পাপ এবং পাপমুক্তির স্পন্দন – শেষ পর্ব

পাপ এবং পাপমুক্তির স্পন্দন – ১
পাপ এবং পাপমুক্তির স্পন্দন – ২
পাপ এবং পাপমুক্তির স্পন্দন – ৩

নারীর শরীরে যে বাঁক আছে, তা যেন তার মনের বাঁকের সাথে মিশে থাকে। এই বাঁকই পুরুষকে দগ্ধ করে, যন্ত্রণাবিদ্ধ করে, কখনো কখনো ধ্বংসকে ত্বরাণ্বিত করে। আবার এই বাঁকের বদৌলতে, এক এক পুরুষের জীবন এক একভাবে বৃদ্ধি পায়, বিকশিত হয়। প্রচন্ড পৌরুষ দীপ্ততা জেগে কোন কোন পুরুষকে অর্জন বা উপার্জনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ঠেলে দেয়। শিপনের নারী সম্পর্কে এইরুপ চিন্তা তার বয়সের তুলনায় ভারী মনে হয়। নারী সম্পর্কে তার মাঝের শত দ্বন্ধ, দূরত্ব, জটিলতা, অবোধ্যতা, ইতস্তত বোধ দূর হওয়ার ব্যাপারে প্রথম প্রভাতের প্রচ্ছন্নতা শাপলাই। ভোরের আলো বাতাসে যার উদ্ভাস। তার ভাষা শেখার অ, আ। এখন শিপন পুরো বাক্য পড়তে পারে ভালভাবেই, তা লিখিত হোক বা অলিখিত।

বাবা-মার মাঝের সম্পর্ক থেকে শিপন বুঝেছে এই বাঁকের অভাব এবং অবোধ্যতা তাদের মাঝের সম্পর্ককে এক ধরণের জড়তার মাঝে আটকে দিয়েছে। এই জীবনবোধ তার কাম্য নয়। এখানে এসে, এদেশের কিছু কিছু বাবা-মাদের দেখে তার সেরকম মনে হয়নি। একধরণের প্রেমময় দীপ্ত গতিশীলতায় তারা তাদের সংসার সন্তানদের উন্মুক্ততায় গড়ে তুলেন বলে প্রতীয়মান। শিপন ভাবে, এই জড়তাবোধ দেশে তার প্রজন্মের মাঝে কমে এলেও, মানুষ ও তার পরিপূর্ণ সুস্থ-স্বাভাবিক বিকাশের প্রয়োজনে এখনও তা অপ্রতুল। পৃথিবীর এই যে এক বিশাল ভূ-খন্ড, মানুষ কি সেই প্রকৃতির অংশ নয়? তাহলে তার প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠার পেছনে এতো প্রতিবন্ধকতা কেন? কেন মানুষ প্রকৃতির মতই স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে না? কেন সহজ সরল স্বাভাবিক সুন্দরকে জটিলতায় সে গুলিয়ে ফেলে। শিপনের ভাবনার জগতে কোন কোন বিশেষ মূহুর্তে কারো প্রতি অজানা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

গ্রীষ্মের শেষে অন্য ঋতুর শুরু। এখানে যাকে ‘ফল’ বলে। ফল ঋতুর শুরুটা বাংলাদেশের শীতের আমেজের সাথে মিলে যায়। আবার বাংলাদেশের বসন্তের শুরুর মতোও মনে হয় কখনো কখনো তার। কিন্তু যতই দিন যেতে থাকে ঠান্ডা আবহাওয়ার ঝাপটা বাড়তে থাকে। শেষে এখানকার ভয়ংকর শীত ঠান্ডার সাথে গিয়ে মিশে। নদীর সাগরে মিশে যাওয়ার মতই, এক ঋতুর অন্য ঋতুর সাথে মিশে যাওয়া। ‘ফল’ শুরু মানে ছেলেমেয়েদের স্কুলে ফিরে যাওয়া। শিপনের কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো ফেরা হলো না। বাংলাদেশে উচ্চ মাধ্যমিকে সে যে ফলাফল করেছে, তা এখানে কোন ভাল বিষয়ে পড়াশুনার জন্য যথেষ্ট নয়। সুতরাং ফল ভাল করতে আবার কয়েকটা বিষয় নতুন করে পড়তে হবে এখানে। অগত্যা পুরোদিনের কাজটা ধরে রেখে, খন্ডকালীন স্কুলে যেতে হচ্ছে তাকে সপ্তাহের দু’দিন সন্ধ্যায় ও শনিবারে পুরো ছুটির দিনে। কাজটা ধরে রেখে লাভ হচ্ছে দু’দিকে। অর্থের সাশ্রয় হচ্ছে। নতুন অভিবাসিত হওয়া তার পরিবারকে অর্থ সাহায্য করতে পারছে, সে সাথে আগামী বছরের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনার খরচের একটা বড় অর্থ এখন সংগ্রহ হয়ে যাচ্ছে।

দোকানের পাশের এলআরটি-এ স্কুলের ছেলেমেয়েদের যাতায়াত করতে দেখে সে প্রতিদিনই। কী চমৎকারই না লাগে ছেলেমেয়েদের স্কুল পোষাকে! দলে দলে ছেলেমেয়েরা স্কুল থেকে ফেরে। কিন্ত একটি দিন ছিল শিপনের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন।

অন্যদিনগুলোর মতই ট্রেন তার নিজস্ব সূচীতে চলছিল। ছেলেমেয়েরাও স্কুল থেকে ঠিক ঠিক বাসায় ফিরছিল। দোকানের কাজের ফাঁকে হঠাৎ তার চোখে পড়ে সাদা-কালোর এক অপূর্ব সংমিশ্রণের চিত্র। এই অদ্ভূত আনন্দ সুন্দর রুপটি দেখবে বলে বোধ হয় ঈশ্বর তাকে এই দোকানে কাজটা মিলিয়ে দিয়েছে।

শৈশব থেকে কৈশোরে উত্তীর্ণ হয়েছে কি তারা? কত বয়স হবে তাদের? দশের বেশি কি? ধরে নিলাম এগারোই হবে। কিন্তু যে ক্রীড়ায় মগ্ন তারা, তা তো বয়সের সীমাকে ছাড়িয়ে গেছে। এত গভীর দীপ্ত প্রেম তারা কোথা থেকে পেল? একি শুধু নিষ্পাপ আকর্ষণ? নাকি তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু লুকিয়ে আছে এতে। এরা তো নির্দোষ একেবারে। বিকৃতবোধ বা স্বেচ্ছা প্রণোদনের বিন্দুমাত্র ভাব নেই এই ক্রিয়ায়। একেবারেই প্রাকৃতিক, প্রকৃতিগত সুন্দর, সাবলীল। প্রকৃতির বিস্ময় কাকে বলে শিপনের জানা নেই। কিন্তু এটা তার কাছে সেরকমই বিস্ময়। এত নিবিড়। আর তাই বোধ হয়, এতে কোন রাখ-ঢাক নেই। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পরে এক কবি বন্ধুর পাল্লায় পড়ে কিছুদিন কবিতা নিয়ে সে একটু গভীর নাড়া-চড়া করতে গিয়েছিল। সেখানে রবীন্দ্র-কাব্যে সীমা ছেড়ে অসীমে যাবার কথা বলা হয়েছে। এটা কি তবে সেই অসীমে পৌঁছার প্রক্রিয়ার অংশ? কিন্তু না, এটা তো দেহের মাঝে থেকেও দেহহীনতার কথা বলছে। তা নয়তো এই ভরা দুপুরে, এত জনসম্মুখে তারা যেভাবে একে অন্যতে আপ্লুত হচ্ছে, তাকে স্রেফ প্রেমময় আকর্ষণে আবদ্ধ করে রাখা বললে অনেক কমই বলা হয়। তাছাড়া এই এত অল্প বয়সে! শিপনের মনে হলো, প্রকৃতির অপার বিস্ময় বা রহস্য বোধ হয় এখানে উদ্ঘাটিত হচ্ছে এই নিতান্ত দুই শিশু-কিশোরের মাঝে। একেবারেই স্বয়ংক্রিয় বা স্বতঃস্ফূর্তভাবে। হ্যাঁ, তা একেবারেই নির্দোষ স্বতঃস্ফূর্ত। অল্প বয়সের এক উদ্দীপনাময়ী আকর্ষনীয়া সুঠাম কালো মেয়ে এবং সেই একই বয়সের এক সুশান্ত সরল শ্বেত ছেলের বিপরীতমুখী দাঁড়িয়ে একে অন্যকে অনবরত চুম্বন। এই চুম্বন মানে একেবারে লিপস্‌ কিসিং। ঠোঁটে ঠোঁট। একবার মেয়েটা দেয় তো, ছেলেটা থামে না। ছেলেটা দেয় তো, মেয়েটা থামে না। বিস্ময়াবিষ্ট কৌতূহলে তাকিয়ে থাকে শিপন। এলআরটি-এর প্ল্যাটফর্মে উঠার শক্ত সিমেন্টের সিঁড়ির একেবারে উঁচুর কাছাকাছি দাঁড়িয়ে, তাদের একে অন্যের মাঝে যেন এক চুমুর প্রতিযোগিতা চলছিল। তুমি থেমেছো কী, আমি জয়ী। আমি থেমেছি কী, তুমি জয়ী। কী যে মধুর সুন্দর! শিপনের অন্তরাত্মা কেঁপে কেঁপে ভাসছে। আশ্চর্য দৃশ্যটাকে এত নিজের মনে হচ্ছে। সেই কৈশোরে সেই স্টেশানের কাছে সেই বালিকার উপস্থিতিতে সেই যে ক্ষণিক আলোড়িত হয়েছিল, এরপর এতকাল ধরে এই দৃশ্যটা দেখার জন্য তার শুধু অপেক্ষা করতে হলো।

এলআরটি স্টেশানের প্লাটফর্মে মানুষ উঠে যাচ্ছে। তাদের পাশ কাটিয়ে। সে সাথে স্কুলের অন্য ছেলেমেয়েরা। হয়তো তারা তাদের অন্য সহপাঠী-সহপাঠিনী। এতেও এই দুই বালক-বালিকার প্রেমসদৃশ রসাস্বাদনে সামান্যতম ভ্রূক্ষেপ নেই। পুরো পৃথিবী একদিকে হলে, তারা দু’জন অন্য জগতে। এক অখন্ড প্রেমরস-আবেগে তৃষ্ণা মেটাতে মগ্ন। চুমুতে চুমুতে একে অন্যের প্রেমময়তা, স্নিগ্ধ সজীব প্রাণময়তাকে জাগিয়ে রাখা। মনের আবেগ, আদর, ভালবাসার এ এক গভীরতম প্রকাশ। তা দিয়ে নিজেদের ভরিয়ে তোলা। এর সামান্যতম না দেখা যেন শিপনের কাছে এক ভীষণ ক্ষতি। তাই তা সে হারাতে চায় না। সে ছাড়া এমন গভীর দৃষ্টিতে আর কেউ তাদেরকে তাকিয়ে দেখছে কি? তার চোখে পড়ে না। এক সময় হালকা ট্রেন এসে স্টেশনে ঢুকে। প্রেমের চড়ুই দু’টো ট্রেন আসবে তাও জানে। অন্যদের সাথে মিশে তারাও ট্রেনে উঠে পড়ে।

বাকরুদ্ধ বিহবল হয়ে শিপন দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। ট্রেনের আগমন এই দুই চড়ুইয়ের মগ্ন রসাস্বাদনে বাধ সাধেনি হয়তো। কিন্তু শিপনের মৌণমগ্ন দু’চোখের দুর্লভ সুখানুভূতি আহরণে মারাত্মক ছেদ ঘটিয়ে দেয়। চোখের পলকে এই দুই অন্তরাত্মার একের প্রতি অন্যের অনাবিল আকর্ষণের চিত্র হঠাৎ উধাও হওয়ায়, শিপনকে অস্থির করে। যাত্রী ভিড়ের মাঝে সে ওদের অনুসন্ধানের চেষ্টা করে। খুঁজে পায় না। ওই দুই সাদা-কালোর সৃষ্ট ছবিটা যে নিতান্তই তাদের নয়, এ যে শিপনেরও ছবি, বালক-বালিকাদ্বয়ের সেই উপলব্ধি নেই। শিপনের ভেতরটাকে যে তারা কিভাবে, কতটা টেনে নিলো, এই অনুভূতিটুকুও তাদের নেই। শিপন বুঝেছে, কতটুকু উন্মোচিত করেছে তারা তাকে, খুঁজে পেতে তাকে কতদূর নিয়ে গেছে, কতদূর উদ্ভাসিত করেছে তার অন্তর আত্মা। যে এক পাপবোধে সে হয়েছিল সংকুচিত শামুক, তার ভেতরের প্রকাশ হয়েছিল উদ্ভ্রান্ত,বিভ্রান্ত; আজ তা থেকে যে তার মুক্তি মিললো।

এরপরও প্রতিদিনই ট্রেন চলে। ভোর পাঁচটা থেকে রাত একটা অবধি। অনেক মানুষ ট্রেনে উঠছে, নামছে। অনেক স্কুল ছাত্র-ছাত্রী। শিপন এখনো খুঁজে ফেরে সেই যাদুময় মধুরতম ছোট্ট জুটিটাকে। তার হৃদয়ে ছোঁয়া পেতে। পায় না খুঁজে। ওই দুই পবিত্র প্রতিমার কোন সন্ধান মেলে না। পথ ভুলেই শিপনের জন্য এই পথে তাদের শুধু একদিন আসা। খুব কাছে পেয়েও তার কিছু এক অন্তরে হারিয়ে ফেলা। হারানোর বেদনা তাকে আনমনা করে, উন্মনা করে। এভাবে আর কত সে হারাবে নিজেকে!

Advertisements

তথ্য কণিকা শামান সাত্ত্বিক
নিঃশব্দের মাঝে গড়ে উঠা শব্দে ডুবি ধ্যাণ মৌণতায়।

2 Responses to পাপ এবং পাপমুক্তির স্পন্দন – শেষ পর্ব

  1. ‌শেষটুকুর অপেক্ষায় ছিলাম, লেখার শেষে মন্তব্য রাখতে পারবো কিনা একটু দ্বিধায় ছিলাম, একই লেখায় শরীর এবং মনস্তত্ত্ব নিয়ে লিখতে গিয়ে অনেককেই দেখেছি দিকভ্রান্ত হয়ে যেতে, কারণ পরিমিতি বোধের অভাব, শামান লিখেছ খুব ভালো, ভাবছিলাম শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে তুমি, প্রথম দিকে খটকা লেগেছিল শিপনের বয়োসন্ধির ছবি আঁকতে গিয়ে লেখক পারবেতো ঠিক বাঁকটিতে এসে প্রয়োজনীয় রঙটি বেছে নিতে! স্থুলতাকে পাশ কাটিয়ে রক্তমাংসের শরীরের ভেতর সৃষ্টির সবচেয়ে সুন্দর অথচ শুন্য জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে শিপনের দীর্ঘশ্বাস সত্যি সুন্দর!

    Like

    • জানো, তোমার এই মন্তব্যটা এই পর্যন্ত এই গল্পে আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া। গল্পটা শেষ করতে আমাকে ভীষণ মাথা খাটাতে হয়েছে। শেষ পর্বটা নিয়ে আমাকে বেশ ভাবতে হয়েছে। পাঠকের প্রতিক্রিয়া নিয়ে এখনো দোদূল্যমানতায় আছি। সেখানে তুমি আমাকে কিছুটা বাঁচালে।

      খুব খুশি হলাম, এসে মতামত জানালে বলে। আমার তা খুবই দরকার ছিল, বুঝতেই পারছো। ভাল থেকো। ঝুঁড়ি ভরা ধন্যবাদ।

      Like

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: