পাপ এবং পাপমুক্তির স্পন্দন – ৩

পাপ এবং পাপমুক্তির স্পন্দন – ১
পাপ এবং পাপমুক্তির স্পন্দন – ২

শিপনের বাবার ইচ্ছে ছিল, শিপন ভাল কলেজে ভর্তি হয়ে পড়াশুনা করুক। শিপনের সে ইচ্ছে হয় নি। বাসা ছেড়ে দূরে অন্য কোন জেলা বা শহরে পড়াশুনা করে কি হবে? যেভাবে দিন কাটছে, সময় যাচ্ছে, সেভাবে কেটে গেলেই তো হয়। জীবনে অন্য কোন উত্তেজনা, আলোড়ন তো তার আর দরকার নেই। কি হবে নতুন কিছু বড় কিছু আর অর্জন করে? বেদনা বাড়িয়ে বা কি লাভ? মার সাথে, বাবার সাথে আছে এটাই তো অনেক বড়।

ছোট বনের সহপাঠিনী জেমি বাসায় আসে। ছোট বোনটার কাছে আসে? না কি তা একটা উছিলা? জেমি সলাজ হয় তাকে দেখে। চোখাচোখি হলে, মিষ্টি হাসে। শিপন ভাবলেশহীন। ওড়নার ফাঁকে দু’একবার তার ফুটন্ত স্তনে চোখ পড়লেও দৃষ্টি তা থেকে সরে আসে।

আজ সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে শুনতে পেল, শাপলা দুবাই থেকে ফোন করে আম্মার সাথে কথা বলেছে। শিপন কী করছে, তাও জানতে চেয়েছে। শীতে ক্যানাডায় এসেছিল শিপনরা। ঠান্ডার তীক্ষ্ণ আঁচ সহ্য করেছে। কিন্তু ক্যালগেরীর সামার যে এত মিষ্টি রোমান্টিক হবে, সে বুঝে উঠেনি। বাংলার বসন্ত বাতাস তো আউলা করে দেয়, তারুণ্যে পদার্পণের পর পর শিপন তা ঠিক অনুভব করে। আর এখানের গ্রীষ্ম যে ক্ষণিকে ক্ষণিকে সুরে সুরে ভেজে যায়। শাপলার প্রিয় গানগুলোর সিডি ছিল শিপনের কাছে। খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতো। এখন তো প্রায় ইন্টারনেটে শুনে। এখানকার গ্রীষ্ম প্রতিমূহুর্তে তনু-মন-প্রাণে অপূর্ব রোমান্টিকতার প্রলেপ বুলিয়ে যায়। হৃদয়ে সুর তোলা সুদূরের কোন এক প্রেয়সীকে তখন কাছে পাবার ইচ্ছে জাগে। এমন এক আকুল করা মূহুর্তে বিশেষ কিছু একটা চোখে পড়ে শিপনের। দু’চোখ ভরে সে তা বিমোহিত হয়ে উপভোগ করে।

সেদিন এখানকার বিশাল এক পার্কের বেঞ্চে সে বসেছিল একমনে লেকের মুখোমুখি। লেকটা বড়ই। নদীর মত আঁকা-বাঁকা বয়ে গেছে দূরে। লেকের পাশেই সিমেন্টের মসৃণ রাস্তা। এক হৃদয়হারা অনুভূতি নিয়ে লেকের অপর পাড়ে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে খুঁজে ফিরছিল শিপন নিজেকে। তার বাঁয়ে দূর থেকে এক জোড়া নীরব নিষ্পাপ চেহারার কিশোর-কিশোরী। ধীর গতিতে দু’টো আলাদা সাইকেলে লেকের পাড়ের রাস্তা দিয়ে তারা পাশাপাশি এগিয়ে আসে। এমন নিষ্পাপ পবিত্র কিশোর জুটি শিপনের চোখে পড়েনি কখনো। তারা কি একে অন্যের আত্মার আত্মীয়? কত বয়স হবে তাদের? চৌদ্দ, বড় জোর পনেরো? কিন্তু কী এক পরিপক্ক বন্ধুবোধ, আত্মীয়তাবোধ জড়িয়ে আছে তাদের মাঝে! আরো ষাট ষাট্টি বছর তারা এভাবে কি একত্রে কাটিয়ে দেবে? এসবের সবই অজানা। কিন্তু তারা তাদের তখনকার প্রতিটি মূহুর্ত যে সর্বোচ্চ উপভোগ ও উপলব্ধির মাঝে ধারণ করে আছে, তা কি কোন মূল্যে বাঁধা যায়? দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে শিপনের বুক থেকে। এমনই সময় সে অতিক্রম করে এসেছে। অজানা কোন এক প্রেয়সীকে খুঁজেছে। কারোর সন্ধান পাওয়া তো দূরের কথা, কোন কিশোরীর কাছাকাছি পৌঁছানো ছিল মহা এক বাঁধা বা বিপত্তির বিষয়। অন্যদের চোখ, বিশেষ করে বড়দের চোখের শাসন ছিল মেয়েদের থেকে দূরত্ব রেখে চলা। কেন যে এক স্বাভাবিকতা এভাবে জটিলতায় প্রতিপন্ন হয়। মেয়ে মানেই শিপনের কাছে যেন এক স্নায়ুবিক জড়তায় ভোগা। কোন কিশোরীর কাছাকাছি বা মুখোমুখি হওয়ার নিষ্পাপ আকাঙ্খাটুকু, বাসনাটুকু, অনুভূতিলাভটুকু ধীরে ধীরে বিষাদিত হওয়া। মানসিকভাবে নিজের অনুভূতি, উপলব্ধিকে দমন করার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে শিপনের তখন থেকে।

কেমন আছে শাপলা? বিয়ে হবার বছর খানেক পর শুনেছে শাপলার স্বামী তবলীগ জামাত করছে। শিপনদের দেশ ছাড়ার মাস তিনেক আগে বিশ্ব এজতেমাতে যোগ দিতে অল্প ক’দিনের জন্য স্বামীসহ সে দেশে আসে। শিপনদের সাথে দেখা হয়নি, তবে শুনেছে স্বামীর কারণে সে এখন পুরোদস্তুর বোরখা পড়ছে। শুধু চোখ দু’টো ছাড়া শরীর আর কোথাও তার উন্মুক্ত নেই, এত গরমেও। এজতেমা শেষ হবার দিন দশকের মধ্যেই আবার দুবাই ফিরে গেছে।

শিপন ভাবে, এখন যদি শাপলার সাথে তার দেখা হয়, শাপলা কোনভাবেই তার মুখাবয়ব তার কাছে উন্মোচন করবে না। সেবার দেশে এলে পরিচিত খালাতো, মামাতো, চাচাতো কোন ভাইয়ের সামনেই নাকি সম্পূর্ণ পর্দা না করে দেখা দেয়নি। এভাবে শাপলার সাথে কোনদিন দেখা হওয়ার কি কোন প্রয়োজন আছে? একমূহুর্ত শাপলার মুখাবয়ব দেখলে যার হৃদয় জুড়িয়ে যেত, শাপলার অনেক কিছু বোধগম্য হতো, কিভাবে সে এখন অমন কালো কাপড়ে আচ্ছাদিত শাপলার কাছে দাঁড়ায়? বোরখার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসা শাপলার দু’চোখের ভাষা সে কতটুকুই বা বুঝবে? এক অজানা অসন্মানবোধ শিপনকে কুঁকড়ে থাকে।

একটা কাজ নিয়েছে সে শহরের কেন্দ্রে। সাবওয়ের পাশে একটা দোকানে। সাবওয়েকে এখানে লাইট রেল ট্রানজিট (এলআরটি) বলছে। স্টেশানগুলো ভূমির উপর অবস্থান করছে বলে হয়তো। বড় আয়তনের এসব দোকানকে বলে এখানে কনভিনিয়েন্স স্টোর। অনেকটা মুদির দোকানের এদেশীয় ধনী সংস্করণ। শিপন স্টোর ক্লার্ক। এ কাজটাই তার কাছে সহজ মনে হয়। হালকা কাজ। দম ফেলার অবকাশ আছে। এখানকার বসন্তের শুরুতে কাজটা পেয়েছিল। তখনো এই শহরে ঠান্ডা। জ্যাকেট পরে চলতে হতো। সেই সাথে ভিন্ন সংস্কৃতিরও একটা চাপ তাকে সইতে হয় এখন বেশিরভাগ সময়ে। দোকানে থেকে সে মানুষ জনকে দেখে। তাদের গতিবিধি, আচার-আচরণ। নিজেকে মেলাতে চেষ্টা করে, এই ভিন্ন সভ্যতায়, যা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগৎ তার কাছে।

কাজ করতে করতে সে দেখে যেদিন একপাল কিশোরী এসেছিল তাদের দোকানটাতে। এইতো সেদিন। আহ্‌ এত সুন্দরী হতে পারে এই মেয়েগুলো। পরী কি এদেরই বলে? মানুষ কি পরী হতে পারে? শুনে এসেছে শিপন, মানুষের ভেতর মনের সৌন্দর্য হলো আসল। কিন্তু যদি ভেতরের তীব্র নিষ্পাপ সৌন্দর্যগুলো কারো মুখাবয়ব ও সারা শরীরে প্রকাশিত হয়। সারা শরীরে মিশে যেয়ে একটা পবিত্র সৌন্দর্যের রুপকল্প তৈরি করে। এই মেয়েগুলো কি তাই নয়? আর চোখের সামনে দেখা রুপকল্পের বাস্তবরুপই কি পরী? কী মুক্ত স্বাধীন না এরা। শুধুমাত্র মুক্ত স্বাধীন মানবীরাই পরী হয়ে উঠতে পারে, এমন বোধ জাগে শিপনের মাঝে তখন। কল্পনায় তার ফেলা আসা কৈশোর মেয়েগুলোর মাঝেই যেন খেলা করছিলো। কৈশোরকে উপভোগে এমন উচ্ছলতা ক’জন মানুষ পায়? ওরা একে অন্যকে তখন পানি ছিটাচ্ছিল। এবং কলহাস্যে চারপাশ মুখরিত হচ্ছিল। বেসিনের টেপ থেকে দোকানের সস্তা ফোমের সাদা গ্লাসে করে প্রথমে তাদের একজন পানি খেলো। কী এক কথা শুনে সে হাস্যরত আরেকজন কিশোরীর পেছনে পানির গ্লাস নিয়ে ধাওয়া করলো। বোঝা গেল, দোকানের বাইরে যেয়ে সে টার্গেট করা কিশোরীটির গায়ে গ্লাসের বাকি পানি ছিটাতে যাচ্ছে। একটু পরে দোকানে এসে ঢুকলো, কাপড়ে পানির ভেজা ছোপ নিয়ে সে টার্গেটকরা কিশোরীটি। সেও একই সস্তাদরের ফোমের সাদা গ্লাসে পানি নিয়ে, হাসতে হাসতে দোকানের বাইরে ছুটছিল আক্রমণকারীনি কিশোরীটিকে পানি ছিটানোর উদ্দেশ্যে। এভাবে একে একে প্রায় সবগুলো মেয়েই পানি ছিটানোর খেলায় মেতে উঠে। খুনসুটিরছলে কিশোরীগুলোর এই হাস্যগুঞ্জনমুখরিত, চটুল আন্দোলিত পদক্ষেপের মৃদুমন্দ ধাপাধাপি তাদের একে অন্যকেই শুধু পানিতে সিক্ত করেনি, শিপনের হৃদয়ের খোলা প্রকৃতিকে সিক্ত করে দিয়ে গেছে অনেকখানি। সেই মাত্রায় তার আবেগও উদ্বেলিত হয়েছে। আর তারা কলহাস্য-আন্দোলনে যেভাবে মুখরিত করছিল চারপাশ, তা চেয়ে চেয়ে দেখারই মত। তার ভেতরের আনন্দ রস অনুধাবনের মত। তার ভেতরে জীবনকে ছাড়িয়ে যাওয়ার উদ্দীপনায় মোহিত হওয়ার মত। আবারও তনু-মন-প্রাণকে সবুজ সতেজ উচ্ছ্লতায় আবিষ্ট বা নিবিষ্ট করে তোলার মত। যে নির্মল, সুস্থ, প্রাণোচ্ছল প্রেরণা আছে এর মাঝে, তাতে অবগাহন করে সৃষ্টিশীলতায় মেতে উঠার মত। মানুষ কখন সৃষ্টিশীল হয়ে উঠে, অথবা সৃষ্টিশীল হতে হলে জীবন সম্পর্কে কি ধরণের শর্ত বা অনুপ্রেরণা থাকা উচিত? এসব প্রশ্ন শিপনের মাঝে বার বারই উদয় হয়েছে। সে কি এসবের মীমাংসা খুঁজে পাচ্ছে তবে?

জীবনকে ছাড়িয়ে অন্য আলোকে উদ্দীপ্ত হতে গেলে সবসময় বাধা আসে। এখানেও তেমন আসে। এইভাবে তার দোকানের একের পর এক গ্লাসের তিরোহান দোকান মালিকের অর্থহীন অসহ্য মনে হয়। ক্রোধ ও বিরক্তি আফ্রিকা থেকে আগত আগাখান সম্প্রদায়ের এই ক্ষুদ্র বণিককে কিছুটা উত্তেজিত করে। উপায়ান্তর না দেখে সে কিশোরীগুলোকে দোকান ছেড়ে চলে যেতে বলে। কিশোরীগুলোর আনন্দ দমে যায় না তাতে। দোকান ছেড়ে তারা চলে যায় সত্যিই। কিন্তু চপলা পরীদের কল-শিহরণমাখা আনন্দ থেমে থাকে না। আস্তে আস্তে সবকিছু শিপনের দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। কিন্তু শুরুতে শিপনের আবেশায়িত মুগ্ধ কৌতূহল-উদ্দীপক দৃষ্টি দোকান মালিকের দৃষ্টি এড়ায় নি। বরং আমোদই ছড়িয়েছিল। মেয়েগুলোকে দেখার পর পর তার উদ্বেলিত চিত্তের অবস্থা বুঝে, তখন তিনি শিপনকে শুনিয়ে কথার তীর ছুঁড়ে বলেছিলেন, “সবগুলো তোমার জন্য।” লজ্জায় শিপনের কাঁচুমাচু হওয়ার মত অবস্থা। মালিকের পাশে গভীর আলাপ-রত পণ্য সরবরাহ সংক্রান্ত বিষয়ে আগত শ্বেত সেলস মহিলা তা শুনে সোল্লাসে খিলখিল করে হেসে উঠলো।

হায়, এর বিপরীতে বয়ঃসন্ধিরকাল থেকে বাংলাদেশে মেয়েদের ভীষণ গুটিয়ে যেতে দেখে শিপন। ছেলেদের থেকে দূরে থাকা তো বটেই। ছেলেদের থেকে সতর্ক থাকা হয়তো অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু এমন তীব্র পারিবারিক এবং সামাজিক অনুশাসন মেয়েটিকে জড়-সড় মাংশাসী প্রাণীতে রুপায়িত করার চেষ্টা করে। সে ভুলে যেতে বসে, তাকে যে ছুটে যেতে হবে, উড়ে যেতে হবে, ভেসে যেতে হবে আলোময় ভূবনে। কষ্টটা তখনই দানা বাঁধে, যখন দেখে খালাতো বোন শিমিন এক বড় মোটা ওড়নায় নিজেকে ঢেকে ঘরের কোণে আবদ্ধ করে রেখেছে। এই করে কি এই কিশোরী মেয়ে তার স্বাভাবিক বিকাশকে রুদ্ধ করে দেয় নি? অথচ শৈশবে কত ভাব ছিল শিমিনের সাথে। খালার বাসায় গেলে বা শিমিন তাদের বাসায় এলে, সারাটা সময় তো তাদের একসাথে খেলে, এখানে ওখানে ছুটে এটা-ওটা করে কেটে যেতো। তার মতই আর দু’একটা মেয়ের সাথে শিমিনের ভাব এখন। শিপন সেখানে অনাহুত, অবিবেচ্য।

নারীর শরীরে যে বাঁক আছে, তা যেন তার মনের বাঁকের সাথে মিশে থাকে।[শেষ পর্বের শুরু]

Advertisements

তথ্য কণিকা শামান সাত্ত্বিক
নিঃশব্দের মাঝে গড়ে উঠা শব্দে ডুবি ধ্যাণ মৌণতায়।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: