লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] নায়ক:২ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার

লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] নায়ক:১ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার

আগের পর্বের ধারাবাহিকতায়:

নাটকীয় বৃত্তিসমূহ

দর্শক-শ্রোতার সাথে নায়কের পরিচিতিকরণ

নায়কের নাটকীয় উদ্দেশ্য হলো শ্রোতাকে গল্পে প্রবেশের জন্য জানালার কপাট খুলে দেয়া। যারা গল্প শুনছে অথবা নাটক বা চলচ্চিত্র দেখছে, তাদেরকে গল্পের প্রথম পর্বেই আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে নায়কের সাথে পরিচিত হতে, তার সাথে এগিয়ে যেতে, এবং নায়কের চোখেই গল্পে বর্ণিত বিশ্বটাকে দেখতে। গল্পকারেরা এটা করছে তাদের নায়কদের মাঝে চমৎকার গুণের সমন্বয় ঘটিয়ে, সর্বজনীন এবং অনন্যসাধারণ চারিত্রিক গুণে নায়ককে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করে।

নায়কদের যে ধরণের বৈশিষ্ট্য আছে, সেগুলো আমাদের কাছে পরিচিত এবং স্বীকৃত। সেগুলোর আছে সর্বজনীনতা ও সকলেই তা বুঝতে পারি। যেমন, নিজের ভালবাসা পাওয়ার আকাঙ্খা, নিজেকে অন্যের বুঝতে পারা, নিজের সফলতা অর্জন করা, অস্তিত্ব রক্ষা করা, মুক্তি পাওয়া, প্রতিশোধ নেওয়া, নিজের ভুলকে শোধরানো, অথবা নিজেকে প্রকাশের প্রয়াস পাওয়া।

গল্প পাঠের সময় আমাদের ব্যক্তিগত জানাশোনাকে নায়ক অনুধাবনের অভিজ্ঞতায় আংশিকভাবে গল্পে নিয়োজিত করি। এইভাবে ক্ষণিকের জন্য হলেও আমরা গল্পের নায়কে রূপান্তরিত হই। আমরা নায়কের অন্তরাত্মায় প্রবেশ করি এবং নায়কের চোখেই বিশ্বকে দেখি। নায়কদের কিছু বিস্ময়-বিমুগ্ধ গুণের প্রয়োজন, যার কারণে আমরা তাদের মত হয়ে উঠতে চাই। আমরা ক্যাথেরিন হেপবার্ণ (Katharine Hepburn)-এর মত আত্মবিশ্বাস, ফ্রেড এসটাইয়ার (Fred Astaire)-এর মত আভিজাত্য, ক্যারি গ্রান্ট (Cary Grant)-এর মত উচ্ছল, মেরিলিন মনরো (Marilyn Monroe)-র মত যৌন-আবেদনময়তার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চাই।

নায়কদের সর্বজনীন গুণ থাকা চাই, থাকা চাই আবেগ, অভিপ্রায়, যেসব অভিজ্ঞতা প্রত্যেক মানুষই কখনো না কখনো অর্জন করে। যেমন, প্রতিশোধ, ক্রোধ, লালসা, প্রতিযোগিতা, আঞ্চলিকতা, দেশপ্রেম, আদর্শবাদিতা, হতাশা বা নৈরাশ্যবাদ। কিন্তু নায়কদের হতে হবে অনন্যসাধারণ বৈশিষ্ট্যের মানুষ, ধরাবাঁধা চরিত্রের বাইরে। অথবা নায়ক এমন কেউ নন, যিনি হবেন ত্রুটিহীন, ধারণাহীন মিথ্যা দৈবতূল্য কেউ। যে কোন অর্থপূর্ণ ফলপ্রসূ শিল্পের মতই নায়করা হবেন সর্বজনীন স্বকীয় মৌলিক। কেউই বিমূর্তগুণসম্পন্ন মানুষের গল্প পড়তে বা চলচ্চিত্র দেখতে আগ্রহী না। আমরা চাই বাস্তব মানুষের গল্প, একটি বাস্তব চরিত্র। কোনক্রমেই একজন বাস্তব মানুষের মত শুধুমাত্র একক কোন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নয়। অনেক গুণ এবং তাড়না ও প্রেরণার এক অনন্য সমন্বয়ে কোন চরিত্র। আবার এই গুণ বা তাড়নাগুলোর মধ্যে রয়েছে পরস্পর বিরোধীতা, এবং এই তীব্র পরস্পর বিরোধীতার মধ্যে রয়েছে সৌন্দর্য। একদিকে প্রেমের প্রতি বিশ্বস্ততা এবং অন্যদিকে কর্তব্য পরায়ণতা এই দু’য়ের দ্বন্দ্বে জর্জরিত চরিত্র স্বাভাবিকভাবেই দর্শক শ্রোতাদের জন্য আগ্রহ উদ্দীপক। যে চরিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে আবেগ উত্তেজনার দ্বন্দ্ব এবং বৈপরীত্য – বিশ্বাসের পাশাপাশি সন্দেহ, আশার পাশাপাশি নিরাশা – সেগুলো মনে হয় বেশ বাস্তবিক এবং মানবিক, অন্য চরিত্রগুলোর চেয়ে যাদের মাঝে দু’য়ের দ্বন্দ্ব এবং বৈপরীত্য নেই।

একজন সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিপূর্ণ নায়ক হবেন একইসাথে দৃঢ়, অনিশ্চিত, আকর্ষণীয়, ভুলোমনা, অধৈর্য, শারীরিকভাবে শক্তিধর এবং দুর্বল হৃদয়ের। গুণগুলোর মাঝে এমনই সুনির্দিষ্ট সমন্বয় থাকতে হবে, যাতে করে দর্শক-শ্রোতা এমন ধারণা পেতে পারে যে, নায়ক গতানুগতিক ধাঁচের বাইরে বাস্তবিকই এক বিশেষ চরিত্রের।

নায়কের বেড়ে উঠা

নায়কের গল্পের আরেক বৃত্তি হলো নায়কের শিক্ষা এবং তার বেড়ে উঠা। একটা পান্ডুলিপি মূল্যায়ন করে কখনো কখনো এটা বলা কঠিন, কে মূল চরিত্র অথবা কার মূল চরিত্র হওয়া উচিত। সবচেয়ে ভাল উত্তর হলো প্রায়ই, সেই চরিত্র যে শিখে এবং বৃদ্ধি পায় সবচেয়ে বেশি গল্পের গতিপথে এগিয়ে যাবার প্রক্রিয়ায়। নায়কেরা বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে তার লক্ষ্যে পৌঁছে যায়। কিন্তু এই চলার পথে তারা নতুন জ্ঞান অর্জন করে বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ হয়ে উঠে।

অনেক গল্পের হৃদস্পদনই হলো শেখা, যে শিক্ষা আমরা পাই নায়ক ও তার বিজ্ঞ বিশ্বস্ত পরামর্শদাতার (mentor) কার্যকলাপ থেকে, নায়ক এবং তার প্রেম থেকে, এমনকি নায়ক এবং খলনায়কের মধ্যকার আচার-ব্যবহার থেকে। আমরা সকলেই যে একে অন্যের শিক্ষক।

নায়কের সক্রিয়তা

আরেকটি নায়কোচিত বৃত্তি হলো নায়কের সক্রিয়তা। পান্ডুলিপিতে নায়কই সাধারণতঃ খুব সক্রিয় ব্যক্তি হয়ে থাকেন। তার ইচ্ছা এবং আকাঙ্খাই বেশিরভাগ গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যায়। পান্ডুলিপিগুলোতে প্রায়ই যে ত্রুটি দেখা যায়, তাহলো, গল্প জুড়ে নায়ককে বেশ গতিশীল দেখা যায়। কিন্তু সবচেয়ে সংকটকালে সে হয়ে উঠে নিস্ক্রিয় এবং সময়মত বাইরের কোন শক্তির আগমন তাকে উদ্ধার করে। এরকম মূহুর্তে সবকিছুর উর্ধ্বে, নায়ককে হওয়া উচিত খুবই সক্রিয়, তার নিজের ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক। গল্পে নায়ককে নেয়া উচিত সুস্পষ্ট ভূমিকা, যাতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি নিয়ে তার দায়িত্ব পালন।

নায়কের নিজেকে উৎসর্গীকরণ

সাধারণতঃ মানুষ ভাবে যে, নায়ক হলো সাহসী ও শক্তিশালী। কিন্তু নিজেকে বিসর্জনের কাছে নায়কের এই গুণ দু’টো গৌণ। সত্যিকারের নায়ক নিজেকে বিসর্জনের জন্য প্রস্তুত। মূল্যবান কিছু ত্যাগের মাধ্যমে সে নিজেকে উৎসর্গ করে। এমনকি কোন আদর্শ বা দলের স্বার্থে নিজের জীবনকে দেয় বিসর্জন। বিসর্জন অর্থ ‘পবিত্র করে তোলা’। ,আদিকালে মানুষ বিসর্জন দিতো, এমনকি দিতো মানুষের জীবনও, আত্মিক পৃথিবীর কাছে নিজেদের ঋণ স্বীকার করার প্রয়োজনে; দেব-দেবী বা প্রকৃতির মত ক্ষমতাবান শক্তিধরদের সন্তুষ্ট করতে এবং তাদের প্রতিদিনের জীবন প্রক্রিয়াকে পবিত্র করার মানসে। মৃত্যু হয়ে উঠে তখন পাপ থেকে মুক্তির এক পবিত্র ধর্মীয় কর্তব্য।

মৃত্যুর সাথে বোঝাপড়া

প্রত্যেকটা গল্পের হৃদয়মূলে আছে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া। যদি নায়ক সত্যিকারে মৃত্যুর মুখোমুখি না হয়, তবে সেখানে জীবন বাজী রেখে কোন কিছু খেলতে নামে বা প্রেম করে, অথবা রোমাঞ্চকর দুঃসাহসিক অভিযানে অংশ নেয়ার মাঝে মৃত্যু ভয় বা প্রতীকি মৃত্যু রয়েছে। এসব পরিস্থিতিতে হয়তো নায়ক সফল হয়ে বেঁচে যাবে অথবা ব্যর্থ হয়ে মারা যাবে।

নায়কেরা আমাদের দেখায় কিভাবে মৃত্যুর মোকাবেলা করতে হয়। তারা মৃত্যু থেকে বেঁচে যেতে পারে, প্রমাণ করে দেখাতে পারে যে মৃত্যু এমন কঠিন কিছু না। তারা মারাও যেতে পারে (প্রতীকি মৃত্যু হিসেবে) এবং আবার জন্ম নিতে পারে, এটা প্রমাণ করতে যে, মৃত্যুকে অতিক্রম বা জয় করা সম্ভব। তারা মরতে পারে নায়কোচিতভাবে, মৃত্যুকে অতিক্রম করে স্বেচ্ছায় নিজেদের জীবন উৎসর্গের মাধ্যমে, কোন এক মহৎ উদ্দেশ্যে, আদর্শের জন্য অথবা তার দলের জন্য।

গল্পে সত্যিকারের নায়কত্ব দেখানো হয়, যখন নায়করা নিজেদের উপযুক্ত সময়ে উৎসর্গ করে। তাদের রোমাঞ্চকর অভিযান ধ্বংস, মৃত্যু বা বিপদ বয়ে আনলেও তারা স্বেচ্ছায় জীবনের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। দেশের জন্য সৈনিকরা যেমন তাদের জীবন দান করতে রাজী থাকে, ঠিক তেমনি নায়কেরা নিজেদের বিসর্জনের সম্ভাবনাকে গ্রহণ করে।

সবচেয়ে কার্যকর নায়ক তারাই, যারা কোন না কোন কিছু উৎসর্গ করেছে। এই কারণে তাদের হয়তো বন্ধু বা ভালবাসার কাউকে হারাতে হয়েছে। তাদের হয়তো নতুন জীবনে প্রবেশের স্বার্থে সযত্নে লালিত কিছু বদ-অভ্যাস বা খামখেয়ালীপনা পরিত্যাগ করতে হয়েছে। সম্ভবতঃ তারা তাদের কিছু জয় বা অর্জন নিয়ে ফিরে আসে অথবা ভাগাভাগি করে নেয়, যা তারা বিশেষ জগৎ (নায়কের কাছে সম্পূর্ণ নতুন ও অপরিচিত, তার নিজস্ব জগৎ হতে ভিন্ন, যেখানে তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী, চ্যালেঞ্জিং পরিবেশ বা শক্তির মুখোমুখি হতে হয়) হতে অর্জন করে। নায়কেরা হয়তো তাদের শুরুর স্থানে ফিরে যায়, তাদের গোত্র বা গ্রামে, এবং দলের অন্যদের সাথে ভাগ করে নেয় তাদের নিয়ে আসা আনন্দ সুখ-সুধা, খাদ্য অথবা জ্ঞান। মার্টিন লুথার কিং অথবা মহাত্মা গান্ধীর মতো মহান সাংস্কৃতিক নায়কেরা তাদের পরোপকারী আদর্শ বাস্তবায়িত করতে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে।

Advertisements

তথ্য কণিকা শামান সাত্ত্বিক
নিঃশব্দের মাঝে গড়ে উঠা শব্দে ডুবি ধ্যাণ মৌণতায়।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: