লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] নায়ক:শেষ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার

লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] নায়ক:১ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার
লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] নায়ক:২ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার
লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] নায়ক:৩ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার

দল-সম্পৃক্ত নায়কেরা

সমাজের সাথে সম্পৃক্ততার সুবাদে নায়কের আরো একটা স্বাতন্ত্র্য তৈরি হয়ে উঠে। প্রথম গল্পকারদের মত, পূর্বতম মানুষেরা যারা শিকারে গিয়েছিল এবং আফ্রিকার সমতলে জড় হয়েছিল, তাদের মতই বেশির ভাগ নায়কের আছে দল-সম্পৃক্ত পরিচিতি। গল্পের শুরুতেই দেখা যায়, তারা সমাজেরই অংশ। কিন্তু তাদের যাত্রা তাদেরকে বাড়ী থেকে অনেক দূরে কোন এক অপরিচিত জায়গায় নিয়ে যায়। যখন আমরা প্রথম তাদের সাথে পরিচিত হই , তখন তারা কোন বংশ, গোত্র, গ্রাম, শহর বা পরিবারের অংশ। তাদের গল্প হলো, সেই গ্রুপ থেকে আলাদা হওয়ার গল্প (প্রথম অংক)।
তারপর একাকী রোমাঞ্চকর অভিযান চলে অপরিচিত অঙ্গন বা ঊষর জনহীন প্রান্তরে (দ্বিতীয় অংক)।
এবং পরিণামে সচরাচর দলের সাথে পূণঃএকত্রীকরণ (তৃতীয় বা শেষ অংক)।

দল-সম্পৃক্ত নায়কেরা প্রায়ই একটা পছন্দের মুখোমুখি হয়। তাহলো আদৌ কি তারা প্রথম অংকের সাদামাটা পৃথিবীতে ফিরে আসবে? না কি দ্বিতীয় অংকের বিশেষ পৃথিবীতে থেকে যাবে? পশ্চিমী কালচারে, নায়কের বিশেষ পৃথিবীতে থেকে যাওয়া খুবই ব্যতিক্রম। কিন্তু উচ্চাঙ্গের এশীয় এবং উত্তর এমেরিকার ইন্ডিয়ান গল্প-উপ্যাখানে তা খুবই স্বাভাবিক।

নিঃসঙ্গ নায়কেরা

দল-সম্পৃক্ত নায়কের বিপরীতে আছে নিঃসঙ্গ পশ্চিমী নায়ক যেমন শেন (Shane), ক্লিন্ট ইস্টউড (Clint Eastwood)-এর ম্যান ইউথ নো নেম (Man with No Name), দি সার্চারস (The Searchers)-এর জন ওয়েন (John Wayne)-এর ইথান (Ethan) অথবা দি লোন রেঞ্জার (The Lone Ranger)। এ ধরণের নায়কের গল্পগুলোতে, সমাজ থেকে নায়কের বিচ্ছেদ দিয়েই গল্প শুরু হয়। তাদের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র হলো ঊষর জনহীন প্রান্তর এবং তাদের স্বাভাবিক প্রকৃতি হলো নির্জন একাকিত্ব। তাদের ভ্রমণ হলো দলে পূনঃপ্রবেশের একটি (প্রথম অংক)।
দলের স্বাভাবিক ভূখন্ডে দলের মাঝে অভিযান (দ্বিতীয় অংক)।
তারপর আবার বিচ্ছিন্ন জনহীন প্রান্তরে ফিরে যাওয়া (তৃতীয় অংক)।
এইসব নায়কদের জন্য দ্বিতীয় অংকের বিশেষ পৃথিবী হলো তাদের গোত্র বা গ্রাম, যেখানে তারা সংক্ষিপ্তভাবে ভ্রমণ করে, এবং সবসময় অস্বস্থিবোধ করে। দি সার্চারস-এর সমাপ্তিতে জন ওয়েনের সেই অপূর্ব শট এই ধরণের নায়কের ক্ষমতার উপসংহার টানে। পরিবারের আরাম এবং আনন্দ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে একজন চিরকালের বহিরাগত হিসেবে ওয়েন কেবিনের দরজার প্রবেশপথে ফ্রেম বন্দী হয়। এই ধরণের নায়ক ওয়েস্টার্ণগুলোতে সীমাবদ্ধ থাকা প্রয়োজন। এটা নাটক এবং একশানধর্মী চলচ্চিত্রগুলোতে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে, যেখানে একজন নিঃসঙ্গ ডিটেকটিভ রোমাঞ্চকর অভিযানে প্রলুব্ধ হতে পারে, যেখানে একজন তপস্বী বা অবসরপ্রাপ্ত লোক সমাজে ফিরে আসতে পারে, অথবা যেখানে একজন আবেগায়িত বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিকে আত্মীয়তার জগতে পূণঃপ্রবেশের জন্য চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়।

দল-সম্পৃক্ত নায়কদের মতো, নিঃসঙ্গ নায়কদেরও চূড়ান্ত পছন্দ রয়েছে তাদের প্রাথমিক পর্যায়ে ফিরে যাওয়ার (এখানে নিঃসঙ্গতায়)।
অথবা দ্বিতীয় অংকের বিশেষ পৃথিবীতে থেকে যাওয়ার। কিছু নায়ক নিঃসঙ্গতা দিয়ে শুরু করে এবং দল-সম্পৃক্ত নায়ক হয়ে শেষতক দলের সাথে থেকে যায়।

অনুঘটক নায়কেরা

নিয়মের ব্যতিক্রম হয় এক নির্দিষ্ট শ্রেণীর নায়কের ক্ষেত্রে, যেখানে নায়কই সেই চরিত্র যে সাধারণতঃ পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যায়। এরা হলো অনুঘটক নায়ক, কেন্দ্রীয় চরিত্র, যারা নায়কোচিতভাবে ক্রিয়াশীল হতে পারে। কিন্তু তারা নিজেদের যথেষ্ট পরিবর্তন করে না, কারণ তাদের মূল কাজ হলো অন্যদের মধ্যে রুপান্তর নিয়ে আসা। রসায়নের সত্যিকারের অনুঘটকের মতো তারা নিজেদের পরিবর্তন না করে সিস্টেম বা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনে।

একটা ভাল উদাহরণ হলো, বেভারলি হিলস কপ (Beverly Hills Cop)-এ এডি মারফি (Eddie Murphy)- র চরিত্র এক্সেল ফোলে (Axel Foley)। তার ব্যক্তিত্ব আগে থেকেই তৈরি হয়ে আছে এবং গল্পের শুরু থেকেই স্পষ্ট ও আলাদা হয়ে আছে। তার চরিত্রের মাঝে তেমন কোন পরিণতি (character arc) নেই, কেননা তার তো কোন অভিযানে যাওয়ার নেই। সে কিছু শিখেনি বা গল্পের ব্যপ্তিতে তার তেমন পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু সে তার বেভারলি হিলস পুলিশ বন্ধু, টেগার্ট (Taggart) ও রোজউড (Rosewood)-এর মাঝে নিশ্চিত পরিবর্তন এনেছে। তার বন্ধুদের চরিত্রের পরিণতি (character arc) তুলনামূলকভাবে অনেক শক্তিশালী। গতানুগতিকতার পথে চলা পুলিশ বন্ধুদ্বয় এক্সলের প্রভাবে, বিচলিত এবং অস্বস্থিকর অবস্থা হতে কঠিন ও বিপদজনক পরিস্থিতি মোকাবেলা করা রপ্ত করে ফেলে। বাস্তবিকই যদিও এক্সেল হলো কেন্দ্রীয় চরিত্র, খলনায়কের প্রধান বিরুদ্ধ পক্ষ, এবং চলচ্চিত্রের বেশি সময় জুড়ে থাকা খুব ভাল এক চরিত্রের। তবুও তর্ক করা যায়, সে সত্যিকারের নায়ক কি না। কিন্তু গল্পের বিজ্ঞ পরামর্শদাতা (mentor), যখন জাজ রেইনহোল্ড (Judge Reinhold) অভিনীত যুবক রোজউড-ই প্রকৃত নায়ক। কারণ সেই গল্পের অগ্রগতিতে সবচেয়ে বেশি শিখে।

বলিউড মুভি থ্রী ইডিয়টস (3 idiots)-এ আমির খান অভিনীত রেঞ্চো চরিত্র অনুঘটক নায়ক হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছে। সে তার দু’বন্ধু ফারহান এবং রাজুর চরিত্রসহ তার প্রেমিকা এবং প্রেমিকার বিদ্‌ঘুটে কঠোর বাবা, ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলের পরিচালকের জীবনেও পরিবর্তন সাধন করে।

অনুঘটক নায়কেরা বিশেষভাবে উপকারী ধারাবাহিক গল্প বলার টিভি এপিসোড বা পর্বসমূহে। দি লোন রেঞ্জার (The Lone Ranger) অথবা সুপারম্যানের (Superman) মতো এই নায়কেরা কিছু অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যায়। কিন্তু প্রাথমিকভাবে অন্যদের সাহায্য করতে বা বেড়ে উঠাতে নির্দেশনা দিতে কাজ করে থাকে। অবশ্যই এটা খুবই ভাল ধারণা, কখনো কখনো এইসব চরিত্রগুলোকে বেড়ে উঠার বা পরিবর্তনের কিছু সময় দেয়া হোক, যা তাদের সতেজ ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে সাহায্য করে।

নায়কের পথ

নায়কেরা হলো আত্মার রুপান্তরের প্রতীক এবং সে সাথে প্রত্যেক মানুষ তার জীবনে যে যাত্রাপথে নামে। এই অগ্রগতির পর্যায়গুলো, জীবন এবং বৃদ্ধির প্রাকৃতিক পর্যায়গুলো নায়কের পরিভ্রমণকে গড়ে তোলে। নায়কের মৌলরুপ বা আর্কিটাইপ লেখক এবং আত্মার অনুসন্ধানীদের উদঘাটনের উর্বর ক্ষেত্র। ক্যারল এস. পিয়ারসন্স (Carol S. Pearson)-এর বই আওয়েকেনিঙ্গ দা হিরোস উইদিন (Awakening the Heroes Within) নায়কের ধারণাকে আরো উপকারী মৌলরুপে ভেঙ্গেছে। মৌলরুপগুলো হলো যেমন, নির্দোষ, এতিম, শহীদ, পথভ্রষ্ট, লালনকারী, অনুসন্ধানী, প্রেমিক, ধ্বংসকারী, সৃষ্টিকারী, শাসক, যাদুকর, ঋষি এবং বোকা। সেইসাথে প্রত্যেকটির আবেগায়িত অগ্রগতির গ্রাফ তৈরি করেছে। নায়কের অনেক রুপের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক বোঝাপড়ার এটা একটা ভাল নির্দেশিকা। কিছু মহিলা নায়কের বিশেষ এভিনিউতে ভ্রমণ মোওরীন মারডক (Maureen Murdock)-এর দি হিরোইন’স জার্নি: ইউমেন’স কোয়েস্ট ফর হোলনেস (The Heroine’s Journey: Woman’s Quest for Wholeness)-এ বিধৃত হয়েছে।

%d bloggers like this: