পরশ পাহাড় [শেষ পর্ব]

পরশ পাহাড় [শুরুর পর্ব]
পরশ পাহাড় [মধ্য পর্ব]

এ ঘটনার পর এক বছর পেরিয়ে যায়। সাব্বিরের পাহাড়ে ঘোরার নেশা কাটে না। মায়ের অজান্তে সুযোগ পেলেই সে পাহাড়ে চলে যায়। মুক্ত স্বাধীন জীবনটা তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। পাহাড়ের কোথাও কোথাও ঘুরলে কোন কোন জায়গাকে তার খুব রহস্যময় মনে হয়। কী না কী আছে এতে। শুধু তার নিজের মত আবিষ্কার করার অপেক্ষা। ঔ যে দূরে পাহাড় ঘেরা লেকটা। কী সুন্দর প্রকৃতির কোলে শরীর এলিয়ে বয়ে চলেছে। সাব্বির তার কাছে পৌঁছে যায়। এই লেকের নীরব নিঃসঙ্গ সময়ের রুপ তাকে বেশী টানে। কিন্তু সে রুপের দেখা হয়ে উঠে না যে! কোথা থেকে এত মানুষ আসে এ লেকের কাছে! পাহাড়-প্রকৃতি আর লেকের নিঃসঙ্গতা তাকে টেনে ধরে। কী জানি, এদের সাথে তার এক আত্মার সম্পর্ক সে খুঁজে পায়। এরিই মধ্যে বছরের কোন কোন সময়ে এলে সে এই পাহাড়-প্রকৃতি বা লেককে মোটামুটি নিঃসঙ্গ অবস্থায় পাবে, তা তার জানা হয়ে গেছে। এই তো কিছুদিন আগে, সে ফিরতে বেশ দেরী করে ফেলে। বুকের ভেতরটা কেমন ধুকু-পুকু করতে থাকে, যদি আজ মা কিছু বলে। মাঝে মাঝে তাকে না পেলে মা যে কেমন অস্থির হয়ে উঠে। মাগরেবের আযান হয়ে গেছে। আকাশের লালিমা এখনও মিশে যায় নি। খোলা পাহাড়ে একটু শীত শীত করছে। অথচ মাগরিবের আগেই তার ঘরে থাকার কথা। এ যাত্রায় সে বেঁচে যায়। বাসায় ফিরে মিনার মার সাথে মাকে সে খুব জরুরী কিছু নিয়ে বেশ নিমগ্ন হয়ে কথা বলতে দেখে। মিনার মা যেতে যেতে বলে, “আপা আমি এখন যাই, দেরী হয়ে গেল। পরে কথা বলবো।” বাসার পেছনের দরজা দিয়ে সাব্বির এতক্ষণে ভেতরের বারান্দায় এসে গেছে। সে মূহুর্তে তাকে দেখে মা শুধু শাসনের স্বরে বলার জন্যই বলে, “কিরে কই ছিলি?” সাব্বিরও বুঝে এ মূহুর্তে যেমন তেমন একটা উত্তর দিয়ে দিলেই হবে, “এইতো এইখানে।” আজ একটু ভয়ও পেয়েছিল সে। মূলতঃ সন্ধ্যা নামাতে পথ হারিয়ে ফেলার ভয়। তবুও মাথাটাকে ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করেছে। পরিচিত পথ থেকে যেন বেপথে চলে না যায়। বাসার ভেতরে আলো জ্বালানো আছে। বারান্দায় এখনো আলো জ্বালানো হয় নি। মিনার মার পেছনে সে মিনাকে দেখে। দিন দিনে তাকে কেমন যেন পটু পটু লাগে। আর মিনাকে সামনে দেখলে, সাব্বিরের মাঝে কোথা থেকে হাবাগোবা এক ভাব এসে জড় হয়। ইস্‌, সে যদি বাসায় থাকতো আজ। মিনা নিশ্চ্য়ই তার সাথে দু’চারটে কথা বলতো। না, মিনাকে নিয়ে সে এত সহজে খেলতে বসতে পারবে না। “যেমন খুশী তেমন সাজো”-তে বউয়ের সাজে দেখার পর থেকে, যতবারই মিনাকে সে দেখেছে, ততবারই তার মাঝে আপনা আপনি এক লাজ-নম্র ভাব প্রকট হয়ে উঠেছে। মিনার সামনে আসতেই তার যত সংশয়। তাই দূর থেকে দেখে চলা। আজ সে পরেছে একটা হাতাকাটা কমলা রঙের ফ্রক, যাতে আছে ফুলের কিছু চমৎকার ছাপ। কেমন সুন্দর মানিয়ে গেছে তাকে। গতবারের আগের বার “যেমন খুশী তেমন সাজো”-র তার সেই ইটা রঙের শাড়ীর সাথে আজকের এই সাজের কোথা যেন একটা মিল। এই এক বছরে মিনাকে তার চেয়ে অনেক বেশী চটপটে, সাহসী ও সুঠাম মনে হয় সাব্বিরের। মিনাকে দেখলেই কেন জানি সে নিজেকে তার সাথে তুলনায় বসে যায়। আর বারে বারে মিনাকে সে উঁচুতে স্থান দেয়। সাব্বিরকে দেখে যেতে যেতে মিনা এক নজর তাকায়। সে সাথে তার স্বভাবসুলভ একটা মিষ্টি হাসি দেয়। সে মূহুর্তে সাব্বিরের মিনাকে তার চাইতে কমসে কম দু’তিন বছরের বেশি বড় মনে হয়। এ বছরে মিনা কি আবারো বউ সাজবে? সাব্বিরের পড়াশুনা আগের চেয়ে কিছুটা ভাল হয়েছে। এবার ৬ষ্ঠ স্হান অর্জন করেছে। শুনেছে এবারে মিনা না কি দ্বিতীয় হয়েছে। স্কুলের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণীতে মিনার হাতে পুরস্কার থাকবে, তার হাতে নয়। কিছুটা মুষড়ে পড়ে সাব্বির।

আজও সে সেই স্বপ্নটা দেখে। সে পাহাড়ে উঠার খুব চেষ্টা করছে। পা যে তার একদম চলতে চায় না। উফ্‌ কী ভীষণ কষ্ট! আগে থেকেই পাহাড়ের মাঝামাঝি উঠাবস্থায় সে, অনেক চেষ্টা করেও আরেক পা বাড়াতে পারছে না। কষ্টকরভাবে একই জায়গায় সে থেকে যাচ্ছে! এমন সময় মায়ের গলায় তাকে ডাকার ডাক শোনে। ভীষণ ভয় পেয়ে যায় সাব্বির। আর তখনই সে দেরী না করে পাহাড় থেকে উল্টে পড়ে গড়াতে থাকে নীচে। কোন কিছু ঘটার আগে এবারেও সে আঁতকে ঘুম থেকে উঠে পড়ে এবং বরাবরের মতই ভীষণ আশ্চর্য হয়ে তাকে আবিষ্কার করে বিছানা থেকে উঠে বসা অবস্হায়। বিগত এক বছরে বেশ কয়েকবার সে এই স্বপ্নটা দেখেছে। আবার একসময় ঘুম থেকে উঠার পর ভুলেও গেছে, যদিও কখনো কখনো স্বপ্নটা তার মনে এসেছে।

গত দু’দিন সে ক্লাসে যায়নি। বছরের শুরুতে বার্ষিক পুরস্কার বিতরণীর উপলক্ষে তিনদিন স্কুলে কোন ক্লাস হয় না। সব স্যারই পিটি স্যারকে হেল্প করে খেলাধূলা ও দৌড়-ঝাঁপের ইভেন্টগুলো ঠিকমত শেষ করতে। স্পোর্টসের কথা শুনে মাও সাব্বিরের স্কুলে না যাওয়াতে তেমন কিছু বলে নি। কিন্তু ফাইনাল দিন সকালে সাব্বির স্কুলে যায়। প্রথমে ক্লাসে আসে যদি সহপাঠি কারো দেখা মেলে। কাউকে না পেয়ে সে স্কুলের বড় মাঠে চলে যায়। এখানে ওখানে বিচ্ছিন্নভাবে দৌড় ঝাঁপের প্রতিযোগিতা চলছে। একটা উৎসব উৎসব ভাব। যে যার মত করে উপভোগ করছে। প্যান্ডেলের একপাশে একা একা বসে থেকে সাব্বির একসময়ে শব্দযন্ত্রে বিস্কুট দৌড়ে অংশগ্রহণের ঘোষনা শুনে। তাদের বয়সের ছেলেদের অংশগ্রহণের জন্য আহবান জানানো হচ্ছে। কিছুটা কৌতূহলী হয়ে উঠে সাব্বির। সে মাঠের দিকে পা বাড়ায়। কিছুটা সংকোচ, কিছুটা দ্বিধা তাকে জড়িয়ে রাখে। একসময় মনে হয়, দেখিই না কী হয়! সে ঝটপট দৌড়ের জন্য দাঁড়িয়ে যায়। হুইসেলের সাথে সাথে সে দ্রুত দৌড়াতে থাকে। বিস্কুট ঝুলানো দড়ির কাছে ছুটে যায়। ও মা, লাফাতে না লাফাতেই একটা বিস্কুট তার মুখে এসে পড়ে। আর দেরী না করে সাব্বির বিস্কুট মুখেই দৌড়ে গন্তব্যে পৌঁছে যায়। যুগপৎ দৌড় ও উত্তেজনায় হাঁপাতে থাকে। অনেক কষ্টে স্যারদের তার নাম বলে এবং সে সাথে কোন শ্রেণীর ছাত্র তাও জানাতে হয়। তার পৌঁছার কিছু পরেই বিস্কুট মুখে আরেকজন ছেলেকে তাদের দিকে ছুটে আসতে দেখে।

পুরস্কার হাতে নিয়ে সাব্বির দ্রুত বাসার দিকে পাড়ি দেয়। তখন সন্ধ্যা হয় হয়। মাগরেবের আযান এখনো পড়েনি। দরজা খুলে বাসায় ঢুকে সে ভেতরের বারান্দায় মাকে পায়। জোর স্বরে মাকে শুনিয়ে বলে, “মা, আমি বিস্কুট দৌড়ে প্রথম হয়ে এই কলমটা পুরস্কার পেয়েছি।” মা চুপ করে থেকে কিছুক্ষণ সাব্বিরের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর খুশীতে মার মুখে হাসি ফুটে উঠে।

প্রথম প্রকাশ: প্রথম আলো ব্লগ। ফেব্রুয়ারী ২, ২০১০

Advertisements

তথ্য কণিকা শামান সাত্ত্বিক
নিঃশব্দের মাঝে গড়ে উঠা শব্দে ডুবি ধ্যাণ মৌণতায়।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: