পাপ এবং পাপমুক্তির স্পন্দন – শেষ পর্ব

পাপ এবং পাপমুক্তির স্পন্দন – ১
পাপ এবং পাপমুক্তির স্পন্দন – ২
পাপ এবং পাপমুক্তির স্পন্দন – ৩

নারীর শরীরে যে বাঁক আছে, তা যেন তার মনের বাঁকের সাথে মিশে থাকে। এই বাঁকই পুরুষকে দগ্ধ করে, যন্ত্রণাবিদ্ধ করে, কখনো কখনো ধ্বংসকে ত্বরাণ্বিত করে। আবার এই বাঁকের বদৌলতে, এক এক পুরুষের জীবন এক একভাবে বৃদ্ধি পায়, বিকশিত হয়। প্রচন্ড পৌরুষ দীপ্ততা জেগে কোন কোন পুরুষকে অর্জন বা উপার্জনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ঠেলে দেয়। শিপনের নারী সম্পর্কে এইরুপ চিন্তা তার বয়সের তুলনায় ভারী মনে হয়। নারী সম্পর্কে তার মাঝের শত দ্বন্ধ, দূরত্ব, জটিলতা, অবোধ্যতা, ইতস্তত বোধ দূর হওয়ার ব্যাপারে প্রথম প্রভাতের প্রচ্ছন্নতা শাপলাই। ভোরের আলো বাতাসে যার উদ্ভাস। তার ভাষা শেখার অ, আ। এখন শিপন পুরো বাক্য পড়তে পারে ভালভাবেই, তা লিখিত হোক বা অলিখিত।

বাবা-মার মাঝের সম্পর্ক থেকে শিপন বুঝেছে এই বাঁকের অভাব এবং অবোধ্যতা তাদের মাঝের সম্পর্ককে এক ধরণের জড়তার মাঝে আটকে দিয়েছে। এই জীবনবোধ তার কাম্য নয়। এখানে এসে, এদেশের কিছু কিছু বাবা-মাদের দেখে তার সেরকম মনে হয়নি। একধরণের প্রেমময় দীপ্ত গতিশীলতায় তারা তাদের সংসার সন্তানদের উন্মুক্ততায় গড়ে তুলেন বলে প্রতীয়মান। শিপন ভাবে, এই জড়তাবোধ দেশে তার প্রজন্মের মাঝে কমে এলেও, মানুষ ও তার পরিপূর্ণ সুস্থ-স্বাভাবিক বিকাশের প্রয়োজনে এখনও তা অপ্রতুল। পৃথিবীর এই যে এক বিশাল ভূ-খন্ড, মানুষ কি সেই প্রকৃতির অংশ নয়? তাহলে তার প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠার পেছনে এতো প্রতিবন্ধকতা কেন? কেন মানুষ প্রকৃতির মতই স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে না? কেন সহজ সরল স্বাভাবিক সুন্দরকে জটিলতায় সে গুলিয়ে ফেলে। শিপনের ভাবনার জগতে কোন কোন বিশেষ মূহুর্তে কারো প্রতি অজানা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

গ্রীষ্মের শেষে অন্য ঋতুর শুরু। এখানে যাকে ‘ফল’ বলে। ফল ঋতুর শুরুটা বাংলাদেশের শীতের আমেজের সাথে মিলে যায়। আবার বাংলাদেশের বসন্তের শুরুর মতোও মনে হয় কখনো কখনো তার। কিন্তু যতই দিন যেতে থাকে ঠান্ডা আবহাওয়ার ঝাপটা বাড়তে থাকে। শেষে এখানকার ভয়ংকর শীত ঠান্ডার সাথে গিয়ে মিশে। নদীর সাগরে মিশে যাওয়ার মতই, এক ঋতুর অন্য ঋতুর সাথে মিশে যাওয়া। ‘ফল’ শুরু মানে ছেলেমেয়েদের স্কুলে ফিরে যাওয়া। শিপনের কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো ফেরা হলো না। বাংলাদেশে উচ্চ মাধ্যমিকে সে যে ফলাফল করেছে, তা এখানে কোন ভাল বিষয়ে পড়াশুনার জন্য যথেষ্ট নয়। সুতরাং ফল ভাল করতে আবার কয়েকটা বিষয় নতুন করে পড়তে হবে এখানে। অগত্যা পুরোদিনের কাজটা ধরে রেখে, খন্ডকালীন স্কুলে যেতে হচ্ছে তাকে সপ্তাহের দু’দিন সন্ধ্যায় ও শনিবারে পুরো ছুটির দিনে। কাজটা ধরে রেখে লাভ হচ্ছে দু’দিকে। অর্থের সাশ্রয় হচ্ছে। নতুন অভিবাসিত হওয়া তার পরিবারকে অর্থ সাহায্য করতে পারছে, সে সাথে আগামী বছরের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনার খরচের একটা বড় অর্থ এখন সংগ্রহ হয়ে যাচ্ছে।

দোকানের পাশের এলআরটি-এ স্কুলের ছেলেমেয়েদের যাতায়াত করতে দেখে সে প্রতিদিনই। কী চমৎকারই না লাগে ছেলেমেয়েদের স্কুল পোষাকে! দলে দলে ছেলেমেয়েরা স্কুল থেকে ফেরে। কিন্ত একটি দিন ছিল শিপনের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন।

অন্যদিনগুলোর মতই ট্রেন তার নিজস্ব সূচীতে চলছিল। ছেলেমেয়েরাও স্কুল থেকে ঠিক ঠিক বাসায় ফিরছিল। দোকানের কাজের ফাঁকে হঠাৎ তার চোখে পড়ে সাদা-কালোর এক অপূর্ব সংমিশ্রণের চিত্র। এই অদ্ভূত আনন্দ সুন্দর রুপটি দেখবে বলে বোধ হয় ঈশ্বর তাকে এই দোকানে কাজটা মিলিয়ে দিয়েছে।

শৈশব থেকে কৈশোরে উত্তীর্ণ হয়েছে কি তারা? কত বয়স হবে তাদের? দশের বেশি কি? ধরে নিলাম এগারোই হবে। কিন্তু যে ক্রীড়ায় মগ্ন তারা, তা তো বয়সের সীমাকে ছাড়িয়ে গেছে। এত গভীর দীপ্ত প্রেম তারা কোথা থেকে পেল? একি শুধু নিষ্পাপ আকর্ষণ? নাকি তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু লুকিয়ে আছে এতে। এরা তো নির্দোষ একেবারে। বিকৃতবোধ বা স্বেচ্ছা প্রণোদনের বিন্দুমাত্র ভাব নেই এই ক্রিয়ায়। একেবারেই প্রাকৃতিক, প্রকৃতিগত সুন্দর, সাবলীল। প্রকৃতির বিস্ময় কাকে বলে শিপনের জানা নেই। কিন্তু এটা তার কাছে সেরকমই বিস্ময়। এত নিবিড়। আর তাই বোধ হয়, এতে কোন রাখ-ঢাক নেই। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পরে এক কবি বন্ধুর পাল্লায় পড়ে কিছুদিন কবিতা নিয়ে সে একটু গভীর নাড়া-চড়া করতে গিয়েছিল। সেখানে রবীন্দ্র-কাব্যে সীমা ছেড়ে অসীমে যাবার কথা বলা হয়েছে। এটা কি তবে সেই অসীমে পৌঁছার প্রক্রিয়ার অংশ? কিন্তু না, এটা তো দেহের মাঝে থেকেও দেহহীনতার কথা বলছে। তা নয়তো এই ভরা দুপুরে, এত জনসম্মুখে তারা যেভাবে একে অন্যতে আপ্লুত হচ্ছে, তাকে স্রেফ প্রেমময় আকর্ষণে আবদ্ধ করে রাখা বললে অনেক কমই বলা হয়। তাছাড়া এই এত অল্প বয়সে! শিপনের মনে হলো, প্রকৃতির অপার বিস্ময় বা রহস্য বোধ হয় এখানে উদ্ঘাটিত হচ্ছে এই নিতান্ত দুই শিশু-কিশোরের মাঝে। একেবারেই স্বয়ংক্রিয় বা স্বতঃস্ফূর্তভাবে। হ্যাঁ, তা একেবারেই নির্দোষ স্বতঃস্ফূর্ত। অল্প বয়সের এক উদ্দীপনাময়ী আকর্ষনীয়া সুঠাম কালো মেয়ে এবং সেই একই বয়সের এক সুশান্ত সরল শ্বেত ছেলের বিপরীতমুখী দাঁড়িয়ে একে অন্যকে অনবরত চুম্বন। এই চুম্বন মানে একেবারে লিপস্‌ কিসিং। ঠোঁটে ঠোঁট। একবার মেয়েটা দেয় তো, ছেলেটা থামে না। ছেলেটা দেয় তো, মেয়েটা থামে না। বিস্ময়াবিষ্ট কৌতূহলে তাকিয়ে থাকে শিপন। এলআরটি-এর প্ল্যাটফর্মে উঠার শক্ত সিমেন্টের সিঁড়ির একেবারে উঁচুর কাছাকাছি দাঁড়িয়ে, তাদের একে অন্যের মাঝে যেন এক চুমুর প্রতিযোগিতা চলছিল। তুমি থেমেছো কী, আমি জয়ী। আমি থেমেছি কী, তুমি জয়ী। কী যে মধুর সুন্দর! শিপনের অন্তরাত্মা কেঁপে কেঁপে ভাসছে। আশ্চর্য দৃশ্যটাকে এত নিজের মনে হচ্ছে। সেই কৈশোরে সেই স্টেশানের কাছে সেই বালিকার উপস্থিতিতে সেই যে ক্ষণিক আলোড়িত হয়েছিল, এরপর এতকাল ধরে এই দৃশ্যটা দেখার জন্য তার শুধু অপেক্ষা করতে হলো।

এলআরটি স্টেশানের প্লাটফর্মে মানুষ উঠে যাচ্ছে। তাদের পাশ কাটিয়ে। সে সাথে স্কুলের অন্য ছেলেমেয়েরা। হয়তো তারা তাদের অন্য সহপাঠী-সহপাঠিনী। এতেও এই দুই বালক-বালিকার প্রেমসদৃশ রসাস্বাদনে সামান্যতম ভ্রূক্ষেপ নেই। পুরো পৃথিবী একদিকে হলে, তারা দু’জন অন্য জগতে। এক অখন্ড প্রেমরস-আবেগে তৃষ্ণা মেটাতে মগ্ন। চুমুতে চুমুতে একে অন্যের প্রেমময়তা, স্নিগ্ধ সজীব প্রাণময়তাকে জাগিয়ে রাখা। মনের আবেগ, আদর, ভালবাসার এ এক গভীরতম প্রকাশ। তা দিয়ে নিজেদের ভরিয়ে তোলা। এর সামান্যতম না দেখা যেন শিপনের কাছে এক ভীষণ ক্ষতি। তাই তা সে হারাতে চায় না। সে ছাড়া এমন গভীর দৃষ্টিতে আর কেউ তাদেরকে তাকিয়ে দেখছে কি? তার চোখে পড়ে না। এক সময় হালকা ট্রেন এসে স্টেশনে ঢুকে। প্রেমের চড়ুই দু’টো ট্রেন আসবে তাও জানে। অন্যদের সাথে মিশে তারাও ট্রেনে উঠে পড়ে।

বাকরুদ্ধ বিহবল হয়ে শিপন দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। ট্রেনের আগমন এই দুই চড়ুইয়ের মগ্ন রসাস্বাদনে বাধ সাধেনি হয়তো। কিন্তু শিপনের মৌণমগ্ন দু’চোখের দুর্লভ সুখানুভূতি আহরণে মারাত্মক ছেদ ঘটিয়ে দেয়। চোখের পলকে এই দুই অন্তরাত্মার একের প্রতি অন্যের অনাবিল আকর্ষণের চিত্র হঠাৎ উধাও হওয়ায়, শিপনকে অস্থির করে। যাত্রী ভিড়ের মাঝে সে ওদের অনুসন্ধানের চেষ্টা করে। খুঁজে পায় না। ওই দুই সাদা-কালোর সৃষ্ট ছবিটা যে নিতান্তই তাদের নয়, এ যে শিপনেরও ছবি, বালক-বালিকাদ্বয়ের সেই উপলব্ধি নেই। শিপনের ভেতরটাকে যে তারা কিভাবে, কতটা টেনে নিলো, এই অনুভূতিটুকুও তাদের নেই। শিপন বুঝেছে, কতটুকু উন্মোচিত করেছে তারা তাকে, খুঁজে পেতে তাকে কতদূর নিয়ে গেছে, কতদূর উদ্ভাসিত করেছে তার অন্তর আত্মা। যে এক পাপবোধে সে হয়েছিল সংকুচিত শামুক, তার ভেতরের প্রকাশ হয়েছিল উদ্ভ্রান্ত,বিভ্রান্ত; আজ তা থেকে যে তার মুক্তি মিললো।

এরপরও প্রতিদিনই ট্রেন চলে। ভোর পাঁচটা থেকে রাত একটা অবধি। অনেক মানুষ ট্রেনে উঠছে, নামছে। অনেক স্কুল ছাত্র-ছাত্রী। শিপন এখনো খুঁজে ফেরে সেই যাদুময় মধুরতম ছোট্ট জুটিটাকে। তার হৃদয়ে ছোঁয়া পেতে। পায় না খুঁজে। ওই দুই পবিত্র প্রতিমার কোন সন্ধান মেলে না। পথ ভুলেই শিপনের জন্য এই পথে তাদের শুধু একদিন আসা। খুব কাছে পেয়েও তার কিছু এক অন্তরে হারিয়ে ফেলা। হারানোর বেদনা তাকে আনমনা করে, উন্মনা করে। এভাবে আর কত সে হারাবে নিজেকে!

Advertisements

পাপ এবং পাপমুক্তির স্পন্দন – ৩

পাপ এবং পাপমুক্তির স্পন্দন – ১
পাপ এবং পাপমুক্তির স্পন্দন – ২

শিপনের বাবার ইচ্ছে ছিল, শিপন ভাল কলেজে ভর্তি হয়ে পড়াশুনা করুক। শিপনের সে ইচ্ছে হয় নি। বাসা ছেড়ে দূরে অন্য কোন জেলা বা শহরে পড়াশুনা করে কি হবে? যেভাবে দিন কাটছে, সময় যাচ্ছে, সেভাবে কেটে গেলেই তো হয়। জীবনে অন্য কোন উত্তেজনা, আলোড়ন তো তার আর দরকার নেই। কি হবে নতুন কিছু বড় কিছু আর অর্জন করে? বেদনা বাড়িয়ে বা কি লাভ? মার সাথে, বাবার সাথে আছে এটাই তো অনেক বড়।

ছোট বনের সহপাঠিনী জেমি বাসায় আসে। ছোট বোনটার কাছে আসে? না কি তা একটা উছিলা? জেমি সলাজ হয় তাকে দেখে। চোখাচোখি হলে, মিষ্টি হাসে। শিপন ভাবলেশহীন। ওড়নার ফাঁকে দু’একবার তার ফুটন্ত স্তনে চোখ পড়লেও দৃষ্টি তা থেকে সরে আসে।

আজ সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে শুনতে পেল, শাপলা দুবাই থেকে ফোন করে আম্মার সাথে কথা বলেছে। শিপন কী করছে, তাও জানতে চেয়েছে। শীতে ক্যানাডায় এসেছিল শিপনরা। ঠান্ডার তীক্ষ্ণ আঁচ সহ্য করেছে। কিন্তু ক্যালগেরীর সামার যে এত মিষ্টি রোমান্টিক হবে, সে বুঝে উঠেনি। বাংলার বসন্ত বাতাস তো আউলা করে দেয়, তারুণ্যে পদার্পণের পর পর শিপন তা ঠিক অনুভব করে। আর এখানের গ্রীষ্ম যে ক্ষণিকে ক্ষণিকে সুরে সুরে ভেজে যায়। শাপলার প্রিয় গানগুলোর সিডি ছিল শিপনের কাছে। খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতো। এখন তো প্রায় ইন্টারনেটে শুনে। এখানকার গ্রীষ্ম প্রতিমূহুর্তে তনু-মন-প্রাণে অপূর্ব রোমান্টিকতার প্রলেপ বুলিয়ে যায়। হৃদয়ে সুর তোলা সুদূরের কোন এক প্রেয়সীকে তখন কাছে পাবার ইচ্ছে জাগে। এমন এক আকুল করা মূহুর্তে বিশেষ কিছু একটা চোখে পড়ে শিপনের। দু’চোখ ভরে সে তা বিমোহিত হয়ে উপভোগ করে।

সেদিন এখানকার বিশাল এক পার্কের বেঞ্চে সে বসেছিল একমনে লেকের মুখোমুখি। লেকটা বড়ই। নদীর মত আঁকা-বাঁকা বয়ে গেছে দূরে। লেকের পাশেই সিমেন্টের মসৃণ রাস্তা। এক হৃদয়হারা অনুভূতি নিয়ে লেকের অপর পাড়ে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে খুঁজে ফিরছিল শিপন নিজেকে। তার বাঁয়ে দূর থেকে এক জোড়া নীরব নিষ্পাপ চেহারার কিশোর-কিশোরী। ধীর গতিতে দু’টো আলাদা সাইকেলে লেকের পাড়ের রাস্তা দিয়ে তারা পাশাপাশি এগিয়ে আসে। এমন নিষ্পাপ পবিত্র কিশোর জুটি শিপনের চোখে পড়েনি কখনো। তারা কি একে অন্যের আত্মার আত্মীয়? কত বয়স হবে তাদের? চৌদ্দ, বড় জোর পনেরো? কিন্তু কী এক পরিপক্ক বন্ধুবোধ, আত্মীয়তাবোধ জড়িয়ে আছে তাদের মাঝে! আরো ষাট ষাট্টি বছর তারা এভাবে কি একত্রে কাটিয়ে দেবে? এসবের সবই অজানা। কিন্তু তারা তাদের তখনকার প্রতিটি মূহুর্ত যে সর্বোচ্চ উপভোগ ও উপলব্ধির মাঝে ধারণ করে আছে, তা কি কোন মূল্যে বাঁধা যায়? দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে শিপনের বুক থেকে। এমনই সময় সে অতিক্রম করে এসেছে। অজানা কোন এক প্রেয়সীকে খুঁজেছে। কারোর সন্ধান পাওয়া তো দূরের কথা, কোন কিশোরীর কাছাকাছি পৌঁছানো ছিল মহা এক বাঁধা বা বিপত্তির বিষয়। অন্যদের চোখ, বিশেষ করে বড়দের চোখের শাসন ছিল মেয়েদের থেকে দূরত্ব রেখে চলা। কেন যে এক স্বাভাবিকতা এভাবে জটিলতায় প্রতিপন্ন হয়। মেয়ে মানেই শিপনের কাছে যেন এক স্নায়ুবিক জড়তায় ভোগা। কোন কিশোরীর কাছাকাছি বা মুখোমুখি হওয়ার নিষ্পাপ আকাঙ্খাটুকু, বাসনাটুকু, অনুভূতিলাভটুকু ধীরে ধীরে বিষাদিত হওয়া। মানসিকভাবে নিজের অনুভূতি, উপলব্ধিকে দমন করার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে শিপনের তখন থেকে।

কেমন আছে শাপলা? বিয়ে হবার বছর খানেক পর শুনেছে শাপলার স্বামী তবলীগ জামাত করছে। শিপনদের দেশ ছাড়ার মাস তিনেক আগে বিশ্ব এজতেমাতে যোগ দিতে অল্প ক’দিনের জন্য স্বামীসহ সে দেশে আসে। শিপনদের সাথে দেখা হয়নি, তবে শুনেছে স্বামীর কারণে সে এখন পুরোদস্তুর বোরখা পড়ছে। শুধু চোখ দু’টো ছাড়া শরীর আর কোথাও তার উন্মুক্ত নেই, এত গরমেও। এজতেমা শেষ হবার দিন দশকের মধ্যেই আবার দুবাই ফিরে গেছে।

শিপন ভাবে, এখন যদি শাপলার সাথে তার দেখা হয়, শাপলা কোনভাবেই তার মুখাবয়ব তার কাছে উন্মোচন করবে না। সেবার দেশে এলে পরিচিত খালাতো, মামাতো, চাচাতো কোন ভাইয়ের সামনেই নাকি সম্পূর্ণ পর্দা না করে দেখা দেয়নি। এভাবে শাপলার সাথে কোনদিন দেখা হওয়ার কি কোন প্রয়োজন আছে? একমূহুর্ত শাপলার মুখাবয়ব দেখলে যার হৃদয় জুড়িয়ে যেত, শাপলার অনেক কিছু বোধগম্য হতো, কিভাবে সে এখন অমন কালো কাপড়ে আচ্ছাদিত শাপলার কাছে দাঁড়ায়? বোরখার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসা শাপলার দু’চোখের ভাষা সে কতটুকুই বা বুঝবে? এক অজানা অসন্মানবোধ শিপনকে কুঁকড়ে থাকে।

একটা কাজ নিয়েছে সে শহরের কেন্দ্রে। সাবওয়ের পাশে একটা দোকানে। সাবওয়েকে এখানে লাইট রেল ট্রানজিট (এলআরটি) বলছে। স্টেশানগুলো ভূমির উপর অবস্থান করছে বলে হয়তো। বড় আয়তনের এসব দোকানকে বলে এখানে কনভিনিয়েন্স স্টোর। অনেকটা মুদির দোকানের এদেশীয় ধনী সংস্করণ। শিপন স্টোর ক্লার্ক। এ কাজটাই তার কাছে সহজ মনে হয়। হালকা কাজ। দম ফেলার অবকাশ আছে। এখানকার বসন্তের শুরুতে কাজটা পেয়েছিল। তখনো এই শহরে ঠান্ডা। জ্যাকেট পরে চলতে হতো। সেই সাথে ভিন্ন সংস্কৃতিরও একটা চাপ তাকে সইতে হয় এখন বেশিরভাগ সময়ে। দোকানে থেকে সে মানুষ জনকে দেখে। তাদের গতিবিধি, আচার-আচরণ। নিজেকে মেলাতে চেষ্টা করে, এই ভিন্ন সভ্যতায়, যা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগৎ তার কাছে।

কাজ করতে করতে সে দেখে যেদিন একপাল কিশোরী এসেছিল তাদের দোকানটাতে। এইতো সেদিন। আহ্‌ এত সুন্দরী হতে পারে এই মেয়েগুলো। পরী কি এদেরই বলে? মানুষ কি পরী হতে পারে? শুনে এসেছে শিপন, মানুষের ভেতর মনের সৌন্দর্য হলো আসল। কিন্তু যদি ভেতরের তীব্র নিষ্পাপ সৌন্দর্যগুলো কারো মুখাবয়ব ও সারা শরীরে প্রকাশিত হয়। সারা শরীরে মিশে যেয়ে একটা পবিত্র সৌন্দর্যের রুপকল্প তৈরি করে। এই মেয়েগুলো কি তাই নয়? আর চোখের সামনে দেখা রুপকল্পের বাস্তবরুপই কি পরী? কী মুক্ত স্বাধীন না এরা। শুধুমাত্র মুক্ত স্বাধীন মানবীরাই পরী হয়ে উঠতে পারে, এমন বোধ জাগে শিপনের মাঝে তখন। কল্পনায় তার ফেলা আসা কৈশোর মেয়েগুলোর মাঝেই যেন খেলা করছিলো। কৈশোরকে উপভোগে এমন উচ্ছলতা ক’জন মানুষ পায়? ওরা একে অন্যকে তখন পানি ছিটাচ্ছিল। এবং কলহাস্যে চারপাশ মুখরিত হচ্ছিল। বেসিনের টেপ থেকে দোকানের সস্তা ফোমের সাদা গ্লাসে করে প্রথমে তাদের একজন পানি খেলো। কী এক কথা শুনে সে হাস্যরত আরেকজন কিশোরীর পেছনে পানির গ্লাস নিয়ে ধাওয়া করলো। বোঝা গেল, দোকানের বাইরে যেয়ে সে টার্গেট করা কিশোরীটির গায়ে গ্লাসের বাকি পানি ছিটাতে যাচ্ছে। একটু পরে দোকানে এসে ঢুকলো, কাপড়ে পানির ভেজা ছোপ নিয়ে সে টার্গেটকরা কিশোরীটি। সেও একই সস্তাদরের ফোমের সাদা গ্লাসে পানি নিয়ে, হাসতে হাসতে দোকানের বাইরে ছুটছিল আক্রমণকারীনি কিশোরীটিকে পানি ছিটানোর উদ্দেশ্যে। এভাবে একে একে প্রায় সবগুলো মেয়েই পানি ছিটানোর খেলায় মেতে উঠে। খুনসুটিরছলে কিশোরীগুলোর এই হাস্যগুঞ্জনমুখরিত, চটুল আন্দোলিত পদক্ষেপের মৃদুমন্দ ধাপাধাপি তাদের একে অন্যকেই শুধু পানিতে সিক্ত করেনি, শিপনের হৃদয়ের খোলা প্রকৃতিকে সিক্ত করে দিয়ে গেছে অনেকখানি। সেই মাত্রায় তার আবেগও উদ্বেলিত হয়েছে। আর তারা কলহাস্য-আন্দোলনে যেভাবে মুখরিত করছিল চারপাশ, তা চেয়ে চেয়ে দেখারই মত। তার ভেতরের আনন্দ রস অনুধাবনের মত। তার ভেতরে জীবনকে ছাড়িয়ে যাওয়ার উদ্দীপনায় মোহিত হওয়ার মত। আবারও তনু-মন-প্রাণকে সবুজ সতেজ উচ্ছ্লতায় আবিষ্ট বা নিবিষ্ট করে তোলার মত। যে নির্মল, সুস্থ, প্রাণোচ্ছল প্রেরণা আছে এর মাঝে, তাতে অবগাহন করে সৃষ্টিশীলতায় মেতে উঠার মত। মানুষ কখন সৃষ্টিশীল হয়ে উঠে, অথবা সৃষ্টিশীল হতে হলে জীবন সম্পর্কে কি ধরণের শর্ত বা অনুপ্রেরণা থাকা উচিত? এসব প্রশ্ন শিপনের মাঝে বার বারই উদয় হয়েছে। সে কি এসবের মীমাংসা খুঁজে পাচ্ছে তবে?

জীবনকে ছাড়িয়ে অন্য আলোকে উদ্দীপ্ত হতে গেলে সবসময় বাধা আসে। এখানেও তেমন আসে। এইভাবে তার দোকানের একের পর এক গ্লাসের তিরোহান দোকান মালিকের অর্থহীন অসহ্য মনে হয়। ক্রোধ ও বিরক্তি আফ্রিকা থেকে আগত আগাখান সম্প্রদায়ের এই ক্ষুদ্র বণিককে কিছুটা উত্তেজিত করে। উপায়ান্তর না দেখে সে কিশোরীগুলোকে দোকান ছেড়ে চলে যেতে বলে। কিশোরীগুলোর আনন্দ দমে যায় না তাতে। দোকান ছেড়ে তারা চলে যায় সত্যিই। কিন্তু চপলা পরীদের কল-শিহরণমাখা আনন্দ থেমে থাকে না। আস্তে আস্তে সবকিছু শিপনের দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। কিন্তু শুরুতে শিপনের আবেশায়িত মুগ্ধ কৌতূহল-উদ্দীপক দৃষ্টি দোকান মালিকের দৃষ্টি এড়ায় নি। বরং আমোদই ছড়িয়েছিল। মেয়েগুলোকে দেখার পর পর তার উদ্বেলিত চিত্তের অবস্থা বুঝে, তখন তিনি শিপনকে শুনিয়ে কথার তীর ছুঁড়ে বলেছিলেন, “সবগুলো তোমার জন্য।” লজ্জায় শিপনের কাঁচুমাচু হওয়ার মত অবস্থা। মালিকের পাশে গভীর আলাপ-রত পণ্য সরবরাহ সংক্রান্ত বিষয়ে আগত শ্বেত সেলস মহিলা তা শুনে সোল্লাসে খিলখিল করে হেসে উঠলো।

হায়, এর বিপরীতে বয়ঃসন্ধিরকাল থেকে বাংলাদেশে মেয়েদের ভীষণ গুটিয়ে যেতে দেখে শিপন। ছেলেদের থেকে দূরে থাকা তো বটেই। ছেলেদের থেকে সতর্ক থাকা হয়তো অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু এমন তীব্র পারিবারিক এবং সামাজিক অনুশাসন মেয়েটিকে জড়-সড় মাংশাসী প্রাণীতে রুপায়িত করার চেষ্টা করে। সে ভুলে যেতে বসে, তাকে যে ছুটে যেতে হবে, উড়ে যেতে হবে, ভেসে যেতে হবে আলোময় ভূবনে। কষ্টটা তখনই দানা বাঁধে, যখন দেখে খালাতো বোন শিমিন এক বড় মোটা ওড়নায় নিজেকে ঢেকে ঘরের কোণে আবদ্ধ করে রেখেছে। এই করে কি এই কিশোরী মেয়ে তার স্বাভাবিক বিকাশকে রুদ্ধ করে দেয় নি? অথচ শৈশবে কত ভাব ছিল শিমিনের সাথে। খালার বাসায় গেলে বা শিমিন তাদের বাসায় এলে, সারাটা সময় তো তাদের একসাথে খেলে, এখানে ওখানে ছুটে এটা-ওটা করে কেটে যেতো। তার মতই আর দু’একটা মেয়ের সাথে শিমিনের ভাব এখন। শিপন সেখানে অনাহুত, অবিবেচ্য।

নারীর শরীরে যে বাঁক আছে, তা যেন তার মনের বাঁকের সাথে মিশে থাকে।[শেষ পর্বের শুরু]

পাপ এবং পাপমুক্তির স্পন্দন – ২

পাপ এবং পাপমুক্তির স্পন্দন – ১

অবুঝ এই বয়সেই নির্বোধের মত নয়, তীক্ষ্ণ বোধ নিয়ে ঈশ্বরের সন্ধানে নেমে পড়ে শিপন অত্যন্ত অসচেতনতায়। পাপের উপলব্ধির একটা বোধ তার মাঝে সবসময় কাজ করে, এই সমাজের একজন সাধারণ জীব হিসেবে। কিন্তু মুয়াজ্জ্বিনের কাছে পাপের সম্পর্কে এত পরিষ্কার ব্যাখ্যা লাভ তাকে বিপর্যস্ত করে এবং বিপাকে ফেলে। তবু নিজেকে নিয়ে খেলার বা উপভোগের পুরোনো উপসর্গ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ দমিয়ে রাখতে ব্যর্থ হয় সে। এমনি একদিনের এক ঘটনা তাকে চমকে দেয়। তার মাঝে প্রশ্ন তৈরি হয়, পাপে নিমজ্জনই কি মানুষের মাঝে পূণ্যবোধের অনুভূতি সৃষ্টি করে? সেটা ছিল এক ছায়াময় সুশীতল ছুটির দিন। আজ অনেক দিন পর মনের আনন্দে সে উপভোগের খেলায় মাতে। উপভোগের শীর্ষে যখন অবস্থান করছে, তখনি বাথরুমের বাইর থেকে তার চেয়ে বছর দু’য়েক বড় বাসার কাজে নিয়োজিত ছেলেটির ডাক শুনে সে যুগপৎ সুচিক্কন ভীতি ও অস্থিরতায় তাড়িত হয়ে পড়ে। ছেলেটি বলে, “মুয়াজ্জ্বিন সাবে আইছে, কুরআন পড়তে আসেন।” আঁৎকে উঠে শিপন। কী করেছে সে! নিজেকে যে থামাতে পারে নি। প্রতিজ্ঞায় দৃঢ় হয় তখনি। না, আর নয়। আর কখ্‌খনো এমন নয়। কাঁপতে থাকে। কিভাবে স্পর্শ করবে কুরআন এ হাতে। এ দুর্গন্ধমাখা নষ্ট হাতে। পূণ্যের চিন্তায় পাপবোধে সে বিচলিত হয়। খৃষ্টান ধর্মে যদি জন্ম নিতো, তবে আবার পবিত্র গ্রন্থ স্পর্শের আগে সে কনফেশানে যেত। কিন্তু এই ধর্মে এই মূহুর্তে কিভাবে সম্ভব, শিপনের তা জানা নেই। তবুও অনেক মমতার সাথে কুরআন শরীফ হাতে ধরে রেখে সে মুয়াজ্জ্বিনের মুখোমুখি হয়, যদিও তার সর্বোচ্চ পবিত্র গ্রন্থ স্পর্শ করতে হাত কাঁপছিলো।

মুয়াজ্জ্বিন এক নজর দেখে তাকে বলে, “তোমাকে আজকে একটু বেচইন মনে হচ্ছে। এই বয়সে এমন হতে পারে। মনে আল্লাহ্‌র ভয় থাকলে সব মুশকিল আসান হবে। গুনাহ্‌র কাজ থেকে দূরে থাকবে।” শিপনের মনে হলো, এই কথাটুকুই সে শুনতে চেয়েছিল। মনে হয় তার, তাহলে পাপ পূণ্যকে কি জড়িয়ে থাকে? না কি পূণ্য পাপকে? সময় যতই এগিয়েছে, জীবন যতই এগিয়েছে, এই পাপ-পূণ্যের বোধ তাকে ক্ষত-বিক্ষত করেছে। যা পাপ, প্রবৃত্তি তাতেই যেন বেশি সম্পৃক্ত হতে চেয়েছে। পাপ আর প্রবৃত্তির মাঝে তাহলে পার্থক্য কোথায়? মানুষ কি তার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি-কে অস্বীকার করতে পারে? মানুষটাই বা তাহলে আর বাঁচে কি করে? শিপনের ছোট মাথা তা আর অত ভেবে উঠতে পারে না। কিন্তু এক অবধারিত ঘটনা তার মাঝে এক নীরব বিদ্রোহ তৈরি করে। পরিবর্তনের সূচনা বোধ হয় তখন থেকেই।

এসএসসির পর শিপন তাদের গ্রামের বাড়ি যায়। সেখান হতে জেলা শহর বেশি দূরে নয়। চাচাতো বোন শাপলা জেলা শহরের বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে পাশ করে সেখানেই ইংরেজি সাহিত্যে অনার্সে পড়ছে। গ্রীষ্মের ছুটি। আম আর কাঁঠালের উৎসব। কাঁচা আম, পাকা রসালো আম। এসব কেমন, শাপলা সাথে না থাকলে এমন করে শিপন বুঝে উঠতো না। আম বাগানে কিভাবে রসালো আম ফুটো করে চুষে চুষে খেতে হয়, শাপলার কাছ থেকে নতুন করে ছবক নেয় সে। পাকা কাঁঠালের মৌ মৌ গন্ধ। রসালো আবেশ। গাছ থেকে ফল পেড়ে নিতে শিখে শিপন। কাঁঠালের কষ হাতে মাখামাখি হয়ে যায়। শাপলা হেসে কুটি কুটি হয়ে শিপনের হাতে তেল মাখিয়ে দেয় কষ তোলার জন্য। কবি জসিম উদ্দীনের “বাঙ্গালীর হাসির গল্প”-এর পাঠান বা পাঞ্জাবীর কাঁঠাল খাওয়ার গল্পটা শুনিয়ে দিয়ে দুষ্টুমী করে তেমনি বলার চেষ্টা করে, “তুমভি কাঁঠাল খায়া?”

কাঠ ফাটা গ্রীষ্মের রোদ্দুরে শাপলা ভেতর বাড়ির পুকুরে ডুব সাঁতার দিয়ে চলেছে। কখনো কখনো ডুব দিয়ে এদিক থেকে ওদিকে যাচ্ছে। ছায়া নিবিড় এই পুকুরের চারপাশ। কিন্তু এক রোদেলা আলো পুকুরটাকে উপর থেকে আলোতে উত্তপ্ত রাখে। রোদ খুব কমই পুকুর জলকে স্পর্শ করতে পারে। গাছ পাতার ফাঁকে ফাঁকে একটু আধটু যা সম্ভব। শিপন পাড়ে দাঁড়িয়ে শাপলার এই অবলীলায় সাঁতার কাটাকে উপভোগ করে। সাথে সাথে নিজে যে পারে না, তার জন্য ভেতরে ভেতরে আফসোসে আক্রান্ত হয় এবং সেই সাথে তাকে হীনতা বোধ স্পর্শ করে। শাপলা ঘাটের কাছে এসে ইশারায় শিপনকে ডাক দেয়, “কিরে, সাঁতার শিখবি?” শিপন হাঁ-বোধক মাথা নাড়ায়। লুঙ্গিটাকে মালকোচা মেরে নেয় সে। কিভাবে পানিতে ভাসতে জানতে হয়, শিপনকে অল্প পানির মধ্যে তা শেখাতে থাকে শাপলা। এছাড়া প্রতি বিকেল সন্ধ্যা রাত তাদের বাড়ির ভেতর ভাজা পোড়া এটা সেটা খেয়ে, গল্প-গুজবে কাটে। কখনো দু’জন বাড়ির আশ-পাশ স্কুল ঘর পর্যন্ত ঘুরে ফিরে। আবার কখনোবা পাড়া-পড়শী অবধি।

একদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে পুকুর পাড়ে বসে থাকে শাপলা। প্রকৃতির ডাকে শিপনকে বাড়ির বাইরে আসতে হয়। ঘরে ফিরে এসে জানালা দিয়ে দক্ষিণের পুকুর ঘাটে শাপলাকে এক মনে বসে থাকতে দেখে সে অবাক হয়। বেরিয়ে এসে, পানিতে গভীর চিন্তা নিয়ে চুপচাপ বসে থাকা শাপলার পাশে এসে বসে। শাপলা শিপনের উপস্থিতি টের পেয়েও তার দিকে তাকায় না। ভারাক্রান্ত মন। কিছু বলে না শিপন। আজকেই প্রথম শাপলার এই বিষণ্ণ রুপ সে দেখতে পেলো। কিছু না বুঝে শাপলার দিকে একসময় সে ঘুরে তাকায়। শাপলাও ফিরে তার চোখে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। নড়ে উঠে শিপন কিছুটা। কোমল একটা অনুভূতি তার হৃদয়ে বয়ে যায়। গতকালের শাপলাকে আজ অন্য শাপলা মনে হয়। একদম ছোট শিশু থাকাবস্থাতেই গ্রামে বড়দের মুখে শাপলা ডাক শুনে শুনেই শিপনও শাপলাকে শাপলা বলেই ডাকতো। চেষ্টা করেও বড়রা তাকে শাপলা আপু বলাতে পারে নি। সেই থেকে শিপনের কাছে শাপলা, শাপলাই থেকে গেছে। কিন্তু এখনকার শাপলা যে সেই শাপলা নয়। এখনকার শাপলা আর তার থেকে আবেগে ভাবেও বড় নয়। তারা সমমর্যাদার। শিপনের স্পর্শের সীমায়। বলে না কিছু সে। তার কাছে এই অনুভূতি নতুন হলেও অজানা নয়। এমনই এক ভাব, আবেগ, অনুভূতি সে বয়ঃসন্ধিকাল থেকে খুঁজে বেরিয়েছে। সেটা যে এমনভাবে এখানে এসে ছুঁয়ে যাবে, তা তার অজানাই ছিল। অবশের মত শিপন শাপলার পাশে বসে থাকে। সে উঠতে চাইলেও উঠতে পারে না যে এখন।

ঘরের বাইরে যাওয়ার ইচ্ছে হলেও তারা এখন বাইরে যেতে পারে না। কেউ যদি তাদের মনের ভাষা, মুখের ভাষা, চোখের ভাষা পড়ে ফেলে। এমনকি ঘরের ভেতরেও তারা অন্যদের আড়ালে থাকার চেষ্টা করে। একদিকের বসার ঘরে বসে অনর্থক অর্থহীন লুডু খেলায় মাতে। খেলতে হয় বলে খেলে যাওয়া। তা না হলে দু’জনের পাশাপাশি থাকা হয় না। খাওয়ার সময় শিপনের পাশে, বসার জায়গাটা শাপলা আগে-ভাগে দখল করে নেয়। আর অল্প কিছুদিন পর বাবা এসে শিপনকে নিয়ে যায়।

এসএসসি-র ফলাফল বের হলে, শিপন তার ভাল ফলাফলের সাথে আর একটা খবর পায়। তাহলো শাপলার বর ঠিক হয়ে গেছে। ছেলে মধ্যপ্রাচ্যে চাকরিরত একজন প্রকৌশলী। বেশ ধার্মিক প্রকৃতির। শাপলাকে তার পছন্দ হয়েছে। যে কোন মূহুর্তে বিয়ে হয়ে যেতে পারে, যেহেতু ছেলে অল্প সময়ের জন্য দেশে এসেছে। এই তাড়াহুড়োয় তাদের বাসার কারোরই আর বিয়েতে যাওয়া হয় নি। এমনকি শিপনের বাবার উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও শেষ মূহুর্তে অফিসের কাজের চাপে যাওয়া সম্ভব হয় নি।

শিপনের বাবার ইচ্ছে ছিল, শিপন ভাল কলেজে ভর্তি হয়ে পড়াশুনা করুক। [তৃতীয় পর্বের শুরু]

পাপ এবং পাপমুক্তির স্পন্দন – ১

[গল্পটি চারপর্বে সমাপ্ত]

ঊনিশ বছর বয়সে বাবা মার সাথে শিপনের ক্যানাডায় আসতে হলো। এখানকার তেল সমৃদ্ধ ধনী প্রদেশ বলে খ্যাত আলবার্টার ক্যালগেরীতে শুরুতেই ঠাঁই নিল তাদের পরিবার।

এখানে শিপনের কাছে সবকিছুই নতুন। ঘর-বাড়ি, রাস্তা-ঘাট, আলো-বায়ু-জল, গাছ-গাছালি, মানুষের ভাষা-কথাবার্তা, পোষাক-আশাক, চাল-চলন সব তার দেখার জগৎ হতে পুরোপরি ভিন্ন। যুগপৎ বিস্ময় ও আনন্দ, আর এক মানসিক চাপ তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। যা কিছু দেখে, তাতে তার বিস্ময় বেড়েই চলে, সে সাথে উৎসুক্য। এতদিনের তার পরিচিত এবং বেড়ে উঠা জীবনের বাইরেও যে একটা জীবন ও জগৎ আছে, হঠাৎ করে তা তার চোখে পড়ায় নিজের ভাবনার জগতে নীরব আন্দোলন তুলে। শুধু ভাবনার জগৎ নয়, তার দৃষ্টির জগতও পাল্টাতে থাকে।

সপ্তম শ্রেণীতে থাকাকালীন শিপন টের পায়, সে সাবালক হয়ে উঠছে। যে হরমোনের উপস্থিতি তাকে সাবালকত্বে উন্নীত করছে, তাকে বিবিধ মূহুর্তে সুরসুরি দিয়ে জাগিয়ে তুলছে, তাকে অস্বীকার করে কিভাবে? টয়লেটে বা বাথরুমে ঢুকলেই নিজেকে নিয়ে সে মেতে উঠতো। নিজেকে নিজে উপভোগ করতো। প্রথমদিন হঠাৎ করে কোথা থেকে যে কী হয়ে গেলো! ভীত-সন্ত্রস্থ হয়ে উঠে। আনন্দ যে কিভাবে নিরানন্দ হয়ে উঠতে পারে, জানা ছিল না তার। এক লজ্জা এবং অনুতাপবোধে গুটিয়ে থাকে। বেশ শান্ত হয়েছিল ঐ ঘটনার পর কিছুদিন। স্মরণে আনতে চাইতো না। চমক খেলে যেত তার মাঝে। নিজেকে উন্মোচনের মূহুর্তে ভয়, বিস্ময়, সুখ, কৌতূহল সব যে একত্রে মিশে থাকে, এ তার জানা ছিল না। একটা নিষিদ্ধ বোধ থেকে মন্দবোধ। আবার মন্দবোধ থেকে পাপবোধ । এরপর অনেকদিন সে এই সুখবোধের কৌতূহলের দিকে ধাবিত হয়নি।

তখন সে অষ্টম শ্রেণীতে। বাবা বদলী হয়ে এলেন নতুন এক শহরে। এখানে পেলেন এক বিরাট বাংলো বাড়ি। এক বৃটিশ ছাতা কোম্পানীর লোকজন না কি থাকতো এই বাড়িতে। এত লম্বা বাসা। এক প্রান্তের ঘর থেকে কেউ চীৎকার করলে অন্য প্রান্তের কেউ শুনতে পাবে না। বিরাট আয়তনের প্রতিটি রুম। ছয় রুমের এই বাংলো বাড়িতে শিপন তার চেয়ে তিন বছরের ছোট বোনসহ বাবা-মার সাথে থাকে। শিপন উত্তর দিক হতে দু’নম্বর রুমটাতে থাকে। আর তার বাবা-মা থাকে দক্ষিণ দিক থেকে দু’নম্বর রুমে। শিপনের ছোট বোনটা বাবা-মার রুমের একপাশে আরেকটা বিছানায় ঘুমায়। শিপন এবং তার বাবা-মার থাকার রুমের মাঝখানে রয়েছে মোটা পর্দা দিয়ে আলাদা করা দু’টো বিরাট রুম। এই রুম দু’টির একটি হলো খাওয়ার ঘর, অন্যটি বসার ঘর। রাতে মাঝে মাঝে শিপনের ঘুম ভেঙ্গে যায়। মনে হয়, কোন অশরীরি কিছু তার গলা চেপে ধরেছে। শিপন উঠে গিয়ে লম্বা লোহার রড়ের দরজার গ্রীলের ভেতর থেকে বাসার বারান্দায় শোয়া রাতের দারোয়ানকে ডাক দেয়।

এই বিরাট বাড়ির বাথরুমগুলোও বড় আকারের। শিপনের রুমের সাথে একটি, বসার ঘরের সাথে আরেকটি এবং অন্যটি তার বাবা-মার রুমের সাথে। বাথরুমগুলো এই বিশাল বাড়ির নিঃসঙ্গতাকে ধরে রেখে কেমন এক নেশায় ডুবিয়ে রাখে, এমনি মনে হয় তার।

এই তিন বাথরুমের বাইরের দিকে বাংলো বাড়ীর পূব অংশে গাছপালার এক সুশীতল মনোরম পরিবেশ। বাথরুমের উঁচু জানালার ফাঁক দিয়ে তা ঠিকই দেখা যায়। সেই জানালা গলেই বাথরুমে দিনের আলো আসে। অনেক সময় বাথরুমে ঢুকেই শিপন ঐ জানালার দিকে মাথা উঁচু করে বাইরে তাকিয়ে থাকে। গাছপালা ও দূর আকাশ দেখা যায়। মোহাবিষ্ট হয় সে বাথরুমের এই নীরব নৈঃশব্দে। শিরশির অনুভূতি জাগে শরীরে। অজান্তে তার হাতের স্পর্শ চলে যায় শরীরের গোপন অংশে। কোন এক প্রেয়সীর শিহরণ লাগা স্পর্শ পেতে ইচ্ছে করে কৈশোরের সেই মূহুর্তে। প্রেয়সীর কামনায় ডুবে যেতে চায়। এক নিমগ্ন সুখানুভূতিতে সে ডুবে যায়। বাইরে যখন বৃষ্টি বাদলা ঝরতে থাকে গাছ-গাছালি ছেয়ে প্রবল, এই চেতনা তখন আরো তীব্রতর হয়। সুদূরের প্রেয়সীর কামনার ডাক তাকে আপ্লুত করে। এরকম সম্মোহিত আকর্ষণের আর এক ঘটনা মনে করে এখনও সে বিস্মিত হয়ে উঠে। সপ্তম শ্রেনীতে উঠেই যেন সে শৈশব থেকে হঠাৎ কৈশোরে জেগে গেছে। মনে মনে আশ্চর্য হয়েছে, নিজের চেতনা, মন এবং শরীরের এই দৈবাৎ পরিবর্তন।

বাসার সামনের রেল স্টেশানটাতে নিত্যদিনকার মতো একটু ঘুরে বেড়াচ্ছিল সেদিন। আকাশ প্রকৃতিতে বৃষ্টি ছুটছিল। স্টেশানের সাথে এক লম্বা চওড়া চতুর্পাশ খোলা পাকা বাজার সদৃশ এক ছাদের নীচে অনেকে এসে বৃষ্টির জন্য আশ্রয় নিয়েছিল। তারই নীচে একধারে দাঁড়িয়ে শিপন আচ্ছন্নের মতো বৃষ্টি-চৈতন্য মগ্ন ছিল। একসময় কোথা থেকে উদোম গায়ের নয় কি দশ বছরের এক ছিন্নমূল মেয়ে তার সামনে এসে ডানপাশে দাঁড়ায়। কী আশ্চর্য! তার দিকে তাকাতেই মূহুর্তেই শিপনের শরীরে বিদ্যুৎ খেলে যায়। তার শরীরে শিরশিরে শিহরণ তৈরি হয়। হঠাৎ করে এই অভূতপূর্ব অনুভূতি তাকে মোহমুগ্ধ করে ফেলার গূঢ় কারণ সে তখন ভেবে পায় নি। এক গোপন ভাললাগার নেশালো বোধ তাকে গ্রাস করে। চৌম্বক আকর্ষণের মতই সে সরে এসে মেয়েটার পেছনে দাঁড়ায়। অভোগ্যপূর্ব এক সুখানুভূতিতে সে বেঘোরে ডু্বতে থাকে। শরীর, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে জেগে উঠে এক বোধ। তাকে অস্বীকার করতে পারে না। শিপনের পেছনে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বালিকার পছন্দ হয় নি। সে সরে গিয়ে অন্য আরেক প্রান্তে চলে যায়। শিপন তাকে অনুসরণ করে। মেয়েটা স্থান পরিবর্তন করে অন্যত্র সরে গেলে, সে আবারও তাকে অনুসরণ করে। স্থান পরিবর্তন দ্রুত হতে থাকে মেয়েটার। বার বার মেয়েটার সরে যাওয়ায় শিপনের প্রবাহমান সুখস্রোত বাধাগ্রস্থ হয় এবং পারিপার্শ্বিকতায় সম্বিৎ ফিরে আসে তার। মেয়েটাকে তার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াতে দেখে এবারে এক কষ্টবোধ, হীনতাবোধ ও লজ্জাবোধ তাকে ঝাপটে ধরে। নিজের সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠে সে। নিজের সম্পর্কে একটা বিশ্রী বোধ জন্ম নেয়। এত নীচতা হঠাৎ করে তার মধ্যে কিভাবে ভর করে, সে ভেবে পায় না। একটা গোপন ভাব, সবার থেকে লুকিয়ে রাখার মত একটা ঘটনা। একটা অন্যায় বোধ, ভয়ও তার সাথে জড়িয়ে থাকে।

বদলী হয়ে এই বাংলো বাড়িতে এলে তার শরীরের নিয়মিত এই জাগরণকে সে আর স্তব্ধ হতে দেয় নি। এখানে এসে এক উপভোগ্যতার নেশা সময় অসময়ে তাকে চেপে বসে। তা অনিয়মিতভাবেই। একসময় বাবার ইচ্ছে হলো, ছেলের কোরআন শরীফ পাঠ এবার শুরু হোক। আমপারা আগেই পড়া ছিল। এলাকার মসজিদের ত্রিশোর্ধ্বের মুয়াজ্জিন কোরআন পাঠ শিক্ষা দেয়ার পাশাপাশি বিবিধ গুণাহ্‌ সম্পর্কে ধারণা দিতে থাকেন। বেহেশ্‌ত লাভ এবং ছওয়াব লাভ সম্পর্কেও উপদেশ দেন। শিপনের মাঝে ধীরে ধীরে পাপ-পূণ্যের এক নির্মোহ ভাব তৈরি হয়। সে চেষ্টা করে পূণ্যের পথে থাকার। নবম শ্রেনীতে উন্নীত হবার পর তার মাঝে পূণ্য লাভের বোধ প্রকোপ পায়। এসএসসি পরীক্ষায় তার ভাল ফলাফল চাই। ভাল ফলাফলের জন্য ঈশ্বরের কৃপা প্রয়োজন। আর ঈশ্বরের কৃপা পেতে হলে পাপ পরিহার করা উচিত। সুতরাং নিজে নিজের শরীর নিয়ে উপভোগ করা গুনাহ্‌র কাজ। তা দ্রুত বন্ধ করা চাই। সে মনের জোর খাটিয়ে বসে। না, ঈশ্বরকে অসন্তুষ্ট করা যাবে না।

অবুঝ এই বয়সেই নির্বোধের মত নয়, তীক্ষ্ণ বোধ নিয়ে ঈশ্বরের সন্ধানে নেমে পড়ে শিপন অত্যন্ত অসচেতনতায়। [দ্বিতীয় পর্বের শুরু]

%d bloggers like this: