অর্থ অর্জন

আপা দেশে এসেছে অনেকদিন পর। সাথে ভাগ্নেটা। বেশ পাজি। কথাবার্তা শুনতে চায় না। নিজের মতই সব কিছু করে। নিজের মতই সব কিছু পেতে চায়। সবকিছুই তাকে সেইভাবে দিতে হবে, যেভাবে সে চায়। বিদেশ থেকে আসা একটা চার বছরের ছেলে যে এমন জিদ ধরে চলবে, ভেবে পায় না তানিশা। সবে এইচএসসি শেষ করেছে সে। হাতে যথেষ্ট সময়। তাই সব আবদার তার উপরই। কী আর করা আপার ছেলে যে! টেবিলে রাখা বাবার ওয়ালেট থেকে বাবার অজান্তে দশ ইউএস ডলারের একটা নোট নিয়ে এসে বলে, “খালা, চানাচুর আনো।” ঢাকায় আসার দু’দিনের মধ্যেই চানাচুর তার প্রিয় হয়ে গেছে। ইউএস-এ বাসায় বাংলা চর্চা থাকায় বাংলাটাও তার আত্মস্থ হয়েছে বেশ। তানিশা ছুটে গিয়ে আপাকে দেখায়, “দেখো, তোমার ছেলেকে, আমাকে কোথা থেকে দশ ডলার এনে দিলো।” আপা থামকে গিয়ে জেরা করে শানুলকে, “কি তুমি এই টাকা কোথায় পেলে।” “বাবার ওয়ালেট থেকে”, নিষ্পাপ উত্তর। “তাই বলে তুমি না বলে নেবে বাবার ওয়ালেট থেকে”, আপা শানুলকে বুঝায়। “কই ওয়ালেট?” শানুল অই দিকে বলে বাসায় ওদের জন্য অস্থায়ী শোয়ার রুমটা দেখায়। আপা ডলার নিয়ে চলে যায়। তারপর ফিরে এসে বলে, “এখন কি কোন দোকান খোলা আছে তানি? রাত কত বাজে? বৃষ্টি থেমেছে?” “আপা দাঁড়াও আমি যাচ্ছি। এখন তো দশটা বাজে। লোকটা বোধ হয়, এখনো তার স্টোর বন্ধ করেনি”, বলে তানিশা বের হতে উদ্যত হয়। আপা চিৎকার দিয়ে উঠে, “তুই একা কোথায় বের হচ্ছিস এই রাতে। দাঁড়া সাইফুলকে পাঠাই।” “না, আমি যাচ্ছি। ও আসতে আসতে দেরী হয়ে যাবে।” তানিশা বেরিয়ে পড়ে।

সালেক সাহেব অনেকদিন সৌদি আরব ছিলেন। কী কাজ করতেন জানা নেই। তবে তিনি দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের লোক হলেও ঢাকা শহরের এই এলাকাকে বেছে নিয়েছেন। কেন নিয়েছেন তার ব্যবসা শুরুর পর্যায়ে তা তিনিই ভাল জানেন। সিদ্ধান্তটা যে সঠিক ছিল, তার “মারহাবা” ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের রাতারাতি উন্নতি, তারই ইঙ্গিত দেয়। ভদ্রলোকের দেড়যুগের উপর সৌদিতে উপার্জনের বলতে গেলে পুরো টাকাটাই ঢেলেছেন বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই আধুনিকমানের একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর করতে। স্টোরটা সদর রাস্তার উপরে। দু’পাশের আবাসিক এলাকার লোকজনের এতে যাতায়াত। উচ্চবিত্ত না হলেও বিত্তবানরা বসবাস করেন এই এলাকায়। বলতে গেলে মাছ মাংস থেকে সবকিছুই আছে এই স্টোরে। সবকিছু সাজানো-গোছানো পরিপাটি করে রাখা। একদামে রাখা বলে ভদ্রলোকের চাইতে ভদ্রমহিলারা এখানে কেনাকাটা করে স্বস্থির পাশাপাশি একধরণের গৌরব বোধ করেন। একমাত্র এই স্টোরেই কোন মহিলাকে দরাদরি করতে সচরাচর দেখা যায় না। স্টোরটাকে দেখে এক ধরণের অভিজাত অভিজাত ভাব সহজেই টের পাওয়া যায়, দেশের বাস্তবতার বৈপরীত্যে।

সালেক সাহেব বেশ ধার্মিক। শ্মশ্রুমন্ডিত, মাথায় টুপি। বেশ চটপটে, অমায়িক। যৌবনের পুরো সময়টা মরু প্রবাসে শ্রমময়তায় বিলিয়ে দিয়ে এখন নিজের জন্য, নিজের গর্বের জন্য কিছু একটা করছেন, তা একটু গভীরে দেখলে টের পাওয়া যায়। উন্নত সেবা দিতে যেমন প্রস্তুত থাকেন, সে ভাবে অর্থ আগমনটা নিশ্চিত করতে এই মধ্য বয়সেও ছাড় দিতে প্রস্তুত নন। স্টোরে আরো তিনজন কর্মীকে কাজ করতে দেখা যায়। যতক্ষণ তিনি তার স্টোরে থাকেন, সব কর্মী এমনকি যেন ক্রেতাদের উপরও থাকে তার শ্যেন দৃষ্টি। স্টোরের কোন কোণই তার দৃষ্টি সীমাকে এড়িয়ে যেতে পারে না। মনে হয়, যৌবনে অর্থের পেছনে ছুটে যে বিরাট এক শূন্যতা তার জীবনে সৃষ্টি হয়েছে, এখন তা পূর্ণ করার সময়। আরব্য দেশে থেকে আরবীটা যেরুপ রপ্ত করেছেন, ধর্ম-কর্মটাকে সেরুপ আঁকড়ে ধরে আছেন। নামাজ কখনো কাজা করেন বলে মনে হয় না। সৃষ্টিকর্তার প্রতি অগাধ সমর্পণ তার প্রতি পদনিক্ষেপে দৃঢ়ভাবে ফুটে উঠে। ব্যবসাকে আরো বড় করার একটা জিদ ভেতরে তীব্রভাবে কাজ করে তার। দিনে দিনে সালেক সাহেবের এই সফল ব্যবসার প্রতি এলাকার মানুষের এক ভক্তিমূলক শ্রদ্ধা গড়ে উঠে।

তানিশা দ্রুত ছুটে আসে বাসা থেকে যদি স্টোরটা বন্ধ হয়ে যায়। দু’টো তরুণকে কেমন ঝুঁকে ঝুঁকে রাস্তা অতিক্রম করতে দেখে, সে ভড়কে যায়। গাড়ি-ঘোড়ার নীচে চাপা পড়ার ভয় নেই নাকি এদের। একটাকে টলে টলে হাঁটতে দেখে তানিশা। অন্যটা লম্বা, স্বাস্থ্যবান, শক্ত-সামর্থ্য। সে পাশের টলতে টলতে হাঁটতে থাকা ছেলেটাকে ধরে এগিয়ে যায়। লম্বা ছেলেটার মধ্যে এক ধরণের তাড়া লেগে আছে। একটা হন্তদন্ত ভাব। কী জানি! এত বুঝতে চায় না সে। আজকাল তো নেশাখোর যুবকের অভাব নেই। ভাল ঘরে, মধ্যবিত্ত ঘরে, উচ্চবিত্ত ঘরে। আশ্চর্য! “মারহাবা” ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের কাছে এসে লম্বা ছেলেটা কোমড় থেকে গামছা খুলে তার মুখটা বেঁধে ফেলে। পকেট থেকে বড় রুমালের মত আরেকটা কাপড় বের করে পাশের ছেলের মুখটা ঢেকে দেয়। বৃষ্টি থেমেছে সামান্য কিছু আগে। প্রকৃতিতে একটা স্বচ্ছ স্বচ্ছ ভাব। রাতের বাতাসটাকে তরতাজা লাগে। রাস্তায় আশে-পাশে দু’একজন লোক দেখা যাচ্ছে। তাদের মধ্যে বাড়ি ফেরার তাড়া। তানিশা রাস্তা অতিক্রম করে ক্রমশঃ “মারহাবা”-র দিকে এগিয়ে আসে। এরি মধ্যে ছেলে দু’টো স্টোরটাতে ঢুকে গেছে। তার কৌতূহল বাড়ে। এই প্রথম সে এমন দেখছে। কেমন এক সন্মোহন, তাকে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরটার কাছে নিয়ে আসে। দেরী না করে সে ভেতরে প্রবেশ করে। ক্যাশ কাউন্টারে দাঁড়িয়ে থাকা গামছায়-মুখ-মোড়ানো লম্বা ছেলেটা হঠাৎ তানিশার দিকে ফিরে চীৎকার করে উঠে, “আর এক পা আগাবি তো তোরে গুলি কইরা মাইরা ফেলাবো।” তানিশাকে না দেখে, তার পাওয়ার আওয়াজ শুনেই লোকটা উন্মাদের মতো চীৎকার দিয়ে উঠে। থমকে যায় তানিশা। ভীত-সন্ত্রস্থ হয়ে পড়ে। এ কিসের মাঝে সে এসে পড়লো! ছেলেটার হাতে এক চকচকে পিস্তল। “এই ব্যাটা। তাড়াতাড়ি কর। ট্যাকা সব বাইর কর। অনেক কামাইছস। একটু উল্টা-পাল্টা করলে মাইরা ফালামু। আইজ একটারো এখনো মারি নাই। তোরা দিয়া শুরু করমু।” ক্যাশ কাউন্টারে দাঁড়ানো সালেক সাহেবের টুপির নীচে কপাল ঘামাচ্ছে। প্রচন্ড অনীহা এবং অপমানের মুখে যে তিনি টাকা বের করে দিচ্ছেন, তা বোঝা যাচ্ছে। চোখ-মুখে ভীষন অপমানবোধ। এর জন্য যে তিনি কখনো প্রস্তুত ছিলেন না। “ওই ব্যাটা, ব্যাগে ভর, ব্যাগে ভর তাড়াতাড়ি।” ধমক দিয়েই চলছে লম্বা ছেলেটা। আর অন্য ছেলেটা বাম পাশে স্টোরের দুই কর্মচারীর সামনে পিস্তল তুলে ধরে মূর্তির মত দাঁড়িয়ে আছে। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকাটাই যেন তার দায়িত্ব। লোকগুলো ভয় পাক আর না পাক। তানিশার দৃষ্টিও ছবির মত স্থির হয়ে গেছে। সে শুধু ভয়ার্ত বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে ঘটনাসমূহ পর্যবেক্ষণ করছে। হঠাৎ এই ভীতিকর অবস্থার বিপরীত ঘটনা ঘটে সবকিছু পাল্টে যায়।

স্টোরের দুই কর্মচারীকে পিস্তলের মুখে রাখা ছেলেটা জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যায়। তার পিস্তল ছুটে যায় এক কর্মচারীর পায়ের কাছে। ছেলেটার জ্ঞান হারিয়ে ফেলাতে লম্বা ছেলেটাও যুগপৎ বিচলিত এবং আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। সালেক সাহেব থেকে টাকা ভরতে থাকা ব্যাগটা আর নেয়া হয় না। এক হাতে পিস্তল ধরে রেখে সে কোনক্রমে ছেলেটাকে মেঝে থেকে তোলার চেষ্টা করে। চেষ্টা করে এক হাতে টেনে তুলতে না পেরে সে ডান হাতে পিস্তল ধরে রেখেই দু’হাতে পাঁজাকোলা করে ছেলেটাকে তুলতে যায়। সঙ্গীকে তুলে নিতে সে যেই উপুড় হয়, তাতে তার শরীরের পেছন দিকে শার্টের ফাঁক গলে কোমরে প্যান্টের নীচে এক বড় বান্ডেল টাকার নোট দেখা যায়। সামনে দাঁড়ানো যুবক কর্মচারীটি তা ঠিক দেখতে পায়। এদিকে সঙ্গীকে কোন রকমে তুলে নিয়ে লম্বা ছেলেটি আর দেরী না করে তাড়াহুড়ো করে স্টোর থেকে বের হতে থাকে। সালেক সাহেব পেছন থেকে এগিয়ে এসেছিল একবার তাকে ধরতে, আক্রমণ হানতে। কিন্তু তড়িৎ গতিতে সঙ্গীকে পাঁজাকোলা করে হাতে রাখা অবস্থাতেই লম্বা ছেলেটা পিস্তল হাতে ঘুরে দাঁড়ায়। “খবরদার একটু উল্টা-পাল্টা করছোস তো ওই পাড়ে পাঠাই দিমু।” ছেলের শাসানি শুনে সালেক সাহেব আর ঝুঁকি নেয়ার সাহস পায়নি। ঠিক সে সময়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা যুবক কর্মচারীটি তার সামনে মেঝের উপর টাকার বান্ডেলটি পড়ে থাকতে দেখে। কর্মচারীটি সেদিকে নজর দিয়ে ডাকাতি করতে আসা লম্বা ছেলেটাকে যেই ডাকতে যাবে, ঠিক সে সময়ই সালেক সাহেব মুখে তর্জনী তুলে তাকে চুপ করার ইঙ্গিত দেয়। ডাকাতদ্বয় স্টোর ছেড়ে বেরুতে না বেরুতে ছোঁ মেরে বান্ডেলটা যুবক কর্মচারীটির হাত থেকে তুলে নেয় সালেক সাহেব। তার পর তা থেকে দু’টো পাঁচশ টাকার নোট বের করে একটা দেয় সম্মুখের যুবক কর্মচারীটিকে আর অন্য নোটটি অপরটিকে। তিনি দুই কর্মচারীকে ধমক দিয়ে সতর্ক করেন দেন, “খবরদার এই কথা অন্য আর কারো বলবি না। বলোস যদি, আমি তগো চাকরি খাইছি।” অপর কর্মচারীটি এরি মধ্যে তার পায়ের কাছে ছুটে আসা পিস্তলটি মেঝে থেকে তুলে নেয়। সেটা নাড়া-চড়া করতে করতে সে সালেক সাহেবের উদ্দেশ্যে বলে উঠে, “ভাই, এটাতো মনে হয় খেলনা পিস্তল।” সালেক সাহেব তার ঠাঁট ধরে রেখে বলে, “আমারে যেটা দিয়া ধরছিলো, ওটা আসল ছিল, খেলনা না। নকল হইলে তো আমি ঐ পোলাটারে থাবড়াইয়া বসাই দিতাম।” এই সময় বাইরে ট্যাক্সির আওয়াজ পাওয়া যায়। তানিশা ডাকাত ছেলে দু’টোকে সারাক্ষণ অনুসরন করছিল। সে চিৎকার করে বলে, “ঐ দু’টো তো ট্যাক্সিতে উঠে চলে গেল।” “ট্র্যাক্সিটা ওদের দলের আপা। এমনি তৈরী হয়ে এরা আসে না।” সালেক সাহেব তানিশাকে জানায়।

তানিশাকে চেনেন সালেক সাহেব। তিনি কখনো কারো সাথে বিশেষ আন্তরিকতা তৈরি করেন না, একটা দূরত্ব রেখে চলেন। এই মূহুর্তে তানিশাকে দেখে তিনি কিছুটা সচেতন হয়ে উঠেন। টাকার বান্ডেলটা ক্যাশ বাক্সে চালান দিয়ে উত্তেজিত আন্তরিকতায় বলেন, “আপা কি লাগবে আপনার?” তানিশা এক প্যাকেট চানাচুরের কথা জানালে, তিনি তার কর্মচারীদের তাড়া দিয়ে বলেন, “এই আপার জন্য চার প্যাকেট চানাচুর আন্‌।” কর্মচারী একজন চার প্যাকেট চানাচুর নিয়ে এলে, তিনি সব কয়টা চানাচুরের প্যাকেট একটা ব্যাগে ভরে তানিশাকে দিয়ে বলেন, “আপা নেন। আপনারে পয়সা দিতে হবে না আজ। আবার আসেন হ্যাঁ।” তানিশা একটু আশ্চর্য হয়ে বলে, “হ্যা”, যেন সে সালেক সাহেবের কথা বুঝতে পারেনি। “নিয়ে যান আপা, পয়সা দিতে হবে না।” সালেক সাহেব আবারও বলে। তানিশা আর কিছু না বলে ব্যাগটা নিয়ে স্টোর থেকে বেরিয়ে যায়।

কর্মচারীদ্বয় স্টোরের ভেতর থেকে মূল ফটক বন্ধ করে। সালেক সাহেব দেরী না করে ক্যাশ বাক্সে টাকা গুণতে বসে যায়। আজ ব্যবসায় অনেক লাভ হয়েছে তার। মনে মনে আল্লাহ্‌কে শুকরিয়া জানায়।

Advertisements

তথ্য কণিকা শামান সাত্ত্বিক
নিঃশব্দের মাঝে গড়ে উঠা শব্দে ডুবি ধ্যাণ মৌণতায়।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: