পরশ পাহাড় [শুরুর পর্ব]

পাহাড়ের পাদদেশে থেকে থেকে কেমন যেন উন্মনা হয়ে উঠে সাব্বির। দৃষ্টি তার দূরে ফেলতে পারে না। বাড়ি পালানো ছেলের মতো লুকিয়ে লুকিয়ে পাহাড়ে চড়েছে সে। তাও সুযোগ বুঝে, যখন মা বাসায় থাকেন না বা দুপুরে খাওয়া শেষে গল্পের বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে যান। বাবা তো অফিসে, কখনও কখনও অফিসের কাজে ট্যূরে। কষ্ট করে পাহাড়ে একবার উঠে পড়লে কি চমৎকারই না লাগে। মজাও কী কম। পৃথিবীর নির্মল বায়ু সেবন, সে সাথে চারপাশটাকেও খুব কাছে মনে হতে থাকে। খুব ছোট হয়ে আসে কি না। উঁচুতে থেকে নীচে দেখা যে কী আনন্দের!

এই পাহাড়ের তলেদেশে থেকে থেকে দৃষ্টি সবসময় পাহাড়ের উঁচুতে উঠে যেত তার। সেখানে একটা বাড়ির কিছুটা দেখা যায়। তারপর আর কিছু দেখা যায় না। মনে মনে উপরে উঠে ওপার-এপার সব পার-কে দেখার এক তীব্র আকাঙ্খা জেগে উঠতো। মার কাছে থেকে প্রতিনিয়ত একটা নিষেধ শুনতে থাকায় সাব্বিরের সাহস হতো না মাকে রাগিয়ে পাহাড়ে যেতে। তাই সুযোগের অপেক্ষায় থাকা। বাড়ির পেছনে পাহাড়। বাড়ির সামনে সমতল রাস্তা মসৃণ করে ইট বিছানো। এই পথ দিয়ে স্কুলে যায় সে। স্কুলের ছেলেমেয়েরাও এই রাস্তাটাকে অনুসরণ করে। স্কুলে যায়, বাড়ি ফিরে। নীচে থেকে পেছনের পাহাড় দেখা, নতুবা বাড়ির সামনের রাস্তায় মানুষ চলাচলের দিকে সাব্বিরের অনিমেষ তাকিয়ে থাকা। যেন পথচলা মানুষদের মনের জগতের খবর নেয়া। কিন্তু সে তো এতটুকুন। চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র। কতটুকুই বা বুঝে আর?

স্কুলের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান শুরু হচ্ছে। তিনদিন ব্যাপী ক্রীড়া প্রতিযোগিতা তো মূল আকর্ষণ। সে সাথে প্রতিবছর যারা পড়াশুনায় বিভিন্ন শ্রেণীতে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হচ্ছে, তাদেরকেও এই পুরস্কার বিতরনী অনুষ্ঠানে পুরস্কৃত করা হচ্ছে। গতবছর ক্রীড়া প্রতিযোগীতার দিনগুলোতে সাব্বির মাঠের দিকে পা-ই বাড়ায়নি। মা যদি কিছু বলে। মা কোথাও যেতে দেয় না। পাহাড়ে যেতে অথবা বাসা থেকে দূরে। স্কুল থেকে একটু দেরী হলেই, বাসাখানা মাথায় তুলে। কত যে কৈফিয়ত দিতে হয়। একদিন স্কুল ছুটি হওয়ার অনেক আগে,তাদের বিভিন্ন ক্লাসের মধ্যে ফুটবল প্রতিযোগীতা ছিল বলে মাঠে নেমে পড়েছিল। খেলায় সবাই তো গোল দেয়ার জন্য উপরে উঠে খেলতো। সাব্বিরের কপালে পড়তো গোলকিপার হবার দুর্ভাগ্য বা সৌভাগ্য। তাই সে মেনে নিতো। গোল পোস্টে বল ঠেকানোতে সুনামও কুড়িয়েছিল। অতটুকুতেই আন্তঃস্কুল জুনিয়র ফুটবল প্রতিযোগিতায় সাব্বিরের নাম এলো গোলকিপার হিসেবে। যখন মায়ের কানে এলো, ‘আপনার ছেলে তো ভাল গোলকিপার হয়ে উঠেছ’, তখনই হৈ-হল্লা পড়ে গেল। “কি তুমি পড়াশুনা বাদ দিয়ে ফুটবল নিয়ে মেতেছো? এত বড় স্পর্ধা! কেউ কি তোমাকে কিছু বলার নেই?” সাব্বিরের সকল আগ্রহ উল্লাস ওখানেই অস্তমিত।

তাই গতবছর যখন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা শুরু হলো, স্কুল ছুটি হলেও, মার শাসনের কথা মনে করে সাব্বির আর ওদিকে ভ্রুক্ষেপ করেনি। সে সোজা বাসায় চলে আসে। নতুন বছরে নতুন বইয়ের পাতা ওল্টায় মলাট বাঁধে। মনে মনে পণ করে, এবার তাকে প্রথম, দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় হতে হবে। তার রোল নাম্বার সবসময় ১১-র পরে। গতবছর ছিল ১৩।
আটেও চলে আসতে পারতো সে যদি আর ১১ নাম্বার বেশি পেতো। অংকটাই তাকে ডুবিয়েছে। অথচ এ অংকটাই সে ভাল পারতো ক্লাসে। এবারে ৯ম হয়েছে সে। স্বান্তনা শুধু অতটুকুই। কিন্তু এবারে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা বাদ দেয়ার চিন্তা করতে পারছে না। গতবছর ক্রীড়া প্রতিযোগিতার শেষ দিনে পুরষ্কার বিতরনীর ঠিক আগে আগে সে মাঠে গিয়েছিল। তাদের ক্লাসে ৫ম স্হান অধিকারী শোয়েবের ইচ্ছায়। “চল্‌ দেখি আসি, অন্য সব ক্লাসের কারা কারা প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়েছে।” মূলতঃ পড়াশুনার কথাই সে বুঝিয়েছে। শোয়েবকে অনুসরণ করে ঠিকই সে মাঠে যায় পুরস্কার বিতরনীর কিছু আগে থেকে। মাঠে তখন ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ চলছে। চারিদিকে কেমন সাজ সাজ রব। ভাল লেগে যায় সাব্বিরের। সে তন্ময় হয়ে সবার সাজগুলো দেখে। কেউ সাংবাদিক, কেউ ফটোগ্রাফার, কেউ চাষী, কেউ ফেরিওয়ালা এমন কত কি? একটু পরেই তার চোখ ছানাবড়া হয়ে উঠে। আরে এতো মিনা। তাদের পাশের বাসার। প্রায়ই তো তাকে দেখে বাসার উঠোনে। তার মার সাথে আমাদের বাসায় আসে। এতটুকু মেয়ে এত সুন্দর করে বউ সেজেছে। সে তো শুধু তার এক ক্লাস নীচেই। কালো মেয়েটাকে দেখতে তখন যেন এক কালো পরীই মনে হচ্ছিল তার। সাব্বিরের মুখে লজ্জার আভা দেখা দেয়। দেখতে না দেখতে অন্য ছাত্র-ছাত্রীরা তাকে ঘিরে ধরে। একটু পরে, পিটি স্যার এসে সবাইকে সরিয়ে দেয়। মিনাকে যত দেখে ততই সাব্বির লজ্জা পায়, অবাকও লাগে তার। এতটুকু মেয়ে, সবার সামনে কি সাহসে না মাঠে হেঁটে বেড়াচ্ছে। এ সাহসটুকু কি তার আছে?

পুরস্কার বিতরণী অনু্ষ্ঠানে এসে তার অবাকের আর কিছুই বাকি থাকে না। সবাই যার যার মত পুরস্কার নিয়ে গেছে। কেউ কেউ লেখাপড়ায় ভাল করার জন্য পেয়েছে, আবার কেউ কেউ খেলাধুলায় ভাল করাতে পুরস্কার পেয়েছে। ক্রীড়ায় একাধিক পুরস্কার পেয়ে কেউ চ্যাম্পিয়ান হয়েছে, কেউ হয়েছে রানার আপ। এই মিনাটাও প্রথম পুরস্কার বাগিয়ে নিয়েছে, ‘যেমন খুশি তেমন সাজ’-তে। অথচ তার না আছে পড়াশুনায় ভাল করার স্বীকৃতি, না খেলাধূলায়। সাব্বির কিছুটা বিমর্ষ হয়ে পড়ে। নিজেকে মূল্যহীন মনে হয় তার। মাঠ থেকে সে দ্রুত বাসায় ফেরে এক না পাওয়ার বেদনা নিয়ে।

তাই এবারে সে উৎসাহ খুঁজে পেতে চায়। [মধ্য পর্বের শুরু]

Advertisements

তথ্য কণিকা শামান সাত্ত্বিক
নিঃশব্দের মাঝে গড়ে উঠা শব্দে ডুবি ধ্যাণ মৌণতায়।

2 Responses to পরশ পাহাড় [শুরুর পর্ব]

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: