পাপ এবং পাপমুক্তির স্পন্দন – ১

[গল্পটি চারপর্বে সমাপ্ত]

ঊনিশ বছর বয়সে বাবা মার সাথে শিপনের ক্যানাডায় আসতে হলো। এখানকার তেল সমৃদ্ধ ধনী প্রদেশ বলে খ্যাত আলবার্টার ক্যালগেরীতে শুরুতেই ঠাঁই নিল তাদের পরিবার।

এখানে শিপনের কাছে সবকিছুই নতুন। ঘর-বাড়ি, রাস্তা-ঘাট, আলো-বায়ু-জল, গাছ-গাছালি, মানুষের ভাষা-কথাবার্তা, পোষাক-আশাক, চাল-চলন সব তার দেখার জগৎ হতে পুরোপরি ভিন্ন। যুগপৎ বিস্ময় ও আনন্দ, আর এক মানসিক চাপ তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। যা কিছু দেখে, তাতে তার বিস্ময় বেড়েই চলে, সে সাথে উৎসুক্য। এতদিনের তার পরিচিত এবং বেড়ে উঠা জীবনের বাইরেও যে একটা জীবন ও জগৎ আছে, হঠাৎ করে তা তার চোখে পড়ায় নিজের ভাবনার জগতে নীরব আন্দোলন তুলে। শুধু ভাবনার জগৎ নয়, তার দৃষ্টির জগতও পাল্টাতে থাকে।

সপ্তম শ্রেণীতে থাকাকালীন শিপন টের পায়, সে সাবালক হয়ে উঠছে। যে হরমোনের উপস্থিতি তাকে সাবালকত্বে উন্নীত করছে, তাকে বিবিধ মূহুর্তে সুরসুরি দিয়ে জাগিয়ে তুলছে, তাকে অস্বীকার করে কিভাবে? টয়লেটে বা বাথরুমে ঢুকলেই নিজেকে নিয়ে সে মেতে উঠতো। নিজেকে নিজে উপভোগ করতো। প্রথমদিন হঠাৎ করে কোথা থেকে যে কী হয়ে গেলো! ভীত-সন্ত্রস্থ হয়ে উঠে। আনন্দ যে কিভাবে নিরানন্দ হয়ে উঠতে পারে, জানা ছিল না তার। এক লজ্জা এবং অনুতাপবোধে গুটিয়ে থাকে। বেশ শান্ত হয়েছিল ঐ ঘটনার পর কিছুদিন। স্মরণে আনতে চাইতো না। চমক খেলে যেত তার মাঝে। নিজেকে উন্মোচনের মূহুর্তে ভয়, বিস্ময়, সুখ, কৌতূহল সব যে একত্রে মিশে থাকে, এ তার জানা ছিল না। একটা নিষিদ্ধ বোধ থেকে মন্দবোধ। আবার মন্দবোধ থেকে পাপবোধ । এরপর অনেকদিন সে এই সুখবোধের কৌতূহলের দিকে ধাবিত হয়নি।

তখন সে অষ্টম শ্রেণীতে। বাবা বদলী হয়ে এলেন নতুন এক শহরে। এখানে পেলেন এক বিরাট বাংলো বাড়ি। এক বৃটিশ ছাতা কোম্পানীর লোকজন না কি থাকতো এই বাড়িতে। এত লম্বা বাসা। এক প্রান্তের ঘর থেকে কেউ চীৎকার করলে অন্য প্রান্তের কেউ শুনতে পাবে না। বিরাট আয়তনের প্রতিটি রুম। ছয় রুমের এই বাংলো বাড়িতে শিপন তার চেয়ে তিন বছরের ছোট বোনসহ বাবা-মার সাথে থাকে। শিপন উত্তর দিক হতে দু’নম্বর রুমটাতে থাকে। আর তার বাবা-মা থাকে দক্ষিণ দিক থেকে দু’নম্বর রুমে। শিপনের ছোট বোনটা বাবা-মার রুমের একপাশে আরেকটা বিছানায় ঘুমায়। শিপন এবং তার বাবা-মার থাকার রুমের মাঝখানে রয়েছে মোটা পর্দা দিয়ে আলাদা করা দু’টো বিরাট রুম। এই রুম দু’টির একটি হলো খাওয়ার ঘর, অন্যটি বসার ঘর। রাতে মাঝে মাঝে শিপনের ঘুম ভেঙ্গে যায়। মনে হয়, কোন অশরীরি কিছু তার গলা চেপে ধরেছে। শিপন উঠে গিয়ে লম্বা লোহার রড়ের দরজার গ্রীলের ভেতর থেকে বাসার বারান্দায় শোয়া রাতের দারোয়ানকে ডাক দেয়।

এই বিরাট বাড়ির বাথরুমগুলোও বড় আকারের। শিপনের রুমের সাথে একটি, বসার ঘরের সাথে আরেকটি এবং অন্যটি তার বাবা-মার রুমের সাথে। বাথরুমগুলো এই বিশাল বাড়ির নিঃসঙ্গতাকে ধরে রেখে কেমন এক নেশায় ডুবিয়ে রাখে, এমনি মনে হয় তার।

এই তিন বাথরুমের বাইরের দিকে বাংলো বাড়ীর পূব অংশে গাছপালার এক সুশীতল মনোরম পরিবেশ। বাথরুমের উঁচু জানালার ফাঁক দিয়ে তা ঠিকই দেখা যায়। সেই জানালা গলেই বাথরুমে দিনের আলো আসে। অনেক সময় বাথরুমে ঢুকেই শিপন ঐ জানালার দিকে মাথা উঁচু করে বাইরে তাকিয়ে থাকে। গাছপালা ও দূর আকাশ দেখা যায়। মোহাবিষ্ট হয় সে বাথরুমের এই নীরব নৈঃশব্দে। শিরশির অনুভূতি জাগে শরীরে। অজান্তে তার হাতের স্পর্শ চলে যায় শরীরের গোপন অংশে। কোন এক প্রেয়সীর শিহরণ লাগা স্পর্শ পেতে ইচ্ছে করে কৈশোরের সেই মূহুর্তে। প্রেয়সীর কামনায় ডুবে যেতে চায়। এক নিমগ্ন সুখানুভূতিতে সে ডুবে যায়। বাইরে যখন বৃষ্টি বাদলা ঝরতে থাকে গাছ-গাছালি ছেয়ে প্রবল, এই চেতনা তখন আরো তীব্রতর হয়। সুদূরের প্রেয়সীর কামনার ডাক তাকে আপ্লুত করে। এরকম সম্মোহিত আকর্ষণের আর এক ঘটনা মনে করে এখনও সে বিস্মিত হয়ে উঠে। সপ্তম শ্রেনীতে উঠেই যেন সে শৈশব থেকে হঠাৎ কৈশোরে জেগে গেছে। মনে মনে আশ্চর্য হয়েছে, নিজের চেতনা, মন এবং শরীরের এই দৈবাৎ পরিবর্তন।

বাসার সামনের রেল স্টেশানটাতে নিত্যদিনকার মতো একটু ঘুরে বেড়াচ্ছিল সেদিন। আকাশ প্রকৃতিতে বৃষ্টি ছুটছিল। স্টেশানের সাথে এক লম্বা চওড়া চতুর্পাশ খোলা পাকা বাজার সদৃশ এক ছাদের নীচে অনেকে এসে বৃষ্টির জন্য আশ্রয় নিয়েছিল। তারই নীচে একধারে দাঁড়িয়ে শিপন আচ্ছন্নের মতো বৃষ্টি-চৈতন্য মগ্ন ছিল। একসময় কোথা থেকে উদোম গায়ের নয় কি দশ বছরের এক ছিন্নমূল মেয়ে তার সামনে এসে ডানপাশে দাঁড়ায়। কী আশ্চর্য! তার দিকে তাকাতেই মূহুর্তেই শিপনের শরীরে বিদ্যুৎ খেলে যায়। তার শরীরে শিরশিরে শিহরণ তৈরি হয়। হঠাৎ করে এই অভূতপূর্ব অনুভূতি তাকে মোহমুগ্ধ করে ফেলার গূঢ় কারণ সে তখন ভেবে পায় নি। এক গোপন ভাললাগার নেশালো বোধ তাকে গ্রাস করে। চৌম্বক আকর্ষণের মতই সে সরে এসে মেয়েটার পেছনে দাঁড়ায়। অভোগ্যপূর্ব এক সুখানুভূতিতে সে বেঘোরে ডু্বতে থাকে। শরীর, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে জেগে উঠে এক বোধ। তাকে অস্বীকার করতে পারে না। শিপনের পেছনে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বালিকার পছন্দ হয় নি। সে সরে গিয়ে অন্য আরেক প্রান্তে চলে যায়। শিপন তাকে অনুসরণ করে। মেয়েটা স্থান পরিবর্তন করে অন্যত্র সরে গেলে, সে আবারও তাকে অনুসরণ করে। স্থান পরিবর্তন দ্রুত হতে থাকে মেয়েটার। বার বার মেয়েটার সরে যাওয়ায় শিপনের প্রবাহমান সুখস্রোত বাধাগ্রস্থ হয় এবং পারিপার্শ্বিকতায় সম্বিৎ ফিরে আসে তার। মেয়েটাকে তার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াতে দেখে এবারে এক কষ্টবোধ, হীনতাবোধ ও লজ্জাবোধ তাকে ঝাপটে ধরে। নিজের সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠে সে। নিজের সম্পর্কে একটা বিশ্রী বোধ জন্ম নেয়। এত নীচতা হঠাৎ করে তার মধ্যে কিভাবে ভর করে, সে ভেবে পায় না। একটা গোপন ভাব, সবার থেকে লুকিয়ে রাখার মত একটা ঘটনা। একটা অন্যায় বোধ, ভয়ও তার সাথে জড়িয়ে থাকে।

বদলী হয়ে এই বাংলো বাড়িতে এলে তার শরীরের নিয়মিত এই জাগরণকে সে আর স্তব্ধ হতে দেয় নি। এখানে এসে এক উপভোগ্যতার নেশা সময় অসময়ে তাকে চেপে বসে। তা অনিয়মিতভাবেই। একসময় বাবার ইচ্ছে হলো, ছেলের কোরআন শরীফ পাঠ এবার শুরু হোক। আমপারা আগেই পড়া ছিল। এলাকার মসজিদের ত্রিশোর্ধ্বের মুয়াজ্জিন কোরআন পাঠ শিক্ষা দেয়ার পাশাপাশি বিবিধ গুণাহ্‌ সম্পর্কে ধারণা দিতে থাকেন। বেহেশ্‌ত লাভ এবং ছওয়াব লাভ সম্পর্কেও উপদেশ দেন। শিপনের মাঝে ধীরে ধীরে পাপ-পূণ্যের এক নির্মোহ ভাব তৈরি হয়। সে চেষ্টা করে পূণ্যের পথে থাকার। নবম শ্রেনীতে উন্নীত হবার পর তার মাঝে পূণ্য লাভের বোধ প্রকোপ পায়। এসএসসি পরীক্ষায় তার ভাল ফলাফল চাই। ভাল ফলাফলের জন্য ঈশ্বরের কৃপা প্রয়োজন। আর ঈশ্বরের কৃপা পেতে হলে পাপ পরিহার করা উচিত। সুতরাং নিজে নিজের শরীর নিয়ে উপভোগ করা গুনাহ্‌র কাজ। তা দ্রুত বন্ধ করা চাই। সে মনের জোর খাটিয়ে বসে। না, ঈশ্বরকে অসন্তুষ্ট করা যাবে না।

অবুঝ এই বয়সেই নির্বোধের মত নয়, তীক্ষ্ণ বোধ নিয়ে ঈশ্বরের সন্ধানে নেমে পড়ে শিপন অত্যন্ত অসচেতনতায়। [দ্বিতীয় পর্বের শুরু]

Advertisements

তথ্য কণিকা শামান সাত্ত্বিক
নিঃশব্দের মাঝে গড়ে উঠা শব্দে ডুবি ধ্যাণ মৌণতায়।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: