পরশ পাহাড় [শেষ পর্ব]

পরশ পাহাড় [শুরুর পর্ব]
পরশ পাহাড় [মধ্য পর্ব]

এ ঘটনার পর এক বছর পেরিয়ে যায়। সাব্বিরের পাহাড়ে ঘোরার নেশা কাটে না। মায়ের অজান্তে সুযোগ পেলেই সে পাহাড়ে চলে যায়। মুক্ত স্বাধীন জীবনটা তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। পাহাড়ের কোথাও কোথাও ঘুরলে কোন কোন জায়গাকে তার খুব রহস্যময় মনে হয়। কী না কী আছে এতে। শুধু তার নিজের মত আবিষ্কার করার অপেক্ষা। ঔ যে দূরে পাহাড় ঘেরা লেকটা। কী সুন্দর প্রকৃতির কোলে শরীর এলিয়ে বয়ে চলেছে। সাব্বির তার কাছে পৌঁছে যায়। এই লেকের নীরব নিঃসঙ্গ সময়ের রুপ তাকে বেশী টানে। কিন্তু সে রুপের দেখা হয়ে উঠে না যে! কোথা থেকে এত মানুষ আসে এ লেকের কাছে! পাহাড়-প্রকৃতি আর লেকের নিঃসঙ্গতা তাকে টেনে ধরে। কী জানি, এদের সাথে তার এক আত্মার সম্পর্ক সে খুঁজে পায়। এরিই মধ্যে বছরের কোন কোন সময়ে এলে সে এই পাহাড়-প্রকৃতি বা লেককে মোটামুটি নিঃসঙ্গ অবস্থায় পাবে, তা তার জানা হয়ে গেছে। এই তো কিছুদিন আগে, সে ফিরতে বেশ দেরী করে ফেলে। বুকের ভেতরটা কেমন ধুকু-পুকু করতে থাকে, যদি আজ মা কিছু বলে। মাঝে মাঝে তাকে না পেলে মা যে কেমন অস্থির হয়ে উঠে। মাগরেবের আযান হয়ে গেছে। আকাশের লালিমা এখনও মিশে যায় নি। খোলা পাহাড়ে একটু শীত শীত করছে। অথচ মাগরিবের আগেই তার ঘরে থাকার কথা। এ যাত্রায় সে বেঁচে যায়। বাসায় ফিরে মিনার মার সাথে মাকে সে খুব জরুরী কিছু নিয়ে বেশ নিমগ্ন হয়ে কথা বলতে দেখে। মিনার মা যেতে যেতে বলে, “আপা আমি এখন যাই, দেরী হয়ে গেল। পরে কথা বলবো।” বাসার পেছনের দরজা দিয়ে সাব্বির এতক্ষণে ভেতরের বারান্দায় এসে গেছে। সে মূহুর্তে তাকে দেখে মা শুধু শাসনের স্বরে বলার জন্যই বলে, “কিরে কই ছিলি?” সাব্বিরও বুঝে এ মূহুর্তে যেমন তেমন একটা উত্তর দিয়ে দিলেই হবে, “এইতো এইখানে।” আজ একটু ভয়ও পেয়েছিল সে। মূলতঃ সন্ধ্যা নামাতে পথ হারিয়ে ফেলার ভয়। তবুও মাথাটাকে ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করেছে। পরিচিত পথ থেকে যেন বেপথে চলে না যায়। বাসার ভেতরে আলো জ্বালানো আছে। বারান্দায় এখনো আলো জ্বালানো হয় নি। মিনার মার পেছনে সে মিনাকে দেখে। দিন দিনে তাকে কেমন যেন পটু পটু লাগে। আর মিনাকে সামনে দেখলে, সাব্বিরের মাঝে কোথা থেকে হাবাগোবা এক ভাব এসে জড় হয়। ইস্‌, সে যদি বাসায় থাকতো আজ। মিনা নিশ্চ্য়ই তার সাথে দু’চারটে কথা বলতো। না, মিনাকে নিয়ে সে এত সহজে খেলতে বসতে পারবে না। “যেমন খুশী তেমন সাজো”-তে বউয়ের সাজে দেখার পর থেকে, যতবারই মিনাকে সে দেখেছে, ততবারই তার মাঝে আপনা আপনি এক লাজ-নম্র ভাব প্রকট হয়ে উঠেছে। মিনার সামনে আসতেই তার যত সংশয়। তাই দূর থেকে দেখে চলা। আজ সে পরেছে একটা হাতাকাটা কমলা রঙের ফ্রক, যাতে আছে ফুলের কিছু চমৎকার ছাপ। কেমন সুন্দর মানিয়ে গেছে তাকে। গতবারের আগের বার “যেমন খুশী তেমন সাজো”-র তার সেই ইটা রঙের শাড়ীর সাথে আজকের এই সাজের কোথা যেন একটা মিল। এই এক বছরে মিনাকে তার চেয়ে অনেক বেশী চটপটে, সাহসী ও সুঠাম মনে হয় সাব্বিরের। মিনাকে দেখলেই কেন জানি সে নিজেকে তার সাথে তুলনায় বসে যায়। আর বারে বারে মিনাকে সে উঁচুতে স্থান দেয়। সাব্বিরকে দেখে যেতে যেতে মিনা এক নজর তাকায়। সে সাথে তার স্বভাবসুলভ একটা মিষ্টি হাসি দেয়। সে মূহুর্তে সাব্বিরের মিনাকে তার চাইতে কমসে কম দু’তিন বছরের বেশি বড় মনে হয়। এ বছরে মিনা কি আবারো বউ সাজবে? সাব্বিরের পড়াশুনা আগের চেয়ে কিছুটা ভাল হয়েছে। এবার ৬ষ্ঠ স্হান অর্জন করেছে। শুনেছে এবারে মিনা না কি দ্বিতীয় হয়েছে। স্কুলের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণীতে মিনার হাতে পুরস্কার থাকবে, তার হাতে নয়। কিছুটা মুষড়ে পড়ে সাব্বির।

আজও সে সেই স্বপ্নটা দেখে। সে পাহাড়ে উঠার খুব চেষ্টা করছে। পা যে তার একদম চলতে চায় না। উফ্‌ কী ভীষণ কষ্ট! আগে থেকেই পাহাড়ের মাঝামাঝি উঠাবস্থায় সে, অনেক চেষ্টা করেও আরেক পা বাড়াতে পারছে না। কষ্টকরভাবে একই জায়গায় সে থেকে যাচ্ছে! এমন সময় মায়ের গলায় তাকে ডাকার ডাক শোনে। ভীষণ ভয় পেয়ে যায় সাব্বির। আর তখনই সে দেরী না করে পাহাড় থেকে উল্টে পড়ে গড়াতে থাকে নীচে। কোন কিছু ঘটার আগে এবারেও সে আঁতকে ঘুম থেকে উঠে পড়ে এবং বরাবরের মতই ভীষণ আশ্চর্য হয়ে তাকে আবিষ্কার করে বিছানা থেকে উঠে বসা অবস্হায়। বিগত এক বছরে বেশ কয়েকবার সে এই স্বপ্নটা দেখেছে। আবার একসময় ঘুম থেকে উঠার পর ভুলেও গেছে, যদিও কখনো কখনো স্বপ্নটা তার মনে এসেছে।

গত দু’দিন সে ক্লাসে যায়নি। বছরের শুরুতে বার্ষিক পুরস্কার বিতরণীর উপলক্ষে তিনদিন স্কুলে কোন ক্লাস হয় না। সব স্যারই পিটি স্যারকে হেল্প করে খেলাধূলা ও দৌড়-ঝাঁপের ইভেন্টগুলো ঠিকমত শেষ করতে। স্পোর্টসের কথা শুনে মাও সাব্বিরের স্কুলে না যাওয়াতে তেমন কিছু বলে নি। কিন্তু ফাইনাল দিন সকালে সাব্বির স্কুলে যায়। প্রথমে ক্লাসে আসে যদি সহপাঠি কারো দেখা মেলে। কাউকে না পেয়ে সে স্কুলের বড় মাঠে চলে যায়। এখানে ওখানে বিচ্ছিন্নভাবে দৌড় ঝাঁপের প্রতিযোগিতা চলছে। একটা উৎসব উৎসব ভাব। যে যার মত করে উপভোগ করছে। প্যান্ডেলের একপাশে একা একা বসে থেকে সাব্বির একসময়ে শব্দযন্ত্রে বিস্কুট দৌড়ে অংশগ্রহণের ঘোষনা শুনে। তাদের বয়সের ছেলেদের অংশগ্রহণের জন্য আহবান জানানো হচ্ছে। কিছুটা কৌতূহলী হয়ে উঠে সাব্বির। সে মাঠের দিকে পা বাড়ায়। কিছুটা সংকোচ, কিছুটা দ্বিধা তাকে জড়িয়ে রাখে। একসময় মনে হয়, দেখিই না কী হয়! সে ঝটপট দৌড়ের জন্য দাঁড়িয়ে যায়। হুইসেলের সাথে সাথে সে দ্রুত দৌড়াতে থাকে। বিস্কুট ঝুলানো দড়ির কাছে ছুটে যায়। ও মা, লাফাতে না লাফাতেই একটা বিস্কুট তার মুখে এসে পড়ে। আর দেরী না করে সাব্বির বিস্কুট মুখেই দৌড়ে গন্তব্যে পৌঁছে যায়। যুগপৎ দৌড় ও উত্তেজনায় হাঁপাতে থাকে। অনেক কষ্টে স্যারদের তার নাম বলে এবং সে সাথে কোন শ্রেণীর ছাত্র তাও জানাতে হয়। তার পৌঁছার কিছু পরেই বিস্কুট মুখে আরেকজন ছেলেকে তাদের দিকে ছুটে আসতে দেখে।

পুরস্কার হাতে নিয়ে সাব্বির দ্রুত বাসার দিকে পাড়ি দেয়। তখন সন্ধ্যা হয় হয়। মাগরেবের আযান এখনো পড়েনি। দরজা খুলে বাসায় ঢুকে সে ভেতরের বারান্দায় মাকে পায়। জোর স্বরে মাকে শুনিয়ে বলে, “মা, আমি বিস্কুট দৌড়ে প্রথম হয়ে এই কলমটা পুরস্কার পেয়েছি।” মা চুপ করে থেকে কিছুক্ষণ সাব্বিরের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর খুশীতে মার মুখে হাসি ফুটে উঠে।

প্রথম প্রকাশ: প্রথম আলো ব্লগ। ফেব্রুয়ারী ২, ২০১০

পরশ পাহাড় [মধ্য পর্ব]

পরশ পাহাড় [শুরুর পর্ব]

তাই এবারে সে উৎসাহ খুঁজে পেতে চায়। তার বয়েসের বিভিন্ন ইভেন্টে অংশ নিতে মাঠে ঘুরে ফিরে। সুযোগ বুঝে মোরগের লড়াই-এর বৃত্তের মাঝে ঢুকে পড়ে। বাছাই পর্বে ফাইটে টিকে থাকা যে আটজনকে বেছে নেয়া হয়, তাতে তার নাম আসে। প্রথম চারজনের মাঝেই সে ছিল। একটা আকাঙ্খা গড়ে উঠে সাব্বিরের মাঝে। খেলায় যে চতুরতার আশ্রয় সে নিয়েছে, তা অনুসরণ করলে প্রথম তিনজনে তার নাম আসাটা অসম্ভব কিছু না। সে সেদিনের মত বাসায় পৌঁছে যায়। মনে মনে ভালভাবে সে ফন্দি আঁটে, কিভাবে অন্যদের আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচাবে। সে ডিফেন্সিভ খেলতে ভালবাসে। অন্যরা কাঁধ দিয়ে আক্রমণে এলেই সে কুঁজো হয়ে নুইয়ে পরে। তাই আক্রমণগুলো তার গায়ে আর লাগে না। অন্যরা নিজেদের মধ্যে ফাইট করুক, ঝরে পড়ুক। কিন্তু সে নিজে তাতে শরীক হবে না। যখন সংখ্যা কমে তিনে আসবে, তখনই সে সুযোগ খুঁজবে কিভাবে দু’জন মিলে একজনকে আক্রমণ করা যায়। পরিকল্পনা পাকাপাকি করে রাতে সে ঘুমাতে যায়। রাত তার আর কাটে না, যেন স্বপ্নেও সে দেখে কিভাবে তাকে যুদ্ধে টিকে থাকতে হবে।

সকালে ঘুম থেকে সে ঠিকমত উঠতে পারে না। চোখে ঘুমের ঘোর আর কাটে না। বিছানা থেকে উঠতেও ইচ্ছে করে না। ঘুম থেকে উঠতে না দেখে, মা এসে তার কপালে হাত রাখে। সে অবস্থায় মা চিৎকার জুড়ে দেয়, “কাল সারাদিন তুমি কোথায় ছিলে, হ্যাঁ? তোমার গায়ে এত জ্বর কেন? স্কুলে কি করেছিলে, কোথায় ছিলে?” সাব্বির ভড়কে উঠে। মায়ের এ চিৎকারে সে কখনো কিছুই লুকাতে পারে না। গড়গড় সে বলে ফেলে, “মা, কাল স্কুলে আমাদের স্পোর্টস ছিল। আমি কক ফাইটে নির্বাচিত হয়েছি। আজকে আমাদের ফাইনাল। আমাকে যেতে হবে।” তেতেমেতে উঠে মা, “কি বললে? কাল তুমি মাঠে মাঠে দৌড়িয়েছো। রোদে ঘুরে এইজন্য তো জ্বর বাঁধিয়েছো। আমাকে তুমি স্পোর্টসের কথা জানিয়েছো? আবার আজকেও জ্বর নিয়ে মাঠে যাবার কথা বলছো? তোমার কোথাও যাওয়া হবে না। তুমি বাসায় থাকবে।” সাব্বির পড়ি্-মড়ি করে কাঁদো কাঁদো গলায় মাকে বলে, “মা আমাকে যেতে হবে। আজ ফাইনাল।” “আবারো তুমি আমার মুখের উপর কথা বলো। কম সাহস তো তোমার না। দাঁড়াও তোমার বাবা বাসায় আসুক আজকে।” সাব্বির তার নিয়তি আঁচ করে ফেলে। কিন্তু নিয়তিকে মেনে চলা আজ তার পক্ষে সম্ভব না। সে হাঁস-ফাঁস করে। টেবিল ঘড়ির কাটার দিকে তার চোখ পড়ে। বেলা ১১:৩০ মিনিটে কক ফাইটের ফাইনাল। এখন ঘন্টা আড়াইয়ের মতো বাকি। সে কিছুক্ষণ বিছানায় শুয়ে থাকে। কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করে বিছানায়। মাকে যে কিভাবে বুঝ দেয়া যায়! এই মা যে কখনও কখনও তার ছুটে চলার গতিকে বন্ধ করে দেয়, তা সে কিভাবে কাকে বোঝায়? সাত-পাঁচ ভাবে সে। একদিন তো মনে মনে সে খুব কেঁদে ফেলেছিলো। মনে হয়েছিল, মা তাকে একদমই ভালবাসে না। তাকে চায় কি না, তাও সে জানে না। মরে গেলে কী হয়! এমন সব সাত-পাঁচ চিন্তা। আধা ঘন্টা পর গৃহকর্মী শিউলি এসে তার বিছানার পাশে এক বাটিতে করে পাতলা সুজি রাঁধা দিয়ে যায়। সে সাথে দু’টো পাতলা করে বেলে নেয়া রুটি। সাব্বির তৃপ্তির সাথেই সুজি দিয়ে রুটি খায়। খাওয়া শেষ হলে আবার ঘড়ির দিকে তাকায়। একটু একটু করে সময় এগিয়ে যাচ্ছে। তার ভেতরেও ধীরে ধীরে অস্থিরতা আঁকুপাঁকু করছে। নিজের মধ্যে কিছুটা সুস্থ সবল উচ্ছ্বল ভাব নিয়ে আসার চেষ্টা করে সে। মা তার রুমে এলেই খাট থেকে নেমে এসে, সাব্বির পাশে তার পড়ার টেবিলের দিকে আগাতে যায়। তার সামনে এসে মা দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেন, “এই সিরাপটুকু একটু খেয়ে নাও।” শিশি থেকে সিরাপ চামুচে ঢেলে সাব্বিরের মুখে দিয়ে দেন দুই দুইবার। সাব্বির ঔষুধ খেয়ে নিয়ে মাকে বলে, মা আমি এখন বেশ সুস্থ বোধ করছি। মা শুধু ‘ঠিক আছে’ বলে রুম থেকে বেরিয়ে যান। কোনরকম ভাবলেশ নেই মার মুখে। কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়ে সাব্বির। বুঝে উঠতে পারে না, মাকে কোন রকম বুঝিয়ে স্কুলে যেতে পারে কি না। একটু পরে ঘুম ঘুম ভাব তাকে জড়িয়ে ফেলে। ঘড়ির কাটা দশটার কাছাকাছি। বিছানায় আরেকটু শুয়ে নিতে ইচ্ছা হয় তার।

পেছনের পাহাড়ের উত্তরদিকে বসবাস করেন সালেহীন সাহেব। তার যথেষ্ট ভদ্র অথচ দুরন্ত ছেলে সামির পাহাড়ে উঠতে যেয়ে একদিন পাহাড় থেকে নীচে গড়িয়ে পড়ে। পাহাড়ের তলদেশের গা ঘেঁষে পাহাড়ের সমান্তরালে পানির ইয়া বড় মোটাসোটা পাইপ সুবিস্তৃত হয়ে বসানো রয়েছে। কোথাও কোথাও পাইপের আশে-পাশের পাহাড়ের মাটি সরে গিয়ে পাইপটা খুব উন্মুক্ত হয়ে গেছে। সামির পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়লেও অলৌকিকভাবে পাইপের সাথে সংঘর্ষ থেকে বেঁচে যায়। পাহাড়ের উপর থেকে গড়াতে গড়াতে সে একেবারে নীচে এসে সাব্বিরদের বাসার ঠিক সীমানার বাইরে পড়েছিল। সীমানার ভেতর থাকা সাব্বির তখন সামিরের শরীর থেকে এক ক্যোঁত করা শব্দ শুনতে পায়। পুরো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে সে ভীষণ শংকিত হয়েছিল। সামিরের এই অল্পতেই বেঁচে যাওয়াতে তার আশ্চর্য হয় খুব। কোন ব্যথাই লাগেনি ছেলেটার শরীরে। এমূহুর্তে সেও পাহাড়ে উঠার খুব চেষ্টা করছে। পা যে তার একদম চলতে চায় না। উফ্‌ কী ভীষণ কষ্ট! আগে থেকেই পাহাড়ের মাঝামাঝি থাকা সে, অনেক চেষ্টা করেও আরেক পা বাড়াতে পারছে না। কষ্টকরভাবে একই জায়গায় যে সে থাকছে! এমন সময় সে শোনে মায়ের গলায় তাকে ডাক। ভয় পেয়ে যায় ভীষণ সাব্বির। আর ঠিক তখনই সে দ্রুত পাহাড় থেকে উল্টে পড়ে গড়াতে থাকে নীচে। কোন কিছু ঘটার আগে সে আঁতকে ঘুম থেকে উঠে পড়ে এবং ভীষণ আশ্চর্য হয়ে তাকে আবিষ্কার করে বিছানা থেকে উঠে বসা অবস্হায়। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার মতই অবস্থা। দেরী না করে সে তড়িৎ গতিতে ঘড়ির দিকে তাকায়। ও মা, এ তো বেলা তিনটা বাজে। সাব্বির বুঝে উঠতে পারে না, কেন সে এত ঘুমালো। দ্রুত সে ঘর থেকে বেড়িয়ে বাসার সামনের গেইটের দিকে যায়। সামনের রাস্তা দিয়ে দু’চারজন করে স্কুল ছাত্ররা তাদের বাসায় ফিরছে। অস্থির আর ভাঙ্গা মন নিয়ে কোন কিছু না ভেবে বোকার মত দু’তিনজনকে জিজ্ঞেস করে ফেলে, “আচ্ছা, কক ফাইট কি হয়ে গেছে?” কোন সদুত্তর পায় না কারো কাছ থেকে। বরং কোন কিছু বুঝতে না পেরে দু’একজন অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকায়। কেউ ঈষৎ অবজ্ঞা দেখিয়ে চলে যায়। সাব্বিরের আর কাউকে প্রশ্ন করার ইচ্ছে বা সাহস কোনটাই হয় না। তাকে কষ্ট এক ভীষণ গিলে ফেলে। একটা পাওয়া তার হাতছাড়া হয়ে গেছে। মনের কষ্ট মনে গুজে তাকে বাসায় ফেরত আসতে হয়।

এ ঘটনার পর এক বছর পেরিয়ে যায়। [শেষ পর্বের শুরু]

পরশ পাহাড় [শুরুর পর্ব]

পাহাড়ের পাদদেশে থেকে থেকে কেমন যেন উন্মনা হয়ে উঠে সাব্বির। দৃষ্টি তার দূরে ফেলতে পারে না। বাড়ি পালানো ছেলের মতো লুকিয়ে লুকিয়ে পাহাড়ে চড়েছে সে। তাও সুযোগ বুঝে, যখন মা বাসায় থাকেন না বা দুপুরে খাওয়া শেষে গল্পের বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে যান। বাবা তো অফিসে, কখনও কখনও অফিসের কাজে ট্যূরে। কষ্ট করে পাহাড়ে একবার উঠে পড়লে কি চমৎকারই না লাগে। মজাও কী কম। পৃথিবীর নির্মল বায়ু সেবন, সে সাথে চারপাশটাকেও খুব কাছে মনে হতে থাকে। খুব ছোট হয়ে আসে কি না। উঁচুতে থেকে নীচে দেখা যে কী আনন্দের!

এই পাহাড়ের তলেদেশে থেকে থেকে দৃষ্টি সবসময় পাহাড়ের উঁচুতে উঠে যেত তার। সেখানে একটা বাড়ির কিছুটা দেখা যায়। তারপর আর কিছু দেখা যায় না। মনে মনে উপরে উঠে ওপার-এপার সব পার-কে দেখার এক তীব্র আকাঙ্খা জেগে উঠতো। মার কাছে থেকে প্রতিনিয়ত একটা নিষেধ শুনতে থাকায় সাব্বিরের সাহস হতো না মাকে রাগিয়ে পাহাড়ে যেতে। তাই সুযোগের অপেক্ষায় থাকা। বাড়ির পেছনে পাহাড়। বাড়ির সামনে সমতল রাস্তা মসৃণ করে ইট বিছানো। এই পথ দিয়ে স্কুলে যায় সে। স্কুলের ছেলেমেয়েরাও এই রাস্তাটাকে অনুসরণ করে। স্কুলে যায়, বাড়ি ফিরে। নীচে থেকে পেছনের পাহাড় দেখা, নতুবা বাড়ির সামনের রাস্তায় মানুষ চলাচলের দিকে সাব্বিরের অনিমেষ তাকিয়ে থাকা। যেন পথচলা মানুষদের মনের জগতের খবর নেয়া। কিন্তু সে তো এতটুকুন। চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র। কতটুকুই বা বুঝে আর?

স্কুলের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান শুরু হচ্ছে। তিনদিন ব্যাপী ক্রীড়া প্রতিযোগিতা তো মূল আকর্ষণ। সে সাথে প্রতিবছর যারা পড়াশুনায় বিভিন্ন শ্রেণীতে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হচ্ছে, তাদেরকেও এই পুরস্কার বিতরনী অনুষ্ঠানে পুরস্কৃত করা হচ্ছে। গতবছর ক্রীড়া প্রতিযোগীতার দিনগুলোতে সাব্বির মাঠের দিকে পা-ই বাড়ায়নি। মা যদি কিছু বলে। মা কোথাও যেতে দেয় না। পাহাড়ে যেতে অথবা বাসা থেকে দূরে। স্কুল থেকে একটু দেরী হলেই, বাসাখানা মাথায় তুলে। কত যে কৈফিয়ত দিতে হয়। একদিন স্কুল ছুটি হওয়ার অনেক আগে,তাদের বিভিন্ন ক্লাসের মধ্যে ফুটবল প্রতিযোগীতা ছিল বলে মাঠে নেমে পড়েছিল। খেলায় সবাই তো গোল দেয়ার জন্য উপরে উঠে খেলতো। সাব্বিরের কপালে পড়তো গোলকিপার হবার দুর্ভাগ্য বা সৌভাগ্য। তাই সে মেনে নিতো। গোল পোস্টে বল ঠেকানোতে সুনামও কুড়িয়েছিল। অতটুকুতেই আন্তঃস্কুল জুনিয়র ফুটবল প্রতিযোগিতায় সাব্বিরের নাম এলো গোলকিপার হিসেবে। যখন মায়ের কানে এলো, ‘আপনার ছেলে তো ভাল গোলকিপার হয়ে উঠেছ’, তখনই হৈ-হল্লা পড়ে গেল। “কি তুমি পড়াশুনা বাদ দিয়ে ফুটবল নিয়ে মেতেছো? এত বড় স্পর্ধা! কেউ কি তোমাকে কিছু বলার নেই?” সাব্বিরের সকল আগ্রহ উল্লাস ওখানেই অস্তমিত।

তাই গতবছর যখন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা শুরু হলো, স্কুল ছুটি হলেও, মার শাসনের কথা মনে করে সাব্বির আর ওদিকে ভ্রুক্ষেপ করেনি। সে সোজা বাসায় চলে আসে। নতুন বছরে নতুন বইয়ের পাতা ওল্টায় মলাট বাঁধে। মনে মনে পণ করে, এবার তাকে প্রথম, দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় হতে হবে। তার রোল নাম্বার সবসময় ১১-র পরে। গতবছর ছিল ১৩।
আটেও চলে আসতে পারতো সে যদি আর ১১ নাম্বার বেশি পেতো। অংকটাই তাকে ডুবিয়েছে। অথচ এ অংকটাই সে ভাল পারতো ক্লাসে। এবারে ৯ম হয়েছে সে। স্বান্তনা শুধু অতটুকুই। কিন্তু এবারে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা বাদ দেয়ার চিন্তা করতে পারছে না। গতবছর ক্রীড়া প্রতিযোগিতার শেষ দিনে পুরষ্কার বিতরনীর ঠিক আগে আগে সে মাঠে গিয়েছিল। তাদের ক্লাসে ৫ম স্হান অধিকারী শোয়েবের ইচ্ছায়। “চল্‌ দেখি আসি, অন্য সব ক্লাসের কারা কারা প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়েছে।” মূলতঃ পড়াশুনার কথাই সে বুঝিয়েছে। শোয়েবকে অনুসরণ করে ঠিকই সে মাঠে যায় পুরস্কার বিতরনীর কিছু আগে থেকে। মাঠে তখন ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ চলছে। চারিদিকে কেমন সাজ সাজ রব। ভাল লেগে যায় সাব্বিরের। সে তন্ময় হয়ে সবার সাজগুলো দেখে। কেউ সাংবাদিক, কেউ ফটোগ্রাফার, কেউ চাষী, কেউ ফেরিওয়ালা এমন কত কি? একটু পরেই তার চোখ ছানাবড়া হয়ে উঠে। আরে এতো মিনা। তাদের পাশের বাসার। প্রায়ই তো তাকে দেখে বাসার উঠোনে। তার মার সাথে আমাদের বাসায় আসে। এতটুকু মেয়ে এত সুন্দর করে বউ সেজেছে। সে তো শুধু তার এক ক্লাস নীচেই। কালো মেয়েটাকে দেখতে তখন যেন এক কালো পরীই মনে হচ্ছিল তার। সাব্বিরের মুখে লজ্জার আভা দেখা দেয়। দেখতে না দেখতে অন্য ছাত্র-ছাত্রীরা তাকে ঘিরে ধরে। একটু পরে, পিটি স্যার এসে সবাইকে সরিয়ে দেয়। মিনাকে যত দেখে ততই সাব্বির লজ্জা পায়, অবাকও লাগে তার। এতটুকু মেয়ে, সবার সামনে কি সাহসে না মাঠে হেঁটে বেড়াচ্ছে। এ সাহসটুকু কি তার আছে?

পুরস্কার বিতরণী অনু্ষ্ঠানে এসে তার অবাকের আর কিছুই বাকি থাকে না। সবাই যার যার মত পুরস্কার নিয়ে গেছে। কেউ কেউ লেখাপড়ায় ভাল করার জন্য পেয়েছে, আবার কেউ কেউ খেলাধুলায় ভাল করাতে পুরস্কার পেয়েছে। ক্রীড়ায় একাধিক পুরস্কার পেয়ে কেউ চ্যাম্পিয়ান হয়েছে, কেউ হয়েছে রানার আপ। এই মিনাটাও প্রথম পুরস্কার বাগিয়ে নিয়েছে, ‘যেমন খুশি তেমন সাজ’-তে। অথচ তার না আছে পড়াশুনায় ভাল করার স্বীকৃতি, না খেলাধূলায়। সাব্বির কিছুটা বিমর্ষ হয়ে পড়ে। নিজেকে মূল্যহীন মনে হয় তার। মাঠ থেকে সে দ্রুত বাসায় ফেরে এক না পাওয়ার বেদনা নিয়ে।

তাই এবারে সে উৎসাহ খুঁজে পেতে চায়। [মধ্য পর্বের শুরু]

সরোজ পাখি হতে চেয়েছিল

পাখিটাকে সরোজ ছেড়ে দিয়েছে ঠিকই। কিন্তু তার কেমন যেন মায়া পড়ে গেল ময়নাটার উপর। স্কুল থেকে বাসায় ফেরার একটা তাড়া ছিল প্রতিদিন, যতদিন পাখিটা ছিল। একটা সখ্যতাও তাদের মাঝে গড়ে উঠছিল। মার উপর এখন আবার কিছুটা রাগ হচ্ছে। মা যদি অমনভাবে না বলতো, তাহলে সরোজ পাখিটাকে এত তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিতো না। এটাও ঠিকই তার ইচ্ছে হচ্ছিল পাখিটাকে খাঁচা থেকে ছেড়ে দেয়। কিন্তু পাখিটাকে হাতে তুললে সে ইচ্ছে আর থাকে না। কেমন তুলতুলে শরীর। এখন সে কী করে! স্কুল থেকে বাসায় ফিরলে কেমন সব ফাঁকা ফাঁকা লাগে। যখন ময়না ছিল না, তখন তো তার এত কষ্ট লাগেনি, এত খারাপ লাগা দূরে থাক, কোন কিছু এত ফাঁকা ফাঁকা লাগেনি।

বাবাটার উপরেও রাগ হচ্ছে তার। পাখিটা কেন তাকে কিনে দিতে গেল! সেদিনই সে প্রথম পাখি কিনতে গেল বাবার সাথে। দরজা খুলে দোকানে প্রথম ঢোকার সাথে সাথে পাখিগুলো কেমন চিৎকার করে হৈ চৈ করলো। দু’একটা যে খুব নিশ্চুপ ঝিম মেরে ছিল না, তা নয়। ওগুলোও খাঁচার মধ্যে একটু এদিক ওদিক করলো। সরোজের মনে হলো, ওগুলো বুড়ো পাখি।

আজ ছুটির দিন ছিল। কালও তার ছুটি। কেমন করে যে দিনটা কেটে গেল। টিভিতে এনিমেশানের গতিচিত্রগুলো দেখলো। একটু ভিডিও গেম খেলার চেষ্টা করলো। কিন্তু কোন কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। পাখিটাকে সে ভুলতেই পারছে না। কেমন জমকালো গায়ের রঙ। কালো আর সবুজে মিলে মিশে। হলুদাভ কমলা ঠোঁট। ঘাড়ের দিকে রয়েছে হলুদ রেখা। পা দু’টোও ছিল হলুদ। এত পাজী পাখিটা, কত চেষ্টা করলো সরোজ। তবু একবারও সে তার নাম ধরে ডাকলো না। ইস্‌ শুনতে যে কত ভাল লাগতো সরোজের! মনটা খারাপ হয়ে যায় তার। এইতো গতবছর, স্কুলের ছোট্ট এক ছুটিতে সে মায়ের সাথে তার নানাবাড়ি গিয়েছিল। ওখানের তেঁতুল গাছটার উঁচুতে বসা কোকিলের ডাক সে শুনেছিল। দুপুর বেলা খাওয়ার শেষে সব চুপচাপ হয়ে গেলে, কোকিলের সে মিষ্টি সুর সরোজকে জাগিয়ে রাখতো। সেও তখন দুষ্ট হয়ে উঠতো। কোকিলের সুরের সাথে তাল মিলিয়ে বলতো, ‘কুউ, কুউ, কুউ…………।
একসময় কোকিলটাও তার স্বর সপ্তমে চাপিয়ে দিত। সরোজের মনে হত তার সাথে বিরক্ত হয়ে রেগে গেছে কোকিলটা। তাই ধৈর্যহারা হয়ে চেঁচিয়ে উঠে খুব দ্রুত ডাকছে, কুউকুউকুউকুউ…………।
সরোজ মজা পেয়ে যেত। সেও ক্ষ্যাপা হয়ে উঠে। কোকিলের ডাকের হুবহু নকল করে চেঁচাতেই থাকে, কুউকুউকুউকুউ………………।
নানীর বাসার গৃহকর্মীটি তার এই চেঁচানো দেখে হেসে ফেললে সরোজ লজ্জা পেয়ে যায়।

এরকম কত চিন্তা যে তার মাথায় এখন ভর করছে! আচ্ছা, ময়নাটা তো এখন বাইরে উড়ে গেছে। ওটা আশে-পাশের কোন এক গাছের মধ্যে বসে নেই? কতই গাছই তো আছে এদিক সেদিক। আম, কৃষ্ণচূড়া, সজনে, জারুল ওদিকে আবার বড় এক বট গাছের মত আছে। এর কোনটাতে বসে ময়নাটা কি একবার তার নাম ধরে চেঁচিয়ে উঠতে পারে না? সে তো খাঁচাবন্দী থেকে মুক্ত করে তাকে তার মত উড়তে দিয়েছে। এ কারণে সে কি তাকে বন্ধু ভেবে দেখা দিতে পারে না?

এইভাবে সাত-পাঁচ ভেবে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়। হঠাৎ সরোজ শুনতে পায় বাইরের গাছে কোন এক পাখির সরোজ সরোজ ডাক। ধড়মড়িয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে সে। বাইরে অনেক রাত মনে হচ্ছে তার। সে তার ঘরের জানালা খুলে দেয়। দূরের আকাশের রঙ ঘোলাটে সাদা বর্ণের। বুঝে উঠে না সে চাঁদটটাও এত ফ্যাকাসে কেন? এমন সময় কোন পাখি নেই কেন? তাহলে এ ডাকটা কোথা থেকে এসেছে? পাখির ডানা ঝাপটানোর কোন আওয়াজও যদি সে শুনতে পেত!

এমন সময় কোথা থেকে একটা ছোট হালকা-পাতলা পাখির পালক হাওয়ায় ভেসে ভেসে সরোজের খোলা জানলার রড গলে ঘরে এসে ঢুকে পড়ে। সরোজ স্তব্ধ হয়ে যায়। বুঝে উঠে না কী করবে। পালকটা তখনও ভাসতে থেকে ঠিক তার বিছানার উপর উঁচুতে এসে পরে। একসময় সে বিছানায় বসলে, পালকটা তার কপাল বরাবর নেমে এসে ভাসতে থাকে। মনে হচ্ছে, ডানে বাঁয়ে দুলতে দুলতে তাকে যেন কিছু একটা বলতে চাচ্ছে। সরোজ হাত দিয়ে পালকটা ধরার চেষ্টা করলে, সেটা দূরে সরে যায়। আবার নেমে আসে তার কপাল বরাবর এবং আগের মত দুলতে থাকে ডানে বাঁয়ে। সে এবারও হাত বাড়িয়ে দেয়। পালকটা উপরে উঠে যায়। হাঁটুর উপর ভর করে সে পালকটাকে ধরতে যায়। পালকটা একটু থামে আবার যতবার সরোজ হাত বাড়ায়, ততবারই একটু একটু করে উপরে উঠতে থাকে। পালকটা যেন তার সাথে মধুর খেলায় মেতে উঠে বলছে তাকে, “Catch me if you can”। এবার সরোজ বিছানার উপর দাঁড়িয়ে পালককে স্পর্শ করতে যায়। কিন্তু পালকটা ততই উপরের দিকে উঠতেই থাকে। সরোজ বিছানা থেকে উপর দিকে লাফাতে যেয়েও লাফাতে পারে না। ধপাস করে সে বিছানায় পড়ে কাৎ হয়ে শুয়ে থাকে।

খুব ভোরে পাখির কিচির মিচির আওয়াজে সে চোখ খুলে। শুয়ে শুয়ে এদিকে ওদিক করে ঘরের উপরের ছাদের দিকে আশ-পাশ তাকায়। মনে পড়ে তার পাখির পালকের কথা। অবাক হয়ে ভাবে, পাখির পালকটা গেল কই! এত চেষ্টা করলো, একবারও যদি ওটা তাকে ধরা দিতো। ময়না পাখিটার ডাকও তার মনে পড়ে। কোথায় যে, লুকিয়েছে পাখিটা। ওই পালকটা তবে কি ময়নার ছিল? এখন সে ঠিক মনে করতে পারে না, পালকটার রঙ। ছাইরঙা, কি চকলেট রঙা? নাকি কালো? উজ্জ্বল কিছু ছিল কি? ঠিক ঠাহর হয় না। মাথাটার যে কী হলো এখন!

খোলা জানলা দিয়ে বাহিরের আলো ঘরে এসে পড়েছে। সকালের রোদ সরোজের বিছানার একপাশে এসে পড়ে। আরেকটু ঘুমিয়ে নিতে ইচ্ছে করে তার। এমন সময় দরজার বাহিরে টোকা পড়ে। গৃহকর্মী মেয়েটা ও প্রান্ত থেকে উঁচু গলায় বলে, “কি ভাইয়া, নাশতা করবেন না? আম্মা ডাকতেছে।” অনিচ্ছাসত্ত্বেও সরোজকে উঠতে হয়। ছুটির দিনগুলোতে একেবারে সকাল সকাল তার বিছানা ছাড়তে ইচ্ছে করে না একেবারেই। এখনতো মোটে সাতটা বেজে সাতত্রিশ মিনিট। এখন যদি বিছানা ছেড়ে সে না উঠে, তবে মা এসে হৈ হৈ করে হামলে পড়বে তার রুমে। ‘কী হলো তোর? শরীর খারাপ? অসুখ করলো? দেখি তো জ্বর কত?’ এইরকম কিছু প্রশ্ন করে তাকে অস্থির করে তুলবে। তার এখনকার একা একা আরামে শুয়ে থাকার এই শান্তিটা আর থাকবে না। সরোজকে উঠতেই হয়।

নাস্তার টেবিলে বসে সে মাকে জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা মা, পাখির পালকের মাঝে কি প্রাণ থাকে? তারা কি মানুষের সাথে খেলা করতে পারে?” অদ্ভূত এই প্রশ্ন শুনে মা সরোজকে কিছুক্ষণ দেখে, তারপর বলে, “তুমি কি রাতে কোন স্বপ্ন দেখেছিলে সরোজ?” সে মাথা নেড়ে ‘না’ সূচক জানায়।

নাস্তার পর সে তার রুমে ফিরে আসে। আকাশে রোদ নেই, ছায়া পড়ে গেছে। একটা শালিক উড়ে এসে তার জানালার পাশে বসে। চোখ-মুখ ঘুরিয়ে ঘরের ভেতরটা দেখার চেষ্টা করে। তারপর সরোজকে দেখে উড়ে যায়। এক শালিক দেখার কারণে মন খারাপ হয়ে যায় তার। সে জানলার কাছে এগিয়ে যায়। দেখে নীচে আরেক শালিক। আগের শালিকটা উড়ে গিয়ে নীচের ঘাসের উপর অন্য শালিকটার কাছে যায়। তারপর জানলায় সরোজকে দেখে দু’টোই একসাথে উড়ে সামনের কামরাঙা গাছে গিয়ে বসে। সরোজের মন ভাল হয়ে যায়। তারও ইচ্ছে করে পাখির মত উড়ে যেতে। সেই যে ময়নাটা গেছে উড়ে। শালিক দেখে কখনো কখনো ময়না বলে ভুল হয় তার। ময়নাটাকে যখন সরোজ হাতে তুলে নিয়েছিল, তখন ময়নার বুকটা ভয়ে কেঁপে কেঁপে যাচ্ছিল। এতটুকু পাখি। অথচ কী চমৎকার তারা উড়ে বেড়ায়। হিংসে হয়, পাখিদের দেখে। ইস্‌, সে যদি উড়ে যেতে পারতো!

আচ্ছা, সে যখন মেলায় বাবার সাথে নাগরদোলায় চড়ে বসেছিল, তখন তো তারাও উপরে উঠে গিয়েছিল। যদিও উড়তে পারেনি। কিন্তু একটা ব্যাপার দেখে তার খুব মজা লেগেছিল। মাও সাথে গিয়েছিল তাদের। মাথা ঘোরার কথা বলে ভয়ে আর নাগর দোলায় চড়েনি মা। আর নাগরদোলাটাও ছিল অনেক উঁচু, বড়সড় গোছের। নাগরদোলাটা যখন উপর দিকে যাচ্ছিল, ততই নীচে মাটির উপর সব কিছুই ছোট হয়ে আসছিল। একসময় একদম উঁচুতে উঠে যখন নামতে শুরু করেছে কেবল, তখন সরোজ নীচের দিকে তাকালে মাকে তার দেখে একটুখানি মনে হয়। সে ভাবে এখন, তাহলে পাখিরা যখন উঁচু দিয়ে উড়ে যায়, তখন তো পাখিরাও আমাদের একটুখানি দেখে। যত উপরে পাখিরা উড়ে, ততই তারা আমাদের ছোট দেখে। কী আশ্চর্য! মনে মনে হেসে ফেলে সে। তাহলে আমাদের যখন বড় আকারে দেখে পাখিরা, তখন, তারা ভয় পেয়ে দূরে উড়ে যায়। দূর থেকে আমাদের দেখতেই পাখিরা স্বস্থি পায়। কিন্তু সরোজের যে তা ভাল লাগে না। পাখির সাথে ভাব করতে যে তার ইচ্ছে করে।

ইচ্ছে হয় তার, সে যদি উড়তে পারতো। জানলার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে এখনো সে। কামরাঙা গাছ ছেড়ে পাখি দু’টো ছুটে আবার কোথায় উড়ে গেলো। তারও এখন খুব উড়তে ইচ্ছে করছে। সে তার হাত দু’টোকে দু’পাশে মেলে ধরে শরীরটাকে হালকা করে দেয়। আহ্‌ এই দু’হাতের উপরে দু’পাশে যদি দু’টো পাখা থাকতো! জানালার লোহার রডগুলো খুলে ফেলে কখন যে সে উড়ে যেত! কী যে মজা হতো! যত উপরে উঠে যেত, নীচের সব কিছুকেই তত ছোট মনে হতো। তার স্থপতি চাচা বলেছিল, পাখীর এই দেখার চোখকে ইংরেজিতে, bird’s-eye view বলে। যে কোন অনেক উঁচু স্থান থেকে নীচে এভাবে আমরা পাখির চোখের মত দেখে থাকি।

সরোজ তো আর পাখির মত ছোট নয়। পাখাটা তাই তার হবে অনেক লম্বা। সে ভাবে, পাখিদেরই উড়তে সুবিধে বেশি। তাদের ছোট হালকা শরীর। ছোট ছোট ডানা। তার এই লম্বা শরীরটাকে নিয়ে সুপারম্যানের মতই আকাশে ছুটে যেতে হবে। কিন্তু তার যে পাখির মত দু’পাশে পাখা মেলে উড়ার শখ। শালিক দু’টোকে আবার ছুটে যেতে দেখে সে। এই সময় মনে পড়ে, এক দুপুরে খাওয়ার পর মায়ের পাশে সে শুয়েছিল। বাবা-মাদের রুমের অন্য প্রান্তে, জানালার পাশে অদূরের নিম গাছের ডালে একটা শালিক এসে বসেছিল। তারপর আরেকটা। তা দেখে মা একটা কবিতা আবৃত্তি করেছিল। ভালভাবে বুঝে উঠতে না পেরে, মাকে কবিতাটা সম্পর্কে সে জিজ্ঞেস করে। মা বলেছিল, ওটা কবি জীবনানন্দের কবিতা। শালিক হয়ে নাকি তিনি আবার পৃথিবীতে আসতে চান। কেমন চমৎকার লেগেছিল কবিতাটা মার মুখে। বেশ মজাও পেয়েছিল সরোজ। এখন তার কিছুই মনে পড়ছে না। কিন্তু পাখি হবার ইচ্ছেটা যে তাকে ঝাঁকিয়ে বসে।

সপ্তাহান্তে বাবা-মার সাথে এক বিয়ের দাওয়াত থেকে ফিরছিল সরোজ। মাকে নিয়ে গাড়ী বাসায় ঢুকে পড়েছে। তার আগে সে বাবাসহ রাস্তার পাশে নেমে পড়ে। বাবাকে জোর করেছিল, এই গরমে তাকে একটা আইসক্রিমের কন্টেইনার কিনে দিতে। সে ফ্রিজে রেখে রেখে প্রতিদিন একটু একটু করে খাবে। শেষমেশ বাবাকে তাই রাস্তার পাশের স্টোর থেকে তাকে আইসক্রিম কিনে দিতে হয়। আইসক্রিম নিয়ে বেশ খুশিমনে বাবার সাথে সাথে সরোজ তাদের বাসায় ঢুকছিল। হঠাৎ করে তার নজরে পড়ে বাসার গেইটের বাম পাশে ঘাস ও পাকার মাঝামাঝি একটা পাখি পড়ে আছে। সে পাখিটার কাছে ছুটে যায়। পাখিটা একপাশে কাৎ হয়ে আছে। ঝিম মেরে ছিল এতক্ষণ। সরোজ কাছে এলে একটু নড়েচড়ে উঠে। মনে হয় একটু ভয় পেয়েছে। সরোজ বুঝতে পারে, এটা শালিক পাখি। পাখিটাকে বেশ অসুস্থ মনে হয় তার। গেইট দিয়ে বাসায় ঢোকার আগেই ছুটে গিয়ে সে বাবার হাত ধরে। উত্তেজিত হয়ে বলে। বাবা, “দেখো ওখানে একটা শালিক পড়ে আছে। খুব অসুস্থ।” বাবা একটু বিরক্ত হয়ে বলে, “সরোজ ওটার কাছে যেয়ো না, ওটা তুমি ধরো না। বাসায় এসো বাবা।” সে আবার বলে, “বাবা ওটার কিছু কর। ওটা খুব অসুস্থ। ওটাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে চলো।” “তুমি আজ বেশ বিরক্ত করছো, সরোজ। চলো, তুমি এখন বাসায় চলো।” বাবা বেশ উষ্মা প্রকাশ করে। “না বাবা, ওটা ওখানে মরে যাবে, তুমি ওকে গাড়ী করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে চলো।”

ওহ্‌ হো, আমি এখন ডাক্তার কোথায় পাবো? পাখির ডাক্তারই বা কোথায় থাকে, আমি জানি না কি?
কেন আমরা যেখান থেকে ময়নাটা কিনেছিলাম, ওখানে? ওখানে তো অনেক পাখি। ওদের ডাক্তার আছে না?
আমি কী জানি বাবা, আমার এখন অত সময় নেই, ডাক্তার খোঁজার।
তাহলে কিছু একটা করো, ওকে বাসায় নাও। আমরা অসুখ হলে যে ঔষুধ খাই, ওকে সে ঔষুধ দাও।
মনের কষ্টে কেঁদে ফেলে সরোজ। বাবা থতমত খেয়ে যায়। পাখির জন্য ছেলেটার ভালবাসা দেখে তার মায়া হয়। কিছু বলার ভাষা খুঁজে পান না তিনি। সরোজ ফুঁপিয়ে কাঁদছে। একসময় সে চোখ থেকে পানি মুছে ফেলে। বাবা ধীরে ধীরে হেঁটে বাসায় ঢুকেন। সরোজও তাকে খুব ধীরে ধীরে অনুসরণ করে।

নিজের ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয় সরোজ। বাইরে থেকে মা তাকে ডাকে, “সরোজ, আইসক্রিম খাবে না?” সে উত্তর দেয়, “না, আমি এখন কিছু খাবো না।”

তার মন খুব খারাপ হয়ে আসে। সে পড়ার টেবিলের উপর মাথা দিয়ে কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে থাকে। একসময় হঠাৎ উঠে গিয়ে দেখে বাইরে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম থেকে উঠে সে পাখির কথা ভুলে যেতে চায়। ভুলে যেতে চায় একসময় তার একটা ময়না ছিল। পাখির সাথে তার সখ্যতা গড়ার ইচ্ছাও ভুলে যেতে চায়। উঠে গিয়ে জানালার কপাট সে বন্ধ করে দেয়, এবং মনে মনে বলে:

আজ থেকে সে আর কখনো পাখি হয়ে উড়তে চাইবে না।
আজ থেকে কোন পাখি আর তার জানালায় উড়ে এসে বসবে না।
আজ থেকে কোন পাখির পালক ঘরে ঢুকে পড়ে তার সাথে খেলবে না।

প্রথম প্রকাশ: আমরা বন্ধু, সরোজ পাখি হতে চেয়েছিল, মে ২৩ ২০১১

লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] নায়ক:শেষ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার

লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] নায়ক:১ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার
লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] নায়ক:২ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার
লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] নায়ক:৩ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার

দল-সম্পৃক্ত নায়কেরা

সমাজের সাথে সম্পৃক্ততার সুবাদে নায়কের আরো একটা স্বাতন্ত্র্য তৈরি হয়ে উঠে। প্রথম গল্পকারদের মত, পূর্বতম মানুষেরা যারা শিকারে গিয়েছিল এবং আফ্রিকার সমতলে জড় হয়েছিল, তাদের মতই বেশির ভাগ নায়কের আছে দল-সম্পৃক্ত পরিচিতি। গল্পের শুরুতেই দেখা যায়, তারা সমাজেরই অংশ। কিন্তু তাদের যাত্রা তাদেরকে বাড়ী থেকে অনেক দূরে কোন এক অপরিচিত জায়গায় নিয়ে যায়। যখন আমরা প্রথম তাদের সাথে পরিচিত হই , তখন তারা কোন বংশ, গোত্র, গ্রাম, শহর বা পরিবারের অংশ। তাদের গল্প হলো, সেই গ্রুপ থেকে আলাদা হওয়ার গল্প (প্রথম অংক)।
তারপর একাকী রোমাঞ্চকর অভিযান চলে অপরিচিত অঙ্গন বা ঊষর জনহীন প্রান্তরে (দ্বিতীয় অংক)।
এবং পরিণামে সচরাচর দলের সাথে পূণঃএকত্রীকরণ (তৃতীয় বা শেষ অংক)।

দল-সম্পৃক্ত নায়কেরা প্রায়ই একটা পছন্দের মুখোমুখি হয়। তাহলো আদৌ কি তারা প্রথম অংকের সাদামাটা পৃথিবীতে ফিরে আসবে? না কি দ্বিতীয় অংকের বিশেষ পৃথিবীতে থেকে যাবে? পশ্চিমী কালচারে, নায়কের বিশেষ পৃথিবীতে থেকে যাওয়া খুবই ব্যতিক্রম। কিন্তু উচ্চাঙ্গের এশীয় এবং উত্তর এমেরিকার ইন্ডিয়ান গল্প-উপ্যাখানে তা খুবই স্বাভাবিক।

নিঃসঙ্গ নায়কেরা

দল-সম্পৃক্ত নায়কের বিপরীতে আছে নিঃসঙ্গ পশ্চিমী নায়ক যেমন শেন (Shane), ক্লিন্ট ইস্টউড (Clint Eastwood)-এর ম্যান ইউথ নো নেম (Man with No Name), দি সার্চারস (The Searchers)-এর জন ওয়েন (John Wayne)-এর ইথান (Ethan) অথবা দি লোন রেঞ্জার (The Lone Ranger)। এ ধরণের নায়কের গল্পগুলোতে, সমাজ থেকে নায়কের বিচ্ছেদ দিয়েই গল্প শুরু হয়। তাদের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র হলো ঊষর জনহীন প্রান্তর এবং তাদের স্বাভাবিক প্রকৃতি হলো নির্জন একাকিত্ব। তাদের ভ্রমণ হলো দলে পূনঃপ্রবেশের একটি (প্রথম অংক)।
দলের স্বাভাবিক ভূখন্ডে দলের মাঝে অভিযান (দ্বিতীয় অংক)।
তারপর আবার বিচ্ছিন্ন জনহীন প্রান্তরে ফিরে যাওয়া (তৃতীয় অংক)।
এইসব নায়কদের জন্য দ্বিতীয় অংকের বিশেষ পৃথিবী হলো তাদের গোত্র বা গ্রাম, যেখানে তারা সংক্ষিপ্তভাবে ভ্রমণ করে, এবং সবসময় অস্বস্থিবোধ করে। দি সার্চারস-এর সমাপ্তিতে জন ওয়েনের সেই অপূর্ব শট এই ধরণের নায়কের ক্ষমতার উপসংহার টানে। পরিবারের আরাম এবং আনন্দ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে একজন চিরকালের বহিরাগত হিসেবে ওয়েন কেবিনের দরজার প্রবেশপথে ফ্রেম বন্দী হয়। এই ধরণের নায়ক ওয়েস্টার্ণগুলোতে সীমাবদ্ধ থাকা প্রয়োজন। এটা নাটক এবং একশানধর্মী চলচ্চিত্রগুলোতে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে, যেখানে একজন নিঃসঙ্গ ডিটেকটিভ রোমাঞ্চকর অভিযানে প্রলুব্ধ হতে পারে, যেখানে একজন তপস্বী বা অবসরপ্রাপ্ত লোক সমাজে ফিরে আসতে পারে, অথবা যেখানে একজন আবেগায়িত বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিকে আত্মীয়তার জগতে পূণঃপ্রবেশের জন্য চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়।

দল-সম্পৃক্ত নায়কদের মতো, নিঃসঙ্গ নায়কদেরও চূড়ান্ত পছন্দ রয়েছে তাদের প্রাথমিক পর্যায়ে ফিরে যাওয়ার (এখানে নিঃসঙ্গতায়)।
অথবা দ্বিতীয় অংকের বিশেষ পৃথিবীতে থেকে যাওয়ার। কিছু নায়ক নিঃসঙ্গতা দিয়ে শুরু করে এবং দল-সম্পৃক্ত নায়ক হয়ে শেষতক দলের সাথে থেকে যায়।

অনুঘটক নায়কেরা

নিয়মের ব্যতিক্রম হয় এক নির্দিষ্ট শ্রেণীর নায়কের ক্ষেত্রে, যেখানে নায়কই সেই চরিত্র যে সাধারণতঃ পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যায়। এরা হলো অনুঘটক নায়ক, কেন্দ্রীয় চরিত্র, যারা নায়কোচিতভাবে ক্রিয়াশীল হতে পারে। কিন্তু তারা নিজেদের যথেষ্ট পরিবর্তন করে না, কারণ তাদের মূল কাজ হলো অন্যদের মধ্যে রুপান্তর নিয়ে আসা। রসায়নের সত্যিকারের অনুঘটকের মতো তারা নিজেদের পরিবর্তন না করে সিস্টেম বা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনে।

একটা ভাল উদাহরণ হলো, বেভারলি হিলস কপ (Beverly Hills Cop)-এ এডি মারফি (Eddie Murphy)- র চরিত্র এক্সেল ফোলে (Axel Foley)। তার ব্যক্তিত্ব আগে থেকেই তৈরি হয়ে আছে এবং গল্পের শুরু থেকেই স্পষ্ট ও আলাদা হয়ে আছে। তার চরিত্রের মাঝে তেমন কোন পরিণতি (character arc) নেই, কেননা তার তো কোন অভিযানে যাওয়ার নেই। সে কিছু শিখেনি বা গল্পের ব্যপ্তিতে তার তেমন পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু সে তার বেভারলি হিলস পুলিশ বন্ধু, টেগার্ট (Taggart) ও রোজউড (Rosewood)-এর মাঝে নিশ্চিত পরিবর্তন এনেছে। তার বন্ধুদের চরিত্রের পরিণতি (character arc) তুলনামূলকভাবে অনেক শক্তিশালী। গতানুগতিকতার পথে চলা পুলিশ বন্ধুদ্বয় এক্সলের প্রভাবে, বিচলিত এবং অস্বস্থিকর অবস্থা হতে কঠিন ও বিপদজনক পরিস্থিতি মোকাবেলা করা রপ্ত করে ফেলে। বাস্তবিকই যদিও এক্সেল হলো কেন্দ্রীয় চরিত্র, খলনায়কের প্রধান বিরুদ্ধ পক্ষ, এবং চলচ্চিত্রের বেশি সময় জুড়ে থাকা খুব ভাল এক চরিত্রের। তবুও তর্ক করা যায়, সে সত্যিকারের নায়ক কি না। কিন্তু গল্পের বিজ্ঞ পরামর্শদাতা (mentor), যখন জাজ রেইনহোল্ড (Judge Reinhold) অভিনীত যুবক রোজউড-ই প্রকৃত নায়ক। কারণ সেই গল্পের অগ্রগতিতে সবচেয়ে বেশি শিখে।

বলিউড মুভি থ্রী ইডিয়টস (3 idiots)-এ আমির খান অভিনীত রেঞ্চো চরিত্র অনুঘটক নায়ক হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছে। সে তার দু’বন্ধু ফারহান এবং রাজুর চরিত্রসহ তার প্রেমিকা এবং প্রেমিকার বিদ্‌ঘুটে কঠোর বাবা, ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলের পরিচালকের জীবনেও পরিবর্তন সাধন করে।

অনুঘটক নায়কেরা বিশেষভাবে উপকারী ধারাবাহিক গল্প বলার টিভি এপিসোড বা পর্বসমূহে। দি লোন রেঞ্জার (The Lone Ranger) অথবা সুপারম্যানের (Superman) মতো এই নায়কেরা কিছু অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যায়। কিন্তু প্রাথমিকভাবে অন্যদের সাহায্য করতে বা বেড়ে উঠাতে নির্দেশনা দিতে কাজ করে থাকে। অবশ্যই এটা খুবই ভাল ধারণা, কখনো কখনো এইসব চরিত্রগুলোকে বেড়ে উঠার বা পরিবর্তনের কিছু সময় দেয়া হোক, যা তাদের সতেজ ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে সাহায্য করে।

নায়কের পথ

নায়কেরা হলো আত্মার রুপান্তরের প্রতীক এবং সে সাথে প্রত্যেক মানুষ তার জীবনে যে যাত্রাপথে নামে। এই অগ্রগতির পর্যায়গুলো, জীবন এবং বৃদ্ধির প্রাকৃতিক পর্যায়গুলো নায়কের পরিভ্রমণকে গড়ে তোলে। নায়কের মৌলরুপ বা আর্কিটাইপ লেখক এবং আত্মার অনুসন্ধানীদের উদঘাটনের উর্বর ক্ষেত্র। ক্যারল এস. পিয়ারসন্স (Carol S. Pearson)-এর বই আওয়েকেনিঙ্গ দা হিরোস উইদিন (Awakening the Heroes Within) নায়কের ধারণাকে আরো উপকারী মৌলরুপে ভেঙ্গেছে। মৌলরুপগুলো হলো যেমন, নির্দোষ, এতিম, শহীদ, পথভ্রষ্ট, লালনকারী, অনুসন্ধানী, প্রেমিক, ধ্বংসকারী, সৃষ্টিকারী, শাসক, যাদুকর, ঋষি এবং বোকা। সেইসাথে প্রত্যেকটির আবেগায়িত অগ্রগতির গ্রাফ তৈরি করেছে। নায়কের অনেক রুপের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক বোঝাপড়ার এটা একটা ভাল নির্দেশিকা। কিছু মহিলা নায়কের বিশেষ এভিনিউতে ভ্রমণ মোওরীন মারডক (Maureen Murdock)-এর দি হিরোইন’স জার্নি: ইউমেন’স কোয়েস্ট ফর হোলনেস (The Heroine’s Journey: Woman’s Quest for Wholeness)-এ বিধৃত হয়েছে।

লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] নায়ক:৩ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার

লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] নায়ক:১ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার
লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] নায়ক:২ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার

অন্য আর্কিটাইপে (মৌলরুপে) নায়কত্ব

কখনো কখনো নায়কের মৌলরূপ প্রধান চরিত্রে প্রতীয়মান নয়, যে মুখ্য চরিত্র সাহসিকতার সাথে খারাপদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়ী হয়। নায়কের মৌলরুপ অন্য কোন চরিত্রে সুস্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে, যখন তারা নায়কোচিতভাবে সক্রিয় হয়। একটি অনায়কসুলভ চরিত্র নায়ক হয়ে উঠতে পারে। গুঙ্গা ডিন (Gunga Din)-এর নাম ভূমিকায় অভিনীত চরিত্র সবমিলিয়ে ভাঁড় বা জোকারের আর্কিটাইপে আরম্ভ করে, কিন্তু প্রাণপণে নায়কে উন্নীত হয়ে উদ্যমী হয়ে উঠে। খুবই সংকটকালীন মূহুর্তে নিজের বন্ধুদের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে, সে নায়ক হওয়ার অধিকার অর্জন করে। স্টার ওয়ারস (Star Wars)-এ ওবি ওয়ান কেনোবি (Obi Wan Kenobi) গল্পের বেশিরভাগ অংশে সুস্পষ্টভাবে বিজ্ঞ পরামর্শদাতা (mentor)-র ভূমিকা পালন করে। যাহাই হক, সে নায়কোচিত আচরণ করে এবং অস্থায়ীভাবে নায়কের মুখোশ পরিধান করে যখন সে লিউক (Luke)- কে ডেথ স্টার (Death Star) থেকে পালাতে সাহায্য করতে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে।

এটা খুবই কার্যকরী হতে পারে যদি কোন খলচরিত্রে বা শত্রুভাবাপন্ন চরিত্রে অনাকাঙ্খিতভাবে নায়কের গুণাবলী প্রতীয়মান হয়ে উঠে। আমেরিকার টিভির এক ধারাবাহিক কমেডিতে (সিটকম), ড্যানি ডেভিটো-র তুচ্ছ “ট্যাক্সি” প্রেরক লুই হঠাৎ উন্মোচন করে যে, তার একটা কোমল হৃদয় আছে অথবা সে মহৎ কিছু করেছে, তখনই সিটকমের এই এপিসোডটি এমি এওয়ার্ড জয় করে। এক দুঃসাহসী খলনায়ক, কোন না কোন ভাবে নায়কোচিত, আবার অন্যদের কাছে তুচ্ছ হয়েও খুবই আবেদনময় হয়ে উঠতে পারে। আদর্শগতভাবে, প্রত্যেক পরিপূর্ণ ও সামঞ্জস্যপূর্ণ চরিত্রে সব ধরণের মৌলরূপ প্রতিভাত হওয়া উচিত, কারণ মৌলরূপগুলো পরিপূর্ণ ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠার বিচ্ছিন্ন অভিব্যক্তিসমূহ।

চরিত্রের ত্রুটিসমূহ

কোন চরিত্রের আকর্ষণীয় ত্রুটিগুলো চরিত্রটিকে মানবিক করে তুলে। নায়কের অবস্থানে এলে আমরা নিজেদের কিছু কিছু করে চিনতে পারি। কেননা, তখন আমরা আমাদের অন্তর্নিহিত সন্দেহবাদিতা, ভুল চিন্তাধারা, অতীতের অপরাধবোধ, মানসিক আঘাত, অথবা ভবিষ্যত আশংকা অতিক্রম করার চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। দুর্বলতা, ত্রুটিপূর্ণতা, অদ্ভুদ আচরণ, বদভ্যাস তাৎক্ষণিকভাবে নায়ক বা অন্য কোন চরিত্রকে আরো বেশি বাস্তব ও আকর্ষণীয় করে তোলে। এটা মনে হয় যে, চরিত্র যত বেশি দ্বন্দ্বগ্রস্থ ও মানসিক স্থৈর্যহীন হবে, ততবেশি শ্রোতা-দর্শক তাদের পছন্দ করবে এবং চরিত্রে মাঝে নিজেদের খুঁজে পাবে।

কোন চরিত্রের ত্রুটি চরিত্রটিকে কোথাও নিয়ে যাবে – যাকে বলা যায় চরিত্রটিকে পরিণতি (character arc) দেবে। চরিত্রটি ‘A’ অবস্থান হতে উত্তীর্ণ হয়ে ‘Z’ অবস্থানে পৌঁছবে পর্যায়ক্রমে ধারাবাহিক পদক্ষেপে। ত্রুটিই হলো অসম্পূর্ণতা বা অপূর্ণতার শুরুর পর্যায়, যা থেকে চরিত্র উত্তরণের দিকে ধাবিত হয়। কোন চরিত্রের মধ্যে অসম্পূর্ণতা থাকতে পারে। সম্ভবতঃ নায়ক (নায়িকা)-র কোন রোমান্টিক সঙ্গী নেই এবং সে তার জীবন পূর্ণ করতে সে অসম্পূর্ণ অংশটা খুঁজছে। এটা রূপকথার গল্পে প্রায়ই রূপকায়িত হয় যে, নায়ক তার পরিবারে কাউকে হারানো বা মৃত্যুর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছে। অনেক রূপকথার গল্প শুরু হয় পিতার মৃত্যু অথবা ভাই বা বোনের অপহরণের মধ্য দিয়ে। পরিবারের একক থেকে পরিবারের সদস্যের এই বিয়োগ গল্পের উত্তেজনাময় ভিত্তিকে গতিশীল করে তোলে। এবং এই গতিশীলতা থেমে যায় না, যতক্ষণ না নতুন পারিবারিক বন্ধন বা পুরনো সদস্যদের পুনর্মিলনের মাধ্যমে পূর্বের পারিবারিক ভারসাম্য পুনঃস্থাপন হয়।

সবচেয়ে আধুনিক গল্পে নায়কের ব্যক্তিত্বই পরিপূর্ণভাবে পুনঃর্নিমাণ বা পুনঃস্থাপিত হয়। হারানো বা অসম্পূর্ণ অংশ হতে পারে ব্যক্তিত্বের সংকটপূর্ণ উপাদান যেমন, ভালবাসতে পারা অথবা বিশ্বাস করার সামর্থ্য। নায়ককে কিছু সমস্যা অতিক্রম করতে হতে পারে যেমন, ধৈর্যহীনতা বা সিদ্ধান্তহীনতা। দর্শক-শ্রোতা নায়কের ব্যক্তিত্বের সমস্যায় হিমসিম খেতে দেখা যেমন পছন্দ করে, তেমনি পছন্দ করে এই সমস্যা হতে উত্তরণ হতে দেখতে। প্রেটি ওমেন (Pretty Woman) ছায়াছবির ধনী এবং শীতল হৃদয়ের ব্যবসায়ী, বিল এডওয়ার্ড (Will Edward), প্রাণবন্ত ভিভিয়ান (Vivian)-এর প্রভাবে উষ্ণ হয়ে উঠে এবং পরবর্তীতে বিল ভিভিয়ানের চার্মিং প্রিন্স-এ রুপায়িত হয়। ভিভিয়ান কি কিছু আত্ম-সন্মান অর্জন করবে এবং তার পতিতা জীবন থেকে বেরিয়ে আসবে? অর্ডিনারী পিওপল (Ordinary People)-এর অপরাধে নিমজ্জিত কিশোর কনরাড কি ভালবাসা গ্রহণ এবং ঘনিষ্ঠ হওয়ার হারানো সামর্থ্য পুনরুদ্ধার করবে? আসলেই কি তাই নয়!

বিবিধ ধরণের নায়ক

নায়কেরা আসে বিভিন্ন রূপে – ইচ্ছুক বা অনিচ্ছুক নায়ক হয়ে, দলবদ্ধভাবে বা একাকী নায়ক হয়ে, প্রতিনায়ক হয়ে, ট্রাজিক নায়ক হয়ে, অনুঘটক নায়ক হয়ে। অন্য সব মৌলরূপের মত, নায়ক হলো একটা নমনীয় ধারণা, যা বিভিন্ন ধরণের ক্ষমতাই প্রকাশ করতে পারে। নায়কেরা অন্য আর্কিটাইপ বা মৌলরূপগুলোকে সমন্বয় করতে পারে সংকরধর্মী ছলনাকারী প্রতারক (Trickster) নায়কে পরিণত হতে। অথবা তারা অস্থায়ীভাবে অন্য আর্কিটাইপের মুখোশ পড়ে হয়ে উঠতে পারে, বিভিন্ন রূপ-পরিগ্রাহী (Shapeshifter), বিজ্ঞ পরামর্শদাতা (mentor) থেকে অন্যকিছু, অথবা এমনকি কোন প্রতিচ্ছায়া।

যদিও সচরাচর ইতিবাচক চরিত্র হিসেবে নায়ক চিত্রায়িত হয়, কিন্তু সে তার অহংবোধের (ego) অন্ধকার বা নেতিবাচক দিককে প্রকাশ করতে পারে। নায়কের মৌলরূপ সাধারণতঃ মানুষের আত্মার ইতিবাচক দিকের প্রতিনিধিত্ব করে, আবার দেখাতে পারে দুর্বলতার পরিণতি এবং নিজের ভূমিকা গ্রহণের অনিচ্ছুকতা।

ইচ্ছুক এবং অনিচ্ছুক নায়কেরা

দেখা যাচ্ছে, নায়কেরা দুই জাতের। প্রথম জাত হলো ইচ্ছুক, সক্রিয়, প্রবল উৎসাহী স্বভাবের। দুঃসাহসিক রোমাঞ্চকর অভিযানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, সন্দেহহীন। সাহসিকতার সাথে সবসময় সামনে এগিয়ে যায়। আত্মপ্রণোদিত। দ্বিতীয় জাত হলো অনিচ্ছুক, সন্দেহবাদী, দ্বিধাগ্রস্থ এবং নিস্ক্রিয় জড় স্বভাবের। এই জাতের নায়কদের আত্মপ্রণোদনা (self-motivation) অর্জন আবশ্যক, এবং শুধুমাত্র বাহ্যিক শক্তির প্রভাবের কারণেই তারা রোমাঞ্চকর অভিযানে প্রবেশ করে। উভয় জাতের নায়কই বিনোদনধর্মী গল্প সৃষ্টি করে, যদিও যে নায়ক সবসময় জড় স্বভাবের সে কোন অসংলগ্ন উটকো নাটকীয় অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে পারে। অনিচ্ছা পোষণকারী নায়কের জন্য উত্তম হলো গল্পের কোন এক মূহুর্তে তার মাঝে পরিবর্তন আসা, প্রয়োজনীয় প্রণোদনা প্রাপ্তির পর তার রোমাঞ্চকর অভিযানের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া।

প্রতিনায়কেরা

প্রতিনায়ক হলো খুবই বিপদজনক একটা শব্দ যা প্রচুর বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। সোজা কথায় বললে, একজন প্রতিনায়ক নায়কের বিপরীত কেউ নয়, কিন্তু এক বিশেষ ধরণের নায়ক, যে আইনের চোখে অপরাধী বা সমাজের দৃষ্টিতে দুর্বৃত্ত। কিন্তু যার প্রতি দর্শক-শ্রোতাদের মুলতঃ সহানুভূতি আছে। আমরা এই ধরণের সমাজ বহির্ভূত লোকের সাথে পরিচিত, কারণ আমরা সবাই জীবনের কোন না কোন সময় নিজেদের সমাজ বহির্ভূত মনে করি।

দুই জাতের প্রতিনায়ক আছে। প্রথম জাতের হলো, সে চরিত্ররা, যারা বড় বেশি গতানুগতিক নায়কদের মত আচরণ করে। কিন্তু তাদের আছে নৈরাশ্যবাদের তীব্র ছোঁয়া অথবা হতোদ্যম অনুভূতি। যেমন, দি বিগ স্লিপ (The Big Sleep) এবং ক্যাসাব্লাঙ্কা (Casablanca)-য় বোগার্ট (Bogart)-এর অভিনীত চরিত্ররা। দ্বিতীয় ধারার হলো, ট্রাজিক নায়কেরা – গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র, যে পছন্দনীয় বা আকর্ষণীয় নাও হতে পারে। এমনকি যার কর্মকান্ডকে আমরা নিন্দা করি। যেমন, ম্যাকবেথ (Macbeth) অথবা স্কারফেস (Scarface), অথবা মামী ডিয়ারেস্ট ((Mommie Dearest)-এর জোওন ক্রফোর্ড (Joan Crawford)।

হতোদ্যম প্রতিনায়ক কখনো বা নিস্প্রভ বীরযোদ্ধা, এক নিঃসঙ্গ মানুষ, যে কি না সমাজ ত্যাগ করেছে বা সমাজ তাকে ত্যাগ করেছে। এই চরিত্রগুলো শেষতক জিতে যেতে পারে এবং পুরো সময় জুড়ে দর্শক-শ্রোতার পুরো সহানুভূতি পেতে পারে। সমাজের চোখে তারা হলো রবিন হুড (Robin Hood)-এর মতই জাতিচ্যুত, শঠ দস্যু অথবা ডাকাতদের নায়ক, অথবা বোগার্ট অভিনীত চরিত্রগুলো। তারা হলো প্রায়ই সন্মানিত ব্যক্তি, যারা সমাজের কলুষ থেকে মুক্ত। তারা সম্ভবতঃ প্রাক্তন পুলিশ বা সৈন্য, যাদের মোহমুক্তি ঘটেছে এবং আইনের ছত্রচ্ছায়ায় বর্তমান কর্মকান্ড চালাচ্ছে , হয় ব্যক্তিগত তদন্তকারী হিসেবে, বা চোরাকারবারী হিসেবে, বা জুয়াড়ী হিসেবে, অথবা রোমাঞ্চ-প্রিয় সৈনিক হিসেবে। আমরা এই চরিত্রগুলোকে ভালবাসি, কেননা তারা বিদ্রোহী এবং তারা সমাজের অনিয়ম, অসংগতির বিরুদ্ধাচরণ করে, যা আমরাও করে থাকি। এই ধরণের অন্য আর্কিটাইপ রিবেল উইদাউট এ কস (Rebel Without a Cause) এবং ইস্ট ইডেন (East of Eden)-এ জেমস ডীন অভিনীত চরিত্রে মূর্ত হয়ে উঠেছে। দি ওয়াইল্ড ওয়ান (The Wild One)-এ যুবক মার্লোন ব্রান্ডো (Marlon Brando) অভিনীত চরিত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক নতুন প্রজন্মের পুরাতনের প্রতি অসন্তুষ্টি ফুটেছে। এই ঐতিহ্য বর্তমানে বয়ে নিয়ে চলেছে মিকে রুউরক (Mickey Rourke), ম্যাট ডিলোন (Matt Dillon), শন পেন (Sean Penn)-এর মত অভিনেতারা।

দ্বিতীয় জাতের প্রতিনায়ক হলো অনেকটা ট্রাজিক নায়কের ক্লাসিক বা উচ্চাঙ্গ ধারণা। এরা হলো ত্রুটিপূর্ণ নায়ক, যারা কখনো অতিক্রম করতে পারে না তাদের ভেতরের অশুভ সত্ত্বাকে এবং নিজেরাই নিজেদের পতন এবং ধ্বংসকে অনিবার্য করে তোলে। তারা হতে পারে আকর্ষণীয় বা মনোমুগ্ধকর গুণবিশিষ্ট। কিন্তু তাদের ত্রুটিগুলোই শেষমেশ জয়ী হয়। কিছু ট্রাজিক প্রতিনায়ক এত আকর্ষণীয় গুণবিশিষ্ট নয়। কিন্তু আমরা তাদের পতনকে মোহাবিষ্ট হয়ে দেখি কারণ সেখানে, ঈশ্বরের ইচ্ছায় আমি যাচ্ছি (there, but for the grace of God, go I.). প্রাচীন গ্রীকদের মত, যারা অদিপাস (Oedipus)-এর পতন প্রত্যক্ষ করেছে, তাদের মত আমরা আমাদের আবেগকে পরিশোধিত করি এবং আমরা একই ধরণের পতন এড়িয়ে যেতে শিখি, যখন আমরা স্কারফেস (Scarface)-এ আল পাচিনো (Al Pacino)-র চরিত্র, গরিলা ইন দা মিস্ট (Gorillas in the Mist)-এ ডায়ান ফোসি (Dian Fossey) চরিত্রে সিগোরনি ওয়েবার (Sigourney Weaver), অথবা লুকিং ফর মিস্টার গুডবার (Looking for Mr. Goodbar)-এ ডায়ান কিটোন (Diane Keaton) অভিনীত চরিত্রের ধ্বংস বা বিনাশ দেখি।

লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] নায়ক:২ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার

লেখকের পরিভ্রমণ[লেখকের জন্য পৌরাণিক কাঠামো] নায়ক:১ -ক্রিস্টোফার ভগ্লার

আগের পর্বের ধারাবাহিকতায়:

নাটকীয় বৃত্তিসমূহ

দর্শক-শ্রোতার সাথে নায়কের পরিচিতিকরণ

নায়কের নাটকীয় উদ্দেশ্য হলো শ্রোতাকে গল্পে প্রবেশের জন্য জানালার কপাট খুলে দেয়া। যারা গল্প শুনছে অথবা নাটক বা চলচ্চিত্র দেখছে, তাদেরকে গল্পের প্রথম পর্বেই আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে নায়কের সাথে পরিচিত হতে, তার সাথে এগিয়ে যেতে, এবং নায়কের চোখেই গল্পে বর্ণিত বিশ্বটাকে দেখতে। গল্পকারেরা এটা করছে তাদের নায়কদের মাঝে চমৎকার গুণের সমন্বয় ঘটিয়ে, সর্বজনীন এবং অনন্যসাধারণ চারিত্রিক গুণে নায়ককে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করে।

নায়কদের যে ধরণের বৈশিষ্ট্য আছে, সেগুলো আমাদের কাছে পরিচিত এবং স্বীকৃত। সেগুলোর আছে সর্বজনীনতা ও সকলেই তা বুঝতে পারি। যেমন, নিজের ভালবাসা পাওয়ার আকাঙ্খা, নিজেকে অন্যের বুঝতে পারা, নিজের সফলতা অর্জন করা, অস্তিত্ব রক্ষা করা, মুক্তি পাওয়া, প্রতিশোধ নেওয়া, নিজের ভুলকে শোধরানো, অথবা নিজেকে প্রকাশের প্রয়াস পাওয়া।

গল্প পাঠের সময় আমাদের ব্যক্তিগত জানাশোনাকে নায়ক অনুধাবনের অভিজ্ঞতায় আংশিকভাবে গল্পে নিয়োজিত করি। এইভাবে ক্ষণিকের জন্য হলেও আমরা গল্পের নায়কে রূপান্তরিত হই। আমরা নায়কের অন্তরাত্মায় প্রবেশ করি এবং নায়কের চোখেই বিশ্বকে দেখি। নায়কদের কিছু বিস্ময়-বিমুগ্ধ গুণের প্রয়োজন, যার কারণে আমরা তাদের মত হয়ে উঠতে চাই। আমরা ক্যাথেরিন হেপবার্ণ (Katharine Hepburn)-এর মত আত্মবিশ্বাস, ফ্রেড এসটাইয়ার (Fred Astaire)-এর মত আভিজাত্য, ক্যারি গ্রান্ট (Cary Grant)-এর মত উচ্ছল, মেরিলিন মনরো (Marilyn Monroe)-র মত যৌন-আবেদনময়তার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চাই।

নায়কদের সর্বজনীন গুণ থাকা চাই, থাকা চাই আবেগ, অভিপ্রায়, যেসব অভিজ্ঞতা প্রত্যেক মানুষই কখনো না কখনো অর্জন করে। যেমন, প্রতিশোধ, ক্রোধ, লালসা, প্রতিযোগিতা, আঞ্চলিকতা, দেশপ্রেম, আদর্শবাদিতা, হতাশা বা নৈরাশ্যবাদ। কিন্তু নায়কদের হতে হবে অনন্যসাধারণ বৈশিষ্ট্যের মানুষ, ধরাবাঁধা চরিত্রের বাইরে। অথবা নায়ক এমন কেউ নন, যিনি হবেন ত্রুটিহীন, ধারণাহীন মিথ্যা দৈবতূল্য কেউ। যে কোন অর্থপূর্ণ ফলপ্রসূ শিল্পের মতই নায়করা হবেন সর্বজনীন স্বকীয় মৌলিক। কেউই বিমূর্তগুণসম্পন্ন মানুষের গল্প পড়তে বা চলচ্চিত্র দেখতে আগ্রহী না। আমরা চাই বাস্তব মানুষের গল্প, একটি বাস্তব চরিত্র। কোনক্রমেই একজন বাস্তব মানুষের মত শুধুমাত্র একক কোন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নয়। অনেক গুণ এবং তাড়না ও প্রেরণার এক অনন্য সমন্বয়ে কোন চরিত্র। আবার এই গুণ বা তাড়নাগুলোর মধ্যে রয়েছে পরস্পর বিরোধীতা, এবং এই তীব্র পরস্পর বিরোধীতার মধ্যে রয়েছে সৌন্দর্য। একদিকে প্রেমের প্রতি বিশ্বস্ততা এবং অন্যদিকে কর্তব্য পরায়ণতা এই দু’য়ের দ্বন্দ্বে জর্জরিত চরিত্র স্বাভাবিকভাবেই দর্শক শ্রোতাদের জন্য আগ্রহ উদ্দীপক। যে চরিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে আবেগ উত্তেজনার দ্বন্দ্ব এবং বৈপরীত্য – বিশ্বাসের পাশাপাশি সন্দেহ, আশার পাশাপাশি নিরাশা – সেগুলো মনে হয় বেশ বাস্তবিক এবং মানবিক, অন্য চরিত্রগুলোর চেয়ে যাদের মাঝে দু’য়ের দ্বন্দ্ব এবং বৈপরীত্য নেই।

একজন সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিপূর্ণ নায়ক হবেন একইসাথে দৃঢ়, অনিশ্চিত, আকর্ষণীয়, ভুলোমনা, অধৈর্য, শারীরিকভাবে শক্তিধর এবং দুর্বল হৃদয়ের। গুণগুলোর মাঝে এমনই সুনির্দিষ্ট সমন্বয় থাকতে হবে, যাতে করে দর্শক-শ্রোতা এমন ধারণা পেতে পারে যে, নায়ক গতানুগতিক ধাঁচের বাইরে বাস্তবিকই এক বিশেষ চরিত্রের।

নায়কের বেড়ে উঠা

নায়কের গল্পের আরেক বৃত্তি হলো নায়কের শিক্ষা এবং তার বেড়ে উঠা। একটা পান্ডুলিপি মূল্যায়ন করে কখনো কখনো এটা বলা কঠিন, কে মূল চরিত্র অথবা কার মূল চরিত্র হওয়া উচিত। সবচেয়ে ভাল উত্তর হলো প্রায়ই, সেই চরিত্র যে শিখে এবং বৃদ্ধি পায় সবচেয়ে বেশি গল্পের গতিপথে এগিয়ে যাবার প্রক্রিয়ায়। নায়কেরা বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে তার লক্ষ্যে পৌঁছে যায়। কিন্তু এই চলার পথে তারা নতুন জ্ঞান অর্জন করে বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ হয়ে উঠে।

অনেক গল্পের হৃদস্পদনই হলো শেখা, যে শিক্ষা আমরা পাই নায়ক ও তার বিজ্ঞ বিশ্বস্ত পরামর্শদাতার (mentor) কার্যকলাপ থেকে, নায়ক এবং তার প্রেম থেকে, এমনকি নায়ক এবং খলনায়কের মধ্যকার আচার-ব্যবহার থেকে। আমরা সকলেই যে একে অন্যের শিক্ষক।

নায়কের সক্রিয়তা

আরেকটি নায়কোচিত বৃত্তি হলো নায়কের সক্রিয়তা। পান্ডুলিপিতে নায়কই সাধারণতঃ খুব সক্রিয় ব্যক্তি হয়ে থাকেন। তার ইচ্ছা এবং আকাঙ্খাই বেশিরভাগ গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যায়। পান্ডুলিপিগুলোতে প্রায়ই যে ত্রুটি দেখা যায়, তাহলো, গল্প জুড়ে নায়ককে বেশ গতিশীল দেখা যায়। কিন্তু সবচেয়ে সংকটকালে সে হয়ে উঠে নিস্ক্রিয় এবং সময়মত বাইরের কোন শক্তির আগমন তাকে উদ্ধার করে। এরকম মূহুর্তে সবকিছুর উর্ধ্বে, নায়ককে হওয়া উচিত খুবই সক্রিয়, তার নিজের ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক। গল্পে নায়ককে নেয়া উচিত সুস্পষ্ট ভূমিকা, যাতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি নিয়ে তার দায়িত্ব পালন।

নায়কের নিজেকে উৎসর্গীকরণ

সাধারণতঃ মানুষ ভাবে যে, নায়ক হলো সাহসী ও শক্তিশালী। কিন্তু নিজেকে বিসর্জনের কাছে নায়কের এই গুণ দু’টো গৌণ। সত্যিকারের নায়ক নিজেকে বিসর্জনের জন্য প্রস্তুত। মূল্যবান কিছু ত্যাগের মাধ্যমে সে নিজেকে উৎসর্গ করে। এমনকি কোন আদর্শ বা দলের স্বার্থে নিজের জীবনকে দেয় বিসর্জন। বিসর্জন অর্থ ‘পবিত্র করে তোলা’। ,আদিকালে মানুষ বিসর্জন দিতো, এমনকি দিতো মানুষের জীবনও, আত্মিক পৃথিবীর কাছে নিজেদের ঋণ স্বীকার করার প্রয়োজনে; দেব-দেবী বা প্রকৃতির মত ক্ষমতাবান শক্তিধরদের সন্তুষ্ট করতে এবং তাদের প্রতিদিনের জীবন প্রক্রিয়াকে পবিত্র করার মানসে। মৃত্যু হয়ে উঠে তখন পাপ থেকে মুক্তির এক পবিত্র ধর্মীয় কর্তব্য।

মৃত্যুর সাথে বোঝাপড়া

প্রত্যেকটা গল্পের হৃদয়মূলে আছে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া। যদি নায়ক সত্যিকারে মৃত্যুর মুখোমুখি না হয়, তবে সেখানে জীবন বাজী রেখে কোন কিছু খেলতে নামে বা প্রেম করে, অথবা রোমাঞ্চকর দুঃসাহসিক অভিযানে অংশ নেয়ার মাঝে মৃত্যু ভয় বা প্রতীকি মৃত্যু রয়েছে। এসব পরিস্থিতিতে হয়তো নায়ক সফল হয়ে বেঁচে যাবে অথবা ব্যর্থ হয়ে মারা যাবে।

নায়কেরা আমাদের দেখায় কিভাবে মৃত্যুর মোকাবেলা করতে হয়। তারা মৃত্যু থেকে বেঁচে যেতে পারে, প্রমাণ করে দেখাতে পারে যে মৃত্যু এমন কঠিন কিছু না। তারা মারাও যেতে পারে (প্রতীকি মৃত্যু হিসেবে) এবং আবার জন্ম নিতে পারে, এটা প্রমাণ করতে যে, মৃত্যুকে অতিক্রম বা জয় করা সম্ভব। তারা মরতে পারে নায়কোচিতভাবে, মৃত্যুকে অতিক্রম করে স্বেচ্ছায় নিজেদের জীবন উৎসর্গের মাধ্যমে, কোন এক মহৎ উদ্দেশ্যে, আদর্শের জন্য অথবা তার দলের জন্য।

গল্পে সত্যিকারের নায়কত্ব দেখানো হয়, যখন নায়করা নিজেদের উপযুক্ত সময়ে উৎসর্গ করে। তাদের রোমাঞ্চকর অভিযান ধ্বংস, মৃত্যু বা বিপদ বয়ে আনলেও তারা স্বেচ্ছায় জীবনের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। দেশের জন্য সৈনিকরা যেমন তাদের জীবন দান করতে রাজী থাকে, ঠিক তেমনি নায়কেরা নিজেদের বিসর্জনের সম্ভাবনাকে গ্রহণ করে।

সবচেয়ে কার্যকর নায়ক তারাই, যারা কোন না কোন কিছু উৎসর্গ করেছে। এই কারণে তাদের হয়তো বন্ধু বা ভালবাসার কাউকে হারাতে হয়েছে। তাদের হয়তো নতুন জীবনে প্রবেশের স্বার্থে সযত্নে লালিত কিছু বদ-অভ্যাস বা খামখেয়ালীপনা পরিত্যাগ করতে হয়েছে। সম্ভবতঃ তারা তাদের কিছু জয় বা অর্জন নিয়ে ফিরে আসে অথবা ভাগাভাগি করে নেয়, যা তারা বিশেষ জগৎ (নায়কের কাছে সম্পূর্ণ নতুন ও অপরিচিত, তার নিজস্ব জগৎ হতে ভিন্ন, যেখানে তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী, চ্যালেঞ্জিং পরিবেশ বা শক্তির মুখোমুখি হতে হয়) হতে অর্জন করে। নায়কেরা হয়তো তাদের শুরুর স্থানে ফিরে যায়, তাদের গোত্র বা গ্রামে, এবং দলের অন্যদের সাথে ভাগ করে নেয় তাদের নিয়ে আসা আনন্দ সুখ-সুধা, খাদ্য অথবা জ্ঞান। মার্টিন লুথার কিং অথবা মহাত্মা গান্ধীর মতো মহান সাংস্কৃতিক নায়কেরা তাদের পরোপকারী আদর্শ বাস্তবায়িত করতে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে।

%d bloggers like this: