়িয়ে ছিটিয়ে মিশে মিশে দূরে মিলিয়ে যায়। কতক্ষণ রক্ত আটকানোর প্রচেষ্টায় জলের তলে হাত চেপে বসে ছিল শায়ান জানে না। সে জানে একটু পরে পশ্চিম আকাশ লালিমায় লাল হয়ে উঠবে, তার শোণিতের ছাপে সারা উদার আকাশ ভরে যাবে। মেঘের কোন আলাদা অস্তিত্ব থাকবে না। মেঘের পরে মেঘ জমবে না।

উঠে পড়ে শায়ান। জলাশয়কে পেছেন ফেলে দাঁড়ায়। সন্ধ্যার এই আঁধারি-তে ভূতের মত ট্রেন ছুটে যায়। কিছুটা ঝিমিয়ে থাকা শায়ান বাষ্পরুদ্ধ ভাবটাকে ভাসিয়ে দিতে পারে না কিছুতেই। তার মাথায় বাজতে থাকে,

Is it you I keep thinking of?
Should I feel like I do?
I’ve come to know that I miss your love
While I’m not missing you

We run ’til it’s gone
Et les fluers du mal
Won’t let you be
You hold the key to a open door
Will I ever be free?

কাটা হাতটাকে এখনো চেপে আছে আগের মত সে। একসময় আলো অন্ধকার হয়ে যায়।

সাদা ঘরে খুব নীলাভ হালকা আলো। আঁধার রাস্তার ওপার থেকে দেখা যায়, কাঁচের ওই ঘরের মাঝটাতে। কালো উঁচু লম্বাটে টেবিলে বসে আছে এক দীপ্তিমান যুবক, এখন সে নিস্তেজ নয়। টেবিলটা শাদা কাফন কাপড়ে মোড়ানো হলেও একপাশ থেকে কাপড় উঠে গিয়ে তার কালো রঙ ঠিকই চোখে সাদা কালোর মিশ্রণ ঘটিয়ে দিয়েছে। তার হাত শ্রশ্রুষায় রত এক ধ্যাণমগ্ন নারী। কাটা হাতটা যতদূর পারা যায় পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে তাতে ব্যান্ডেজ বাঁধিয়ে দেয়া হচ্ছে। সেই হাতে ব্যান্ডেজের দিকে তাকিয়ে কি যেন ঠিকরে বের হচ্ছে শায়ানের চোখ থেকে! নিরুত্তর চারপাশ অথবা আশপাশ।

এখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। এই জলাশয়ের দূরে অন্য এক প্রান্তে ঠিক আকাশের বিপরীতে বাঁশ, কাঁঠ ও মাটির সম্বন্বয়ে নির্মিত একটি চমৎকার দৃষ্টিনন্দন সুদৃশ্য বাড়ি। এইটাকে পিকচার পারফেক্ট বলা যায়, কেননা এর আশে পাশে আর কোন বসত ভিটা নেই। এর পাশ দিয়ে জলাশয়, তার পর সুবিস্তৃত আকাশ। ডান পাশে অতি দূরে উঁচু পাহাড়। এই বাড়িটি শায়ান কিছুদিন আগে নির্মাণ করেছিল। এই বাড়িতেই আলিশাকে সে এনেছিল। আলিশা শহরে বেড়ে উঠছিল। শান্ত স্নিগ্ধ ধীরলয়ের শহর। এই শহরেই আলিশাকে মানাতো। কিন্তু একসময় শায়ানের চোখে তাকে মানানো মনে হয় নি। আলিশার প্রকৃতি কী যেন মিস করছিল। সেই মিসিং লিংকটা পেতে এই বাড়ি। তারপর আলিশা, ১৭ -কে এই বাড়িতে নিয়ে আনা। আলিশার চোখ হরিণী। আলিশা শকুন্তলা। আলিশা পাহাড়ী ঝর্ণা। আলিশা জলাশয়ে পা বিছিয়ে প্রকৃতির বনে হারিয়ে যেতে জানে। শায়ানের এই আলিশাকেই চাই।

শায়ান বিদেশ ফেরৎ। সেখানে পাহাড় ও প্রকৃতি জড়াজড়ি করে থাকে। সেখানে লেকের জলে শ্বেত উর্বশীরা উড়ে উড়ে ভেসে থাকে। সেখানে যে কোন পুরুষকে উর্বশীরা স্বপ্নীল পুরীর চাবি দিয়ে দেয়। কেউ তা রাখে, কেউ তা হারিয়ে ফেলে, কেউ দুয়ার খুলে তলিয়ে যায়। শোনা যায়, উর্বশীরা সেই পুরুষের অপেক্ষা করছে, যে এই চাবিতে দুয়ার খুলে উর্বশীদের সাথে তালে তালে উড়ে বেড়াবে। ওখানকার বুড়ো পুরুষেরা বলে, এমন পুরুষ না কি এখনো মিলে নি।

আলিশা কালো। গোলাপও না কি কালো। আলিশা ধবল নয়। হৃদয় তার ধবল। আলিশার ডানা নেই, কিন্তু উর্বশীদের মত উড়ার পাখা গজিয়েছিলো তার। কারো চোখে পড়েনি। শায়ানই তা প্রথম দেখে। তাই শায়ান এই কালো উর্বশীকে এই জলাধারের বনানীতে নিয়ে আসে। সে জানে, সেই একমাত্র পুরুষ যে এই উর্বশীর সাথে তালে তালে উড়ে বেড়াবে। তখন জগত স্বপ্নীল মায়াবী যাদুর পুরীতে রূপান্তরিত হবে।

এখন এই বেলায় তার বানানো বাড়িটায় লেলিহান শিখা আকাশের বিপরীতে দীপ্র হয়ে উঠেছে। শায়ানের হৃদয়ের আগুন ঠিকরে বেরিয়ে এই বাড়িটা দাউ দাউ জ্বলে উঠেছে। আগুন বের হতে দেখে দূর পাহাড়ের ওপার থেকে লোকজন উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে আসে। ছুটে এসে তারা চমকে যায়, যখন দেখে শায়ানের বুক মুখ থেকে উত্থিত আগুনের শিখা বাড়ির দিকে ছুটে এসে পুরো বাড়িটাকে ছেয়ে ফেলছে। কেউ কেউ জলাশয় থেকে পানি নিতে চেয়েছিল। কিন্তু জলাশয়ের শীতল পানি এখন তাপিত হয়ে আছে। শায়ান সে পানিতে দাঁড়িয়ে থেকে বাড়ির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার চতুর্পাশ্বের জলাশয়ের পানি থেকে বাষ্প উত্থিত হচ্ছে। তা দেখে লোকগুলো দূরে, ওই একটু দূরে বনানীর বড় এক গাছের আড়ালে নিরাপদ দূরত্বে গেছে চলে। শায়ানের খালি পা পানিতে। শায়ানের হাতে সাদা গজের ব্যান্ডেজ।

শামান সাত্ত্বিক | ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০১১ | ১১:০৫ বিভাগ: গল্প

এ লে ফ্লে দ্যু মাল – ২

%d bloggers like this: