শব্দ-বিভ্রাট এবং মেধাবী ও সুদর্শনা নারী [প্রথম অংশ]

মানুষের শব্দ ব্যবহারে কেমন অদ্ভূত মনস্তত্ত্ব কাজ করে। তার রহস্য ভেদ করা যে কী কঠিন, জ্বলন্ত এক প্রমাণ আমি পেয়েছি বিশ্বের দু’টি দেশে বসবাসের সুবাদে। প্রথমে আমি ক্যানাডার ক্যালগেরি শহরে ছিলাম। সেখান থেকে জাপানের নিগাতা। ক্যালগেরিতে শীত টোরন্টোর চাইতে অনেক বেশি। যেমন, টোরন্টোয় হিমাঙ্কের নীচে -১০ ডিগ্রী সেলসিয়াস হলে, ক্যালগেরিতে তা -২০ ডিগ্রীতে চলে যেতে পারে।

যে শব্দের ব্যবহার দিয়ে শুরু করতে চাচ্ছি, তা আমি প্রথম শুনি ক্যালগেরিতে আমার বাংলাদেশী রুমমেট থেকে। কোন এক ছুটির দিনে ভর শীতের সকালে। ঘুম থেকে উঠেই সে লিভিং রুমের কাঁচের স্লাইডিং ডোরের পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকিয়ে বেশ হতবাক হয়ে জোরে বলে উঠে,’কী বরফ পড়ছে বাইরে!’ চেয়ার ছেড়ে উঠে বাইরে একচোখ তাকিয়ে নিয়ে, তারপর রুমমেটের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি কতক্ষণ। সে তা খেয়াল করে না। আমিও আর কিছু বলি না। বাইরে তো ভীষন স্নো (snow) পড়ছে। তখনই একটু চিন্তিত হয়ে পড়ি। বরফ তো হলো একটা শক্ত, ভারী জিনিস। সেটা আবার উপর থেকে পড়ে কি করে? স্নো শব্দের কি কোন বাংলা নেই? না, আছে তো! সুলেখক সৈয়দ মুজতবা আলী-ই তো আফগানিস্থানে ভ্রমণ বর্ণনায় পেজা পেজা তুলার মত তুষারপাতের একটা চমৎকার বর্ণনা দিয়েছিলেন। অনেক আগে পড়া। বাইরে তো এখন তাই হচ্ছে। ভীষন পেজা পেজা তুলার মত তুষারের বিমুগ্ধকর নীরব-ছন্দময়তায় পতন। কিছুক্ষণ এক নাগাড়ে তাকিয়ে থাকলে কেমন যেন স্বপ্নাচ্ছন্ন করে তোলে। কিন্তু এর উল্টো ব্যাপারও আছে। এই তুষার পতন অনেকের কাছেই বিরক্তিকর। রাস্তা-ঘাটে গাড়ি চালানো ভয়ংকর ও বিপদজনক হয়ে উঠতে পারে। স্নো পরিষ্কার করতে মানুষের কষ্ট স্বভাবতঃই বেড়ে যায়।

কিন্তু আমার প্রশ্ন হল, ‘তুষার’এর মত সুন্দর একটা শব্দ ব্যবহার না করে বরফের মত একটা শক্ত, ভারী বস্তুকে বলছি কেন? আমি নতুন ক্যালগেরিতে এসেছি মাত্র। আর দু’একজন বাংলাদেশী লোকের মুখেও বরফ পড়া শুনেছি। অন্ততঃপক্ষে বরফ না বলে স্নো বলতে পারে তারা এই ইংরেজির দেশে থেকে। অহরহ তো স্নো-ই বলছে এখানকার মানুষেরা এখানে সেখানে। আইস(ice) বলছে তখনই, যখন দু’একদিন রাস্তায় থেকে তুষার বা স্নো ঠান্ডায় জমে যাচ্ছে। সেটাকেই তো বাংলায় বরফ বলা স্বাভাবিক। খুব ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল। বাংলাদেশে শিলাবৃষ্টির সময় শখ করে উঠানে নেমে শিলা কুড়াতে গেলে, মাকে কখনো কখনো একটু উত্তেজিত হতে দেখতাম, ‘এ্যাই সাবধান, শিলা মাথায় লেগে আবার মাথা ফাটবে দেখিস।’ এরপর কখনো শিলা কুড়াতে গেলে নিজের অজান্তেই শিলা মাথায় পড়া থেকে সাবধান থাকতাম। আর এখন বুঝুন, একবার বরফ যদি মাথায় পড়ে, তবে কি হয়? বরফের একটা বড় চাঁই যদি পড়ে মাথায়………..।

নিগাতায় যখন এলাম, সেখানেও দেখি একই অবস্থা! বেশির ভাগই ছাত্র। সবাই জীবনে প্রথম ‘বরফ পড়া’ দেখে আনন্দিত। কেউ কেউ রোমাঞ্চিত! আর আমি মনে মনে প্রমাদ গুনি, সত্যিকারের বরফ পড়লে না জানি কী না হয়! এভাবে ‘বরফ পড়া’ শুনতে শুনতে ভেতরে ভেতরে একসময় তিতি-বিরক্তি হতে শুরু করলাম। বুঝলাম, আমার মনস্তত্ত্বে সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

একদিন এক ‘বরফ পড়া’ শীতের সন্ধ্যায় জাপানে চাকুরিজীবি এক বাংলাদেশি ভদ্রলোকের বাসায় বাঙ্গালী ছাত্রদের এক দাওয়াতের আসর বসল। সেখানে নতুন-পুরাতন অনেকে আছেন। কিছুটা নতুন এক তরুনী মহিলা এসেছেন পিএইচডি করতে। তিনি এর আগে জাপানের হোক্বাইডোর সাপ্পোরো-তে ছিলেন। সেখান থেকে এমএস করা। যেমন মেধাবী, তেমন সুদর্শনাও বটে। আর তাই আজ দাওয়াতে তিনি একরকম মধ্যমনিই। দাওয়াতে একে একে ছাত্ররা আসেন (কেউ কেউ পরিবারসহ) এবং সবার কথার মাঝেই প্রধান বিষয়বস্তুই ছিল, ‘যা বরফ পড়ছে না আজ!’ মেধাবী-সুদর্শনা মহিলা আস্তে আস্তে একটু নড়ে চড়ে উঠেন। তিনি জাপানে ছিলেন না আগে! একসময় সুরেলা তেজোদীপ্ত কন্ঠে বলে উঠেন, ‘এখানে আবার এমন বরফ কি? সাপ্পোরোতে যা বরফ পড়ে না। সে তুলনায় এখানে তো তেমন কিছুই না।’ এতক্ষণ ধরে ‘বরফ পড়া’ শুনতে শুনতে নিজেকে তা থেকে কোন রকমে চুপচাপ বাঁচিয়ে রেখেছিলাম। যেই মেধাবী-সুদর্শনা রমনীটি, আজ এই আসরে নিজেকে ‘যা বরফ পড়া’ দেখার এক নিষ্পাপ গর্বিত বোধে আপ্লুত হলেন, তখন আমাকে পায় কে? মোক্ষম সময় আমি পেয়ে গেলাম। ‘বরফ পড়া’ কাকে বলে এবার দেখাচ্ছি! তাছাড়া মেধাবী-সুদর্শনাদের ঝাড়ি কষার সুযোগ আমার মত সামান্য মানুষের মনে উসখুস করলেও সে সুযোগ কি সবসময় জুটে? আর দেরি হতে না দিয়ে অন্য কোন সাত-পাঁচ চিন্তা না করে ঘর-ভরা আসরে সবার সামনে বলেই ফেললাম, ‘আচ্ছা, বরফ পড়লে তো আপনার মাথা ফেটে যাবে।’ সুদর্শনা একটু আঁৎকে উঠে। চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকায়। এতে যে তাকে আরো বেশি সুন্দরী লাগবে তা আমি কখনও ভাবিনি। মনে মনে বেশ মজা পাই। দেখি ঘরভর্তি সব চোখ জোড়া আমার দিকে কেমন একটা কৌতূহল ও সামান্য কিছুটা অবজ্ঞা নিয়ে তাকিয়ে আছে। সুদর্শনা কিছু বুঝে না উঠে আমাকে বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘মানে?’ এবার আমি একটু আমার জ্ঞান দেখাই,’আরে স্নো জমে হয় আইস, আর আইস-এর বাংলা হল বরফ। সুতরাং বরফ পড়লে তো মাথা ফাটবেই। স্নো-র বাংলা হল তুষার, আমাদের ‘তুষার পড়া’ বলা উচিত।’ যারা এতক্ষণ আমাকে সামান্য অবজ্ঞার ভাব দেখাচ্ছিল, তারা দমে গিয়ে চুপসে গেল। আর যে ছাত্ররা ব্যাচেলর ছিল, তারা যেন নীরব হিংসার এক একটা টেনিস বলের মত তুষার গোলা ছুঁড়ে মারছিল আমার পানে। আমারও বলা শেষ হলে নিজের অজান্তেই বেশ এক তৃপ্তি ও প্রশস্তির ভাব ফুটে উঠে। তুষার পড়া শেষ হলে যেমন পৃথিবীর অবস্থা স্বচ্ছ, নির্মল ও তুষার ধবল হয়ে উঠে, ঠিক তেমনি। যাক – আমারও তাহলে মেধা একটু-আধটু আছে। কী যে তৃপ্তি – আহ্!

কিন্তু হায় হায়, আমার এই তৃপ্তির ভাব কাটতে না কাটতেই রমণী যে মূর্তিতে উদয় হলেন, সেরুপ দেখা তো আমার কাম্য ছিল না – তাকে যে বড় বেশি অসুন্দর লাগছে এবার! তার চোখের দিকে তাকিয়ে আমার মাঝে যতটুকু রোমান্টিকতা ছিল, তা যে হল বিদায়। উল্টো তিনি আমাকে যেভাবে সোজা ঝাড়ি (তা না বলে ধোলাই বা রামধোলাই বললে বোধ হয় বেশ মানায়) দিলেন, তাতে নিজের স্বল্প মেধা ও বুদ্ধি যে খেল প্রচন্ড আঘাত। তা আঘাত খাক, না হয় হজম করলাম। কিন্তু সবার সামনে ভীষন এক লজ্জা ও দ্বিধাতে যে আমায় ডোবালো! এমন জানলে নিশ্চিত করে বলছি, এ জীবনে কখ্‌খনই মেধাবী আর সুদর্শনাদের পিছনে লাগতাম না। ভালভাবেই বোঝা গেল, মেধাবী-সুদর্শনাকে সবার সামনে জ্ঞান দিতে গিয়ে এই বিপত্তি বাঁধিয়ে ফেলেছি। ওনার আঁতে ঘা যে লেগেছে দারুন। সে যে সাংঘাতিক! তরুনী মহিলা উচ্চস্বরে তেজ ও তাচ্ছিল্য নিয়ে বলে উঠলেন, ‘কেন, আপনি পানি খান না, পানি পান করেন তো বলেন না! আবার তো সিগারেট খাওয়া বলেন, ধুমপান করা তো বলেন না! সুতরাং বরফ পড়া আর তুষার পড়া একই কথা!’ এমন ঝাড়ির পর ঝিম মেরে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। বাবারে, কে যে কারে জ্ঞান দেয়! মেধা যে কী জিনিস, জীবনে প্রথম অগ্নিমূর্তির দেবীকে দেখে সাক্ষাৎ প্রমাণ পেলাম। একবার ভাবি, মুজতবা আলীকে এখানে উদ্ধৃত করা যায় কিনা। কিন্তু মূহুর্তেই বুঝলাম, সুবিধা তো কিছু হবে না বরং উল্টো হতে পারে। তাই মুখ বুঁজে হজম করা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না কোন। সে সাথে নীচু মাথাটাকে একটু তুলে অন্য কারো দিকে তাকাতে আর ইচ্ছে হল না। তবুও না তাকিয়ে উপায় কি আছে? তাতেই দেখি, আমার নাজেহাল অবস্থা দেখে ঘরভর্তি একটু আগে চুপসে যাওয়া প্রায় সবার মাঝে একটু একটু পুলক পুলক ভাব। ব্যাচেলরগুলোর কেউ কেউ আবার মুচকি টিপি টিপি হাসি দিচ্ছে, যেন এ মাত্রই তারা তাদের হারানো পৌরুষ ফিরে পেয়েছে। সুতরাং সংগত কারণেই, আমার সমর্থনে আর কাউকেই পাওয়া গেল না।

মাস দুয়েক আগে এই টোরন্টোতে তুষার পড়লো খুব।

[পরের পোস্টে সমাপ্ত]

Advertisements

তথ্য কণিকা শামান সাত্ত্বিক
নিঃশব্দের মাঝে গড়ে উঠা শব্দে ডুবি ধ্যাণ মৌণতায়।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: