শব্দ-বিভ্রাট এবং মেধাবী ও সুদর্শনা নারী [শেষ অংশ]

শব্দ-বিভ্রাট এবং মেধাবী ও সুদর্শনা নারী [প্রথম অংশ]

মাস দুয়েক আগে এই টোরন্টোতে তুষার পড়ল খুব। এমনি এক তুষার পড়া সন্ধ্যারাতে আমার এক প্রকৌশলী চাচাতো ভাইয়ের বাসায় দাওয়াতে কয়েকজন বাঙ্গালী পরিবার একত্রিত হল। এখানেও সেই একই শব্দের ব্যবহার। যেমন, ‘বরফ পড়াতে গাড়ি চালাতে অসুবিধা হচ্ছে’ অথবা ‘যা বরফ পড়ছে, এভাবে চলতে থাকলে রাস্তায় বরফ পরিষ্কার না হলে ফেরার পথে গাড়ি চালাতে সাংঘাতিক অসুবিধা হবে’। কী আর করা! চুপচাপ থাকা ঠিক বলে সাব্যস্ত করলাম। এবার জেনেশুনে আর বিপদ ডেকে নাজেহাল হতে চাই না। একটু পরে এক নারী কন্ঠ ভেসে এল। আমি পাশের ঘরে। ভদ্রমহিলা তার স্বামীকে বলছে, ‘দেখো বেশি বরফ পড়লে তোমার আর আজকে ড্রাইভ করা দরকার নেই। ভাইয়ের এখানে গাড়ি রেখে চলো আমরা বাস আর সাবওয়ে ধরে ফিরি।’ অন্যদের শুনিয়ে মহিলা আরও বলতে থাকে, ‘গত উইন্টারে ও ভালই বাঁচা বেঁচে গেছিল। যা স্কিড করেছিল ওর গাড়ি! ভাগ্যিস, আশে পাশে আর কোন গাড়ি ছিল না। এই বরফ পড়ার সময় একটু সাবধানে থাকা ভাল।’ এইবার আর পারলাম না। ‘বরফ পড়া’ শোনার পর পরই আমার মাথা বিগড়ে গেল। আরে! ভীষন বিস্মিত হওয়ার পালাও আমার! যখন আমি টের পেলাম, শুধুমাত্র নারীকন্ঠে ‘বরফ পড়া’ শুনলেই আমার ভেতরটা ভীষন বিদ্রোহ করে উঠে। যেন আমার ভেতর থেকে বলতে শুরু করে, না, না, আর মেনে নেয়া সম্ভব না। এবার কিছু একটা করা চাই-ই চাই। অথচ এতক্ষণ ধরে পুরুষকন্ঠে ‘বরফ পড়া’ শোনা সত্ত্বেও নিজেকে অনেক কষ্টে চেপে রাখতে পারছিলাম। হায়রে, মনে মনে বলি, কী অদ্ভূত মনস্তত্ত্ব আমার! বিস্মিত যেমন আমি নিজের মনস্তত্ত্ব জেনে, তার চেয়েও যে আরো বেশি বিস্মিত হলাম লিভিং রুমে এসে যেই মাত্র ‘বরফ পড়া’ বলা নারীকন্ঠের দিকে তাকালাম। আরে, ইনিও তো মহা সুদর্শনা! মেধাবী কি না, তা এখনও অবশ্য জানা হয়নি। স্বাভাবিক কারণেই আমায় ভীতি চেপে ধরল।

আমার কাজিনের বয়স অনুসারে অতিথি পরিবারগুলোর বয়স গড়পড়তা তিরিশের মাঝামাঝি মনে হচ্ছে। শুধু দু’একজন ব্যতিক্রম ছাড়া। আগত পরিবারগুলো আমার কাজিনের পারিবারিক বন্ধু। আমার সাথে তাদের কোন পুর্ব জানা-পরিচয় নেই। আজই প্রথম তাদের সাথে দেখা। আস্তে আস্তে পরিচয় হচ্ছে সবার সাথে। এরই মাঝে সুযোগ খোঁজার চেষ্টা করি, কিভাবে যে উত্তর দিই এই ‘বরফ পড়া’-র। ঠিক সময়মত এই লিভিং রুমেই আমার উল্টোদিকে বসা পুরুষ অতিথি একজন আমাকে প্রশ্ন করেন, ‘তারপর কেমন আছেন? আপনি করছেন কি?’ উত্তর দিলাম, ‘এই চালিয়ে নিচ্ছি আর কি।’ এরপর একটু সময় নিয়ে বললাম, ‘আর একটা জিনিস কিন্তু আমি নিয়মিত করছি।’ তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘জিনিসটা কি?’ বললাম, ‘ব্লগিং।’ তিনি বললেন, ‘ব্লগিং? কোথায়?’ অন্যদের চোখও দেখি আমার দিকে সরে এল। আমিও নিজেকে বেশ প্রস্তুত করলাম। একটু গুরুত্ব দেখিয়ে বললাম, ‘প্রথম আলো ব্লগিং’। ‘ও, তাই না-কি?’ আশেপাশের দু’একজনও দেখি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। একজন বললেন, ‘নেটে প্রথম আলো পড়তে যেয়ে চোখে পড়েছে।’ আর এই ফাঁকে আমার মাথার বুদ্ধিও ধীরে ধীরে তার নিজস্ব পথ পেয়ে বেশ উৎসাহিত হয়ে এগুতে শুরু করল। এইতো মোক্ষম সময়ের দিকে এগুচ্ছি। আমি তাদের বললাম, ‘জানেন আমাদের ব্লগে, ‘বরফ আহাসান’ এবং ‘বরফ কন্যা’ নামে দু’জন ব্লগার আছেন।’ ‘তাই না-কি?’ একজন হেসে ফেলল। আরেকজন এমন অদ্ভূতভাবে জিজ্ঞেস করল যেন অন্য সবার হয়ে, ‘এগুলো আবার কেমন নাম?’ সেই ‘বরফ পড়া’ বলা নারী কন্ঠও তাল মেলাতে পিছপা হয় না, ‘ছোটবেলায় তো তুষার কন্যার গল্প বলে রুপকথার একটা বই পড়েছিলাম। বরফ কন্যা তো কখনও শুনিনি।’ আমি এবার সত্যি সত্যিই ভেতরে ভেতরে প্রমাদ গোনা শুরু করলাম। এবারেও কি? বাবারে, যদি কোথা থেকে আবারও কিছু ঘটে বসে? একই বিষয়ে একইভাবে বারে বারে নাজেহাল হতে কার এত সয়! মহা সুদর্শনার কাছে শেষমেশ আবার ধরা খেয়ে বসি না তো! এ অসময়ে আমার কাজিন সুমনও মুখ খুলে বসে, ‘বলিস কি রে, বরফ আহাসান বলে কোন নাম আছে না কি? কী অদ্ভূত নাম!’ আমি স্বর একটু নীচু করেই বললাম, ‘যদি বিশ্বাস না হয়, তবে তুমি তোমার কম্পিউটার অন কর।’ এবার সুমন ভাই বলল, ‘কম্পিউটার অন-ই আছে নীচে আমার স্টাডি রুমে।’ ‘তুমি কি ল্যাপটপ ইউজ করছো এখন?’, আমি জিজ্ঞেস করি। ‘হ্যাঁ।’ ‘তাহলে আমি ল্যাপটপ এখানে নিয়ে আসছি’ বলে বেসমেন্টের স্টাডি রুম থেকে তাড়াতাড়ি করে ল্যাপটপটা উপরের এই লিভিং রুমে নিয়ে আসি। খাবার টেবিলে এখনও খাবার সেভাবে পরিবেশন হয়নি। টেবিলের অনেকটা খালি পড়ে ছিল। আমি ল্যাপটপটা নিয়ে একেবারে খাবার টেবিলের মাঝামাঝি বসে যাই। মহিলা দু’তিনজন আগে থেকেই খাবার টেবিলের পাশে বসে আজকের হোস্ট আমার চাচাতো ভাবীর সাথে টুকটাক আলাপ করছিল। আর খাবার সাজাতে ভাবীকে সাহায্য করছে দু’একজন নারী অতিথিও। এসময় কৌতূহল মেটাতে তাদের, দু’একজন করে পুরুষ মেহমান টেবিলে আসতে থাকে। আমি প্রথম আলো ব্লগের ওয়েবসাইটে চলে আসি। শীর্ষ ব্লগারের কলাম হতে তুষার আহাসানকে ক্লিক করি। তারপর সবাইকে বলি দেখতে। একজন পুরুষ মেহমান বলে উঠে, ‘এটাতো তুষার আহাসান, বরফ আহাসান না।’ একটু ঝুঁকে পড়ে দেখে অন্যরাও সায় দেয়। স্বাভাবিকভাবেই একটু রাগতস্বরে সুমন ভাই বলেন, ‘কিরে তুইতো বললি নামটা বরফ আহাসান, তুষার আহাসান হল কি করে, হ্যাঁ? একটু ঝিম মেরে থেকে চোখ ঘুরিয়ে টেবিলের আশ-পাশটা দেখে নিই, বিশেষ করে সেই মহা সুদর্শনা নারীটিকে। সুদর্শনার মাঝে আবার বড় কোন মেধা লুকিয়ে নেই তো? এরি মধ্যে ভদ্রমহিলাদের একজন তুষার আহাসান-এর ব্লগে মনোযোগ নিয়ে তাকিয়ে দেখে শট করে বলে ফেলেন, ‘ভদ্রলোক তো ভালই হৃদয় এফোঁড়-ওফোঁড় করতে জানেন।’ কেমন আলতো মাখানো বুলি মহিলার। আমি চমকে উঠি, কী বলে মহিলা! তারপরই আমার তুষার আহাসানের আইকনের দিকে চোখ যায়, আরে, ঠিকই তো বলেছেন! সুমন ভাই আমার অবিচল ধীর স্হির অবস্থা দেখে একটু বিস্ময় ও বিরক্তি নিয়ে তাড়া দেন, ‘কিরে চুপ করে আছিস কেন? কিছু বল্‌।’ আমি বেচারা শেষমেশ আর করি কি? বলেই ফেললাম, ‘তোমরা যদি তুষার পড়া-কে বরফ পড়া বলো, আমি কেন তুষার আহাসান-কে বরফ আহাসান বলতে পারি না?’

এক মূহুর্তেই যেন সবাই থতমত খেয়ে গেল। এক্কেবারে পিনপতন নীরবতা। কেউ কেউ কি লজ্জা পেল? শুধু সেই ‘বরফ পড়া’ বলা মহা সুদর্শনা ললনা সত্যিকারের আনন্দ ও বিস্ময় প্রকাশ করে বলল, ‘তাই তো?’ এই প্রথম আমার এই শব্দবিভ্রাট সংক্রান্ত মানসিক সমস্যায়, আমার সমর্থনে অন্ততঃ একজনকে পেলাম। যিনি নেহায়েৎ সুদর্শনা এবং নিজের মাঝের আবেগকে যেন সঠিকভাবে প্রকাশ করতে জানেন। সেই সাথে এও বুঝে নিতে কষ্ট হল না যে, এই নারী মহা সুদর্শনা হতে পারেন, তবে কোনক্রমেই মেধাবী নন, তা নিশ্চিত।

সুপ্রিয় ব্লগার বন্ধুরা, আপনাদের মধ্যে যদি অন্ততঃ একজনও মেধাবী ও সুদর্শনা হয়ে থাকেন, তবে এ যাত্রা আমাকে রেহাই দেবেন কি?

[বি.দ্র.: তুষার আহাসান এবং তুষার কন্যা, আমাকে মার্জনা করিতে আপনাদের আপত্তি আছে কি? আপনারা মাইন্ড খাইলে, আমি নির্ঘাত ব্যান খাইব।]

উৎসর্গ: ব্লগার তুষার আহাসান ও তুষার কন্যা
প্রথম প্রকাশ: প্রথম আলো ব্লগ, শব্দ-বিভ্রাট এবং মেধাবী ও সুদর্শনা নারী, ১৭ এপ্রিল ২০০৯

Advertisements

তথ্য কণিকা শামান সাত্ত্বিক
নিঃশব্দের মাঝে গড়ে উঠা শব্দে ডুবি ধ্যাণ মৌণতায়।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: