লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] নায়ক:১ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার

[লেখকরা হলো গল্পকার। তাদের বেশিরভাগই মিথের (পুরাণ কথার) মূলনীতিগুলোকে ব্যবহার করে দক্ষ গল্প সৃষ্টি করেছে, যাতে রয়েছে নাট্যগুণ, বিনোদন এবং মনস্তাত্ত্বিক সত্য।

জোসেফ ক্যাম্পবেলের পৌরাণিক অধ্যয়নের উপর ভিত্তি করে রচিত এই পুস্তক লেখকের পরিভ্রমণ, এক অন্তর্দৃষ্টি বা জ্ঞান সরবরাহ করে, যাতে করে ফিকশান বা নন-ফিকশান লেখকরা পৌরাণিক কাঠামো ব্যবহার করে শক্তিশালী আখ্যান রচনা করতে পারে।

লেখকরা ধাপে ধাপে উন্মোচন করবে গল্পের ঘটনা পরম্পরাকে কাঠামোগত রুপ দেয়া এবং বাস্তবসম্মত চরিত্র চিত্রণের বিবিধ নির্দেশনাবলী। সৃষ্টিশীল অনুশীলন লেখককে সাহায্য করবে তাদের নিজেদের লেখার সমস্যার সমাধানে এবং মানের উত্তরণে। এই পুস্তকের ধারণাগুলো পরীক্ষিত এবং পরিশোধিত হয়েছে পেশাদার চিত্রনাট্যকার, নাট্যকার এবং উপন্যাসিক দ্বারা। প্রাচীন পুরাণের জ্ঞানের আলোকে, যে কোন লেখকের গল্প বলার ক্ষমতাকে আরো শক্তিমান করে তুলবে। – প্রকাশক

ক্রিস্টোফার ভগ্লারের এই বইটি বুঝে শুনে পড়তে হয়েছে আমাকে। একটু ধৈর্য ধরে পড়লে এর অন্তর্নিহিত ভাব ও অর্থ উপলব্ধি করা যায়। প্রথম প্রথম বুঝে উঠতে সমস্যা হলেও পরবর্তীতে এত বেশি বইটার ভেতরে আবিষ্ট হয়েছি যে, তা উপভোগ করেছি। নায়ক পর্যায়ের এই শুরুর পর্বটা অনেকের কাছে বুঝতে কঠিন মনে হতে পারে। কিন্তু পরবর্তী পর্যায় থেকে সহজ প্রতিপন্ন হবে।

এই পুস্তকের প্রথমদিকের দু’তিন অধ্যায় পাঠকের কাছে দুর্বোধ্য মনে হতে পারে বিধায়, এই পর্যায়ে সরাসরি মূল বিষয়ে প্রবেশ করা হয়েছে।]

নায়ক

আমরা ঈশ্বর হতে বিশেষ দায়িত্ব প্রাপ্ত।

– ডেন এইকরয়েড (Dan Aykroyd) এবং জন লেন্ডিস (John Landis)-এর লেখা দি ব্লু ব্রাদার্স  (The Blues Brothers)-এর চিত্রনাট্য থেকে

‘হিরো’ শব্দটা হলো গ্রীক, যার মূলের অর্থ হলো “রক্ষা করা এবং সেবা করা” (ঘটনাক্রমে লস এঞ্জেলেস পুলিশ বিভাগের মূলমন্ত্র বা আদর্শ বাণী)। , যেমন একজন মেষপালক তার মেষপাল-কে রক্ষা করতে এবং বাঁচাতে নিজেকে উৎসর্গ করে। মূলতঃ নায়কের ধারণা নিজেকে উৎসর্গের সাথে সম্পর্কিত। (মনে রাখুন যে, লেখক এই নায়ক শব্দটা ব্যবহার করেছে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যে কোন লিঙ্গের কেন্দ্রীয় বা মূখ্য চরিত্রকে বুঝাতে।)

মনস্তাত্ত্বিক বৃত্তি

মনস্তাত্ত্বিক পরিভাষায়, নায়কের আর্কিটাইপ (সুইস মনস্তত্ত্ববিদ কার্ল জে ইয়ূং-এর মতে আর্কিটাইপ মানে ব্যক্তিত্বের পুরোনো প্যাটার্নগুলো, যেগুলো সমানভাবে মানবপ্রজাতির উত্তরাধিকারের মধ্যে পড়ে) মনস্তত্ত্ববিদ ফ্রয়েডের ভাষায় অহংবোধ (ego)-কে উপস্থাপন করে – ব্যক্তিত্বের যে অংশ মা থেকে ব্যক্তিকে আলাদা করে, যা সুস্পষ্টভাবে নিজেকে বাকি মানব প্রজাতি থেকে পৃথক বিবেচনা করে। অবশেষে, একজন নায়ক হলো সেই যার অহংবোধের মোহ এবং সীমা অতিক্রম করার সামর্থ্য আছে। কিন্তু প্রথমেই নায়ক মানেই অহংবোধ: এই আমিই একমাত্র, এই ব্যক্তিগত পরিচিতি, যা মনে করে, বাকি দল থেকে সে আলাদা। নায়কের যাত্রা হলো নিজের পরিবার বা গোত্র থেকে আলাদা হবার গল্প, যা একজন শিশুর মা থেকে আলাদা হবার চেতনা বা বোধের মতই।

নায়কের আর্কিটাইপ(মৌল আদর্শ) অহংবোধের পরিচিতি এবং সস্পূর্ণতার অনুসন্ধানকে উপস্থাপন করে। পরিপূর্ণ এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ মানুষ হওয়ার প্রক্রিয়ায়, আমরা সকল নায়কেরা অন্তর্নিহিত অভিবাবক, নরপিশাচ, এবং সাহায্যকারীর মুখোমুখি হই। আমাদের নিজেদের মনের উদঘাটনের খোঁজে, আমরা পাই শিক্ষক, পথ প্রদর্শক, অপদেবতা, দেবতা, বন্ধু, ভৃত্য, বলির পাঁঠা, প্রভু, প্রলোভক, প্রতারক, মিত্র – এসবই আমাদের ব্যক্তিত্বের বিবিধ রূপ এবং আমাদের স্বপ্নের সকল চরিত্রসমূহ। নায়কের ভিলেন, ধাপ্পাবাজ প্রতারক, প্রেমিক/প্রেমিকা, বন্ধু, এবং শত্রু , আমাদের ভেতরেই খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। যে মনস্তাত্বিক দায়িত্ব ভারের মুখোমুখি আমরা হই, তাহলো এই সকল বিচ্ছিন্ন সত্ত্বা বা অংশগুলোকে একটি সম্পূর্ণ, ভারসাম্যময় একক সত্ত্বায় একীভূত করা। এই অহংবোধ বা নিজের নায়ক ভাবনা, নিজেকে নিজের অংশগুলো হতে আলাদা ভাবা, অবশ্যই নিজে একজন হয়ে উঠতে হলে এসব কিছুকেই একত্রিত করতে হবে।

[পরবর্তীতে আসছে নাটকীয় বৃত্তি। সাথে থাকুন।]

Advertisements

তথ্য কণিকা শামান সাত্ত্বিক
নিঃশব্দের মাঝে গড়ে উঠা শব্দে ডুবি ধ্যাণ মৌণতায়।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: