পরশ পাহাড় [মধ্য পর্ব]

পরশ পাহাড় [শুরুর পর্ব]

তাই এবারে সে উৎসাহ খুঁজে পেতে চায়। তার বয়েসের বিভিন্ন ইভেন্টে অংশ নিতে মাঠে ঘুরে ফিরে। সুযোগ বুঝে মোরগের লড়াই-এর বৃত্তের মাঝে ঢুকে পড়ে। বাছাই পর্বে ফাইটে টিকে থাকা যে আটজনকে বেছে নেয়া হয়, তাতে তার নাম আসে। প্রথম চারজনের মাঝেই সে ছিল। একটা আকাঙ্খা গড়ে উঠে সাব্বিরের মাঝে। খেলায় যে চতুরতার আশ্রয় সে নিয়েছে, তা অনুসরণ করলে প্রথম তিনজনে তার নাম আসাটা অসম্ভব কিছু না। সে সেদিনের মত বাসায় পৌঁছে যায়। মনে মনে ভালভাবে সে ফন্দি আঁটে, কিভাবে অন্যদের আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচাবে। সে ডিফেন্সিভ খেলতে ভালবাসে। অন্যরা কাঁধ দিয়ে আক্রমণে এলেই সে কুঁজো হয়ে নুইয়ে পরে। তাই আক্রমণগুলো তার গায়ে আর লাগে না। অন্যরা নিজেদের মধ্যে ফাইট করুক, ঝরে পড়ুক। কিন্তু সে নিজে তাতে শরীক হবে না। যখন সংখ্যা কমে তিনে আসবে, তখনই সে সুযোগ খুঁজবে কিভাবে দু’জন মিলে একজনকে আক্রমণ করা যায়। পরিকল্পনা পাকাপাকি করে রাতে সে ঘুমাতে যায়। রাত তার আর কাটে না, যেন স্বপ্নেও সে দেখে কিভাবে তাকে যুদ্ধে টিকে থাকতে হবে।

সকালে ঘুম থেকে সে ঠিকমত উঠতে পারে না। চোখে ঘুমের ঘোর আর কাটে না। বিছানা থেকে উঠতেও ইচ্ছে করে না। ঘুম থেকে উঠতে না দেখে, মা এসে তার কপালে হাত রাখে। সে অবস্থায় মা চিৎকার জুড়ে দেয়, “কাল সারাদিন তুমি কোথায় ছিলে, হ্যাঁ? তোমার গায়ে এত জ্বর কেন? স্কুলে কি করেছিলে, কোথায় ছিলে?” সাব্বির ভড়কে উঠে। মায়ের এ চিৎকারে সে কখনো কিছুই লুকাতে পারে না। গড়গড় সে বলে ফেলে, “মা, কাল স্কুলে আমাদের স্পোর্টস ছিল। আমি কক ফাইটে নির্বাচিত হয়েছি। আজকে আমাদের ফাইনাল। আমাকে যেতে হবে।” তেতেমেতে উঠে মা, “কি বললে? কাল তুমি মাঠে মাঠে দৌড়িয়েছো। রোদে ঘুরে এইজন্য তো জ্বর বাঁধিয়েছো। আমাকে তুমি স্পোর্টসের কথা জানিয়েছো? আবার আজকেও জ্বর নিয়ে মাঠে যাবার কথা বলছো? তোমার কোথাও যাওয়া হবে না। তুমি বাসায় থাকবে।” সাব্বির পড়ি্-মড়ি করে কাঁদো কাঁদো গলায় মাকে বলে, “মা আমাকে যেতে হবে। আজ ফাইনাল।” “আবারো তুমি আমার মুখের উপর কথা বলো। কম সাহস তো তোমার না। দাঁড়াও তোমার বাবা বাসায় আসুক আজকে।” সাব্বির তার নিয়তি আঁচ করে ফেলে। কিন্তু নিয়তিকে মেনে চলা আজ তার পক্ষে সম্ভব না। সে হাঁস-ফাঁস করে। টেবিল ঘড়ির কাটার দিকে তার চোখ পড়ে। বেলা ১১:৩০ মিনিটে কক ফাইটের ফাইনাল। এখন ঘন্টা আড়াইয়ের মতো বাকি। সে কিছুক্ষণ বিছানায় শুয়ে থাকে। কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করে বিছানায়। মাকে যে কিভাবে বুঝ দেয়া যায়! এই মা যে কখনও কখনও তার ছুটে চলার গতিকে বন্ধ করে দেয়, তা সে কিভাবে কাকে বোঝায়? সাত-পাঁচ ভাবে সে। একদিন তো মনে মনে সে খুব কেঁদে ফেলেছিলো। মনে হয়েছিল, মা তাকে একদমই ভালবাসে না। তাকে চায় কি না, তাও সে জানে না। মরে গেলে কী হয়! এমন সব সাত-পাঁচ চিন্তা। আধা ঘন্টা পর গৃহকর্মী শিউলি এসে তার বিছানার পাশে এক বাটিতে করে পাতলা সুজি রাঁধা দিয়ে যায়। সে সাথে দু’টো পাতলা করে বেলে নেয়া রুটি। সাব্বির তৃপ্তির সাথেই সুজি দিয়ে রুটি খায়। খাওয়া শেষ হলে আবার ঘড়ির দিকে তাকায়। একটু একটু করে সময় এগিয়ে যাচ্ছে। তার ভেতরেও ধীরে ধীরে অস্থিরতা আঁকুপাঁকু করছে। নিজের মধ্যে কিছুটা সুস্থ সবল উচ্ছ্বল ভাব নিয়ে আসার চেষ্টা করে সে। মা তার রুমে এলেই খাট থেকে নেমে এসে, সাব্বির পাশে তার পড়ার টেবিলের দিকে আগাতে যায়। তার সামনে এসে মা দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেন, “এই সিরাপটুকু একটু খেয়ে নাও।” শিশি থেকে সিরাপ চামুচে ঢেলে সাব্বিরের মুখে দিয়ে দেন দুই দুইবার। সাব্বির ঔষুধ খেয়ে নিয়ে মাকে বলে, মা আমি এখন বেশ সুস্থ বোধ করছি। মা শুধু ‘ঠিক আছে’ বলে রুম থেকে বেরিয়ে যান। কোনরকম ভাবলেশ নেই মার মুখে। কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়ে সাব্বির। বুঝে উঠতে পারে না, মাকে কোন রকম বুঝিয়ে স্কুলে যেতে পারে কি না। একটু পরে ঘুম ঘুম ভাব তাকে জড়িয়ে ফেলে। ঘড়ির কাটা দশটার কাছাকাছি। বিছানায় আরেকটু শুয়ে নিতে ইচ্ছা হয় তার।

পেছনের পাহাড়ের উত্তরদিকে বসবাস করেন সালেহীন সাহেব। তার যথেষ্ট ভদ্র অথচ দুরন্ত ছেলে সামির পাহাড়ে উঠতে যেয়ে একদিন পাহাড় থেকে নীচে গড়িয়ে পড়ে। পাহাড়ের তলদেশের গা ঘেঁষে পাহাড়ের সমান্তরালে পানির ইয়া বড় মোটাসোটা পাইপ সুবিস্তৃত হয়ে বসানো রয়েছে। কোথাও কোথাও পাইপের আশে-পাশের পাহাড়ের মাটি সরে গিয়ে পাইপটা খুব উন্মুক্ত হয়ে গেছে। সামির পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়লেও অলৌকিকভাবে পাইপের সাথে সংঘর্ষ থেকে বেঁচে যায়। পাহাড়ের উপর থেকে গড়াতে গড়াতে সে একেবারে নীচে এসে সাব্বিরদের বাসার ঠিক সীমানার বাইরে পড়েছিল। সীমানার ভেতর থাকা সাব্বির তখন সামিরের শরীর থেকে এক ক্যোঁত করা শব্দ শুনতে পায়। পুরো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে সে ভীষণ শংকিত হয়েছিল। সামিরের এই অল্পতেই বেঁচে যাওয়াতে তার আশ্চর্য হয় খুব। কোন ব্যথাই লাগেনি ছেলেটার শরীরে। এমূহুর্তে সেও পাহাড়ে উঠার খুব চেষ্টা করছে। পা যে তার একদম চলতে চায় না। উফ্‌ কী ভীষণ কষ্ট! আগে থেকেই পাহাড়ের মাঝামাঝি থাকা সে, অনেক চেষ্টা করেও আরেক পা বাড়াতে পারছে না। কষ্টকরভাবে একই জায়গায় যে সে থাকছে! এমন সময় সে শোনে মায়ের গলায় তাকে ডাক। ভয় পেয়ে যায় ভীষণ সাব্বির। আর ঠিক তখনই সে দ্রুত পাহাড় থেকে উল্টে পড়ে গড়াতে থাকে নীচে। কোন কিছু ঘটার আগে সে আঁতকে ঘুম থেকে উঠে পড়ে এবং ভীষণ আশ্চর্য হয়ে তাকে আবিষ্কার করে বিছানা থেকে উঠে বসা অবস্হায়। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার মতই অবস্থা। দেরী না করে সে তড়িৎ গতিতে ঘড়ির দিকে তাকায়। ও মা, এ তো বেলা তিনটা বাজে। সাব্বির বুঝে উঠতে পারে না, কেন সে এত ঘুমালো। দ্রুত সে ঘর থেকে বেড়িয়ে বাসার সামনের গেইটের দিকে যায়। সামনের রাস্তা দিয়ে দু’চারজন করে স্কুল ছাত্ররা তাদের বাসায় ফিরছে। অস্থির আর ভাঙ্গা মন নিয়ে কোন কিছু না ভেবে বোকার মত দু’তিনজনকে জিজ্ঞেস করে ফেলে, “আচ্ছা, কক ফাইট কি হয়ে গেছে?” কোন সদুত্তর পায় না কারো কাছ থেকে। বরং কোন কিছু বুঝতে না পেরে দু’একজন অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকায়। কেউ ঈষৎ অবজ্ঞা দেখিয়ে চলে যায়। সাব্বিরের আর কাউকে প্রশ্ন করার ইচ্ছে বা সাহস কোনটাই হয় না। তাকে কষ্ট এক ভীষণ গিলে ফেলে। একটা পাওয়া তার হাতছাড়া হয়ে গেছে। মনের কষ্ট মনে গুজে তাকে বাসায় ফেরত আসতে হয়।

এ ঘটনার পর এক বছর পেরিয়ে যায়। [শেষ পর্বের শুরু]

Advertisements

তথ্য কণিকা শামান সাত্ত্বিক
নিঃশব্দের মাঝে গড়ে উঠা শব্দে ডুবি ধ্যাণ মৌণতায়।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: