পাপ এবং পাপমুক্তির স্পন্দন – ২

পাপ এবং পাপমুক্তির স্পন্দন – ১

অবুঝ এই বয়সেই নির্বোধের মত নয়, তীক্ষ্ণ বোধ নিয়ে ঈশ্বরের সন্ধানে নেমে পড়ে শিপন অত্যন্ত অসচেতনতায়। পাপের উপলব্ধির একটা বোধ তার মাঝে সবসময় কাজ করে, এই সমাজের একজন সাধারণ জীব হিসেবে। কিন্তু মুয়াজ্জ্বিনের কাছে পাপের সম্পর্কে এত পরিষ্কার ব্যাখ্যা লাভ তাকে বিপর্যস্ত করে এবং বিপাকে ফেলে। তবু নিজেকে নিয়ে খেলার বা উপভোগের পুরোনো উপসর্গ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ দমিয়ে রাখতে ব্যর্থ হয় সে। এমনি একদিনের এক ঘটনা তাকে চমকে দেয়। তার মাঝে প্রশ্ন তৈরি হয়, পাপে নিমজ্জনই কি মানুষের মাঝে পূণ্যবোধের অনুভূতি সৃষ্টি করে? সেটা ছিল এক ছায়াময় সুশীতল ছুটির দিন। আজ অনেক দিন পর মনের আনন্দে সে উপভোগের খেলায় মাতে। উপভোগের শীর্ষে যখন অবস্থান করছে, তখনি বাথরুমের বাইর থেকে তার চেয়ে বছর দু’য়েক বড় বাসার কাজে নিয়োজিত ছেলেটির ডাক শুনে সে যুগপৎ সুচিক্কন ভীতি ও অস্থিরতায় তাড়িত হয়ে পড়ে। ছেলেটি বলে, “মুয়াজ্জ্বিন সাবে আইছে, কুরআন পড়তে আসেন।” আঁৎকে উঠে শিপন। কী করেছে সে! নিজেকে যে থামাতে পারে নি। প্রতিজ্ঞায় দৃঢ় হয় তখনি। না, আর নয়। আর কখ্‌খনো এমন নয়। কাঁপতে থাকে। কিভাবে স্পর্শ করবে কুরআন এ হাতে। এ দুর্গন্ধমাখা নষ্ট হাতে। পূণ্যের চিন্তায় পাপবোধে সে বিচলিত হয়। খৃষ্টান ধর্মে যদি জন্ম নিতো, তবে আবার পবিত্র গ্রন্থ স্পর্শের আগে সে কনফেশানে যেত। কিন্তু এই ধর্মে এই মূহুর্তে কিভাবে সম্ভব, শিপনের তা জানা নেই। তবুও অনেক মমতার সাথে কুরআন শরীফ হাতে ধরে রেখে সে মুয়াজ্জ্বিনের মুখোমুখি হয়, যদিও তার সর্বোচ্চ পবিত্র গ্রন্থ স্পর্শ করতে হাত কাঁপছিলো।

মুয়াজ্জ্বিন এক নজর দেখে তাকে বলে, “তোমাকে আজকে একটু বেচইন মনে হচ্ছে। এই বয়সে এমন হতে পারে। মনে আল্লাহ্‌র ভয় থাকলে সব মুশকিল আসান হবে। গুনাহ্‌র কাজ থেকে দূরে থাকবে।” শিপনের মনে হলো, এই কথাটুকুই সে শুনতে চেয়েছিল। মনে হয় তার, তাহলে পাপ পূণ্যকে কি জড়িয়ে থাকে? না কি পূণ্য পাপকে? সময় যতই এগিয়েছে, জীবন যতই এগিয়েছে, এই পাপ-পূণ্যের বোধ তাকে ক্ষত-বিক্ষত করেছে। যা পাপ, প্রবৃত্তি তাতেই যেন বেশি সম্পৃক্ত হতে চেয়েছে। পাপ আর প্রবৃত্তির মাঝে তাহলে পার্থক্য কোথায়? মানুষ কি তার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি-কে অস্বীকার করতে পারে? মানুষটাই বা তাহলে আর বাঁচে কি করে? শিপনের ছোট মাথা তা আর অত ভেবে উঠতে পারে না। কিন্তু এক অবধারিত ঘটনা তার মাঝে এক নীরব বিদ্রোহ তৈরি করে। পরিবর্তনের সূচনা বোধ হয় তখন থেকেই।

এসএসসির পর শিপন তাদের গ্রামের বাড়ি যায়। সেখান হতে জেলা শহর বেশি দূরে নয়। চাচাতো বোন শাপলা জেলা শহরের বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে পাশ করে সেখানেই ইংরেজি সাহিত্যে অনার্সে পড়ছে। গ্রীষ্মের ছুটি। আম আর কাঁঠালের উৎসব। কাঁচা আম, পাকা রসালো আম। এসব কেমন, শাপলা সাথে না থাকলে এমন করে শিপন বুঝে উঠতো না। আম বাগানে কিভাবে রসালো আম ফুটো করে চুষে চুষে খেতে হয়, শাপলার কাছ থেকে নতুন করে ছবক নেয় সে। পাকা কাঁঠালের মৌ মৌ গন্ধ। রসালো আবেশ। গাছ থেকে ফল পেড়ে নিতে শিখে শিপন। কাঁঠালের কষ হাতে মাখামাখি হয়ে যায়। শাপলা হেসে কুটি কুটি হয়ে শিপনের হাতে তেল মাখিয়ে দেয় কষ তোলার জন্য। কবি জসিম উদ্দীনের “বাঙ্গালীর হাসির গল্প”-এর পাঠান বা পাঞ্জাবীর কাঁঠাল খাওয়ার গল্পটা শুনিয়ে দিয়ে দুষ্টুমী করে তেমনি বলার চেষ্টা করে, “তুমভি কাঁঠাল খায়া?”

কাঠ ফাটা গ্রীষ্মের রোদ্দুরে শাপলা ভেতর বাড়ির পুকুরে ডুব সাঁতার দিয়ে চলেছে। কখনো কখনো ডুব দিয়ে এদিক থেকে ওদিকে যাচ্ছে। ছায়া নিবিড় এই পুকুরের চারপাশ। কিন্তু এক রোদেলা আলো পুকুরটাকে উপর থেকে আলোতে উত্তপ্ত রাখে। রোদ খুব কমই পুকুর জলকে স্পর্শ করতে পারে। গাছ পাতার ফাঁকে ফাঁকে একটু আধটু যা সম্ভব। শিপন পাড়ে দাঁড়িয়ে শাপলার এই অবলীলায় সাঁতার কাটাকে উপভোগ করে। সাথে সাথে নিজে যে পারে না, তার জন্য ভেতরে ভেতরে আফসোসে আক্রান্ত হয় এবং সেই সাথে তাকে হীনতা বোধ স্পর্শ করে। শাপলা ঘাটের কাছে এসে ইশারায় শিপনকে ডাক দেয়, “কিরে, সাঁতার শিখবি?” শিপন হাঁ-বোধক মাথা নাড়ায়। লুঙ্গিটাকে মালকোচা মেরে নেয় সে। কিভাবে পানিতে ভাসতে জানতে হয়, শিপনকে অল্প পানির মধ্যে তা শেখাতে থাকে শাপলা। এছাড়া প্রতি বিকেল সন্ধ্যা রাত তাদের বাড়ির ভেতর ভাজা পোড়া এটা সেটা খেয়ে, গল্প-গুজবে কাটে। কখনো দু’জন বাড়ির আশ-পাশ স্কুল ঘর পর্যন্ত ঘুরে ফিরে। আবার কখনোবা পাড়া-পড়শী অবধি।

একদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে পুকুর পাড়ে বসে থাকে শাপলা। প্রকৃতির ডাকে শিপনকে বাড়ির বাইরে আসতে হয়। ঘরে ফিরে এসে জানালা দিয়ে দক্ষিণের পুকুর ঘাটে শাপলাকে এক মনে বসে থাকতে দেখে সে অবাক হয়। বেরিয়ে এসে, পানিতে গভীর চিন্তা নিয়ে চুপচাপ বসে থাকা শাপলার পাশে এসে বসে। শাপলা শিপনের উপস্থিতি টের পেয়েও তার দিকে তাকায় না। ভারাক্রান্ত মন। কিছু বলে না শিপন। আজকেই প্রথম শাপলার এই বিষণ্ণ রুপ সে দেখতে পেলো। কিছু না বুঝে শাপলার দিকে একসময় সে ঘুরে তাকায়। শাপলাও ফিরে তার চোখে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। নড়ে উঠে শিপন কিছুটা। কোমল একটা অনুভূতি তার হৃদয়ে বয়ে যায়। গতকালের শাপলাকে আজ অন্য শাপলা মনে হয়। একদম ছোট শিশু থাকাবস্থাতেই গ্রামে বড়দের মুখে শাপলা ডাক শুনে শুনেই শিপনও শাপলাকে শাপলা বলেই ডাকতো। চেষ্টা করেও বড়রা তাকে শাপলা আপু বলাতে পারে নি। সেই থেকে শিপনের কাছে শাপলা, শাপলাই থেকে গেছে। কিন্তু এখনকার শাপলা যে সেই শাপলা নয়। এখনকার শাপলা আর তার থেকে আবেগে ভাবেও বড় নয়। তারা সমমর্যাদার। শিপনের স্পর্শের সীমায়। বলে না কিছু সে। তার কাছে এই অনুভূতি নতুন হলেও অজানা নয়। এমনই এক ভাব, আবেগ, অনুভূতি সে বয়ঃসন্ধিকাল থেকে খুঁজে বেরিয়েছে। সেটা যে এমনভাবে এখানে এসে ছুঁয়ে যাবে, তা তার অজানাই ছিল। অবশের মত শিপন শাপলার পাশে বসে থাকে। সে উঠতে চাইলেও উঠতে পারে না যে এখন।

ঘরের বাইরে যাওয়ার ইচ্ছে হলেও তারা এখন বাইরে যেতে পারে না। কেউ যদি তাদের মনের ভাষা, মুখের ভাষা, চোখের ভাষা পড়ে ফেলে। এমনকি ঘরের ভেতরেও তারা অন্যদের আড়ালে থাকার চেষ্টা করে। একদিকের বসার ঘরে বসে অনর্থক অর্থহীন লুডু খেলায় মাতে। খেলতে হয় বলে খেলে যাওয়া। তা না হলে দু’জনের পাশাপাশি থাকা হয় না। খাওয়ার সময় শিপনের পাশে, বসার জায়গাটা শাপলা আগে-ভাগে দখল করে নেয়। আর অল্প কিছুদিন পর বাবা এসে শিপনকে নিয়ে যায়।

এসএসসি-র ফলাফল বের হলে, শিপন তার ভাল ফলাফলের সাথে আর একটা খবর পায়। তাহলো শাপলার বর ঠিক হয়ে গেছে। ছেলে মধ্যপ্রাচ্যে চাকরিরত একজন প্রকৌশলী। বেশ ধার্মিক প্রকৃতির। শাপলাকে তার পছন্দ হয়েছে। যে কোন মূহুর্তে বিয়ে হয়ে যেতে পারে, যেহেতু ছেলে অল্প সময়ের জন্য দেশে এসেছে। এই তাড়াহুড়োয় তাদের বাসার কারোরই আর বিয়েতে যাওয়া হয় নি। এমনকি শিপনের বাবার উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও শেষ মূহুর্তে অফিসের কাজের চাপে যাওয়া সম্ভব হয় নি।

শিপনের বাবার ইচ্ছে ছিল, শিপন ভাল কলেজে ভর্তি হয়ে পড়াশুনা করুক। [তৃতীয় পর্বের শুরু]

Advertisements

তথ্য কণিকা শামান সাত্ত্বিক
নিঃশব্দের মাঝে গড়ে উঠা শব্দে ডুবি ধ্যাণ মৌণতায়।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: