সাম্প্রতিক সময়ের কবিতাগুচ্ছ

মৃত্যুর দিকে হেঁটে যাওয়া

আমরা একটা মৃত্যুর দিকে হেঁটে যাচ্ছি
সেদিকে তাকাবার কারো ফুরসত ছিল না
আমরা একট গভীর বসন্তকে জড়িয়েছি
হৃদয় আকুল খোলা জানালায় রঙের মূর্ছনা
আমরা যখন উঠোনের ভেতর দিয়ে হেঁটে যেতে থাকি
কে যে পিছু নেয় ফিরে তাকিয়ে হদিস মেলে না

তারপর জং ধরা এক গেইট খুলে ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়েছি
অনেক দূর থেকে কুকুরের ঘেউ ঘেউ এলেও
একদলা শান্ত নীরবতা ঘরের ভেতরে বিরাজিত
জানালার শিক গলিয়ে বাড়ির বাগানে
আমরা নেমে পড়ি
এক কোমল প্রত্যাশায় ভীত-তটস্থ খরগোস শাবক
আলতো কোলে তুলে নিলে
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও স্নায়ুতে ধবল রাত নেমে আসে

বিছানায় যাই আমি
আরামে কাতর নেশায়
তোমার যুগল স্তন ভাঁজে
ডিঙ্গা নাওয়ের উন্মাতাল প্রবাহে স্থির হই

মৃত্যুরুপী সাপ বাসর অবধি ছিদ্রান্বেষণে ব্যাপৃত।

বেঘোর বসন্তে শ্রাবণ ধারা

একটা বেদনাকে ধারণ করে এগিয়ে চলছিলাম আমরা
সে সময় কিছু রমণী এসে হাজির হলো
তারা খুব সুসজ্জিত ছিল
তাদের বেশবাস সাজ-সজ্জায় পুরুষের অনেকেই
হাওয়ায় ভেসে ভেসে বেলুনের মত উড়ছিল
কারো কারো মুখ সুইস চকোলেটে ভরে গেলো
কেউ কেউ মনে হলো এখনই ডাচ পনিরের স্বাদ মুখে পুরেছে
কারো কারো শখ হলো উঁচু সাঁকো থেকে ঝাঁপ দিয়ে
নদীর জলে ডুব সাঁতার দেয়।

এভাবে সবাই যার যার নারী নিয়ে দূরে সরে গেলে
অবশিষ্ট একমাত্র নারীটি মিটিমিটি হেসে তাকালে
আকাশের তারাগুলো খসে এক এক করে
চোখে এসে তার জড়ো হতে লাগলো।

শ্রাবণ ধারা বেঘোর বসন্তে বয়ে চললো।

শূন্যে ভাসে লোহিত কমল

পাখীর পালকের মতো উড়তে শখ হয়েছিল বালকের মুষ্টিবদ্ধ হাত।
আকাশের সিঁড়িতে সে রেখেছিল তার কোমল পদস্পর্শ
সুগন্ধি রাত গন্ধ বিলিয়ে গেলে হাস্নাহেনার
মেঘের রাজ্যে ভেসে বেড়াল মৃত নারীর শরীর

চারদিকের কুয়াশা ঘেরা অরণ্যে রঙের হোলি খেলা
সূর্যরশ্মির সাতরঙের বাহার
শিশুকে ধরে বেড়ে উঠেছিল প্রজাপতি যে
তারও ইচ্ছে হলো ‘খুন নেশায় মাতি’
সবচে’ সহজ মৃত্যুবরণ ছিল ভ্রূণের
মা হতে পারতেন যিনি – হয়েছেন তীক্ষ্ণ বদন মলিন

শূন্য থেকে আসে মানুষ, শূন্যে যায় মিশে
আসতে পথে পেয়াদা-পাইক শূন্যে বেড়ায় ভেসে।

বন্ধ হয়ে আসে নিঃশ্বাস

জানলার পর্দার ফাঁক গলে এক প্রস্থ সূর্যালো ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল দেয়ালের উপর
আমার মরু উদ্যানে পৌঁছে যাবার সময় হয়ে এলো।
নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু ছেড়ে উষ্ণতা আমায় ধাবিত করলো।
করমন্ডলে এক ভৌতিক বিষাদ আচ্ছন্ন হলো।

আমি উড়ালাম পাখা নেমে যেতে গভীর হ্রদে
যেখানে দৃষ্টি রেখে সুউচ্চ প্রভাতে মেতেছিল পাখিরা ওড়াওড়ি খেলায়
আমি বাড়ালাম হাত চলছিল রঙিন ঘুড়ির ওড়াওড়ি দু’দিক হতে
আমার স্পর্শের ইচ্ছায় নিলো ঘুরিয়ে মাথা তারা
ভেজা বাতাস সপাৎ সপাৎ চললো ঘুড়ির ওড়া

ডানা ঝাপটিয়ে ক্লান্ত আমি উড়ে যাই
খোলা আকাশ এত্ত ভেজালো বাতাস
তবুও কেন বন্ধ হয়ে আসে নিঃশ্বাস।।

তখনো বেঁধেনি সূতীক্ষ্ণ ত্রিশূল

অন্ধঘরে উলঙ্গ হাতড়াতে থাকেন সকরুণ এক নায়িকা
ধানের গোছা কেটেছিল সে কাস্তের শাণিত ধারে
সূর্য ঝলসিয়ে দিয়েছে তার গতরের ফলা
তবুও শিশিরের ফোঁটা পড়ে লবণ ঘর্মাক্ত দেহজ ভাঁজে

একদিন নেমে গেছে সে চৈত্র শেষের সুমধুর জ্যোৎস্নার
আঁধার আলিঙ্গনে
কথা দিয়েছিলো ছিনিয়ে নেবে বসন্ত শেষের উৎসব
অনেক পাথর এসে জড় হয় ধাবমান জলের
দুরন্ত খেয়ালী স্রোতে
তখনো আঁধারে জড়ো হয়নি স্ফটিক তারা
সন্ন্যাস সৌরভ নিয়ে মেতেছিল একদল ভিক্ষু শুধু
চাঁদের আঙ্গিনায় রেখেছিল তাদের রুপোলী ধূপ
মহৎ সাঁতারে পেরিয়েছিল বিজন বিশাল দুর্বিনীত নদ
দু’চারটে দাঁড়কাক স্তব্ধ নয়নে করছিল হা-পিত্যেশ

জলবসন্ত সেরে গেলে ‘পর
নায়িকা নেচে উঠে তীব্র প্রখর ছন্দে
কিন্তু গ্রীবায় তার তখনো বেঁধেনি সূতীক্ষ্ণ ত্রিশূল।

নেচে উঠে ঢেউ গাংচিল

গভীর সমুদ্রে নেচে উঠে ঢেউ গাংচিল, মোহন ছন্দে
ফ্যাকাশে আলোর বাতিঘরের
চাঁদই দেখিয়ে নেয় পথ
ধাবমান জলের আস্তরণ খুলে বেরিয়ে আসে
দিগন্তের সুদূর হাতছানি

জলের উপর মৎস্য কন্যার দীঘল মুরতি
দ্যোর্দন্ড আহবান
বৃদ্ধ নাবিকের সতর্ক সংগ্রাম
নিয়ন্ত্রণ-দৃঢ় তার সমুদ্রযান
বিদ্বেষ ছুঁড়ে পরীকে জলের
জলের পথে সামলে বাধা দ্বন্দ্বে বেখেয়াল
রাতের আকাশে তখন
শিলার বর্ষণ নামে
দূরন্ত অন্ধ প্রবাহে
অতল আঁধারে লেজের দাপটে মাতম শুনে জলের।
দিকভ্রান্ত হয়ে নাবিক

স্রোতের মধ্যে ছেড়েছি নীল

স্বপ্নীল শ্রাবণে তুলে নিয়েছে স্বপ্ন স্বপ্নীল কিছু স্রোত
স্রোতের মধ্যে ছেড়ে দিয়েছি একবিন্দু নীল
স্রোত হয়েছে ফেনিল, উত্তেজক, ধাবমান দূত
সংঘর্ষে নমিত হয়নি পাথরখন্ডে স্রোত
উত্তেজনায় ভেসেছে প্রবল
নদ-নদী প্রান্তর পেরিয়ে
চিনেছে সাগরকে শেষমেশ
সেখানে জ্বললে চোখ
নির্বাণলাভে উড়ে আকাশে
মেঘের কোলে লুকিয়ে মুখ
নিঃসীম অন্যালোকে পদার্পণ।।

মুষ্টিবদ্ধ করণই চরম অর্জন

মানুষ ভাসাতে জানে
ভাসিয়ে দিতে জানে তুলে ঢেউ
ভুল বোঝা ছিল গদ্যে পদ্যে
সৌন্দর্যগুলো ছড়িয়ে দিয়ে
তুলেছিলাম শিশির সুরেলা ঠোঁটে

সিক্ত শিশিরে মাখামাখি হলে
জমে গেছে ধবল কালো পিতলা রঙে
দু’চোখ তোলে এঁকে ফেলে নিজ পরিচয়
জানিয়ে দেয় দুপুর বাতাসে
সব কিছুই রয় মুঠোয় হাতের

পাশে দাঁড়িয়ে ধবল অবয়ব ঢেউখেলা লাল প্রলেপ
নিতে চেয়েছিল
রাতের গভীর তারল্য
তার উঁচু পর্বত – এখনো হাওয়ার ঝিরঝিরি গুঞ্জন
জানিয়ে দিলো সে
জ্বলন্ত বিদ্যুৎকে –

জীবন ধারণ নয়
মুষ্টিবদ্ধ করণই চরম অর্জন।।

ঢেউ তুলে বিপন্ন প্রহর

বিস্ফোরণ বুকে বেঁধে দ্রুত অপসৃয়মাণ সন্ধ্যায়
সান্ধ্যভাষায় জানাজানি হয়
শোণিতে তুলে দেবে গর্জন কতদূর, ভাবেনি

সৃষ্টির শেকড় যদি করো উন্মূল
নতুন বীজ বপন হবে কি
ওহে সোনার উঠোন

সলাজে বেঁধে দানা
পতন কতটুকু ঘটাবে তার
উর্মিমুখর শস্যের প্রখর প্রভাতে

উতলা নারীর ঝর্ণায় ঝরে যদি বৃষ্টি
তাতে কাতর স্বরে ভস্মীভূত হবে না জানি
উদ্দীপ্ত নহরে বইতে থাক হাওয়া
ধানের সারি সারি আঁচলে
ঢেউ তুলে বিপন্ন প্রহর।।

তন্ত্র গভীর কথন

সেলাই খুলে গেলে সূতো উঠে আসে
রঙগুলো তখনও থাকে রঙ-চঙে
জোয়ার এলে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলে একাকী
শিশুর নেই রিরংসা কোন

সোনালি এক বিকেলে নদীর পাড়ে
দাঁড়িয়ে শিশু দেখেছিল
কৃষ্ণচূড়া ফুলের ভেসে আসা
কূলে নেমে স্পর্শ করার ইচ্ছে
সংবরণ করে রেখেছিল মাত্র দু’দিন

তারপর আলোক জোৎস্নায় জলে
চাঁদের প্রতিবিম্ব দেখে
মনে পড়ে অনেক অনেক অনেক রাতের ভীড়ে
চর্যা গুরুগোষ্ঠীর সাধনতন্ত্রের সুগভীর কথন।

অটিস্টিক বালক

কখনো কখনো মৃত্যু দেখে আনন্দে হেসে উঠে অটিস্টিক বালক।
এমন খুশির ফোয়ারা তার চটুল ঠোঁটে কখনো আসেনি আর
মৃত্যুর কোমলতা বেঢপ অবয়বে স্নিগ্ধ নিপুণতায় তোলে বান
শরীর ঝাঁপিয়ে কাঁপুনি – বিরহী যক্ষের যাতনার বিদীর্ণ গান
মৃত্যুকে সে চেয়ে চেয়ে চেখে, মেলে নয়নে নয়ন আসমান

কুয়াশা ঝরানো হাসি নিয়ে মিশে ছিল বালক
গহন সমুদ্রে বেড়ে ওঠা মাছ তারার সাথে
কোলাহল খুনসুঁটি ভরে ছিল জলজ অরণ্যে
জলের পাপড়ি ঠেলে জমে এক মায়ার ইথারলোক
দূর দৃশ্যে চেতন ফিরলে চরকির বেগে মিলায় বৃত্তে

সে বালক এখনো দুপুর রাতে মাছেদের পিছু ছুটে
আঁশটে মাছের শরীর বাঁধে ঠোস ওঠা চর্মকোষে।

বারুদ বাতাসে ঝকমকে ধীর

সুবেশী চাঁদপনা রুপ পেলে
কেনে তুমি এমন
এমন সপাটে ছুঁড়ে গুলি
পাল তোলা তরী ছিঁড়ে
বায়ু বহে সবেগ

শূন্য থালা তুলে রেখে
চাঁদের জানালায় রাখি মুখ
তুমি এন্তার এনেছো বারি
বরিষণ প্রচুর

খরগোস মোলায়েম
চুমু রাখি কপোলে
রাগিনী তরঙ্গিম।

বঙ্কিম হাসি মেলে
খরগোস খর পায়ে
চৌঁচির চির চির
বারুদ বাতাসে ঝকমকে ধীর
গতিটা অস্থির।

ঝলসানো চাঁদ নামালি রুপোলি রাত

ঝলসানো চাঁদ কেন তুই নামালি এই রুপোলি রাত
কেন তুই নিলি ছিঁড়ে নিঝ্‌ঝুম দুপুর
কেন লাগাম ছিঁড়ে দিলো ছুট ষাঁড় উন্মুখ
কেন উরুতে রেখে মুখ রাতের নিদারুণ দুখ
কেন ভাবে আসে সম্ভোগ পদ্ম গহীনপুর
ঝলসানো চাঁদ জ্বালালি শূন্য পেয়ালা ধূমায়িত বিস্বাদ
নিঝঝুম রুপোলি রাত।

মাছেরও ঝরে রঙ সমুদ্র অতল
ছিল ভরা গোপন চিঠি ভাসে নীলাভ বোতল
কেন তুই নিলি টেনে জোয়ারের উন্মত্ত জল
বসালি নখড় রাক্ষুসে নামে উচ্ছ্বাস ঢল

ঝলসানো চাঁদ বুকে নামে মরু-বর্ষা জল আকাল
খুঁজি তার হাত ছুটি আশ-পাশ অনন্ত উদাস
ছুঁয়ে তাকে বেজেছে বাঁশের বাঁশি
স্বপ্নালু দু’চোখে শুধু রঙ মাখি

ঝলসানো এ রুপোলি রাত
মিশেছে বায়ুতে কী বিষাদ প্রপাত
জলে আমি গেছি নেমে শূন্য চৌঁচির
পাখিগুলো গেছে ভুলে শিস্‌, শিহরিত নয় আহা একটুও ইস্‌।।

আড়ং ও অরণ্যের উৎসব

নিঃশব্দ চাঁদের পাশে আলো জ্বেলে বসেছিল ভাবুক রাত
ঊষর মরুতে বায়ু বয়, বয় বিষণ্ণ বিদ্রুপ প্রপাত
এন্তার নিয়ে খবর উড়োজাহাজ নামে
বুটধারী বলিষ্ঠ ধারালো পদভার

রাতের কোলাহলে সম্বিত ফিরে
ভীরু পাপে আঁকি উঁকি তোলে
বাজখাই বিকট আওয়াজে বিদীর্ণ বিলাপ
বিশ্বস্ত বিরাট জনপদের ক্রম বিলীয়মান সাজ
 
তখনও দুরন্ত দুপুর রাতে বালক
ভিডিও গেইমে মাতে
সংহারে সমাচ্ছন্ন অবিরত
বীভৎস বিদঘুটে নির্গুণ দৈত্য ও দানো

বায়ু হলে নির্গত বাষ্পীয় হয়ে উঠে সব রব
বায়বীর উঠোনে আড়ং ও অরণ্যের উৎসব।।

 আলো জ্বলে কোমল

নিঃস্ব রঙ্গে ঝিম ধরেছে দীপ্ত অহংকার
মুহুর্মুহু বইছে চেতন হাওয়ার রন্ধ্রে
গোলাপ পাপড়ি ঝলমলিয়ে শূন্যে
মেলছে ডানা
ভূমিষ্ঠ হতে টানছে তাকে চতুর বালক

আলোর ধারায় পতন এলো
গোলাপ পাপড়ি ঢেকে দিলো সুবোধ
সব পেঁচা উড়াল দিলো
অন্ধ আঁধারে দ্বন্দ্ব হলো
তারপর …
কালো আকাশ কয়লা গুঁড়ো মেখে নিলো
স্রোতস্বিনীর স্রোতধারায় আলো জ্বলে কোমল।

Advertisements

তথ্য কণিকা শামান সাত্ত্বিক
নিঃশব্দের মাঝে গড়ে উঠা শব্দে ডুবি ধ্যাণ মৌণতায়।

2 Responses to সাম্প্রতিক সময়ের কবিতাগুচ্ছ

  1. aparajita1971 says:

    ভাল লেগেছে……..

    Like

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: